মাননীয় ব্লগ মডারেটর,
লোডশেডিং নিয়ে একটি পোস্ট দিয়েছিলাম। পোস্ট নয় প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে একটি খোলা চিঠি। সবে লোডশেডিংয়ের জের কাটিয়ে উঠেছি, মাত্র কারেন্ট এসেছে, গায়ের ঘাম তখনও শুকায়নি। ব্যাস লিখে ফেললাম। প্রধানমন্ত্রী আসুন ব্লগে কথা বলি, আসুন কৃচ্ছতা সাধন করি
এই পোস্টকে কেন্দ্র করে আচমকাই একটি জেদ আমাদের সবার মধ্যে দানা বেঁধে উঠল। খুব দ্রুতই পোস্টের উপর থেকে আমার ব্যক্তিগত অধিকার হারিয়ে গেল, পোস্টটিকে অধিকাংশ পাঠক নিজের জ্ঞান করে- এই পোস্টটি প্রধানমন্ত্রীকে পড়তে হবে - এই জেদ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। কেউ স্পিকারের বাসায় ছুটলেন পোস্টটি স্পিকারকে দিয়ে যদি প্রধানমন্ত্রীর হাতে পৌঁছানো যায়, কেউ প্রধানমন্ত্রী এবং সরকারী সংস্থায় মেইল করলেন, কেউ পত্রিকায় ছাপানোর ব্যবস্থা করলেন- ইত্যাদি । পোস্টটি স্টিকি হল , খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে ফেসবুক, টুইটার, চেইন মেইলে লেখাটি ছড়িয়ে পড়লো। অভাবনীয় একটি ঘটনা ঘটতে গিয়ে চূড়ান্ত পরিণতির খানিকটা আগেই পোস্টটি নিজেই লোডশেডিং হয়ে হারিয়ে গেল। লোডশেডিং নামক ব্যাপারটি সঙ্গে আমরা পরিচিত বলে - ব্যাপারটি আমাদের গায়ে তেমন লাগল না।
প্রধানমন্ত্রী চিঠিটি পড়লেই কী সব সমস্যার সমাধান হবে ? তা না হলে এই পোস্টটি প্রধানমন্ত্রীকে পড়তেই হবে - এই গোয়ার্তুমি আমাদের মাথায় ভর করলো কেন ? বাংলাদেশ একটি গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র এবং তিনি হচ্ছেন সেই রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী। আমাদের ভোটে , আমাদের সমর্থনে তিনি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন কেবল , কেবল এবং কেবল আমাদের দেখভাল করার জন্য। তিনি সাহারা খাতুনের প্রধানমন্ত্রী নন, তিনি জাহাঙ্গীর কবির নানক কিংবা সাজেদা চৌধুরীদের প্রধানমন্ত্রী নন, তিনি আমাদের জনগণের প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশ একটি দোতলা রাষ্ট্র ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। উপর তলায় বাস করেন রাজনীতিবিদরা। পাঁচ বছর পর পর তারা এক তলায় নেমে এসে - ভুলিয়ে ভালিয়ে আমাদের ভোট দিয়ে দোতলার ভিসা বগলদাবা করে দোতলায় চলে যান। একতলার মানুষদের দিকে ফিরেও তাকান না। এই হচ্ছে আমাদের দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। প্রধানমন্ত্রীকে যে
প্রস্তাবগুলো আমরা দিয়েছিলাম, সেটি হয়তো ততটা বাস্তবভিত্তিক ছিলনা। কিন্তু আমাদের কষ্ট, আমাদের হাহাকার, আমাদের নিদারুন দুঃখ দুর্দশাজনিত যে আবেগ, তাতে তো খাদ ছিলনা। আমরা চেয়েছিলাম , আমাদের এক তলার মানুষদের ডাকে সাড়া দিয়ে দোতলার সবচেয়ে ক্ষমতাশালী মানুষটি বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে একবার উঁকি মেরে আমাদের কৃতার্থ করবেন। অল্পতে খুশি হওয়ার জাত আমরা। আমরা তাতেই বর্তে যেতাম। বাংলাদেশে একটা নতুন কালচারের সূচনা হতো।
