ধর্ম নিয়ে বেশ বিপদে পড়েছি। অবশ্য বন্ধুদের কথামত চললে এ বিপদে পড়তাম না। হয় নির্বিবাদে ব্যাপারটাকে মেনে নিতে পাড়তাম, না হয় নির্বিবাদে ছেড়ে দিতে পাড়তাম; ও নিয়ে মাথা ঘামাতে হতো না। কিন্তু আমি এর কোনোটাই করতে পারছিনা। তাই আমার হয়েছে বিপদ।
অন্যের কথা জানিনে, আমি আমার ধর্মমত পেয়েছি উত্তারাধিকার সূত্রে। আমার পূর্বপুরুষ এই ধর্মে বিশ্বাস করতেন। আমি তাদের সন্তান হিসাবে যেমন তাঁদের পরিত্যক্ত সম্পত্তির উত্তারাধিকার পেয়েছি, তেমনি এই ধর্মমতেরও উত্তারাধিকার আমার উপর বর্তেছে। পারিবারিক ঐতিহ্য হিসাবে আমি এই শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠেছি। এরপর উত্তারাধিকারে প্রাপ্ত অন্যান্য সম্পদের ন্যায় এটিকে বিচার বিশ্লেষণ করতে গিয়েই পরেছি বিপদে।
প্রশ্ন উঠতে পারে, যা পেয়েছো, তা নির্বিবাদে মেনে নিলেই পারো, বিচার করে দেখার দরকার কি? সে কথাতো আমি আগেই বলেছি, তা যদি পারতাম, তা হলে আর এমনি বিপদে পড়তে হতো না। কারণ অন্যান্য উত্তারাধিকারের বেলায় বিচার বিবেচনা করতে গেলে কেউই এ প্রশ্র তুলেননা; বরং যতোদূর সম্ভব খুঁটিয়ে তার উপযোগিতা বিচার করতে বলেন। সুতরাং ধর্মের ব্যাপারে সেটি করতে গেলে তারা উল্টো সুরে কথা বলবেন কেন! ধরুন আমার পিতা আমার জন্য একটি ঘর রেখে গেছেন। শিশু কালে আমি তাতেই লালিত পালিত হয়েছি। বয়স কালে যখন আমার উপর এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ত পড়বে, তখন অবশ্যই সেই ঘরটিকে নিয়ে আমাকে ভাবতে হবে। সেটি আমার বসবাসের উপযোগী কিনা, তা বিচার করে তাতে প্রয়োজনীয় রদবদল করলে কেউই আমাকে গালমন্দ করবেন না। কারন একটি ঘর শুধু মাথা গোজার ঠাঁই মাত্র নয়, এর সাথে আমার সাস্থ্য সাচ্ছন্দ্য, আমার ব্যক্তিগত রুচির পরিচয়ও জড়িয়ে আছে। সব কিছু মিলিয়েই আমাকে আমার সার্মথানুসারে তাকে সাজিয়ে তুলতে হবে।
ধর্মও তো এমনি একটি ঘরের মতোই। হোক সে মানসিক ঘর, তবু এর মধ্যেই সুখে দুঃখে আমাকে আশ্রয় নিতে হয়। সুতরাং সেটির উপযোগিতাও তো বিচার করে দেখার ব্যাপার। সেক্ষেত্রে উল্টো সুরে যারা কথা বলেন, তারা কি ধর্মকে জীবনের আশ্রয় বলে মনে করেন না? যদি ধর্মকে জীবনের আশ্রয় বলে তারা মনে করেন, তবে জীবনের জন্য তার উপযোগিতা বিচার করে দেখাকে তারা মন্দ বলবেন কেনো? জীবনকে সুন্দর করাইতো ধর্মের লক্ষ্য। পারলৌকিক পুরষ্কার আর শান্তি তো এই লক্ষ্য সাধনেই নিয়োজিত। কাজেই আমার জীবনের সৌর্ন্দয বিধান করতে গিয়ে অবশ্যই ধর্মের মুল্যমান আমাকে খতিয়ে দেখতে হবে।
