somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমলাতন্ত্র নিপাত যাকঃ শক্তিশালী জেলা পরিষদ সহ পূর্নাঙ্গ স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাই একমাত্র সমাধান পর্ব -১।

২১ শে ডিসেম্বর, ২০০৯ রাত ৯:২৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ভূমিকাঃ কিছু দিন আগে প্রধান মন্ত্রীর উপদেষ্টা মোদাস্ছের আলী বলেন সচিবরা সরকারের সাথে গতি রেখে কাজ করতে পারছে না। তারা তাদের সেই ফাইল চালাচালি দারি, কমা নিয়ে ব্যস্থ থাকা।

সেদিন আওয়ামীলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জনাব শেখ ফজলুল করিম সলিম এক আলোচনায় বলেন আমলাতন্ত্রের জন্য দেশের উন্নয়ন বাঁধাগ্রস্থ হচ্ছে।

এরকম হাজারো মন্তব্য বিভিন্ন সরকারের সময়ে সরকার দলীয় নীতি নির্ধারনী ব্যক্তিবর্গ সহ সুসীল সমাজের অনেকেই বলেছেন। এছারা এদেশের প্রতিটি সাধারন মানুষও তাদের অভিজ্ঞতা ও ধারনা থেকে আমলাতন্ত্রের কুচক্র সম্পর্কে একমত। তবে এত কালেও এদের সম্পর্কে আমরা সামান্যই কহিয়াছি আর বুঝিয়াছি আরও আল্পই। আমলাদের সম্পর্কে একটু বলিলেও একাধিক পাতা উভয় পিঠ জুরিড়া লিখিতে হইবে। এক কথায় বলিলে এই প্রাণীগনই আসলে এদেশের পথের ঘাটের মাঠের আকাশের নদীর গ্রামের শহরের এবং রাজধানীর দৈনন্দিন ও স্থায়ী দৃশ্যমান ও অদৃশ্য যা কিছুই দেখিনা কেন তার আশি শতাংশের জন্য দায়ী। গৃহপালিত অপ্রয়োজনীয় এই প্রাণীদের কর্মের প্রমান হাটে মাঠে ঘাটেই হাজার হাজার ছড়িয়ে আছে।

যদিও সাধারন মানুষ এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ আমলাতন্ত্রের দূরভীসন্ধি সম্পর্কে তাদের ক্ষুদ্র জ্ঞানে সামান্যই অনুধাবন করতে পারে তবুও অস্পষ্ট এই ধারনা থেকেই আজ আমারা একটা উপসংহারে আসতে পারি যে এই দেশের সমস্যার মূলে আছে আমাদের আমলাতন্ত্র।

সুতরাং প্রবলেটা বুঝতে না পারলেও সমস্যার লোকেশনটা আইডেন্টিফাই করতে পেরছি। আমলাতন্ত্র শুধু দেশের উন্নয়ন বাঁধাগ্রস্থ করছে না বরং সমগ্র দেশটাকে সেই স্বাধীনতার পর থেকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। খেয়ে খেয়ে আঁখে ছাবা বানাচ্ছে আবার সেই ছাবা তুলে আবার খাচ্ছে। এই আমলাতন্ত্র থেকে বের হতে হলে আমাদের কয়েকটা মৌলিক বিষয় বুঝতে হবে। ১. আমলাতন্ত্রের উৎপত্তি। ২. আমলাদের ইতিহাস। ৩. বর্তমানে আমলাতন্ত্রের অবস্হা। ৪. পূর্নাঙ্গ স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় আমলাতন্ত্রের ভূমিকা।

