এই ব্যাপারটা গ্রামে গনজে ঘটলে মানায় এবং পুরোপুরি বিশ্বাসযোপ্যতা পায়। কিন্তু খোদ রাজধানীর বুকে - এই ঘটনা ঠিক বিশ্বাসযোগ্য না।
তবু নিছক কৌতুহলের বশে সন্ধ্যার দিকে এক বন্ধু নিয়ে ঐ এলাকায় গেলাম। গিয়ে পুরোপুরি হতভম্ব। পায়ে শিকল, ছেলেটা দুচোখে রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে বসে আছে।
দারোয়ান জানালো , ছেলেটাকে যিনি বেঁধে রেখেছেন, তিনি বর্তমানে ঢাকায় নেই, তাবলিগের কাজে চিটাগাং গেছেন, তবে ঐ ভদ্রলোকের ভাই আছেন, যিনি এই বাড়ির মালিক।
আমার আগমনের খবর পেয়ে ঐ ভদ্রলোক চলে এলেন। গায়ে সুতির পাঞ্জাবি। আমি অসম্ভব ভীতু ধরণের ছেলে। ঐ লোকের ভাবটাব দেখে আমি ফোনটোন দিয়ে দু তিনজন বন্ধুকে খবর দিয়ে নিয়ে এলাম। হাসান , মনজুরুল- এলো। আর তৌহিদ তো আমার সাথেই ছিল। যিনি খবরটা দিয়েছিলেন সেই আসাদ ভাই ফিরোজকে নিয়ে চলে এলেন। এবার আমরা মোটামুটি দলে ভারী হলাম।
তবুও ঐ ভদ্রলোকের কাছে আমরা নস্যি। তিনি আমাদের তুমি তুমি করে গরম গরম বক্তৃতা দিতে লাগলেন। কোন পুলিশ তার বন্ধু, কোন ম্যাজিস্ট্রেট তার ভাগ্নি জামাই এবং আমাদের মতো চ্যাংড়া সাংবাদিকদের যে তিনি গোণার মধ্যে ধরেণই না সেটাও জানলাম।
ঐ লোকের কথা মিথ্যা না। আমি একজন পাতি সাংবাদিক, হাসাহাসি বিষয়ক একটা পাতা সম্পাদনা করি। তবুও আমি আমার সীমিত ক্ষমতা এবং যোগাযোগ দিয়ে ঢাকার এডিসি মনির সাহেব নামক জনৈক পুলিশ কর্মকর্তার মোবাইল নাম্বার যোগাঢ় করলাম এবং তাকে ফোন দিলাম। তিনি ঠিক আছে দেখছি বলে ফোন রাখলাম। আমি ঘন্টাখানেক অপেক্ষা করে আবারও ফোন দিলাম , বললাম, ভাই আমি স্পটে দাঁড়িয়ে। যাই হোক আরও ঘন্টাখানেক পর পুলিশ এলো।
ঐ লোক মুহুর্তের মধ্যে পুলিশকে ম্যানেজ করে ফেললেন। বললেন, এই ছেলে এলাকার সব মোবাইল চুরি করে ফেলেছে। ভদ্রলোক পাঁচতলা বাড়ির মালিক। কাকে দাম দিতে হয় পুলিশ ভাইয়েরা এটা ভালো করেই জানেন। কাজেই পুলিশবাহিনী- ঐ বাচ্চার শার্ট খুলে গায়ে কোথাও ইনজেকশনের দাগ আছে কিনা - এটা পরীক্ষা করতে লাগলো আর এতো দামী শার্ট কই পাইছোস ? মোবাইল চুরি কইরা কই ব্যাচোস - ইত্যাদি পুলিশি জিঞ্জাসাবাদ শুরু হলো।
বেশ কিছু দিন আগে পুলিশের হাতে একবার মার খেয়েছিলাম। সেই থেকে এদেরকে আমি খুব সন্মান করি। তবুও ঝুঁকি নিয়ে গলায় যথাসম্ভব মধু ঢেলে তর্ক শুরু করলাম। একটা বাচ্চা অপরাধ করতেই পারে। সেটা প্রমাণ হবার আগেই- এই রকম এক বাচ্চাকে টানা দুইদিন না খাইয়ে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখার মাজেজা কী ? এটা কোন আইনের পর্যায়ে পড়ে ....
এই বাচ্চা যদি অপরাধি হয়, তাহলে যিনি তাকে দুইদিন এভাবে শিকল দিয়ে বেঁধে রেখেছেন , তিনি কত বড় সাধু এটা আমি পুলিশের কাছে জানতে চাইলাম ?
যুক্তি নয়, আমার পরিচয় পেয়ে পুলিশ বাহিনী নরম হল। তাদের সুর বদলে গেল। তারা ঘটনাটি অন্য দৃস্টিকোন থেকে দেখা শুর করলেন। এবার ঐ ভদ্রলোক ফাঁপরে পড়লেন।
শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত এ বাচ্চা এখন পুলিশি হেফাজতে ( আমি পুলিশকে নরম গলায় অনুরোধ করেছি, ওকে যেন মারধোর না করা হয় ) এবং ঐ ভদ্রলোককে রাত্রে থানায় যোগাযোগ করতে বলা হল।
মোবাইল ফোন খুবই শক্তিশালী অস্ত্র। ঐ ভদ্রলোক গোটা প্রশাসনে তার যতো পুলিশ ভায়রা এবং ভাগ্নি জামাই ম্যাজিস্ট্রেট আছে - তাদেরকে ক্রমাগত ফোন দিচ্ছেন এবং পুলিশের সাথে কথা বলাচ্ছেন।
শিশুদেরকে হ্যাঁ বলুন - এইসব ডায়লগ বলে যেসব এনজিও এবং সুশীল সমাজ কাজ করছেন- তারা কি বিষয়টা নিয়ে একটু কাজ করবেন।
ছেলেটা আছে মিরপুর থানায় আর দুই ভদ্রলোকের একজন তাবলিগে চিটাগাংয়ে এবং আরেকজন সনির হলের পাশের গলির পাঁচতলায়, খুব সম্ভবতঃ এখনও মোবাইল ফোনে আত্নীয়স্বজনদের সাথে লিয়াজো রক্ষা করে চলছেন।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই আগস্ট, ২০০৯ রাত ১:১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