জানি মুরব্বীরা এক্ষেত্রে চোখ রাঙিয়ে বসবেন, ও তোমাকে খতিয়ে দেখতে হবে না, যা পেয়েছো তা মেনে নিলেই তোমার জীবন সুন্দর হয়ে উঠবে। কিন্তু মুশকিল হয়েছে এই যে, পৃথিবীতে যদি একটি মাত্র ধর্মমত থাকতো, তাহলে নির্বিবাদে মুরব্বীদের কথা মেনে নেয়া যেতো। যখন মানুষ গুহায় বাস করতো, তখন গুহার দৈর্ঘ্যে প্রস্থ নিয়ে সে বাছ বিচার করতে যায় নি; প্রকৃতির দান যা পেয়েছে, তাতেই মাথাগুঁজে আত্নরক্ষা করেছে। কিন্তু সে পর্যায় পেরিয়ে এসে আজকে মানুষ নির্মাণ কৌশলে সমৃদ্ধ বলেই বাছ বিচারের আর অন্ত নেই। বিচিত্র রুচি আর সাচ্ছন্দ্যবোধ তাকে কেবলই তাড়া করে ফিরছে। তেমনি ধর্মমতও আজ আর একটি নয়, অজস্র। সংখ্যায় তার হিসাব নিতে গেলে হাজার দুহাজার ছাড়িয়ে যাবে। আর সব ধর্মের মুরব্বীরাই একই সুরে সেই একটি কথাই বলেন, যা পেয়েছো, তাকেই আঁকড়ে ধরে থাকো। সাবধান, আর যা কিছু সবই ভুয়া, সবই ফাঁকি।
আমার বিপদ হয়েছে এখানেই; উত্তরাধিকার সূত্রে আমি যা পেয়েছি, তাকেই যদি একমাত্র সত্য বলে মনে করি, তাহলে আর সবাইকে মিথ্যা বলতে হয়। আর তা করতে গেলে পৃথিবীর সবকিছু ছেড়ে দিয়ে কেবল নিজের মধ্যেই গুটিয়ে আসা ছাড়া গতান্তর থাকে না। কিন্তু মানুষের পক্ষে কি এ ভাবে গুটিয়ে থাকা সম্ভব? তাহলে মানুষ আর অন্য প্রানীর মধ্যে পার্থক্য থাকে কি করে? আর কি করেই বা মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব বলে আখ্যায়িত হয়? অন্য সকল প্রানীই তো কেবল নিজকে নিয়ে ব্যপৃত; অন্য করো দিকে ফিরে তাকাবার তার ফুরসত নেই। কিন্তু মানুষ সবার প্রতি দৃষ্টি দিয়েছে বলেই আজ পৃথিবীর সেরা।
সুতরাং মানুষের সৃষ্টি বিজ্ঞান যদি উদারতার বানী শুনায়, দর্শন যদি সকলের প্রতি দৃষ্টি দিতে বলে, তাহলে ধর্ম এমন সংকীর্নতার কথা বলবে কেনো? সত্য কি শুধু ধর্মের মধ্যেই আছে, দর্শনে বিজ্ঞানে কোনো সত্য নেই? পৃথিবিতে মানুষের যে ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে, যে ঐতিহ্য সম্ভার গড়ে উঠেছে, তা কি শুধু ধর্মেরই অবদান? আমার পূর্বপূরুষের নিকট থেকে আমি কি শুধু ধর্মের উত্তরাধিকারই লাভ করেছি; দর্শন বিজ্ঞানের কোনো উত্তরাধিকার কি তারা রেখে যাননি? তাছাড়া আমার পূর্বপূরুষ বলতে কি শুধু আমার বংশ পরম্পরায় প্রাপ্ত কিছু সংখ্যক লোকের কথাই ভাববো; এর বাইরে কি মানুষের সৃষ্টি এই ঐতিহ্য সম্ভারে আমার উত্তরাধিকার নেই?