আমলাতন্ত্রের উৎপত্তিঃ এ বিষয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রধান মন্ত্রীর উপদেষ্টা জনাব মোদাস্ছের আলীর সম্প্রতী মন্তব্যটি লক্ষ্য করা যেতে পারে। তিনি বলেন সচিবরা সরকারের সাথে গতি রেখে কাজ করতে পারছে না। তারা তাদের সেই ফাইল চালাচালি দারি, কমা নিয়ে ব্যস্থ থাকা। আরে না, জনাবেরা শুধুমাত্র দারি কমা না সেই সাথে দক্ষ কেরানীর মত এতকাল শুধু বানান নিয়াই আছেন ইহাই তাদের অন্তিম লক্ষ্য। পদবীর ও দায়িত্বের সোপানে যত উপরে যাবেন কেরানীগিরির এই দক্ষতাও তত বেশী পরিলক্ষিত হবে। কারন তাহারা যেসমস্ত প্রাকটিস বিধি বিধানের আওতায় থাকিয়া কর্ম সম্পাদন করে তাহা ইহাদের এই শিক্ষাই দেয়। আর এই বিধি বিধান ও এর আওতায় এই শ্রেণী তৈরী করা হয়েছিল সেই উপনিবেশ আমলে যা পাকিস্তান আমলে এ পুর্নাংঙ্গতা লাভ করে ছিল। স্বাভাবিক নিয়মেই তৎকালীন শাসক শ্রেণীর প্রয়োজন ছিল ভৃত্যের, কেরানীর। দেশ প্রেমীক বা দেশের জন্য চাকরী করবে এমন চাকর তৎকালীন মালিককের জন্য ছিল বিপদজনক। একটু খেয়াল করে দেখুন আমলারা কখনও দেশের জন্য চাকরী করে না। করে মনীবের জন্য এবং নিজের জন্য। আমলাতন্ত্রের জন্মের পর থেকেই জী হুজুরপনা এদের মানসিকতায় ও কর্মে ঢুকে গেছে সেখানে দেশ ও জনগনের কোন স্থান নেই। কালের পরম্পরায় আমরা স্বাধীন হয়েছি নিজেদের দেশ হয়েছে কিন্তু প্রথম থেকেই আমরা আমাদের স্বাধীনতা পূর্ব আমলাতন্ত্র বিধিবিধান এবং তৎকালীন আমলাদের ধারাবাহীকতায় কোন পরিবর্তন আনতে পারিনি। সেদিন যেই প্রশিক্ষিত আমলারা ছিল যেসমস্ত কেরানি তৈরীর নিয়ম কানুন ছিল সেগুলিই দিয়েই যাত্রা শুরু করে সদ্য স্বাধীন দেশ। এখনও পাকিস্তানী সিভিল সার্ভিসের, পাকিস্তানে দেশ প্রেমের দিক্ষায় দিক্ষিত সিএসপির, ভূত ৪৫ বছর বয়সের বেশি সমস্ত আমলার মানসপটে স্পষ্ট আছে এদের কর্মকাল শেষ হওয়ার আগে এই দেশে রাষ্ট্র যন্ত্রের কোন পরিবর্তন সম্ভব না আমার এই উক্তি দিবালোকের মত সত্য। বিষয়টা ভালো ভাবে বোঝার জন্য নিচের কর্মকর্তা গোষ্ঠির দিকে খেয়াল করা যেতে পারে।

এরা বর্তমানে সরকারের প্রবীন ডেপুটি সেক্রেটারী স্টেটাস থেকে সেক্রেটারী স্টেটাস পর্যন্ত আবার কেউ কেউ অবসর গ্রহনের পরও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে চুক্তিতে বা কোন সাংবিধানিক পদে বসে আছে। যেমন সাদাত হোসেন পি এস সি চেয়ারম্যান। ডিএস এবং যুগ্ম সচিব যারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্নধার। মন্ত্রনালয়ের সচিবগনতো আছেই। নির্বাহী প্রকৌশলী সহ চীফ ইন্জিনিয়ারগন। বিভাগীয় কমিশনার থেকে অনেক জেলা প্রশাসকগন।

আমলারা দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সেই পুরোন আমলের নথিতেই ডিটো বা ঐ দিয়ে শুরু করে। স্বাধীন যুদ্ধ বিদ্ধস্থ দেশে সেই পুরোন নিয়ম কানুন আর সেই পুড়োন আমলাতন্ত্র দিয়েই প্রশাসন যন্ত্র শুরু হলো। পাকিস্তানের সিএসপি কর্মকর্তাগনই সচিব যুগ্ম সচিব প্রধান প্রকৌশলী ইত্যাদি হয়ে বসলেন। এই লোকগুলি পাকিস্তানের লাহোরে দুই বছর মেয়াদী বুনিয়াদী প্রশিক্ষন সহ এদেশের মানুষকে শোষনের জন্য উচ্চ পর্যায়ে প্রশিক্ষীত ও পাকিস্তানী দেশ প্রেমের দিক্ষায় দিক্ষিত এবং পরীক্ষিত এক এক জন। এরা শুরু থেকেই দেশটাকে এদের আজীবন সম্পদে পরিণত করার প্রকল্প হাতে নিয়েছিল। প্রশাসনের সব কিছুকে সাধারন জনসাধারনের জন্য নিষিদ্ধ এবং সংরক্ষীত এলাকা হিসাবে গড়ে তুলতে লাগল। সে দিনের সেই সিএসপিগন সম্প্রতী সময় পর্যন্ত বহাল থেকে পুরো প্রশাসন যন্ত্রের মানসীকতা জনগন বিরোধী হিসাবে সুদৃঢ় করে তুলেছে।


