আমার প্রিয় পোস্ট

বঙ্গবন্ধুর সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা : কিছু দালিলিক চিত্র ও প্রাসঙ্গিক গল্প....অমি রহমান পিয়াল

১৯ শে জুলাই, ২০১০ রাত ১১:৪২

শেয়ারঃ
0 1 0

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গ উঠলে এসব ঘাতক-দালালকেও দেখা যায় বঙ্গবন্ধূকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করতে। খুনী আল-বদর নেতারা তখন বাকশালের জনকের নাম তাজিমের সঙ্গে উচ্চারণ করে বলে- তিনি তো সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে বিষয়টি নিষ্পত্তি করে দিয়েছেন, এতদিন পরে এসব নিয়ে আলোচনা অর্থহীন। রাজনৈতিক মিত্রতা সূত্রে তাদের পক্ষের সুশীল ও বুদ্ধিজীবিদের মুখেও একই কথার অনুরণন। লেখনীতেও। সঙ্গে জুড়ে যায় আজগুবী সব গালগল্প। দালাল শিরোমনি শাহ আজিজুর রহমানের সঙ্গে কুমিল্লা সার্কিট হাউজে খিচুড়ি খাওয়া, খান এ সবুরকে ছুটাতে গাড়ি নিয়ে নিজে জেল গেটে যাওয়া। একজন মহামানবকে বিতর্কিত করতে যত কসুর থাকে তারই সবই প্রয়োগ করে গেছে তারা প্রজন্মান্তরে। আর তা মুখে মুখে রটে, আমাদেরও শোনানো হয়।


ব্যক্তিগত আগ্রহের কারণেই এই সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার বিষয়টি নিয়ে ঘাটাঘাটি আমার দীর্ঘদিনের। সময়টায় সম্বল বলতে নিউইয়র্ক টাইমসের একটি পেপার কাটিং, যাতে অল্প কয়েক লাইনে বলা হয়েছে ৩০ হাজারের মতো দালালকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে যার মধ্যে রয়েছে কারাগারে থাকা গভর্ণর মালিক ও তার কয়েকজন সাঙ্গপাঙ্গ। এত বড় একটা ঘটনা, এত বড় একটা সিদ্ধান্ত, এত বড় একটা ঘোষণা এর কোনো দলিল থাকবে না! খোঁজের পর খোঁজ, পরিচিত মুক্তিযুদ্ধ দলিল সংগ্রাহক কিংবা যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে কাজ করাদের কাছে পাই না। এটা রাষ্ট্রপ্রধানের আদেশ, সরকারী গ্যাজেটে থাকা উচিত। আইনজীবিদের কাছে বার্ষিক আইন কানুনের যে অমনিবাস থাকে, তাতে থাকা উচিত। পাই না। ’৭৩-৭৪ সালের অনেক কিছুই তাদের সংগ্রহে থাকে না। ফাইলপত্র গায়েব। দলিলপত্র গায়েব। সুপ্রীমকোর্টের একজন আইনজীবি সরাসরি অভিযুক্ত করলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে। তিনি আত্মসমর্পনের স্মারক ঢাকতে যেমন শিশুপার্ক বানিয়েছেন, তেমনি যুদ্ধাপরাধীদের প্রসঙ্গে যাবতীয় কাগজপত্রকে ছাই বানানোর আদেশটা ব্যক্তিগত উদ্যোগে কার্যকর করেছেন। বার কাউন্সিল লাইব্রেরিতেও নেই।