আমি জানি, এর উত্তর দিতে গিয়ে মুরব্বীরা নাক কুঁচকে, মুখ বাঁকিয়ে চোখ মিটমিট করে বলবেন, ও বুঝেছি, ছেলেটা বয়ে গেছে। আর এ কথা শুধু তারা এ যুগে নয়, সব যুগেই বলে এসেছেন। তাই মুরব্বীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলতে হয়, আপনাদের সধর্ম নিষ্ঠার মুখে ফুল চন্দন পড়ুক। কিন্তু ও দিয়েতো আমার বয়ে যাওয়া আপনারা ফিরাতে পারেননি! আমি কি চাইনা আপনাদের মতো অখন্ড বিশ্বাসের শান্তি দিয়ে আমার মানষিক যন্ত্রনাকে দূরে ঠেলে দিতে, অবশ্যই চাই! কিন্তু পারছি কৈ? আপনাদের অখন্ড শান্তিকে মনে হয় এক নির্বিকল্প সমর্াধি, যা কবর শ্বশানের সাথেই যুক্ত, জীবনের সাথে নয়। কারন জীবনতো বিচিত্র ব্যাপক বিরাট! দেশে দেশে দিশে দিশে তার বিস্তার। তার সাথে যুক্ত হলে এমন নির্বিকল্প সমাধির কথা কল্পনাও করা যায়না। আমি জীবনকে চাই বলেই বিপদে পড়েছি, তানা হলে আপনাদের মতো নির্বিকল্প সমাধি লাভ করা এমন কোনো কঠিন কাজ ছিলোনা। কিন্তু একান্ত বাধ্য হয়েই আপনাদের পূণ্য পদাংক অনুসরন করা থেকে দূরে সরে আসতে হয়েছে। অবশ্য তাতেও বিপদের অন্ত হয়নি।
কারন আপনাদেরকে অনুসরন করতে না পারি, কিন্তু তাই বলে আপনাদেরকে সর্ম্পুন ছেড়ে দেওয়াতো সম্ভব নয়। অন্তত:আমি সেটা করতে পারছিনা। আপনারা আমার পূর্বপুরুষ, আপনারা আমার স্বজন বান্ধব; আপনাদের বিশ্বাস ও আচার আচরনকে এক ফু্ৎকারে উড়িয়ে দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। পিতার মূর্খতার জন্য পিতাকে অস্বীকার করায় বিপদ আছে। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নিয়ে এসে প্রাইমারি স্কুলের অস্তিত্ব অস্বীকার করা শুধু বিপদজনক নয়, চরম বোকামি। সুতরাং আপনাদের বিশ্বাস ও আচরণের মূল্যমান অস্বীকার আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কারন আপনাদের এই বিশ্বাস আর আচরণ মানুষের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্দ্য অংশ। একে বাদ দিয়ে ইতিহাসের বিশ্লেষন সম্ভব হতে পারে না। অন্য দিকে এ ছাড়া আমার পক্ষের আপনাদের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা প্রদর্শনের অন্য কোনো পথ নেই।
সুতরাং একান্ত সবিনয়ে আপনাদের সম্মুখে সেই ঐতিহাসিক বিশ্লেষনের কথা তুলে ধরতে হয়। জানি, আপনারা চোখ বুঝে কানে তুলো দিয়ে চীৎকার করে বলবেন, ওসব কথা শুনতে নেই, শোনা ভয়ানক পাপ। তবু আমাকে বলতেই হবে। কারন বিজ্ঞানের আবিষকৃত আধুনিক যন্ত্রপাতি ও কলাকৌশল যদি আপনাদের নিকট গ্রাহ্য হয়ে থাকে, তা হলে এই বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষনকে আপনারা এমনভাবে অগ্রাহ্য অন্যায্য বলবেন কেনো? গাছের ফল খেতে পারি কিন্তু গাছের নাম শুনলেই কানে আংগুল দিই - এ কেমন ব্যবহার। যদি ছাড়তে হয় সবই ছেড়ে দিন, তাতে কারো কিছু বলার থাকে না। বিজ্ঞানের ফসল খাবেন আর বিজ্ঞানের নাম শুনলেই আৎকে উঠবেন, এতে সুবুদ্ধির কোনো পরিচয় নেই। আমি সেটা পারছিনা বলেই আপনাদের অসুবিধা হবে জেনেও সেই বিশ্লেষনের কথা আমাকে বলতে হচ্ছে। দয়া করে আমাকে ক্ষমা ঘেন্না করবেন।