সেটি হয়নি । বরঞ্চ বলা ভালো সেটি হওয়ার আগেই পোস্টটি প্রথম পাতা থেকে হাওয়া হয়ে গেল।
( যারা পোস্টটি নিয়ে ছোটাছুটি করছিলেন, তাদেরই একজন ড. জাফর ইকবালকে পোস্টটির প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে লিংক পাঠিয়েছিলেন। ড. ইকবাল যথাস্থানে পোস্টটি না পেয়ে মেইলদাতাকে ফোন করেন এবং জানান পোস্টটি তিনি পড়তে পারছেন না। আমাদের তখন কারেন্ট ছিল না। কারেন্ট আসার পর ব্লগ খুলে দেখা গেল পোস্টটি প্রথম পাতায় নেই। )
শুরুতেই বলেছি, পোস্টটি থেকে আমার ব্যক্তিগত সকল অধিকার খর্ব হয়েছে। কাজেই পোস্টটির ভবিষ্যতের দায় - পাঠকদের উপর ছেড়ে দিলাম।
আজ এই ঘন দুর্যোগের মধ্যেও মিরপুরে ফাড লাইট জ্বালিয়ে ক্রিকেট ম্যাচ খেলা হয়েছে। জাতীয় বিদ্যুত গ্রিডের স্বল্পতার কারণে যেখানে হাসপাতালে বিদ্যুত সরবরাহ করা যাচ্ছে না, সেখানে এই ক্রিকেট ম্যাচটি কিছুদিন পরে হলে কী তি হতো ? এই বাণিজ্যিক ক্রিকেটের সুবিধাভোগী যে দুয়েকজন মানুষ- তারা হয়তো তাদের ভাগের টাকা কয়েকদিন পরে পেতেন , কিন্তু কোটি মানুষের ভোগান্তি তো কমতো। আমার কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই, তবে বেশ বুঝতে পারি, এই ম্যাচের হর্তাকর্তারা সরকারের খাতিরের লোক, তা না হলে যেখানে গোটা দেশে বিদ্যুতের জন্য হাহাকার , সেখানে রাতের বেলায় ফ্লাড লাইট জ্বালিয়ে ক্রিকেট ম্যাচের অনুমোদন পাওয়া মোটামুটি অসম্ভব একটি ব্যাপার।
প্রধানমন্ত্রী গতকাল জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে চলচ্চিত্র পুরষ্কার দিলেন। পপিকে প্রধানমন্ত্রী পুরষ্কার দিচ্ছেন - এমন ছবি আজ পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। দু এক মাস পর বিদ্যুতের চাপ যখন কমতো- তখন কী পপিকে পদকটি দেয়া যেত না ? পপি তো দুয়েকমাসের মধ্যে পালিয়ে যেতেন না। প্রধানমন্ত্রী যখন হাসিমুখে পপির হাতে পদক দিচ্ছিলেন, তার কী একবারের তরে গ্রামের কৃষকের কথা মনে হয়েছিল, যিনি বিদ্যুতের অভাবে সেচ দিতে পারছেন না। পপিদের হাতে পদক প্রদান অনুষ্ঠানে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুত সরবরাহ করতে গিয়ে কয়টি সেচ যন্ত্র বন্ধ ছিল - এ দেশের নাগরিক হিসেবে- সে কথা জানতে আমাদের বড়ো ইচ্ছে হয়।
এসব হচ্ছে নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন। অত্যন্ত ফাজিল প্রশ্ন, সন্দেহ নেই। আমরা ক্রমশঃ ক্লীব হয়ে উঠছি, প্রতিবাদের শক্তি ও সাহস আমরা হারিয়ে ফেলছি। সেই সময়ে অন্তর্জালে গড়ে ওঠা এই মুভমেন্টটির বড়ো প্রয়োজন ছিল, মাননীয় ব্লগ মডারেটর।
আমাদের বেয়াদবি হলে মাপ করে দেবেন মাননীয় মডারেটর। যকন প্রচলিত মিডিয়া তাদের দায়বদ্ধতার দায় ঝেড়ে ফেলেছে, তখন যদি বিকল্প মিডিয়া হিসেবে ব্লগকে আমরা স্থান দেয়ার পরিকল্পনা করি, সেটা খুব বাজে চিন্তা ? উপরে আল্লাহ, দোতলায় প্রধানমন্ত্রী ,এই কেসে অন্তত: দেড় তলায় আপনাদের স্থান।
কাজেই, পোস্টটি কি আবারও স্টিকি করা যায় না ?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