আমলাদের ইতিহাসঃ ব্যতিক্রম ও সাধারন সৈনিক বাদে বাংলার আর্মি অফিসারেরা যেমন যুদ্ধ করেছিল দ্যাশটা স্বাধীন হলে তারা কর্নেল হতে পারবে জেনারেল হতে পারবে এই আশায় আমলারাও যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল তারা যুগ্ম সচিব, সচিব ইত্যাদী হইবো বইলা। দ্যাশটা পাকিস্তান থাকলে কোন কালেও পূর্ব পাকিস্তানের অফিসাররা সচিব হবে সে ছিল দুরআশা। সে সময়ে হাতে গোনা কিছু কর্মকর্তা বাদ দিলে বাকিদের কিত্তিকলাপ সুবিধা বাদীই ছিল তার প্রমান পাওয়া যায় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিভিন্ন লেখায়। এখানে এরকম দু একটি উল্লেখ করা হলোঃ

১. ১৯৭১ সালে জুলাই আগষ্ট মাসে প্রবাসী সরকার সেই পুরোনো ঔপনিবেশিক ধাচেই বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং সচিবালয় গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়। সে সমস্ত আমলারা সীমান্ত পেরিয়ে কোলকাতায় আশ্রয় নিয়েছিল তাদের নিয়েই গঠিত হয়েছিল এ সমস্ত আমলাতান্ত্রিক সংগঠন। কিছু তরুণ দেশপ্রেমিক আমলা এ ধরনের উদ্যোগের অসাড়তা উপলব্দি করে ঐ সমস্ত মন্ত্রণালয় এবং সচিবালয়ে যোগদানের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠে। পরিবর্তে তারা মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যোগদান করে প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন। ।

২. সেই সময় ৫৮ নং বালিগঞ্জ, কোলকাতা ছিল মুজিব নগর সরকারের পিঠস্থান। লোকাকির্ণ ছোট্ট একটা জায়গা। সবসময় অসংখ্য লোকজন ভীড় করে থাকে। নিরাপত্তা রক্ষা করা দুঃস্কর, কথাটা অতি সত্য। অসংখ্য লোকে ঠাসা ঠাসি কেউবা উচু নেতা, কেউবা জাদরেল আমলা। সবার পরিধানে নতুন নতুন কাপড়-চোপড়। হাল ফ্যাশনের অন্ত নেই। দিব্যি হেলেদুলে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এ সমস্ত ভিআইপি ব্যক্তিদের প্রত্যেকের হাতে একটা নতুন ব্রিফকেস কিংবা ছোট এট্যাচী। কারও কারও কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ। তারা যা কিছুই করছেন এ সমস্ত জিনিসগুলোও থাকছে তাদের সাথে সাথে। এমনকি প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে যাবার সময়ও সেগুলো সাথে নেয়া হচ্ছে, পাছে হারিয়ে যায়। ব্যাপার কি? এ সমস্ত ব্রিফকেস, এট্যাচী এবং ঝোলায় কি এমন দুর্লভ জিনিষ রয়েছে ভেবেই পাচ্ছিলাম না। রহস্যটা উৎঘাটন হল কিছুদিন পর।

সমস্ত ডিস্ট্রিক্ট ও সাব-ডিভিশন থেকে মুক্তিফৌজের সাথে বর্ডার ক্রস করে আসার সময় ব্যাংক ট্রেজারীগুলো সব উজাড় করে নিয়ে এসেছেন স্থানীয় প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিরা। যার ভাগ্যে যতটুকু পরেছে সেগুলো রাখা আছে এ সমস্ত ব্রিফকেসে, এট্যাচীতে এবং ঝোলায়। তাই এগুলোকে এভাবে হেফাজত করা হচ্ছে।