জীবন ও জগতের ইতিহাস আজ আর রহস্যময় কিছু নয়। সূর্য থেকে বেরিয়ে আসা এ পৃথিবীর বয়স প্রায় সাড়ে চারশ কোটি বৎসর। জ্বলন্ত অগ্নি পিন্ডরুপী এই পৃথিবী ঠান্ডা হতে বেশ সময় নিয়েছে। তারপর জলীয় বাষ্পের আর্বিভাব ঘটে সাগরের সৃষ্টি হয়েছে। এর আগে প্রাণের আর্বিভাব ঘটেছে প্রায় দু’শ কোটি বৎসর আগে। বিশেষ প্রজাতি হিসেবে মানুষের আবির্ভাব ঘটেছে কমপক্ষে দশ লক্ষ বৎসর পূর্বে।
তখন থেকে শুরু হয়েছে মানুষের অগ্রযাত্রা। গাছের ফলের উপর র্নিভরশীল মানুষ এক সময়ে এর অভাবে নেমে এসেছে সমতল ভূমিতে। জীবিকার তীব্র প্রয়োজনে মাংসাশী হতে গিয়ে তার দেহের পরিবর্তন ঘটেছে অনেকখানি। হাত দুটিকে পায়ের কাছ থেকে মুক্তি দিয়ে সে যেমন সোজা হয়ে দাড়াতে শিখেছে, তেমনি পশু শিকারের জন্য সে উদ্ভাবন করেছে হাতিয়ার। এ সময়ে সাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তাবোধও পূর্বাপেক্ষা অধিক মাত্রায় তার মধ্যে দেখা দিয়েছে। তাই সে হয়েছে গুহাবাসী।
জীবনের এ পর্যায়ে আমরা মানুষের মধ্যে মননশীলতার সুষ্পষ্ট আবির্ভাব লক্ষ্য করি। প্রকৃৃতির উপর তার ইচ্ছাশক্তির প্রভাব সম্পর্কে সে তখন অতি মাত্রায় সচেতন। এর ফলে সে এমন কিছু ধ্যান ধারনা ও আচার অনুষ্ঠান পোষন করতে আরম্ভ করে, যা তার দলবদ্ধ শক্তির বদান্যতা ও অস্ত্র উদ্ভাবনের পারদর্শিতাকে অতিক্রম করে এক অতীন্দ্রিয় চেতনার পরিচয় বহন করছে। এই চেতনাই তার প্রাথমিক ধর্মবোধ, যার পরিচয় সে রেখে গেছে গুহাচিত্রের মাঝে এবং যার রেশ এখনো দেখতে পাই যাদু টোনা ও বিচিত্র ব্রতানুষ্ঠানে। বৃষ্টির জন্য ব্যাং বিয়ে দেয়ার যে অনুষ্ঠান সর্বত্র দেখা যায়, এর সেই প্রাথমিক ধর্মবোধেরই পরিচয় বহন করছে। অনুকরণের মাধ্যমে নিজের ইচ্ছাশক্তিকে অন্যের উপর প্রভাবশীল করে তোলার প্রচেষ্টা ছাড়া এর মধ্যে অন্য কোনো অলৌকিকত্ব নেই।
কিন্তু মানুষের এই অতীন্দ্রিয় চেতনা নিজের ইচ্ছাশক্তিকে কেন্দ্র করে অধিককাল স্থায়ী হয়নি। জনসংখ্যার বৃদ্ধি ও জীবিকা অর্জনের ক্রমবর্ধমান জটিলতার ফলে তার এই ইচ্ছাশক্তিকে সে অন্যের মধ্যেও সমপ্রসারিত করতে বাধ্য হয়েছে। এর ফলে পাহাড় নদী, বৃক্ষলতা ও পশুপাখী সবকিছুই তার মতো ইচ্ছাময় হয়ে উঠেছে। কারন জীবিকার অভাবের বাস্তব হেতু আবিষ্কারের মতো মননশীলতা তখনো তার আয়ত্তের বাইরে। তাই জীবিকা অর্জনে তার ইচ্ছাশক্তির ব্যর্থতা অন্য কোনো ইচ্ছাশক্তির প্রভাবের ফল বলে সে ধারনা করেছে। এর সাথে এসে যুক্ত হয়েছে গোত্র জীবনের অভিজ্ঞতা। গোত্রপতির শাসন ও ত্রাসন তাদের মধ্যে এই বোধেরই সৃষ্টি করেছে যে, সৃষ্টির অন্যত্রও এমনি গোত্রপতিসূলভ শক্তিমানের অস্তিত্ব বিদ্যমান। তার অধিস্থনদেরকে আয়ত্ব করতে হলে শক্তিমান দলপতিকে সন্তুুষ্ট করতে হবে। এর ফলেই উদ্ভাবিত হয়েছে বিচিত্র পূজা অর্চনার পদ্ধতি। এ গুলিতে প্রশংসাবাণী আর বস্তু সামগ্রীর উপঢৌকন ছাড়া আর কিছু নেই।
