somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মরমী কবি সৈয়দ শাহ নূর (র.)

০২ রা অক্টোবর, ২০০৯ রাত ১:৪৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সূফী সাধক ও মরমী কবি সৈয়দ শাহ নূর (র.) সিলেটি নাগরী লিপিতে রচিত সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। তার রচিত পুথি 'নূর নছিয়ত' রচিত হয় ১২২৬ বাংলার (১৮১৯ খ্রিস্টাব্দ) ভাদ্র মাসে। হাতের লেখা পুথিটির পৃষ্ঠা সংখ্যা ২৭৩।
পুথি 'নূর নছিয়ত' রচনার সময় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রথমিক যুগ। তখন ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এক বছরের শিশু। মাইকেল মধুসুধনের জন্ম হয় পাঁচ বছর ও বঙ্কিম চন্দ্রের জন্ম হয় উনিশ বছর পর। 'নূর নছিয়ত' পুথির ভাষা ছিল সিলেটি জবানের।

গবেষকদের মতে সৈয়দ শাহ নূর (র.) এর সময়কাল ১৭৩০-১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দ। তিনি কোন সনে কোথায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন এ বিষয়ে তথ্য নির্ভর কোন বর্ণনা পাওয়া যায় না। অধিকাংশ গবেষকদের মতে তিনি মৌলভীবাজার জেলার লংলা পরগনার (কুলাউড়া উপজেলার) ঘর গাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন। সৈয়দ শাহ নূর (র.) সিলেট বিভাগের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সময়ে বসবাস করেছেন। রাজনগর উপজেলার জালালসাপ গ্রামে তার মাজার আছে। সৈয়দ শাহ নূর (র.) হযরত শাহজালাল (র.) এর সঙ্গীয় দরবেশ সৈয়দ শাহ আলাউদ্দিন (র.) এর পুত্র সৈয়দশাহ রোকন উদ্দিন (র.) এর অধঃস্থন পুরুষ। তার মায়ের নাম কলস বিবি। সৈয়দ শাহ নূর (র.) বিয়ে করেন রাজনগর উপজেলার কদমহাটা গ্রামের মুহাম্মদ দরছ মিয়া চৌধুরীর কন্যা হামিদা খাতুনকে। পরে তিনি জগন্নাথপুর উপজেলার সৈয়দপুর গ্রামে বসবাস করেন এবং সেখানে বিয়ে করেন সামিনা খাতুনকে। সৈয়দপুরে কয়েক বছর বসবাসের পর শাহ নূর আবার কদমহাটায় স্ত্রীসহ চলে আসেন। সৈয়দ শাহ নূর তিনটি বিয়ে করেন বলে তার গ্রন্থে উল্লেখ আছে।

সৈয়দ শাহ নূর (র.) এর জীবন ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে যারা আলোচনা ও গবেষনা করেছেন তাদের মধ্যে মরহুম আব্দুল জব্বার বি.এ, মরহুম আশরাফ হোসেন সাহিত্যরত্ন, মরহুম চৌধুরী গোলাম আকবর সাহিত্যভুষণ, মরহুম অধ্যাপক মোহাম্মদ আসাদ্দর আলী, মরহুম অধ্যাপক ফয়জুর রহমান, সৈয়দ মোস্তফা কামাল, মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান, তরফদার মুহাম্মদ ইসমাইল উল্লেখযোগ্য। মরমী সংগীতের রহস্যজাল বিংবা গানের বাণী ও সুর নিগূঢ় রহস্যের আত্মসমালোচনামূলক আলপন ভাববাদী মানুষকে নিয়ে যারা অন্য জগতে। মুসলিম ধর্ম প্রচারক সূফী দরবেশদের আগমনের সাথে সাথে এই আধ্যাতিক ভাবধারার সূচনা হয়। এই সব গানে ও গজলে আশিক-মাসুকের প্রেমালাপনই মরমী সাহিত্যের বিষয়বস্তু। সিলেটের মরমী সাহিত্যের পীর দাদাপীর হিসেবে সৈয়দ শাহ নূর (র.) কে মনে করা হয়। একদা চিশতিয়া তরিকার মরমী সাধকগণ সুবাসিত লুবান ও আতরের ঘ্রাণে ভরপুর ছিলেন। তাদের খানকায় যেভাবে মোমের মত জ্বলে উঠেছিল তা আজও অব্যাহত আছে।

মানব জীবন বহমান নদীর মত। গতি আছে স্থিতি নেই। এই জীবনই কালে কালে শিল্প সাহিত্যের উপধান। মানব জীবনের রহস্যঘেরা এবস তত্ত্বকথা যাদের বাণী ও সুরে ব্যক্ত হয়েছে সৈয়দ শাহ নূর (র.) অন্যতম। 'দেহা-হিয়া' তরা-মনা'-র পরিচয় করাতে শাহ নূর বলেনঃ-

তুমি চিনলানা-রে মন
একৈ মন্দিরে বাসা না হইল মিলন।।

একৈ আশা একৈ বাসা একৈ ঘরের ধন
একৈ ঘরে থাকতে কেনে না হৈল মিলন।।

আসিতে আসিলায় মনা একৈ সঙ্গী হইয়া
ভবেতে আসিয়া মনা রহিলায় ভুলিয়া।।

ভবেতে পরবেশ করি না চিনিলায় গিরি
নিশ্চয় জানিও তণু পরার অধিকারী।।

মায়া মধুর রস পাইয়া রহিলায় ভুলিয়া
যাইতে বাসর ছাড়ি না চাইব ফিরিয়া।।

সৈয়দ শাহ নূরে কৈন দুনিয়া মিছা মায়া
বাজিকরে বাজি দিয়া বন্দি কৈল কায়া।।

যেহেতু দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী । সবাইকে একদিন চলে যেতেই হবে। তাই দুনিয়ায় থাকতেই আখেরের কামাই করতে হবে।

সৈয়দ শাহ নূর (র.) বলেনঃ-

বন্ধু তোর লাইগা রে আমার তনু জর জর-
মনে লয় চলিয়া যাইতাম ছাড়িয়া বাড়ি ঘর।।

অরণ জঙ্গলার মাধে আমার ভাঙ্গা ঘর
ভাই নাই বান্ধব নাইরে কে লইত খবর।।

বটবৃক্ষের তলে আইলাম ছায়া পাইবার আশে
ডাল ভাঙ্গিয়া রৈদ্র পোহাইলাম আপন কর্ম দোষে।।

সৈয়দ শাহ নূরে কাঁন্দে গাঙের কূলে বইয়া
পার হইমু পার হইমু করি দিনত যায় মোর গইয়া।।

ভাব-ভাষা, উপমা-উৎপ্রেক্ষা ও রূপকের বাণী ও সুরকে বিশ্বের দরবারে পোঁছিয়ে দেয়া আমাদের কর্তব্য।
সৈয়দ শাহ নূর (র.) এর গ্রন্থ সমূহঃ-
১. রাগ নূর ২. নূর নসিয়ত ৩. নূরের বাগান ৪. মনিহারী। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে আব্দুল জব্বার প্রথম নাগরী লিপি থেকে বাংলায় "শাহ নূর গীতিকা' নামে সৈয়দ শাহ নূরের ৪৮টি গান প্রকাশ করেন। তার জীবনী নিয়ে আরও গবেষনা করলে তার জীবন সম্পর্কে আরও অনেক তথ্য জানা যাবে।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা অক্টোবর, ২০০৯ রাত ১:৪৮
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×