কিংবদন্তি বিপ্লবী জ্যোতি বসুঃ সর্বভারতীয় রাজনীতিতে অনুকরণীয়, অনুস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব_শেখ রফিক
লড়াই-সংগ্রাম আর ভালোবাসার নাম জ্যোতি বসু। আমৃত্যু লড়াই করেছেন মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য। মার্ক্সবাদী রাজনৈতিক দর্শনের আলোকে গড়ে তুলেছিলেন নিজেকে। শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, সর্বভারতীয় রাজনীতিতেই অনুকরণীয়, অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব জ্যোতি বসু। তাঁর বাবা নিশিকান্ত বসু লন্ডনে পাঠিয়েছিলেন ব্যারিস্টার হবার জন্য। কিন্তু ছেলে ফিরেছিলেন কমিউনিস্ট হয়ে। শুরু হয় রাজনৈতিক জীবন। মিশে যান হতদরিদ্র মানুষের জীবনের সঙ্গে। তাদের অধিকার আদায়ে অব্যহত রাখেন সমাজ বদলের সংগ্রামকে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রারম্ভে তিনি রাজনীতির হাতেখড়ি নেন। ফ্যাসিবাদের উত্থান, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম, সোভিয়েত রাশিয়ার পতন, চীন-ভারত যুদ্ধ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, ভারতের জরুরী অবস্থাসহ ইতিহাসের প্রতিটি ঘটনার প্রত্যক্ষ লড়াকু সাক্ষী তিনি। কমিউনিস্ট পার্টির শৃংখলা ও তত্ত্বের অনুগামী হয়েও একনিষ্ঠভাবে সকল প্রগতিশীল ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের তিনি ছিলেন অগ্রসৈনিক। তিনি ১৯৭৭ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত একটানা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৪ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনি সিপিআই(এম) দলের পলিটব্যুরো সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পশ্চিম বঙ্গ থেকে তিনিই একমাত্র রাজনীতিবিদ যার নাম ভারতের প্রধানমন্ত্রীত্বের জন্য বার বার আহ্বান আসা সত্বেও তিনি দলের সিদ্বান্তে তা প্রত্যাখান করেছেন অকপটে। তাঁর ইমেজের ওপর ভর করেই পশ্চিম বাংলায় তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থেকেছে বামফ্রন্ট। পশ্চিম বাংলার জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ দেবতা আর জ্যোতি বসুকে আলাদা করে দেখে না। সেই দেবতা কমরেড শ্রী জ্যোতি বসু ৯৭ বছর বয়সে ১৭ জানুয়ারি সকাল ১১.৪৭ মিনিটে সল্ট লেকের AMRI Hospital’এ মারা যান। জয়তু কমরেড জ্যোতি বসু।
এই কিংবদন্তি বিপ্লবী জ্যোতি বসুর জন্ম ১৯১৪ সালের ৮ জুলাই। কলকাতার হ্যারিসন রোডের ৪৩/১ নম্বর একটি বাড়িতে। এখন নাম বদলে গেছে মহাত্মা গান্ধী রোড। তাঁদের আদি বাসস্থান বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও উপজেলার বারোদি গ্রামে। বাবা নিশিকান্ত বসু। মা হেমলতা বসু।