কিন্তু প্রাকৃতিক শক্তির বৈচিত্র্যের মধ্যে ইচ্ছা অনিচ্ছার উপস্থিতির এই ধারনা এবং তাকে সন্তুষ্ট করার জন্য উদ্ভাবিত নানাবিধ প্রক্রিয়া দু’দশ বৎসরের ফল নয়; এর জন্য বহুকাল ধরে মানুষের মননশীলতাকে কাজে লাগাতে হয়েছে। একারনেই প্রকৃতি পূজার এই কাল পরিধি যেমন দীর্ঘ, তেমনি বিচিত্র পর্যায়ে বিভক্ত।
এর প্রাথমিক পর্যায়ে বৃহৎ ও আয়ত্তি বহির্ভুত বস্তু, বৃক্ষ, প্রাণি ও ঘটনামাত্রেই মানুষের মনে ভয় ও বিষ্ময়ের সৃষ্টি করেছে। তাই তাকে সন্তুষ্ঠ করতে নানাবিধ সামগ্রি নিয়ে এগিয়ে গেছে মানুষ। পশু ও শস্যের উৎসর্গিকরণ এরই দীর্ঘকালিন ফলশ্রুতি। বিভিন্ন জলাশয়ে বৃক্ষের মূলে বা স্তুপের নীচে দুধ কলা বা অন্য সামগ্রীর উপাচার প্রদান, যা আজো আমাদের এ দেশে ও অন্যত্র দেখতে পাওয়া যায়, তা সেই প্রাচীন ধর্মবোধেরই বিচিত্র অনুসৃতি ছাড়া অন্য কিছু নয়।
অবশ্য এই পর্যায় অতিক্রম করতে গিয়ে মানুষ জীবন ও জীবিকার ক্ষেত্রে আরো জটিলতার সম্মুখীন হয়েছে। এর ফলে তার উদ্ভাবন কৌশল যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি মনন ও মেধার ক্ষেত্রেও নতুনত্বের অভিসারী হতে হয়েছে তাকে। এরই কল্যাণে তার ইচ্ছাময়তার পেছনে ক্রিয়াশীল এক অনির্বচনীয় সত্তার উপলব্ধি তাকে এক নতুন জগতের সন্ধান দিয়েছে। সে জগৎ এই বস্তু জগতেরই সমান্তরালে অবস্থিত। এরপর নিজের দেহের মধ্যে উপলব্ধ এই আত্বশক্তিকে সে অন্যান্য বস্তু ও প্রাণির মধ্যেও ক্রিয়াশীল বলে মনে করেছে। এও সেই পূর্বের ইচ্ছা অনিচ্ছার উপস্থিতিরই অনিবার্য ফলশ্রুতি। কারন যেখানে ইচ্ছা অনিচ্ছা আছে, সেখানে তার পরিচালিকা শক্তির অবস্থান কল্পনা অযৌক্তিক কিছু নয়। সুতরাং শুধু নিজ গোত্র প্রতিক বা টোটেমকে উপাস্য হিসাবে বরণ করে নেয়ার মধ্যে নয়, বরং তারো চাইতে বেশী করে বৃহত্তর ও মহত্তর প্রাকৃতিক শক্তিগুলিকে সন্তুষ্ঠ করার ধর্মবোধে সে উদ্ভুদ্ধ হয়েছে। অগ্নি, বায়ু, জল, চন্দ্র, সূর্য, তারকা ইত্যাদিও তার উপাস্য হিসাবে স্থান লাভ করেছে।
অন্যদিকে এই আত্নশক্তিতে সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক বস্তুর উপাসনারই ফলশ্রুতি হিসাবে এসেছে আত্মার অবিনশ্বরতা। কারন প্রাকৃতিক শক্তিগুলির নিজের অস্তিত্বের মতোই তাদের আত্মশক্তি অবিনশ্বর। সুতরাং মানুষ নিজেও সে গুণে গুণাণ্বিত হবার যোগ্য। অবশ্য বস্তুর মতো তার দেহ চিরস্থায়ী হতে না পারে। কিন্তু তার আত্মশক্তি তাদের মতোই চিরস্থায়ী। আর এরই ফলে পূর্বপুরুষের উপাসনা তথা প্রেতোপাসনার মাধ্যমে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও মঙ্গল কামনার দায়িত্ব পালন করেছে। অনুরূপ ধারণা ও আচারের বৈচিত্র্য কবর পূজা ও প্রতীক তথা মূর্তি পূজার মধ্যে