আমার সম্বল বলতে অল্প ক’টি লাইন। বঙ্গবন্ধু সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছেন ঠিকই, কিন্তু খুনী, ধর্ষক, লুটেরাদের মাফ দেননি। কিন্তু প্রমাণ কি! এমন কথা যারা বলে তারাও দেয় না, যুদ্ধাপরাধী বলে যারা অভিযুক্ত এই সাধারণ ক্ষমার চাদর গায়ে চড়ায়- তারাও না। তাহলে কি! ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর বঙ্গবন্ধূ এই ঘোষণা দিয়েছিলেন। প্রেসনোটটি ছাপা হওয়ার কথা তখনকার পত্রিকাগুলোয়। এবার সে খোঁজে লাগা। আর এখানেই ত্রাতা হয়ে আসে জিসান। প্রকাশনার প্রক্রিয়ায় থাকা দৈনিক অধিনায়ক ে যোগ দেওয়ার পর আমাকে কিছু মেধাবী ছেলেমেয়ে নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। আগামী একযুগে বাংলাদেশের সাহিত্য সংস্কৃতিতে একটা বড় ভূমিকা রাখার যোগ্যতা এরা রাখে। জিসান তাদের একজন। এই সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পেপার ক্লিপ যোগাড় করতে আমি দুজনকে দায়িত্ব দিই। অভিজিত দাস জাতীয় আর্কাইভে যাওয়ার পর তাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের অনুমতিপত্রের মুলো ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। বাংলা একাডেমিতে একই বাধার মুখে পড়ে জিসানও। তার আগে পিআইবিতে গিয়ে ব্যর্থ হতে হয় তাকে।



পরের গল্পটা স্পাই থ্রিলারকে হার মানায়। মেয়াদোত্তীর্ণ লাইব্রেরী কার্ড সম্বল করে জিসান ঢুকে পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পাঠাগারের ভুতল আর্কাইভে। পরিচিত মামাদের ভরসায় বড় বড় মশার কামড় খেয়ে খুঁজে বার করে আরাধ্য সেই পত্রিকাগুলো। এর মধ্যে কয়েকজন ছাত্রনেতা তার এই অস্বাভাবিক তৎপরতায় আগ্রহী হয়, তার ইন্টারভিউ (পড়ুন জেরা) নেয়। নেতাদের নাম মুখস্ত করে তাদের কর্মজীবন সম্পর্কে আধারে থাকা এইসব মুরুব্বীরা অবশ্য জিসানের স্মার্টনেসের কাছে পাত্তা পায় না। সে বরং উল্টো তাদের ক্যামেরা ধরিয়ে দিতে চায় ছবি তোলায় সাহায্য করতে। কাঁপা হাতে জিসান ছবি তোলে, ভিডিও করে তার স্যামসাং মোবাইলে। ব্যাটারির আয়ু ফুরানোর আগে শেষ করে পুরোটা। এসে আমাকে ব্লু টুথে সেসব পাচার করার পর প্রতিশ্রুতি দেয়, পিয়াল ভাই আমাকে চারটা দিন দেন আরো, আমি প্রত্যেকটা লাইন লিখে নিয়ে আসবো।


ওকে আনন্দে জড়িয়ে ধরার প্রবল ইচ্ছাটা আমি সম্বরণ করি। চাপা উত্তেজনা নিয়ে আমি বাসায় ফিরি। এই ছবি আর ক্লিপ সম্বল করেই দেখি কতটা কি বের করা যায়। দুদিনের অপেক্ষা আমার সহ্য হয় না। ছবিগুলো ছোটো বড় করে বোঝার চেষ্টা করি অক্ষরগুলো, নিজেই লিখে ফেলি সবটুকু। ক্লিপগুলো ইউটিউবে আপলোড করার সিদ্ধান্তটা আগেই নেয়া। সেগুলো বাছাই, এরপর কনভার্টার ব্যবহার করে এভিআই ফাইল বানানো, ম্যুভি মেকারে আরেকটু স্লো করে, ব্রাইটনেস অ্যাডজাস্ট করে একটা পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়া। এসব কিছুই হতো না যদি না জিসান নামে ছেলেটা থাকতো। মুক্ত তথ্য প্রবাহের এই যুগে বাংলা ব্লগে ঐতিহাসিক একটি উপাত্ত উন্মোচনে ওর এই ভূমিকা আমি আজীবন কৃতজ্ঞতাভরে স্মরণ করবো। এবার দেখা যাক কি আছে সাধারন ক্ষমা ঘোষণায়, কি লেখা হয়েছিলো এর ফলোআপ রিপোর্টগুলোতে, কারা কারা মুক্তি পেয়েছিলো।



সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার প্রতিবেদন : দৈনিক বাংলা ১ ডিসেম্বর ১৯৭৩

শিরোনাম : দালাল আইনে আটক সাজাপ্রাপ্তদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা
উপ-শিরোনাম : দেশের কাজে আত্মনিয়োগের জন্য ক্ষমাপ্রাপ্তদের প্রতি বঙ্গবন্ধুর আহ্বান : ধর্ষণ ও হত্যাকারীদের ক্ষমা নেই