পড়াশুনার হাতেখড়ি পরিবারে। প্রাথমিক পাঠ শেষে তাঁর বাবা তাঁকে কলকাতার লরেটো স্কুলে ভর্তি করে দেন। তখন তাঁর বয়স ছিল ৬ বছর। লরেটো কিন্ডার গার্টেনে পাঠ্যক্রম ছিল চার বছর মেয়াদী। পড়াশুনা ভালো করার কারণে ‘ডাবল প্রমোশন’ পাওয়ায় তিন বছরে কিন্ডার গার্টেন পাঠ্যক্রম সমাপ্ত হয়। ১৯২৪ সালে তাঁকে সেন্ট জেভিয়ার্সে সেকেন্ড স্ট্যান্ডার্ডে ভর্তি করানো হয়। এই স্কুল থেকেই তিনি সিনিয়র ক্যামব্রিজ (নাইনথ্ স্ট্যান্ডার্ড) পাসের স্বীকৃতি পান। ইন্টারমিডিয়েটেও পড়েছেন ওই কলেজে। তারপর ভর্তি হন প্রেসিডেন্সী কলেজে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে। ১৯৩৫ সালে প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে বিএ অনার্স পাস করেন। ১৯৩৫ সালে ব্যারিস্টার হওয়ার জন্য বিলেত যান। ১৯৩৬ সালে তিনি পিতার ইচ্ছানুযায়ী সরকারী চাকুরীর যোগ্যতা অর্জনের জন্য আইসিএস পরীক্ষা দিয়ে অকৃতকার্য হন। ব্যারিস্টারি পড়া অব্যাহত রাখলেন। লণ্ডনে এ সময় ভারতীয় ছাত্রদের নিয়ে গড়ে ওঠে লন্ডন মজলিস। জ্যোতি বসু এর প্রথম সম্পাদক নির্বাচিত হন। ভারতের স্বাধীনতার সপক্ষে মত গঠন করা এবং চাঁদা সংগ্রহ ছিল তাঁর মুখ্য কাজ। ১৯৪০ সালে তিনি ব্যারিস্টার হয়ে দেশে ফেরেন।
রাজনীতির সঙ্গে তাঁর পরিবারের তেমন সংযোগ ছিল না। তবে ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবীদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সহমর্মিতা ছিল তাদের পক্ষ থেকে সব সময়। ১৯১৩-১৪ সালে বিপ্লবী মদনমোহন ভৌমিক নিশিকান্ত বসুর বাড়িতে বেশ কিছুদিন আত্মগোপন করেছিলেন। এখানে অস্ত্রও লুকিয়ে রাখতেন। পুলিশের খানা-তল্লাশীর সময় জ্যোতি বসুর মা তাঁর শাড়ীর ভাজেঁ অস্ত্রটি লুকয়ে রেখেছিলেন। তাঁর বাড়ি ছিল ঢাকা জেলার ডুমনিতে। ১৯০৫ সালে তিনি অনুশীলন সমিতিতে যোগ দেন। ১৯১৩ সালে প্রথম গ্রেপ্তার। তখন তিনি ঢাকা মেডিকেল স্কুলের ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র। সাক্ষ্য সাবুদ যোগাড় করতে না পেরে পুলিশ শেষ পর্যন্ত মামলা তুলে নেয়। এরপর তিনি আত্মগোপন করলেন। ১৯১৪ সালে অসুস্থ অবস্থায় আবার গ্রেপ্তার হলেন। দ্বিতীয় বরিশাল ষড়যন্ত্র মামলায় তাঁর দশ বছর সাজা হয়। আন্দামানে দ্বীপান্তরে থাকার সময় তাঁর ওপর অকথ্য অত্যাচার হয়। জেল থেকে ছাড়া পেয়েও তিনি বিপ্লবীদের সান্নিধ্যে কাটান। ১৯৫৫ সালে তাঁর জীবনাবসান হয়।
এই ঘটনা জ্যোতি বসু ছোট বেলা থেকে মা-বাবার কাছে প্রায়ই শুনতেন। এই বিপ্লবীর জীবন কাহিনীই জ্যোতি বসুর মানস-চেতনায় দেশপ্রেমের বীজ বুনে। সেই স্কুল জীবন থেকে ভাবতে থাকেন দেশ ও দেশের মানুষের কথা। চিন্তা করতে থাকেন, কি করে মানুষের কল্যাণ করা যা! ১৯২৬ সালের আগস্ট মাসে প্রকাশিত হয় শরৎচন্দ্রের ‘পথের দাবী’। ওই বছরই সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে বইটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এসময় তিনি পথের দাবী গোপনে সংগ্রহ করে বইটি পড়েন।
১৯৩০ সালে মহাত্মা গান্ধির অনশনের সময় একদিন তিনি স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে ওই অনশনে যুক্ত হন। এ সময়ই তিনি অক্টরলোনি মনুমেন্টে (শহীদ মিনার ময়দান) সুভাষ বসুর ভাষণ শুনতে গেলেন খদ্দর পরে। সেদিন পুলিশ লাঠিপেটা শুরু করলে তাঁর মনে পলায়নের পরিবর্তে মোকাবেলার অনুভূতি জেগে উঠেছিল। আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন, ‘সেটাই বোধহয় রাজশক্তির বিরুদ্ধে আমার প্রথম প্রকাশ্য