বিদ্যমান। এরই সঙ্গে এসে মিশেছে পরকাল তথা স্বর্গ নরকের অনন্ত জীবনের ধারণা। জন্মান্তরবাদ ও আত্মার এই অবিনশ্বর গুণগ্রামের সাথে যুক্ত আর এতে এই পরকাল সম্পর্কীয় ধারণায় অবস্থানগত পার্থক্য থাকলেও গুণগত কোনো পার্থক্য নেই। তদুপরি এ ধারণাও প্রাকৃতিক নিয়মে বৃক্ষলতা ও পশুপাখির বংশানুক্রমের মাধ্যমে আত্নপ্রকাশের অভিজ্ঞতার উপর প্রতিষ্ঠিত। অবশ্য পরবর্তী পর্যায়ে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব পরিকল্পনার ফলে তাতে কিছুটা ব্যতিক্রমের সৃষ্টি হয়েছে।
এভাবে মানুষের দীর্ঘকাল ধরে প্রাকৃতিক শক্তির পশ্চাতে ক্রিয়াশীল এক ইচ্ছাময় সত্তার কল্পনায় ও তার বিধানে বিচিত্র তত্ত্ব ও তথ্যের জন্ম দিয়েছে। এসব ক্ষেত্রে সেই প্রাথমিক পর্যায়ের অতীন্দ্রিয় চেতনার প্রভাব থেকে তার মুক্তি লাভ সম্ভব হয়নি। অনেক সময তার নিজের মননশীলতা, উদ্ভাবন শক্তি ও সঙ্গবদ্ধ প্রচেষ্টার প্রতি তার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের পক্ষে কার্যকারণ বিশ্লেষণের এই শ্রমসাপেক্ষ বক্তব্যকে উপলব্ধি করা সহজ হয়ে উঠে নি। কারণ এ করতে গেলে প্রচলিত সহজ পথে তার পক্ষে কিছুতেই সম্ভব নয়। তদুপরি স্বার্থান্বেষী ক্ষমতাবানরা সর্বদাই এ ব্যাপারে প্রবল বাধার সৃষ্টি করেছে। তবু তাদের এ প্রকার বাধা সত্ত্বেও উৎপাদন ব্যবস্থার পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে এই বিচিত্র ধর্মবোধেও পরিবর্তন দেখা দিয়েছে।
মানুষের জীবনে কৃষি ব্যবস্থার সমৃদ্ধি. স্থায়ী বসবাসের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া এবং একক কেন্দ্রীয় শাসনের অনিবার্য ফলশ্রুতি ধর্মীয় বোধেও একেশ্বরের ধারণাকে অত্যাবশ্যকীয় করে তুলেছে। এ ধারণায় বৈচিত্র্য মতোই থাকুক, কেন্দ্রীয় শাসকরাই নিজ স্বার্থে একে লালন, পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করেছে। এরপর শিল্প বিপ্লবোত্তর যুগেও ভাববাদের প্রসারের মধ্যেও সেই ধর্মবোধের অতিসুক্ষ লীলাবিলাস আমরা লক্ষ্য করে থাকি। বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ যতোই প্রচলিত ধ্যান-ধারণাকে নস্যাৎ করে দিচ্ছে, ততোই তা সুক্ষতর অতীবন্দ্রিয় মার্গে উত্থিত হচ্ছে।
অতিসংক্ষেপে মানুষের ধর্মবোধের এই ইতিহাস একটি সরলসূত্রে গ্রথিত। নিজের উদ্দেশ্যমূলক শ্রম শক্তিনিয়োগের পশ্চাতে ক্রিয়াশীল ইচ্ছা-অনিচ্ছার মধ্যে যথার্থ জ্ঞানের অভাবে যে অতীন্দ্রিয় সত্ত্বার উপস্থিতি মানুষ এক সময়ে উপলব্ধি করে ছিলো, সেখানেই উপ্ত হয়েছিল ধর্মবোধের বীজ। উৎপাদন ব্যবস্থার সাথে তাল মিলিয়ে সেই বীজই এখন শাখা-প্রশাখায় বিস্তারিত বিরাট মহীরুহ।