সরকার বাংলাদেশ দালাল আইনে অভিযুক্ত ও সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছেন। বাংলাদেশ দালাল (বিশেষ ট্রাইবুনাল) অধ্যাদেশ ১৯৭২ বলে যারা আটক হয়েছেন, যাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা অথবা হুলিয়া রয়েছে এবং যারা এই আইনে সাজা ভোগ করছেন তাদের সকলের প্রতিই এই সাধারণ ক্ষমা প্রযুক্ত হবে এবং তারা অবিলম্বে মুক্তিলাভ করবেন। তবে নরহত্যা, নারী ধর্ষণ এবং অগ্নিসংযোগ অথবা বিস্ফোরকের সাহায্যে ঘরবাড়ি ধ্বংস অথবা জলযান ধ্বংসের অভিযোগে অভিযুক্ত ও সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা প্রযুক্ত হবে না। গতকাল শুক্রবার রাতে প্রকাশিত এক সরকারী প্রেসনোটে এই সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার কথা প্রকাশিত হয়।
প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গতরাতে বলেন, দলমত নির্বিশেষে সকলেই যাতে আমাদের মহান জাতীয় দিবস ১৬ ডিসেম্বরে ঐক্যবদ্ধভাবে নতুন দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে দেশ গড়ার শপথ নিতে পারে সরকার সেজন্য দালাল আইনে আটক ও সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছেন। বাংলাদেশ দালাল অধ্যাদেশে আটক ও সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা যাতে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পর অনতিবিলম্বে জেল থেকে মুক্তিলাভ করতে পারেন এবং আসন্ন ১৬ ডিসেম্বরে বিজয় উৎসবে যোগ দিতে পারেন বঙ্গবন্ধু সেজন্য তাদের মুক্তি তরান্বিত করতে স্বরাষ্ট্র দফতরের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন। সাধারণ ক্ষমায় যারা মুক্তি পাবেন তাদের বিজয় দিবসের উৎসবে একাত্ম হতে এবং দেশ গঠনের পবিত্র দায়িত্ব ও দেশের স্বাধীনতা রক্ষার শপথ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
বঙ্গবন্ধু তার সরকারের সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শনের কথা ঘোষণা করতে গিয়ে বলেন, মুক্ত হয়ে দেশগঠনের পবিত্র দায়িত্ব গ্রহণের পূর্ণ সুযোগ তারা গ্রহণ করবেন এবং তাদের অতীতের সকল তৎপরতা ও কার্যকলাপ ভুলে গিয়ে দেশপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন তিনি এটাই কামনা করেন।
বঙ্গবন্ধু বলেন, বহু রক্ত, ত্যাগ তিতিক্ষা আর চোখের পানির বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা লাভ করেছি। যে কোনো মূল্যে এই স্বাধীনতাকে রক্ষা করতে হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে এবারের বিজয় দিবস বাঙালীর ঘরে ঘরে সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণের এক নতুন দিগন্ত উম্মোচিত করবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কিছু লোক দখলদার বাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা করে আমাদের মুক্তি সংগ্রামের বিরোধিতা করেছিলেন। পরে বাংলাদেশ দালাল আদেশ বলে তাদের গ্রেফতার করা হয়। এদের মধ্যে অনেকেই পরিচিত ব্যক্তি। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় দখলদার বাহিনীর সঙ্গে তাদের সহযোগিতার ফলে বাংলাদেশের মানুষের জীবনে অবর্ণনীয় দুঃখ দুর্দশা নেমে এসেছিল।
বঙ্গবন্ধু বলেন, এসব লোক দীর্ঘদিন ধরে আটক রয়েছেন। তিনি মনে করেন এতদিনে তারা নিশ্চয়ই গভীরভাবে অনুতপ্ত। তারা নিশ্চয়ই তাদের অতীত কার্যকলাপের জন্য অনুশোচনায় রয়েছেন। তিনি আশা করেন তারা মুক্তিলাভের পর তাদের সকল অতীত কার্যকলাপ ভুলে গিয়ে দেশ গঠনের নতুন শপথ নিয়ে প্রকৃত দেশপ্রেমিকের দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন। গতকাল স্বরাষ্ট্র দফতর থেকে নিম্নোক্ত প্রেসনোটটি ইস্যু করা হয়।