প্রতিবাদ’। কলকাতার সিনিয়র ক্যামব্রিজ (নাইনথ্ স্ট্যান্ডার্ড) কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে পড়াশুনাকালীন তিনি ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস অধ্যায়ন করেন। শৈশবকাল থেকে তিনি বিপ্লবীদের জীবনী পড়া পছন্দ করতেন। একনাগাড়ে জানতে শুরু করেন ভারতের স্বাধীনতাকামী বিপ্লবীদের সংগ্রামী জীবনের কথা। এক্ষেত্রে তার কলেজ শিক্ষক অজিত রায় সহযোগিতা করেন। প্রেসিডেন্সী কলেজে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য পড়াশুনাকালীন তিনি ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস বিষয়ে পড়াশুনা অব্যহত রাখেন।
জ্যোতি বসুর আত্মীয়া ইন্দুসুধা ঘোষ ছিলেন শান্তি নিকেতনে আচার্য নন্দলাল বসুর ছাত্রী। তিনি প্রায়ই আসতেন তাদের বাড়িতে আসতেন । পুঁটুর (সুহাসিনী গাঙ্গুলির) বান্ধবী। ইন্দুর ছেলে ছিলেন বেঙ্গল ল্যাম্পের কিরণ রায়। কিরণ রায়ই ইন্দুকে বিপ্লববাদে আকৃষ্ট করেছিলেন। পরে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যা হয়েছিলেন। নারী শিক্ষা মন্দিরে অধ্যক্ষ ছিলেন বহুদিন। জ্যোতি বসুর তরুণ বয়সে ইন্দুও ছিলেন ব্যতিক্রমী মানুষ।
“ক্ষুব্ধ স্বদেশ, বিপ্লবীদের মরণপণ সংগ্রাম, ইংরেজ রাজপুরুষদের নৃশংস অমানবিকতা, বাবার নিরুচ্চার স্বদেশ অনুভূতি, ইন্দুদি এই সব মিলিয়ে আমার তরুণ বয়স যেন ডিসট্যান্ট সিগনালের মতো দেখতে পেতাম ভবিষ্যতের পথ-নির্দেশ। যদিও তা খুব স্পষ্ট ছিল না তখন।
বাবার যে দাদা মারা গিয়েছিলেন, তাঁর স্ত্রী অর্থাৎ আমাদের জ্যাঠাইমা এবং তাঁর তিন ছেলে দুই মেয়ে আমাদের সঙ্গে থাকতেন। এই জ্যাঠাইমা ছিলেন স্বদেশী মানসিকতার। তাঁর কাছে মাঝে মধ্যে আসতেন কিরণ রায়, বিজয় মোদক প্রমুখ। এঁরা যাদবপুর টেকনিক্যাল স্কুলে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তেন। এঁদের দেখতাম। কিন্তু তখনো কিছু সচেতনভাবে বুঝতাম না। আমার জ্যাঠামশাই নলিনীকান্ত বসু তখন হাইকোর্টের বিচারপতি পদ থেকে অবসর নিয়েছেন। তিনি ভুগছিলেন ডায়াবেটিসে। ওই সময় মেছুয়াবাজার বোমার মামলা বিচারের জন্য সরকার একটি স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছিলেন। মূল অভিযুক্ত ছিলেন নিরঞ্জনদা (নিরঞ্জন সেন) এবং অন্যরা। জ্যাঠামশাইকে বলা হলো ওই স্পেশাল ট্রাইব্যুনালের জজ হতে। বাবার তীব্র আপত্তি ছিল। বললেন, কেন এই সমস্ত গোলমালের মধ্যে আপনি যাচ্ছেন? তা ছাড়া আপনার শরীরও সুস্থ নয়। কিন্তু চিফ সেক্রেটারি নিজে আমাদের বাড়িতে এসে জ্যাঠামশাইয়ের সম্মতি আদায় করলেন। আমরা যখন শুনলাম, খুব খারাপ লাগল। বিপ্লবীদের পথ ও মত সম্পর্কে আমার তখন স্পষ্ট কোনো ধারণা ছিল না। কিন্তু এটা তো বুঝতাম ওরা দেশের জন্য প্রাণ দিচ্ছেন। বহু বাঙালি পরিবার হয়ত সরাসরি সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত ছিল না, কিন্তু হৃদয়ের মধ্যে তারা রেখে দিয়েছিল এই সমর্পিত প্রাণ বিপ্লবীদের জন্য শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা। যাই হোক জ্যাঠামশাই ট্রাইব্যুনালের জজ হলেন। পুলিশ সেই সময় তল্লাশি চালিয়ে বহু বই বাজেয়াপ্ত করত। সেই সমস্ত বই জ্যাঠামশাইয়ের টেবিলে সাজানো থাকত। উনি যখন কোর্টে যেতেন, আমরা গোপনে বইগুলো দেখতাম। আবার ফেরার আগে যথাস্থানে সাজিয়ে রাখতাম। এভাবেই আমার নিষিদ্ধ রাজদ্রোহী সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় এবং পরিণয় ঘটেছে”(জ্যোতি বসুর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ থেকে)।