৩. একদিন কোন এক অজানা মহারথী তার মাথার নিচে ব্রিফকেসটা রেখে খাবার পর সুখনিদ্রা দিচ্ছিলেন। ঘুমের ঘোরে ব্রিফকেসটা মাথার নিচ থেকে সরে গিয়েছিল। আশেপাশে কাউকে না দেখে সেটা চট করে তুলে নিয়ে খুলে ফেললাম। ভদ্রলোকের ব্রিফকেসে তালা ছিল না। খুলতেই চোখ চড়কগাছ! একি! থরে থরে সাজানো পাকিস্তানী পাচঁশত টাকার নোটের বান্ডিলে ব্রিফকেসটা বোঝাই। ব্রিফকেসটা নিয়ে আমরা চুপিসারে কেটে পড়লাম। কিছুক্ষণ পর ঘুম থেকে উঠে ভদ্রলোক তার ব্রিফকেসের হদিস না পেয়ে সারা বাড়ি মাথায় তুলে হায় হায় করতে লাগলেন। আরদালীকে পাঠিয়ে ভদ্রলোককে ডেকে পাঠালাম। তিনি এলেন। জিজ্ঞেস করলাম,
-কি ব্যাপার? এতো হৈ চৈ করছেন কেন?
-আমার ব্রিফকেস চুরি হয়ে গেছে। তিনি কাদো কাদো হয়ে বললেন।
-কি ছিল তাতে?
-আমার কিছু কাপড় ও প্রয়োজনীয় জরুরী কিছু কাগজপত্র ছিল।

টাকা সম্পর্কে সবটাই গোপন করলেন ভদ্রলোক। ইতিমধ্যে একজন উঠে গিয়ে পাশের ঘরে কর্নেল ওসমানীকে সবকিছু খুলে বলেছে। সব শুনে কর্নেল ওসমানী আমরা যে ঘরে বসেছিলাম সেখানে আসেন। তিনি ভদ্রলোককে অনেকভাবে জেরা করেন। ভদ্রলোক টাকার কথা সম্পূর্ন চেপে গিয়ে ঝোলাতে শুধু কিছু কাপড় ও জরুরী কাগজপত্র ছিল সে কথাই কর্নেল ওসমানীকে জানান। সব শুনে কর্নেল ওসামানী আমাদের আদেশ করেন ব্রিফকেসটি ভদ্রলোককে ফিরিয়ে দিতে। ইতিমধ্যেই ব্রিফকেস থেকে প্রায় ১২ লাখ টাকা আলাদা করে রেখে দেওয়া হয়েছিল। কাপড়-চোপড় ও কিছু কাগজপত্রসহ ব্রিফকেসটি ভদ্রলোককে ফিরিয়ে দেয়া হয়। তিনি তাড়াতাড়ি ব্রিফকেস খুলে দেখেন টাকা ছাড়া অন্য সবকিছুই ঠিক আছে। তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়। কিন্তু অবস্থা বেগতিক বুঝে ব্রিফকেস বন্ধ করে নিয়ে আমাদের ধন্যবাদ জানিয়ে সুর সুর করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। এরপর সেই ভদ্রলোককে আর কখনও দেখিনি পুরো ৯ মাস সংগ্রামকালে।

৪. শুধুমাত্র বগুড়ার ষ্টেট ব্যাংক থেকে লুট করা হয়েছিল ৫৬ কোটি টাকার উপর। এ সমস্ত লুটপাটের সাথে জড়িত ছিলেন আমলাদের একটা অংশ। চিহ্নিত কিছু আমলা তখন আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছিলেন। বাড়ি, গাড়ী, সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছিলেন ঐ সমস্ত অসৎ ব্যক্তিরা।

৫. তখন এ বিষয়ে সাধারন মুক্তিযোদ্ধাদের ভেতর ক্ষোভ সৃষ্টি হলে নেতৃবর্র্গের কথা ছিল অবশ্যই এ সমস্ত অসৎ ব্যক্তিদের শাস্তি পেতে হবে, কিন্তু সেটা দেয়া হবে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রকাশ্যে গণআদালতে।” তার কথা মেনে নিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে গণআদালত তো দূরের কথা কোন কোর্ট-আদালতেও ঐ সমস্ত অপরাধিদের বিচার হয়নি। কারণ এ সমস্ত অসৎ কার্যক্রমের সাথে প্রশাসনের প্রায় সব রুই-কাতলাই জড়িত ছিলেন। রক্ষক যখন ভক্ষক হয়ে উঠে তখন অবস্থা বেসামাল হয়ে পড়ে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অবস্থা হয়েছিল ঠিক তাই। লুটপাট, চুরি-চামারির বিচারের পরিবর্তে এ সমস্ত জাতীয় স্বার্থ বিরোধী কার্যকলাপের মাত্রা গিয়েছিল অনেক বেড়ে। লুটপাট সমিতির কার্যকলাপে কিভাবে মুক্তিযুদ্ধের তথা সমস্ত বাঙ্গালী জাতির ভাবমুর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছিল তার কয়েকটি বিবরণ নিচে দেয়া হল:-