প্রেসনোট : যারা ১৯৭২ সালের দালাল (বিশেষ ট্রাইবুনাল) আদেশ (পি.ও নং-৮, ১৯৭২ সালের) বলে আটক রয়েছেন অথবা সাজাভোগ করছেন তাদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শনের প্রশ্নটি সরকার আগেও বিবেচনা করে দেখেছেন। সরকার এ সম্পর্কে এখন নিম্নোক্ত ঘোষণা করছেন : ১. দুনম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত ব্যক্তিদের ও অপরাধ সমূহের ক্ষেত্র ছাড়া : (ক) ১৮৯৮ সালের ফৌজদারী দন্ডবিধি ৪০১ নং ধারা অনুযায়ী উল্লিখিত আদেশবলে আটক ও সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের রেহাই দেওয়া হচ্ছে এবং উল্লিখিত আদেশ ছাড়া অন্য কোনো আইনবলে তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ না থাকলে তাদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার অনতিবিলম্বে জেল থেকে মুক্তি দেওয়া হবে। (খ) কোনো বিশেষ ট্রাইবুনালের সম্মুখে অথবা কোনো বিশেষ ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে উক্ত আদেশবলে বিচারাধীন সকল মামলা সংশ্লিষ্ঠ ট্রাইবুনাল ও ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি নিয়ে প্রত্যাহার করা হবে এবং উল্লিখিত আদেশ ছাড়া অন্য কোনো আইনে তাদের বিরুদ্ধে বিচারাধীন কোনো মামলা বা অভিযোগ না থাকলে তাদের হাজত থেকে মুক্তি দেওয়া হবে। (গ) কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে উল্লিখিত আদেশবলে আনীত সকল মামলা ও তদন্ত তুলে নেওয়া হবে এবং উল্লিখিত আদেশ ছাড়া অন্য কোনো আইনে বিচার বা দন্ডযোগ্য আইনে সে অভিযুক্ত না হলে তাকে মুক্তি দেওয়া হবে। উল্লিখিত আদেশবলে ইস্যু করা সকল গ্রেফতারী পরোয়ানা, হাজির হওয়ার নির্দেশ অথবা কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে হুলিয়া কিংবা সম্পত্তি ক্রোকের নোটিশ দেয়া থাকলে তা প্রত্যাহার বলে বিবেচিত হবে এবং গ্রেফতারী পরোয়ানা অথবা হুলিয়ার বলে কোনো ব্যক্তি ইতিপূর্বে গ্রেফতার হয়ে হাজতে আটক থাকলে তাকে অনতিবিলম্বে মুক্তি দেওয়া হবে। অবশ্য সে ব্যক্তি উল্লিখিত দালাল আদেশ ছাড়া কোনো বিচার বা দন্ডযোগ্য অপর কোনো আইনে তার বিরুদ্ধে যদি কোনো মামলা না থাকে তবেই। যাদের অনুপস্থিতিতেই সাজা দেওয়া হয়েছে অথবা যাদের নামে হুলিয়া বা গ্রেফতারী পরোয়ানা ঝুলছে তারা যখন উপযুক্ত আদালতে হাজির হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা ও বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করবে কেবল তখনই তাদের বেলা ক্ষমা প্রযোজ্য হবে। ২. দন্ডবিধির ৩০২ নং ধারা (হত্যা), ৩০৪ নং ধারা, ৩৭৬ ধারা (ধর্ষণ), ৪৩৫ ধারা (গুলি অথবা বিস্ফোরক ব্যবহার করে ক্ষতিসাধন), ৪৩৬ ধারা (ঘর জ্বালানো) ও ৪৪৮ ধারায় (নৌযানে আগুন বা বিস্ফোরণ) অভিযুক্ত ও সাজাপ্রাপ্তগণ এক নম্বর অনুচ্ছেদে উল্লিখিত ক্ষমার আওতায় পড়বে না।