ব্রিটিশ-ভারতে বিলেতি শিক্ষার সামাজিক ও পেশগত মূল্য ছিল অসীম। জ্যোতি বসুর বাবা সেই কারণেই তাকে উচ্চ শিক্ষার জন্য ছেলেকে বিলেত পাঠান। ১৯৩৫ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করে তিনি তাই লন্ডন চলে যান আইন শিক্ষার জন্য। লন্ডনে এসে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়।
১৯৩৬-এ ভূপেশ গুপ্ত পড়তে এলেন লন্ডনে। তিনি ছিলেন স্বদেশী। এজন্য ব্রিটিশ পুলিশ গ্রেফতার করে। বহরমপুর জেলে আটকে রাখে। কারাবন্দি থেকেই বিএ পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হন। মুক্ত হয়ে লন্ডনে এলেন ব্যারিস্টারি পড়তে যান।
লন্ডনের একটি বাড়িতে ভূপেশের সঙ্গে জ্যোতি বসুর প্রথম পরিচয়। দেশ থেকে ভূপেশ গ্রেট ব্রিটেন কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বের উদ্দেশ্যে লিখিত একটি চিঠি সঙ্গে করে নিয়ে যান। প্রায় একই সময়ে স্নেহাংশু আচার্য এসে উপস্থিত লন্ডনে। ভূপেশের সঙ্গে জ্যোতি বসুও দেখাকরলেন ব্রিটেনের বিখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা হ্যারি পলিট, রজনী পাম দত্ত, বেন ব্র্যাডলে প্রমুখের সঙ্গে। ব্রিটিশ কমিউনিস্ট নেতৃবৃন্দ ইন্ডিয়া লীগ এবং ভারতীয় ছাত্রদের সক্রিয় সমর্থন ও সহযোগিতা করেছিলেন।
মূলত এ সময় থেকেই জ্যোতি বসু কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়লেন। লন্ডনে ভারত লীগ ও ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান স্টুডেন্টস ইন গ্রেট বৃটেনের সদস্য ও ভারত মজলিসের সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করে তা যথাযথভাবে পালন করেন।
বিশ্ব রাজনীতি তখন তিনটি ধারায় প্রবাহিত। একদিকে নাৎসি ও ফ্যাসিবাদী শক্তির প্রসার, অন্যদিকে কমিউনিস্টদের ক্রমবর্ধমান প্রভাব বৃদ্ধি। একই সময় পুঁজিবাদি গণতান্ত্রিক শক্তির ক্রমবিকাশ ঘটতে থাকে। পরাধীন দেশগুলির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ক্রমশ প্রবল হয়ে উঠে। ওই সময় সোভিয়েত রাশিয়া পৃথিবীর বিভন্ন দেশে তাদের স্বাধীনতার জন্য প্রত্যক্ষভাবে সাহায্য করে। ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। ১৯৪০ সালে জ্যোতি বসু দেশে ফিরে কমিউনিস্ট পার্টির সাথে যুক্ত হয়ে সদস্য পদ নিলেন। একপর্যায়ে পার্টি থেকে তাকে শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য দায়িত্ব দেয়া হল। শুরু করেন শ্রমিক আন্দোলন। অল্প দিনের মধ্যে শ্রমিক নেতা হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেন।
