somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শীত সংকট ও আমাদের অবস্থান

১২ ই ডিসেম্বর, ২০০৯ রাত ১১:২৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

শীত যে এদেশের জনগণের জন্য এক জীবন সংহারী সংকট সে কথা বলতে আমাদের বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই। একদিকে শীতার্ত মানুষের দেহের কম্পন আমাদের মানবিক অনুভূতিকে নাড়া দেয় অপরদিকে এদেশের তাবেদের শাসক শ্রেণী গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার নামে শোষণ ও শাসন করার নানারকম পথ আবিষ্কারের চিন্তা করে। ক্রমে ক্রমে বেড়ে চলে সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচারের স্টিম রোলার। প্রশ্ন এসে উপস্থিত হয় শীতের এই সংকট কি নিছক শৈত্যের সংকট নাকি আমাদের দেশের বিদ্যমান শোষণ ও লুন্ঠনমূলক শাসনব্যবস্থা এর জন্য দায়ী? উত্তর বৈষম্যমূলক আর্থ সামাজিক অবস্থা এর জন্য দায়ী।

যে সত্য আমাদের সামনে হাজির হয় তা আমরা অকপটে বলে ফেলি। শীত সংকট কোনো প্রাকৃতিক দৈব-দুর্বিপাক নয়,সাম্রাজ্যবাদ ও তার তাবেদার শাসকগোষ্ঠীর শোষণের ফল। যে বস্ত্রের অভাবে এদেশের সাধারণ মানুষ শীতের কবলে মৃত্যু বরণ করে সেই বস্ত্রখাত থেকে শ্রমিক শোষণকারী পুঁজিপতিরা লাভ করে এদেশের জাতীয় আয়ের প্রায় সিংহ ভাগ। তার বিনিময়ে শ্রমিককে কোনোভাবে বেঁচে থাকার নুন্যতম সুযোগটুকু দেয়া হয় না। আমাদের কৃষিসহ সব ধরণের অর্থনৈতিক খাত কে সাজানো হয়েছে এই একই ভাবে। পরাধীন এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যদিয়ে জনগণের স্বাধীনতা অর্জন করা সম্ভবপর নয়।

মৌলিক প্রয়োজন বা মৌলিক অধিকার যা বলি না কেন এগুলো নিয়ে বেঁচে থাকা আমাদের জন্য কষ্টসাধ্য!

অথচ, দীর্ঘদিন ধরে এদেশের মানুষ স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন করার আশা নিয়ে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রাম করে যাচ্ছে অবিরত। আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে নিজেরা বারবার জাতীয় গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের লক্ষ্যে নিয়োজিত রেখেছে। তবে তাদের স্বপ্ন শুধু স্বপ্ন রয়ে গেছে। শুধু তাই নয় জনগণ বারবার হয়েছে প্রতারিত এই তাবেদার শাসকশ্রেণীর রোষানলে পড়ে।
কৃষির ক্ষুদ্রাকার ও পশ্চাৎপদ অবস্থা আজো অটুট রয়েছে আমাদের দেশে। সাম্রাজ্যবাদী সার বীজ উচ্চমূল্যে কেনা,সরকারি ক্রয়কেন্দ্র ও ফড়িয়াদের কাছে সস্তায় ফসল বিক্রি করা,বর্গার ভাগ, এনজিও, আর মহাজনী সুদ কেবল নিঃস্ব করে দিচ্ছে কৃষকদের। বাড়ছে সর্বগ্রাসী বেকারত্ব আর অভাব। মানুষ আসছে শহরের দিকে।

কোথাও নেই জনগণের উপযোগী কোনো শিল্প। বৃটিশ আমল থেকে এদেশের কল- কারখানা তৈরি হয়েছে সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থে। প্রয়োজনের তুলনায় ব্যাপক শিল্পায়ন আজ আর সম্ভব হচ্ছে না। ভারতীয় পণ্যের কবলে ধ্বংস হচ্ছে আমাদের দেশীয় শিল্প। গড়ে উঠছে ইপিজেড। কাজ জুটছে কম। দেশ বিদেশের শোষকেরা সস্তা মজুরি দিয়ে কেড়ে নিচ্ছে শ্রমজীবী মানুষের শ্রম।

দেয়ালে পিঠ ঠেকলে প্রতিবাদ করে শ্রমজীবী এসব বঞ্চিত মানুষেরা। তখন রাষ্ট্রের পেটোয়া বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের তথাকথিত কৌশলের নামে চালায় অত্যাচার, নিপীড়ন, অবৈধ আটক এমনকি গুলি! মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে একেকটি তাজা প্রাণ, রাজপথ ভাসে রক্তে, নিঃস্ব হয় একেকটি পরিবার। ক্ষতির দায়ভার নেবে কে? এ ক্ষতির দায়ভার কি রাষ্ট্রের উপরে পড়ে না?