বাংলার বাণী কিংবা ইত্তেফাকের কথাবার্তাও মোটামুটি একইরকম যার নমুনা মিলবে ভিডিও ফুটেজে। দৈনিক বাংলার সেদিনের পাতাতেই আরেকটি চমকপ্রদ সংবাদ রয়েছে। জিয়া সরকারের আমলে প্রধানমন্ত্রী হওয়া শাহ আজিজুর রহমান এবং এরশাদের কাছে স্বাধীনতা পদকে সম্মানিত শর্ষীনার পীর সাহেবের জেলমুক্তি নিয়ে খবরটি। লেখা হয়েছে : বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ আদেশে গতকাল শুক্রবার সকালে ঢাকা সেন্ট্রাল জেল থেকে অধুনালুপ্ত পিডিপির নেতা শাহ আজিজুর রহমান এবং শর্ষীনার পীর সাহেবকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। দখলদার বাহিনীর সাথে সহযোগিতার অপরাধে তাদের আটক করা হয়েছিলো। এনার খবরে একথা জানা গেছে। স্মর্তব্য শাহ আজিজুর রহমান পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর সমর্থনে জাতিসংঘে পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। একটু খোঁজ নিয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে গভর্ণর মালেক ও শাহ আজিজের মতো হাইপ্রোফাইল দালালদের কাউকেই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের বাইরে স্থানান্তর করা হয়নি। গ্রেফতারের পর থেকে তারা সেখানেই ছিলেন মুক্তি পাওয়ার আগ পর্যন্ত। তাই জেল থেকে ডেকে এনে শাহ আজিজকে নিয়ে কুমিল্লায় বঙ্গবন্ধুর খিচুড়ি খাওয়ার গল্পের মতো আজগুবী দাস্তান বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই।



৩ ডিসেম্বর দৈনিক ইত্তেফাকের খবরে সাধারণ ক্ষমার ফলোআপ এসেছিলো যে সিদ্ধান্তটাকে সকল মহল স্বাগত জানিয়েছে। সেখানেই রয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ খবর। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আবদুল মালেক উকিল সেখানে দালাল আইনে আটকদের এবং মুক্তি পাওয়াদের বিষয়ে সাংবাদিকদের ক্ল্যারিফাই করেছেন। দালাল আইনে আটক ব্যক্তিদের মোট সংখ্যা ৩৭ হাজার ৪শত ৭১ শিরোনামে ওই খবরে লেখা হয়েছে : সরকার কর্তৃক সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শনের পরিপ্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় এই আদেশের আওতাভুক্ত সকল ব্যক্তির মুক্তি ত্বরান্বিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়াছেন। গতকাল (শনিবার) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সহিত আলাপ-আলোচনাকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জনাব আবদুল মালেক উকিল এ কথা জানান। তিনি বলেন যে, সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শন আদেশের সহিত দালালি আইনে আটক ব্যক্তিদের তালিকা পরীক্ষা করার পর ইহার আওতাভুক্ত সকল ব্যক্তিকে মুক্তিদানের জন্য তিনি ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট সরকারী কর্মচারীদের নির্দেশ দিয়াছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান যে, দালালি আইন অনুযায়ী মোট অভিযুক্ত ব্যক্তির সংখ্যা হইতেছে ৩৭ হাজার ৪ শত ৭১ জন। ইহার মধ্যে চলতি বছর অক্টোবর মাস পর্যন্ত ২ হাজার ৮ শত ৪৮ জনের বিরুদ্ধে মামলার নিষ্পত্তি হইয়াছে। তন্মধ্যে ৭ শত ৫২ জনের সাজা হইয়াছে এবং বাকি ২ হাজার ৯৬ জন খালাস পাইয়াছেন। তিনি বলেন একটি সংবাদপত্রে দালাল আইনে আটক ব্যক্তিদের সংখ্যা ৮৬ হাজার বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। কিন্তু উহা সত্য নহে বরং অতিরঞ্জিত। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন যে, আটককৃত বা সাজাপ্রাপ্ত অনেক প্রাক্তন নেতা এই সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার আওতায় মুক্তি লাভ করিবেন। তিনি বলেন যে যাবজ্জীবন কারাদন্ডপ্রাপ্ত সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের প্রাক্তন গভর্ণর ডাঃ এ এম মালেক ও তাহার মন্ত্রীসভার সদস্যবৃন্দ শীঘ্রই মুক্তিলাভ করিবেন। অন্যদের মধ্যে যাহারা মুক্তি পাইবেন তাহাদের মধ্যে ডঃ কাজী দীন মোহাম্মদ, ডঃ হাসান জামান, ডঃ সাজ্জাদ হোসেন, ডঃ মোহর আলী (প্রত্যেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের দালাল শিক্ষক) ও খান আবদুর সবুরও রহিয়াছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন যে মুক্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা তাহাদের সম্পত্তি ফেরত পাইবেন এবং দেশের নাগরিকদিগকে প্রদত্ত সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করিবেন। পাকিস্তান থেকে ফিরেই বঙ্গবন্ধু খান এ সবুরকে নিজে গাড়ি চালিয়ে জেল থেকে মুক্ত করে এনেছিলেন বলে যে গল্পটা শুনেছিলাম সেটার নিষ্পত্তি হলো এই খবরে।