“বাবা ইতোমধ্যে আমার বিবাহের জন্য আলোচনা করে রেখেছিলেন। আমি বিবাহের কথা গুরুত্ব দিয়ে তখন ভাবতাম না। কেননা আমি মনে করতাম যে আমাদের কঠিন সংগ্রামের সম্মুখীন হতে হবে। যাই হোক না কেন, আমি বিবাহ করলাম। আমার শ্বশুরের নাম ছিল শ্রীঅনুকূল ঘোষ, এই পরিবারেরই একজন ছিলেন অধ্যাপক প্রফুল্ল ঘোষ; ইনি প্রেসিডেন্সি কলেজের ইংরেজির অধ্যাপক ছিলেন। বিবাহের অল্পদিন বাদেই আমার স্ত্রীর মৃত্যু হয়। ১৯৪১ সালে আমার মায়ের মৃত্যু হয়। আমি সেই সময় হাইকোর্ট বার লাইব্রেরিতে বসে আছি। বাবা টেলিফোনে আমাকে খবর দিলেন। শ্রাদ্ধের কাজ আমার দাদাই করলেন। বাবাই আমাকে বললেন, আমাকে নিরামিষ খেতে হবে না, তার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি অবশ্য ওসব কিছুই করতাম না। বাবা এটা বলাতে আমি জোর পেলাম”(জ্যোতি বসুর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ থেকে)।
১৯৪৪ সালে গড়ে তোলেন বেঙ্গল আসাম রেল রোড ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন। বেঙ্গল আসাম রেল রোড ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের নেতা জ্যোতি বসু ১৯৪৬ সালের গোড়ার দিকে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইনসভার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় কংগ্রেসের হুমায়ুন কবীরকে আট হাজার ভোটে পরাজিত করে বিধায়ক নির্বাচিত হন বসু। এই নির্বাচনে কমিউনিস্ট পার্টি মোট তিনটি আসন পেয়েছিল। জ্যোতি বসুর সঙ্গে দার্জিলিং কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন অপর কমিউনিস্ট নেতা রতনলাল ব্রাহ্মণ।
১৯৪৬ সালের ১৪ মে নবগঠিত প্রাদেশিক আইনসভার প্রথম বৈঠক বসে। এই দিন রাজবন্দীদের মুক্তির বিষয়ে জ্যোতি বসু একটি মুলতুবি প্রস্তাব দিয়েছিলেন। প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। পরে সেই মুলতুবি প্রস্তাব পুনর্বিচারের জন্য অস্থায়ী অধ্যক্ষ ডি গ্ল্যাডিং-এর নিকট আবেদন জানান, কিন্তু গ্ল্যাডিং এই প্রস্তাব গ্রহণে অসম্মতি জানান। জুলাই মাসে বাজেট অধিবেশন বসলে প্রথমেই বন্দী মুক্তির প্রসঙ্গে আইনসভা সোচ্চার হয়। জ্যোতি বসু পুনরায় এই প্রসঙ্গে একটি মুলতুবি প্রস্তাব উত্থাপন করলে অধ্যক্ষ তা প্রত্যাখ্যান করেন। কারণ জানতে চাইলে, মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী কিছু বলতে যান। বসু উত্তরে বলেন যে, তিনি অধ্যক্ষের রুলিং মেনে চলবেন, মুখ্যমন্ত্রীর নয়। কংগ্রেসের কিরণশঙ্কর রায়, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রমুখ সদস্য জ্যোতি বসুকে সমর্থন করেন এবং বাইরে অপেক্ষমান হিন্দু-মুসলমান ছাত্র শোভাযাত্রার কাছে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে বক্তব্য রাখতে অনুরোধ জানান। এই নিয়ে বিধানসভায় বেশ উত্তেজনা হয়। সোহ্রাওয়ার্দী এক প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ১৫ অগস্টের মধ্যে রাজবন্দীদের মুক্তির প্রতিশ্রুতি দেন। বন্দীরাও মুক্তি পান। উল্লেখ্য, এই বন্দীমুক্তির ব্যাপারে জ্যোতি বসু ও কমিউনিস্ট পার্টিই মূলত উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন এবং আইনসভায় তাঁরা কংগ্রেসের সহায়তাও পেয়েছিল।