ঘামে করা হাজার কোটি টাকার শীতবস্ত্র ও বস্ত্র এদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য। তাহলে দেশে শীতের কবলে এত মানুষ মরে কেন? কার নির্দেশে পরিচালিত হয় এদেশের পোশাক শিল্প প্রশ্নের উত্তর আমাদের অজানা থাকার কথা নয়। এটা হল সাম্রাজ্যবাদকে সেবা করার অর্থনীতি।

দেশের সম্পদশালী মানুষ ও বিত্তবানেরা উৎপাদন করে এদেশের সাধারণ জনগণের ভাগ্যকে পরিবর্তন করার নেশায় নয়। বরং সস্তা শ্রমের যোগানদার হিসেবে দালালীর টাকায় ধনবান হতে চায়। এটা হল দালার শাসক শ্রেণীর অর্থনীতির চিত্র।

শুধু তাই নয় বিপর্যস্ত অর্থনীতি যে কৃষক শ্রমিকদের উদ্বাস্তু করছে, তারা ভীড় করছে শহরে, ফুটপাতে, রাস্তায় কিংবা বস্তিতে।

বিপরীতে গার্ডেন সিটি, মডেল টাউন, ন্যাম ফ্লাট টাওয়ার আর টাওয়ার এসব কি সাক্ষ্য দিচ্ছে? দুর্নীতি আর দেশ বিক্রির কালো টাকা বিনিয়োগ করা হচ্ছে জমিতে, দালাল নির্মাণে আর ফ্লাট কেনায়। চলছে রমরমা রিয়েল এস্টেট বিজনেস, দালানের জায়গা ছেড়ে দিতে পুড়ছে বস্তি। শুধু তাই নয় অপুষ্টিজনিত রোগে মরছে অনেক শীতার্ত মানুষ। দেশে শিশুদের ৯০ ভাগ আর মোট জনসংখ্যার ৫০ ভাগ অপুষ্টির শিকার।

মঙ্গা, খাদ্যভাব আর জনস্বাস্থ্যের দুর অবস্থার এই দেশে চলছে প্রাইভেট হাসপাতাল আার ক্লিনিকের প্রসার, চলছে টিভি- পত্রিকায় রেসিপির প্রতিযোগিতা। শীতার্ত শিশুটির গোঙানির শব্দ ছাপিয়ে তালে তালে শীত পোশাকের ফ্যাশন প্যারেড, পত্রিকা জুড়ে রঙিন খবর, রিহ্যাব মেলা, সিনেমা টিভিতে বিলাস বহুল ফ্লাটের চাকচিক্য, শপিং মলের জৌলুস এসব হয়ে উঠেছে অর্থনীতির প্রকাশ, শাসক শ্রেণীর সংস্কৃতির অংশ।

শীত সংকটকে ঘিরে নানা প্রতারণার পথ উন্মুক্ত। একদিকে শীত সংকট কে প্রাকৃতিক দুর্যোগ-দুর্বিপাক বলে এদেশের শাসকশ্রেণী শোষণমূলক সমাজ ব্যবস্থকে আড়াল করে; অন্যদিকে ত্রাণ সহায়তা, মানব সেবার আফিম দিয়ে শাসকশ্রেণীর পত্রিকাগোষ্ঠী, এন.জি.গুলো সমাজের প্রগতিশীল অংশকে বুঁদ করে তাদের দিয়েই সমাজের দুষ্টুক্ষতে প্রলেপ দেয়ার চেষ্টা করে। এগুলো যে শীত সংকটের প্রকৃত কোনো সমাধান নয় বরং প্রতারণার নিত্য নতুন কৌশল তা উপলব্ধি করা এখন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।

আমরা চাই সংকটের প্রকৃত সমাধান। সবার জন্য নয় প্রধানত এদেশের কৃষক শ্রমিক মেহনতি মানুষের ওপর জেঁকে আছে শীত। দেশি- বিদেশি শাসক শ্রেণীর তীব্র শাসন আর শোষন এর জন্য দায়ী। তাই এ শাসক শ্রেণী জনগণের এ সংকট কে কোনোভাবেই মুক্ত করতে পারে না। তাই শীত সংকটের সমাধান চুড়ান্ত অর্থে রাজনৈতিক। এ জন্য দরকার কেবল জনগণের শক্তির জাগরণ আর বৈষম্যমূলক সমাজ ব্যবস্থার উচ্ছেদ সাধন। জনগণের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল যদি বিকশিত হয় তবে আমরা আমাদের এ দেশ কে নিজেদের স্বপ্নের মত গড়ে নিতে পারব সে দিন বুঝি আর বেশি দূরে নেই।

শীতার্তদের বাঁচার লড়াইয়ে সামিল হোন
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই ডিসেম্বর, ২০০৯ রাত ১১:৩২
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×