সবশেষে তুলে ধরছি সে বছর ১৫ ডিসেম্বর রেডিও টিভিতে সম্প্রচার হওয়া বঙ্গবন্ধুর ভাষণে এ প্রসঙ্গে বলা অংশটুকু : ... বিপ্লবের পর স্বাধীনতার শত্রু হিসেবে যারা অভিযুক্ত হয়েছিলো তাদেরও আমরা হত্যা করিনি, ক্ষমা করেছি... আমরা প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধ গ্রহণের নীতিতে বিশ্বাসী নই। তাই মুক্তিযুদ্ধের শত্রুতা করে যারা দালাল আইনে অভিযুক্ত ও দন্ডিত হয়েছিলেন তাদের সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শন করা হয়েছে। দেশের নাগরিক হিসাবে স্বাভাবিক জীবন যাপনে আবার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আমি বিশ্বাস করি অন্যের প্রচারণায় যারা বিভ্রান্ত হয়েছেন এবং হিংসার পথ গ্রহণ করেছেন তারা অনুতপ্ত হলে তাদেরও দেশ গড়ার সংগ্রামে অংশ নেয়ার সুযোগ দেয়া হবে। ...

সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার প্রেক্ষাপট হিসেবে অনেক বিষয়ই এসেছে। সেগুলো নিয়ে লেখালিখিও হয়েছে। কিন্তু মূল বিষয়টি এখনও কারও লেখায় রেফারেন্স হিসাবে পাইনি। সে ঘাটতিটা এই পোস্ট মেটাতে পারলে পরিশ্রমটা সার্থক হবে আমার। আমার ব্যক্তিগত ধারণা সাধারণ ক্ষমা ঘোষণাটি প্রজ্ঞাপন আকারে দেওয়ার পর দালাল আইন অধ্যাদেশে খানিকটা মেরামতি করা হয়, যাকে সংশোধনী বলে। কিন্তু তারপরও এটি গেজেটে কেনো নেই, তা একটা ধাঁধা হয়েই থাকবে।

সূত্র : দৈনিক বাংলা, দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলার বাণী ও বাংলাদেশ অবজারভার

ফুটেজগুলোয় নিউজ ক্লিপিংগুলো ব্যবহার করা হয়েছে।

কৃতজ্ঞতা : ইকরাম নেওয়াজ ফরাজী জিসান

আইনগুলো সম্পর্কে জানতে পড়তে পারেন এই লেখাটা

 

সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে জুলাই, ২০১০ রাত ১১:৪২ | বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...

 

১. ১৯ শে জুলাই, ২০১০ রাত ১১:৪৬
তোরাশ বলেছেন: প্রিয়তে। সময় নিয়ে পড়তে হবে। +
২. ১৯ শে জুলাই, ২০১০ রাত ১১:৪৯
রবিন-৭৭ বলেছেন: অনেক দিন পর ব্লগে একটা ভালো লেখা পাইলাম। পিয়াল ভাই এগিয়ে যাও।
৪. ২০ শে জুলাই, ২০১০ রাত ১২:০৩
মেজো ছেলে বলেছেন: আপনার সাহসকে স্যালুট। আমি শুধু লিঙ্ক দিছিলাম
৫. ২০ শে জুলাই, ২০১০ রাত ১২:০৫
মামুন বিদ্রোহী বলেছেন: আশা করি এ নিয়ে কথিত বিভ্রান্তি দূর হবে। সত্যের জয় হবেই ইনশাল্লাহ