জ্যোতি বসুর রাজনৈতিক জীবন ঘটনা বহুল। বিধানসভায় বিরোধী দলের নেতৃত্ব থেকে শুরু করে উপ-মুখ্যমন্ত্রীত্ব, ১৯৫২সাল থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত রাজ্য কমিটির সম্পাদকের দায়িত্ পালন করেন। ১৯৭৭ সালের ২১শে জুন বাম ফ্রণ্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ গ্রহণ করে দায়িত্ব পালন করেন। এটা ছিল তার রাজনৈতিক জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এই সময়ে ঘটে গেছে বহু পরিবর্তন। দেশ ভাগ হয়েছে, কমিউনিস্ট পার্টি ভাগ হয়েছে, নকশাল রাজনীতির সমর্থন ও বিরোধিতায় বুদ্ধিজীবী থেকে সাধারণ দলীয় কর্মীরা আন্দোলিত হয়েছে।
“১৯৮৭ সালের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশ সফরের কথা বিশেষভাবে মনে পড়ছে। বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণেই সস্ত্রীক সেখানে গিয়েছিলাম। সফর ছিল দিন পাঁচেকের। ২৯ জানুয়ারি বিকালে ঢাকায় যাই। কলকাতায় ফিরে আসি ফেব্রুয়ারির ২ তারিখে। একচল্লিশ বছর পর ঢাকায়। হাজার হাজার মানুষের সোচ্চার অভ্যর্থনায় আমি অভিভূত হয়ে পড়েছিলাম।
ঢাকায় যাওয়ার পরদিন গিয়েছিলাম আমার পৈত্রিক বাড়ি নারায়ণগঞ্জের বারদিতে। হেলিকপ্টারে মেঘনা নদী পেরিয়ে। সকালে হেলিকপ্টার নামার পরই সে এক আশ্চর্য দৃশ্য। হাজার হাজার মানুষ এসেছেন, আমাকে দেখতে। তাঁরা আমাকে মনে রেখেছেন! গাঁদা ফুলের পাশাপাশি গোলাপ ফুলের তোড়ায় চাপা পড়ে যাওয়ার যোগাড়।
বুক ভরা ভালোবাসা আমাকে যেন শৈশবে পৌঁছে দিয়েছিল। ওখানে আমাদের পুরনো দোতলা বাড়ি। ছোটবেলায় ছুটির সময় বাবার সঙ্গে বারদির বাড়িতে যেতাম। সেই বাড়ি, ঘর, বারান্দা। পাল্টে যাওয়া চারপাশ। সে এক আলাদা অনুভূতি। আমি আর আমার স্ত্রী দোতলায় উঠি। বারদির বাড়িতে দেখা হয় হবিবুল্লাহ আর তাঁর নব্বই বছরের মা আয়াতুন্নেসার সঙ্গে। উনি আমাকে ছোট বেলায় দেখেছেন। বারদিতে ইউনিয়ন অফিসে আমরা দুপুরের খাবার খেয়েছিলাম। বিকালে ঢাকায় ফিরে আসি।
ঢাকায় রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদের সঙ্গে সৌজন্যমূলক সাক্ষাৎকার তো ছিলই। মনে আছে, বৈঠক হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী মিজানুর রহমান, উপরাষ্ট্রপতি এ কে এস নুরুল ইসলাম, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে। কথা হয়েছিল আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে। বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে। পরে আরো একবার বাংলাদেশ গিয়েছি। কিন্তু সাতাশির বাংলাদেশ সফর সেবার ভীষণভাবে দাগ কেটেছিল। দেশ ভাগের আগের স্মৃতি যাঁদের আছে তাঁদের সকলেই বোধহয় আমার মতো অবস্থা।
আবার বাংলাদেশে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ওঁরা আমায় বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। ওঁদের বিদেশমন্ত্রীও কলকাতায় এসে আমাকে অনুরোধ করেন। কিন্তু বেশ কিছুদিন সময় করা যাচ্ছিল না। অবশেষে ২৭ নবেম্বর আমি ঢাকায় গেলাম। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবং অসীম দাশগুপ্ত গিয়েছিলেন আমার সঙ্গে। সরকারিভাবে ওদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। বাংলাদেশ সরকারের আতিথ্যের কথা নতুন করে বলার নয়। সে দেশের মানুষ আমার প্রতি, আমাদের রাজ্য সরকারের প্রতি যে শ্রদ্ধা ভালোবাসা দেখিয়েছেন তাতে আমি অভিভূত। এবারো আমি বারদিতে গিয়েছিলাম। ছোট বেলার স্মৃতি জড়িয়ে আছে যেখানে তার টানই আলাদা। ওই বাড়িটাকে আমি অবশ্য বাংলাদেশ সরকারের হাতেই তুলে দিয়েছি। আমি বলেছিলাম, সাধারণ মানুষের কাজে লাগে এমন কোনোভাবে বাড়িটাকে ব্যবহার করা হোক। ওঁরা কথা দিয়েছেন, তাই হবে।
