রেললাইনের মাঝখানে একা হাটছি, একটু পর ফিরে যাবো বাড়ী। সকালে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে কাউকে না বলেই জমির উপর দিয়ে হেটে একা চলে এসেছি রেললাইনে হাটতে! একটা সময় ছিলো আমি আর ফুপ্পি হাটতাম রেল লাইনে, দু-জন দু-জনের হাত ধরে। অনেক ধুর পর্যন্ত যেতাম আবার ফিরে আসতাম। ছোট ফুপ্পিও আমার মতো উড়ুউড়ু। আমার কেন জানি মনে হয় পরিবারের ছোট সন্তান গুলো এমন উড়ুউড়ু ঘুরু ঘুরু হয়! ফুপ্পি আর আমি হাটতাম, ফুপ্পি আমাকে নিয়ে যেতো গুচ্ছ গ্রামে, সেখানে গিয়ে ফুপ্পি অচেনা মানুষের সাথে কথা বলতো, কি ভাবে তারা থাকে ইত্যাদি জানতে চেতো! সেই সময় আমাদের গ্রামে ডাকাতিয়া নদীর উপর একটা ব্রীজ করছে , তখন ফুপ্পি আমাকে নিয়ে যেতো ব্রীজ দেখাতে। ফুপ্পি আমাকে পেলেই হতো ঘুরাঘুরি শুরু করতো। সারাদিন চিন্তা করতো কোথায় যাওয়া যায়! গ্রামে আসলে ফুপ্পি যেখানে নিয়ে যেতো, সেখানেই যেতাম। ব্রীজে যাওয়া নিয়ে একটা ঘটনা আছে। সেটা হল 'নদীর উপর যে ব্রীজ টা তৈরি হচ্ছিল তার চারপাশে শুধু পানি ছিল, আর পানি থাকবে এটাই স্বাভাবিক? ব্রীজের কাছে যাওয়ার ২ টা রাস্তা ছিলো। একটা গুচ্ছ গ্রামের ভিতর দিয়ে আরেক টা পানি দিয়ে! নদীর পানিতে বালি ফেলা হয়েছিল, পরেই রাস্তা তৈরি হল। আমরা ব্রীজে গেলাম গুচ্ছ গ্রাম দিয়ে। কিন্তু আসলাম পানির রাস্তা দিয়ে! তখন বর্ষা কাল ছিলো তাই পানি ছিলো প্রচুর, আমি ফুপ্পি আর বড় ভাইয়া বাড়ী ফিরছি। পানির নিচে বালু, আমি অনেক ছোট পানিতে হাটতে কষ্ট হচ্ছিল বার বার পা আটকে যাচ্ছিল। ফুপ্পি বড় ভাইয়াকে বলল সামনে থাকতে, আর সাবধানে হাটতে। আমি ফুপ্পির সাথে সাথে হাটছি। হঠ্যাৎ করে বালুর মধ্যে আমার পা আটকে গেলো, আমি কিছুতেই পা কে তুলতে পারছি না! ফুপ্পি তো হেটে সামনে চলে যাচ্ছে। তারপর আমার মনে হলো পড়ে যাচ্ছি! বড় ভাইয়া সামনে, ফুপ্পিও সামনে। আমি তাদের জোরে ডাকতেও পারছিলাম না, একটু পর আমি তলিয়ে যেতে থাকি। আমার নাক মুখ দিয়ে পানি ডুকে যায়। একটু পর ফুপ্পি পিছনে খেয়াল করে আমার নাম ধরে চিৎকার দিয়ে উঠে। কিন্তু ততক্ষনে আমি পানিতে হাবু ডুবু খাচ্ছি! একটা বাজে অবস্থা। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল, কাউকে ডাকতে পারছি না! তারাতারি ভাইয়া, ফুপ্পি কাছে আসে। ফুপ্পি আমাকে টেনে কোলে তুলে নেয়। আমি ফুপ্পিকে ধরে কান্না শুরু করি। ফুপ্পি বুঝতে পারে আমি অনেক ভয় পেয়েছি। বার বার মাথায় হাত বুলাতে থাকে আর বলতে থাকে,তুমি আমার সাথে ছিলে ওখানে গেলে কি করে? আল্লাহ মাফ করুক আজ কিছু হলে কি যে হতো? তোমাকে