লুটপাট সমিতির সদস্যরা তখন কোলকাতার অভিজাত পাড়াগুলোতে এবং বিশেষ করে পার্ক ষ্ট্রিটের হোটেল, বার এবং রেস্তোরাগুলোতে তাদের বেহিসাবী খরচার জন্য ‘জয় বাংলার শেঠ’ বলে পরিচিত। যেখানেই তারা যান মুক্তহস্তে বেশুমার খরচ করেন। থাকেন বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কিংবা হোটেলে। সন্ধ্যার পর হোটেল গ্র্যান্ড, প্রিন্সেস, ম্যাগস, ট্রিংকাস, ব্লু ফক্স, মলিন র্যু, হিন্দুস্তান ইন্টারন্যাশনাল প্রভৃতি বার রেষ্টুরেন্টগুলো জয়বাংলার শেঠদের ভীড়ে জমে উঠে। দামি পানীয় ও খাবারের সাথে সাথে পাশ্চাত্য সঙ্গীতের আমেজে রঙ্গীন হয়ে উঠে তাদের আয়েশী জীবন। বয়-বাবুর্চিরাও তাদের আগমনে ভীষণ খুশি হন। এমনই একজন নেতা তার দলবল নিয়ে প্রত্যেক দিন হোটেল গ্র্যান্ডের বারে মদ্যপান করতেন। তিনি বগুড়া ব্যাংক লুটের টাকার একটা বিরাট অংশ কব্জা করেছেন কোনভাবে। তার কাছে রয়েছে প্রায় চার কোটি টাকা। একদিন মধ্যরাতে তিনি হোটেল বারে গিয়ে মদ পরিবেশন করার জন্য বারম্যানদের হুকুম দেন। বারম্যানরা কাচুমাচু হয়ে তাকে জবাব দেয় সময় শেষ হয়ে যাওয়ায় বার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। জবাব শুনে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন বাঙ্গালী শেঠ। টলমল অবস্থায় চিৎকার করে বলতে থাকেন, তিনি হোটেলটাই পুরো কিনে নিতে চান। বেসামাল কিন্তু শাসালো খদ্দের, তাই বারম্যানরা চুপ করে সবকিছু হজম করে যাচ্ছিল। শেঠ আবোল-তাবোল বকে পরে একজন বারম্যানকে হুকুম দেন, কাল বার খোলার সময় থেকে বন্ধ করার আগ পর্যন্ত তিনি ও তার সঙ্গীগণ ছাড়া অন্য কাউকে মদ পরিবেশন করা যাবে না। তারাই শুধু থাকবেন বারে। তার হুকুম শুনে বারম্যান ম্যানেজারকে ডেকে পাঠায়। ম্যানেজার এলে শেঠ তাকে প্রশ্ন করেন,
-রোজ আপনাদের বারের সেল কত টাকা?
ম্যানেজার একটা অংক তাকে জানায়। শেঠ তখন তাকে তার সিদ্ধান্তেরর কথা জানিয়ে বলেন পুরোদিনের সেলের টাকাই তিনি পরিশোধ করবেন। পুরো টাকার মদ ওরা খেয়ে শেষ করতে না পারলে বাকি মদ যেন তার বাথরুমের টাবে ভরে দেবার ব্যবস্থা করা হয়। তিনি তাতে গোসল করবেন। ম্যানেজার তার কথা শুনে ’থ হয়ে গিয়ে মাতালের প্রলাপ মনে করে কোন রকমে সেখান থেকে কেটে পড়েন।