প্লাস সহ প্রিয়তে..++
৬. ২০ শে জুলাই, ২০১০ রাত ১২:১৭
শামসুন হাসনাত বলেছেন: লেখাটি তথ্যবহুল। ভালো লাগলো। লেখাটি বঙ্গবন্ধুর সাধারণ ক্ষমা বিষয়ক বেশ কিছু বিভ্রান্তী দুর করতে সাহায্য করবে। তবে একটি প্রশ্ন থেকে গেলো। যে সরকারের গেজেটে এই গুরুত্বপুর্ণ দলিলগুলি নেই কেন? জানি না এর উত্তর কখনও পাব কি না।
৮. ২০ শে জুলাই, ২০১০ রাত ১২:৪১
আল বেরুনী বলেছেন: আসল কথা সবারই জানা উচিত......
৯. ২০ শে জুলাই, ২০১০ রাত ১:২৫
ওরাকল বলেছেন: @লেখক : পোস্ট হতেই উদ্ব্রিতি দেই -

'স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন যে, আটককৃত বা সাজাপ্রাপ্ত অনেক প্রাক্তন নেতা এই সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার আওতায় মুক্তি লাভ করিবেন। তিনি বলেন যে যাবজ্জীবন কারাদন্ডপ্রাপ্ত সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের প্রাক্তন গভর্ণর ডাঃ এ এম মালেক ও তাহার মন্ত্রীসভার সদস্যবৃন্দ শীঘ্রই মুক্তিলাভ করিবেন। অন্যদের মধ্যে যাহারা মুক্তি পাইবেন তাহাদের মধ্যে ডঃ কাজী দীন মোহাম্মদ, ডঃ হাসান জামান, ডঃ সাজ্জাদ হোসেন, ডঃ মোহর আলী (প্রত্যেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের দালাল শিক্ষক) ও খান আবদুর সবুরও রহিয়াছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন যে মুক্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা তাহাদের সম্পত্তি ফেরত পাইবেন এবং দেশের নাগরিকদিগকে প্রদত্ত সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করিবেন। '

তা এই পূর্ব পাকিস্তানের প্রাক্তন গভর্ণর ডাঃ এ এম মালেক ও তাহার মন্ত্রীসভার সদস্যবৃন্দ কারা আসুন একটু দেখি

১)ড: এ.এম. মালিক
২)আবুল কাশেম
৩)আব্বাস আলী খান (জামাতের প্রাক্তন সেক্রেটারী জেনারেল, মুজাহিদ যার স্থলাবিষিক্ত হয়)
৪)আখতারুদ্দিন আহমেদ
৫)এ.এস.এম. সোলায়মান
৬)ওবায়দুল্লাহ মজুমদার
৭)প্রফেসর শামসুল হক
৮)মাওলানা মোহাম্মদ ইশহাক
৯)নওয়াজিশ আহমেদ
১০)মাওলানা এ.কে.এম ইউসুফ (তত্ব আমলে নিজামী গ্রেফতার হওয়ার পরে এই লোক ছিল ভারপ্রাপ্ত আমির)
১১) মং সু প্রু চৌধুরী!!

অথচ এই নরপশুগুলর নারকিয় কর্মকান্ডের বিষদ বর্ননা পাওয়া যায় মুক্তিযুদ্ধ চলাকালিন সময়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রচারিত তুমুল জনপ্রিয় 'চরমপত্র' এর রচয়িতা এম আর আখতার মুকুল রচয়িত 'চরমপত্র' গ্রন্থে। এই লোকগুলর অধিনেই ( কারন এরাই ৭১ এ পূর্ব পাকিস্তানের প্রসানিক ক্ষমতায় ছিল ) পাক আর্মি সারা বাংলায় নারকিয় হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে ৯ মাস !