খুজে পাওয়া যেতো না। ভাই-ভাবী যে কি বলতো? সবাই আমাকে.......! ফুপ্পি আমাকে শান্তনা দিতে লাগল। কিছু হয়নি কিছু হয়নি বলে। সবার কথাই আমার কানে আসছিল। বড় ভাইয়া ফুপ্পি কে বলতে লাগল আর কোন দিন ব্রীজ দেখতে আসবো না আর আসলেও এই রাস্তা দিয়ে আসবো না। আজ ও যদি নদীতে তলিয়ে যেতো, আমরা যদি উঠাতে না পারতাম তাহলে যদি মারা যেতো তাহলে কি হতো? এই কথা বলে ভাইয়া কান্না করে দেয়। ফুপ্পির ভাইয়াকে বলল আমারি শিক্ষা হলো, ওকে হাতে ধরে রাখা উচিত ছিলো। আমি কি বুজেছি এমন কিছু হবে? ভাইয়া কে শিখিয়ে দিলো ঘরে গিয়ে যাতে কিছু না বলে তাহলে সবাই বকা দিবে। আমাকে ফুপ্পি বলল কাউকে কিছু না বলতে! ঘরে নিয়ে গিয়ে ফুপ্পি আমার হাতে পায়ে গরম তেল মালিশ করে আমাকে ঘুম পারিয়ে দেয়।'
রেললাইন দিয়ে হাটতেই চোখ পড়ে গেলো ব্রীজের দিকে, একবার ভাবলাম যাই ওখানে। কিন্তু গেলাম না! একটু পর ব্যস্ত তা বাড়বে চারপাশে, রোদ উঠেছে। একটু পর পর বাতাস বইছে, আমাকে বাতাস ছাড়িয়ে চলে যাচ্ছে। বাতাসের কারনে গাছের পাতা গুলো শব্দ করছে, খুব সুন্দর শব্দ হচ্ছে চারপাশে। সামনে না হেটে এবার ঘরে ফিরার উদ্দ্যেশে হাটতে শুরু করলাম। জমির উপর দিয়ে না গিয়ে ধুলো মাখা পথে হাটছি। আমি সব-সময় এমনি করি, গ্রামে গেলে যে পথ দিয়ে হেটে যাই পরের বার অন্য পথ দিয়ে ফিরে আসি। বাড়িতে ডুকলাম চাচীকে দেখলাম রান্না ঘরে কাজ করছে। আমার দিকে তাকিয়ে হাসি দিয়ে বলল কোথায় গিয়েছিলে? আমি কিছুই বললাম না! চাচী বলল নাস্তা তৈরি করবো একটু পর, এখন তুমি কি খাবে মুড়ি দিবো, ওটা খাবে না কি পিঠা বানিয়ে দিবো?
এবার আমি মৃদু হাসলাম বললাম কিছু করা লাগবে না, আপনি কাজ করেন। চাচি আচ্ছা বলে নিজের মনে কাজ করতে লাগল। দাদু বাড়িতে উনি একজন মানুষ যে সবাই কে দেখাশুনা করেন। সব কিছুর ব্যবস্থা করেন। আর কেউ গেলে অস্থির হয়ে যায় কি খাওয়াবে না খাওয়াবে। সব চাচীরা ঢাকা থাকে কেউ আবার বিদেশে! শুধু একমাত্র ছোট চাচী গ্রামে থাকেন দাদা-দাদীর দেখা শুনা করেন। আমি চলে গেলাম ছাঁদে একটা পাটি বিছিয়ে বসলাম ছায়াতে। একটু পর একটা ট্রেন গেলো, চোখ চলে গেলো সেখানে!
কেনো জানি মনে হল আমাদের জীবন টা ট্রেনের মতো, ট্রেন যেমন ছুটে চলছে জীবন ও .........! প্রতিটি ট্রেন একটি নিদিষ্ট স্টেশনে গিয়ে থেমে যায় আর জীবন ট্রেন যে, কোথায় গিয়ে থেমে যাবে কেউ যানে না। কিন্তু একটা স্টেশনে আমাদের সবাইকে যেতে হবে একদিন আর সেই স্টেশনের নাম 'জাগ্রতিক ছুটি'!!!
চলবে...................

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