৬. আর একদিন আর একজন শেঠ তার পুত্রের প্রথমবারের মত জুতো পরার দিনটি উৎযাপন করার জন্য ব্লু ফক্স রেষ্টুরেন্টে প্রায় ১০০ জনের একটি শানদার পার্টি দেন। এছাড়া অনেক শেঠরা দিল্লী এবং বোম্বেতে গিয়ে বাড়িঘর কিনতে থাকেন। অনেকে আবার ফিল্ম ইন্ডাষ্ট্রিতেও বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হয়ে উঠেন। তাদের এ সমস্ত কির্তিকলাপের ওপর শহীদ জহির রায়হান একটি প্রামাণ্য চিত্র তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তার এ অভিপ্রায়ে অনেকেই ভীষণ অসন্তুষ্ট ছিলেন তার উপর। অনেকে তার এ ঔদ্ধত্ত্বে ক্ষেপেও গিয়েছিলেন। তার রহস্যজনক মৃত্যুর পেছনে এটাও একটা কারণ হতে পারে। কোন এক নায়িকার জন্মদিনে তখনকার দিনে তার এক গুণমুগ্ধ ভক্ত তাকে ৯ লক্ষ টাকা দামের হীরের নেকলেস্ উপহার দিয়েছিলেন।

৭. দরগা রোডের বিশু বাবুর বাড়িতে থাকতেন মন্ত্রী পরিষদের পরিবারবর্গ। প্রবাসী সরকারের টাকার প্রায় সবটাই কালো কালো ট্রাঙ্কে ভরে রাখা হয়েছিল বিশু বাবুর বাড়িতে এবং ৩নং সোহরাওর্য়াদী এ্যাভেনিউ এর তিন তলার ছাদের দু’টো কামরায়। সেখানে থাকতেন অর্থসচিব। এ টাকার কোন হিসাব ছিল না। কোলকাতার বড় বাজারের মারোয়াড়ীদের সাহায্যে এগুলোর এক্সচেঞ্জ করা হত। এ কাজের দালালী করেও অনেকে কোটিপতি হয়ে উঠেন রাতারাতি। বগুড়ার ষ্টেট ব্যাংক ছাড়াও মোটা অংকের টাকা নিয়ে আসা হয়েছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম ও পাবনার ট্রেজারি থেকে। সে টাকারও কোন সুষ্ঠ হিসাব পাওয়া যায়নি।

৮. যুদ্ধবিদ্ধস্থ বাংলাদেশেও আমলান্ত্র কিভাবে স্বাধীনতার সমস্ত অর্জন নীড়বে খেয়ে যাচ্ছিল তার প্রমান পাওয়া যায় বঙ্গবন্ধুর দেয়া নানা জনসভায়। যেমনঃ ১৯৭৫ সালের ২৬শে মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু তার রাজনৈতিক জীবনের শেষ জনসভায় বক্তব্যের একটি অংশ ছিল এরকমঃ

"একটা কথা জিজ্ঞেস করি আপনাদের কাছে, মনে করবেন না কিছু। না আমাদের কাছে জিজ্ঞেসা করি, খালি আপনাদের কাছে জিজ্ঞেসা করব কেন, আমি তো আপনাদেরই একজন।

আমাদের লেখপড়া শিখাইছে কিডা ? আমাদের বাপ মা।আমরা কই বাপমা।

আমাদের লেখাপড়া শিখায় কে ? আমাদের ডাক্তারী পাশ করায় কে ? ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করায় কে ? আইজ সাইন্স পাশ করায় কে ? আর বৈজ্ঞানিক করে কে ? আইজ অফিসার বানায় কে ? কার টাকায় ?

-বাংলার দূঃখি জনগনের টাকায়।

আপনাদের কাছে আমার জিজ্ঞাসা। শিক্ষীত ভাইরা এই জনগন আপনার লেখাপড়ার খরচ দিয়েছে শুধু আপনার সংসার দেখার জন্য নয়। শুধু আপনার ছেলে মেয়ে দেখার জন্য নয়।
দিয়েছে, তাদের আপনি কাজ করবেন সেবা করবেন।
তাদের আপনি কি দিয়েছেন ? কি ফেরত দিচ্ছেন ? কতটুকু দিচ্ছেন ?

কার টাকায় ইঞ্জিনিয়ার সাব ? কার টাকায় ডাক্তার সাব ? কার টাকায় অফিসার সাব ? কার টাকায় সচিব সাব ? কার টাকায় মেম্বার সাব ? কার টাকায় সব সাব ?

সমাজ যেন ঘুনে ধরে গেছে এই সমাজকে আমি চরম আঘাত করতে চাই।"

চলবেঃ
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে ডিসেম্বর, ২০০৯ রাত ৯:৩১
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×