একারণেই কোনো একটি বিশেষ ধর্মমতকে সত্য বলা বা শাশ্বত বলা এবং অন্যগুলিকে মিথ্যা বলা কিছুতেই সম্ভব নয়। আমার পক্ষে সেটি সম্ভব হয় নি বলেই আপনাদের সকলের প্রতিই আমি শ্রদ্ধাশীল। যদিও আমার উপরোক্ত বিশ্লেষণের ধারা পরিক্রমায় আপনারা বিশেষ কালে বিশেষ রূপে আর্বিভূত হয়েছেন মাত্র এবং এর ফলে মানুষের সভ্যতা সংস্কৃতির ইতিহাসে বিচিত্র ঘটনা ও দূর্ঘটনার সৃষ্টি হয়েছে ঠিকই; কিন্তু সভ্যতা সংস্কৃতির বিনির্মাণে এর প্রভাব কখনো তেমন সুফল প্রসব করেনি। কারণ এক সময়ে জীবনের জন্য ধর্মের আর্বিভাব ঘটলে ও কালক্রমে তা জীবনবিমুখী চেতনায় আচ্ছন্ন হয়ে গেছে এবং যে সমাজের বুকে সে লালিত পালিত হয়েছে, সেই সমাজকে পাশ কাটিয়ে আজ সে আত্নকেন্দ্রিক মোক্ষ সাধনায় নিয়োজিত। তবু আপনাদের সবার প্রতিই আমি শ্রদ্ধাশীল। কারণ যে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের দ্বারস্থ হয়ে আপনাদের প্রতি এই শ্রদ্ধার ভাব পোষণ করছি, তা ইতিপূর্বে অনিবার্য কারণেই সম্ভব ছিলোনা। আপনারা যে পরিবেশে যে ভাবে এই ধর্মবোধকে পোষণ করেছেন, তা নানা কারণে আপনাদের জন্য স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে হয়। এমন কি একই পর্যায়ের বোধ ও মেধার অর্ন্তগত হয়েও পরস্পরের প্রতি আপনাদের এই উধ্যত মুষ্টি ভাবও সঙ্গত কারণেই দেখা দিয়েছিলো। কিন্তু আজ বিজ্ঞানের প্রখর আলোতে এসেও যদি আপনারা চোখ মুছে পরস্পরকে মিথ্যাবাদী প্রতারক বলে গালাগালি করতে থাকেন, তাহলে এক সময়ে আপনারা সবাই একই অবস্থায় পরিগণিত হবেন। তখন আপনাদের দ্বারা পরস্পরের প্রতি প্রদত্ত মিথ্যা ও প্রতারণার বিশ্লেষণ সামগ্রিক ভাবে আপনাদের জন্য অপরিহার্য হয়ে দাঁড়াবে।
এই অশুভ পরিণতি থেকে মুক্তি লাভের একমাত্র পথ সেই ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ কে মেনে নেয়া, যার মধ্যে পর্যায়ক্রমিক মর্যাদায় আপনারা সকলেই অবস্থান করতে পারেন এবং পরস্পরকে শ্রদ্ধা করার ঐতিহাসিক শ্রদ্ধা লাভ করতে পারেন। কিন্তু এ না করে উল্টো পথে চললে বিজ্ঞানের মারকে কিছুতেই ঠেকতে পারবেন না। যা অনিবার্য, তাকে নিবারণ করে কার সাধ্য। সে অনবরত আপনাদের নিষ্ঠার মূলে জ্ঞানের কুঠার দিয়ে আঘাত হানছে। একদিন আপনাদের ধর্মের এই বোধি বৃক্ষ সমূলে উৎপাঠিত হবে। এর থেকে নিষকৃতি পাবার পথ নেই।
জানি এরপরও বিপদের শেষ হবে না। কারণ মানুষতো সবকিছূ জানে না। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের আদি অন্ত নিয়ে তার জিজ্ঞাসার এখনো অন্ত হয়নি। এই জিজ্ঞাসার পথধরেই তাকে এগিয়ে যেতে হবে। কোনো বাক্যে এই অনতহীন সমস্যার সমাধান করে দেখা তার পক্ষে সম্ভব নয়। সুতরাং বিপদ তার চিরসঙ্গী। আমিও মানুষ, তাই আমার বিপদেরও শেষ নেই। মানুষকে মানুষ ভাবই বলেই এই বিপদ, তার সৃষ্ট ঐতিহ্য সভ্যতাকে নিজের মনে করি বলেই এই বিপদ এবং সকলের প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করে প্রত্যেককে তার ন্যায্য প্রাপ্য দিতে চাই বলেই এই বিপদ।
আপনি কি আমার এই বিপদের কথা বুঝতে পারছেন?
আকুয়া, ১লা ভাদ্র ১৩৮৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