বাংলাদেশ সফরে স্বাভাবিকভাবেই জলবণ্টন নিয়ে আমাকে হাজারো প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। সাংবাদিকরা তো ছাড়তেই চান না। আমি বললাম, চুক্তি করতে হবে তো দিল্লির সঙ্গে, কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে। আমি চাই, পারস্পরিক স্বার্থ বজায় রেখে জলবণ্টন চুক্তি করা হোক। আমাদের স্বার্থ দেখতে হবে। ওদের ব্যাপারটাও দেখতে হবে। দু’দেশের সুসম্পর্ক গড়তে হবে। জনগণ তাই চান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও তাই বললাম।
জলবণ্টন চুক্তি।
বাংলাদেশ থেকে ফিরে ডিসেম্বরের গোড়ায় আমি দিল্লি গেলাম। সেখানে প্রধানমন্ত্রী দেবগৌড়ার সঙ্গে কথা হলো। বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন আলোচনা হলো। তার পরদিনই শেখ হাসিনা দিল্লিতে এলেন। প্রধানমন্ত্রী দেবগৌড়ার সঙ্গে ওনার কথা হলো। আমার সঙ্গে হলো। তারপরই ১২ ডিসেম্বর (১৯৯৬) স্বাক্ষরিত হলো জলবণ্টন নিয়ে সেই ঐতিহাসিক চুক্তি”(জ্যোতি বসুর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ থেকে)।
এই কিংবদন্তি নেতা একটানা ২৩ বৎসর পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ২০০০ খ্রিস্টাব্দে জ্যোতি বসু বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের হাতে দায়িত্ব ছেড়ে অবসর জীবনে চলে যান। এরপর থেকে সল্টলেকে ইন্দিরা ভবনে বসবাস করতে থাকেন তিনি। এখানে বসবাস কালে তিনি পার্টি নীতি নির্ধারণী থেকে শুরু করে পার্টির যাবতীয় বিষয়ে সার্বক্ষণিক পরামর্শ ও দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি দীর্ঘ দিন ধরে শ্বাসকষ্টে ভুগেছেন।
আমাদের গ্রামের গল্প!

আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন
পণ্ডশ্রম

এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,
চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।
কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,
আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।
দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন
আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?
আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?
ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন
ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই
আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।
তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন
১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে
আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।