মর্গের ডোম হিসেবে শুধু সনি দাসেরই নিয়োগ রয়েছে। সনি জানান, এই কাজ একার পক্ষে সম্ভব হয় না। একটা লাশ হাসপাতাল থেকে তুলে নিয়ে আসা, মর্গে এনে নামানো, কাটাকাটি করে সেলাই করে আবার প্যাকেট করে গাড়িতে তুলে দিতে হয়। এই কাজের জন্য পাঁচ-ছয়জন লোকের প্রয়োজন পড়ে। তাই তাঁর ছোট ভাই রনি কুমার দাস, ভাগনে সুদা চন্দ্র দাস, চাচাতো ভাই সুরেশ চন্দ্র দাস, সুমন কুমার দাসকে সহযোগী হিসেবে রেখেছেন। এরা সবাই প্রায় কিশোর বয়সের। এদের পড়াশোনা তৃতীয় থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত। মাসে ২০ টাকা শুধু সনি দাসেরই প্রাপ্য, কিন্তু সেই বেতন ওঠাতে হয় জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে। সনি বলেন, ১৩-১৪ মাস আগে তাঁর বাবা মারা গেছেন। বাবার মৃত্যুর পর তিনি এই টাকার খোঁজে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু ঝামেলার কথা শুনে টাকা না তুলেই চলে আসেন। আর কোনো দিন ওই টাকার খোঁজে যাননি। তিনি বলেন, তাঁর বাবা অবিনাশও কোনো দিন ওই বেতন তুলতে যাননি। তাঁদের হাত পাততে হয় যাঁরা লাশ নিয়ে আসেন তাঁদের কাছে।
কয়েক দিন আগে হাসপাতালের মর্গে গিয়ে দেখা যায়, সনিসহ তারা সিঁড়ির ওপরে সার হয়ে বসে রয়েছে। সনি জানান, শুধু বেতনই নয়, মর্গে আরও কিছু খরচ আছে, কোনো খরচই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দেয় না। যেমন—কাজ করতে গেলে গ্লাভস, ব্লেড, বয়াম, লবণ, সুতা, গালা, মোম, ম্যাচ, মার্কিন কাপড়, পাটি, পলিথিন ও কিছু মেডিসিন লাগে—সবই তাঁদের কিনতে হয়। কিন্তু এসব করেও তাঁরা সব সময় টাকা পান না। অনেক লাশ আসে পরিচয়হীন। অভিভাবক থাকে না। যেসব লাশের আত্মীয়স্বজন গরিব, তারা কান্নাকাটি করে, টাকা দিতে পারে না। আবার যারা প্রভাবশালী, তারা ধমক দেয়। ধমক খেয়েই চুপ করে থাকতে হয়।
সনি বলেন, ‘সবাই মনে করে, আমরা সরকারি চাকরি করি। কারও মনে চাইলে আমাদের বকশিশ দিবে, না হয় না দিবে। আমাদের কথা কেউ শোনে না। কেউ বুঝতে চায় না।’ তিনি বলেন, ‘আমরা চাই না, স্বজন হারানো শোকে পাথর কোনো মানুষের কাছে টাকার জন্য হাত পাতি। তা ছাড়া সব দিন লাশ পাওয়া যায় না। কখনো কখনো সারা দিন বসে থেকে চলে যেতে হয়।’
রাজশাহী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ সৈয়দ গোলাম কিবরিয়া বলেন, তিনি ঠিক জানেন না, কীভাবে ডোমেরা পারিশ্রমিক পান। এটি খোঁজ নিয়ে বলতে পারবেন। তিনি বলেন, তাঁরা মেডিকেল কলেজে পড়েছেন। তখন থেকেই দেখেন, ডোম আছেন, কাজ করেন। তিনি স্বীকার করেন, তাঁদের ছাড়া মেডিকেল কলেজ চলবে না। কিছুক্ষণ পরে ফোন করে তিনি বলেন, মেডিকেল কলেজে সুইপারের নিচে আর কোনো পদ নেই। ডোম মেডিকেল কলেজের কোনো স্টাফ নন। তাই এ ব্যাপারে তাঁদের কিছু করার নেই।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশরাফুল আলম সিদ্দিকী বলেন, ‘ওরা ডোম হিসেবে কাজ করে। ওরা হাসপাতালের স্টাফ না।’ তিনি বলেন, তাঁদের সুইপার পদে নিয়োগ দিয়ে লাশ কাটার কাজ করালে তাঁরা হাসপাতালের স্টাফ হিসেবে বেতন পেতে পারেন। তা ছাড়া তাঁদের জন্য কিছু করার নেই। তিনি বলেন, এটা চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