দ্ধিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলার অথবা সাম্প্রতিক সময়ের বুশ হয়ত এক জন ব্যাক্তিকে ও নিজ হাতে হত্যা করেনি ইরাকে। কিন্তু তাই বলে এর দায় বা বিচার এড়াতে পারেনি হিটলার; যদি বিচার হয় তবে বুশ ও দন্ডিত হবেন নিশ্চিত। তবে কেন আমরা ৭১ এর ঐ সব মাস্টারমাইন্ড গুলর বিচার করব না ? পাকিগুলর ক্ষেত্রে না হয় কিছুই করার নাই কিন্তু এগুল ত বাংলাদেশেই ঘুরে বেড়াচ্ছে, তবে এগুলকে কেন ধরা হবে না ?


বিস্তারিত জানুন Click This Link
১১. ২০ শে জুলাই, ২০১০ রাত ১:৪৭
বিদেশীপোলা বলেছেন: অনেক মনোযোগ দিয়ে পড়লাম । কিন্তু কোন গালি খুজে পেলাম না । /:) /:) কেমনে বুজব এটা শিয়ালটার লেখা।
১২. ২০ শে জুলাই, ২০১০ রাত ২:১২
াহো বলেছেন: +++++++

shahriar kabir article
dailyjanakantha.com/news_view.php?nc=16&dd=2010-07-20&ni=26476
১৩. ২০ শে জুলাই, ২০১০ রাত ২:১২
াহো বলেছেন: +++++++

shahriar kabir article
dailyjanakantha.com/news_view.php?nc=16&dd=2010-07-20&ni=26476
১৪. ২০ শে জুলাই, ২০১০ সকাল ১০:৩৮
যীশূ বলেছেন: বিরাট কাজ করছেন! অসংখ্য ধন্যবাদ তথ্যগুলোর জন্য। :)
১৫. ২০ শে জুলাই, ২০১০ সকাল ১০:৩৯
যীশূ বলেছেন: পিয়াল ভাই তো বিরাট কাজ করছেন! অসংখ্য ধন্যবাদ তাকে আর জিসান কে তথ্যগুলোর জন্য।
১৬. ২০ শে জুলাই, ২০১০ দুপুর ১২:২২
মেজো ছেলে বলেছেন: ওরাকল সাব, ম্যাতকার কইরা কি লাভ? আগের গল্পটা তো মিথ্যা হইলো
১৭. ২০ শে জুলাই, ২০১০ দুপুর ১২:২৭
মেজো ছেলে বলেছেন: বিভ্রান্তি ও ষড়যন্ত্রের দোলাচলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচা


শাহরিয়ার কবির

'৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ও প্রধান নাগরিক আন্দোলনের দাবি। যুদ্ধাপরাধী বলতে বাংলাদেশের আমজনতা মনে করেন মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত সকল অপরাধ_ '৭৩-এর আইনে বর্ণিত গণহত্যা, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, শানত্মির বিরম্নদ্ধে অপরাধ, জেনেভা কনভেনশনের লঙ্ঘন ইত্যাদি। সাধারণ মানুষ রাজাকারকেও যুদ্ধাপরাধী মনে করেন। মন্ত্রীরা যখন বলেন আমরা যুদ্ধাপরাধের বিচার করব না, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করব তখন মানুষ বিভ্রানত্ম হন। এর পাশাপাশি বিচার নিয়ে আগ্রহী আন্দোলনকারীদের ভ্রূকুঞ্চিত হয়। কোন অপরাধে কার বিচার কীভাবে কতদিনে হবে এসব বিষয়ে মনত্মব্য করবার এখতিয়ার কার_মন্ত্রীদের না ট্রাইব্যুনালের? ট্রাইব্যুনাল তো মন্ত্রণালয়ের অধীন সরকারি কোন সংস্থা নয়!
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলন ১৯৯২ সালের জানুয়ারিতে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে সংগঠিতভাবে সূচিত হয়েছে বটে, তবে দাবি উচ্চারিত হয়েছে ১৯৭২-এর মার্চে। আজকের প্রজন্মের জানবার কথা নয়_সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে রাজপথে প্রথম যে মিছিল নেমেছিল সেটি ছিল '৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে। ১৭ মার্চ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জমায়েত থেকে মিছিল শুরম্ন হয়েছিল, শেষ হয়েছিল বঙ্গভবনে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিকট স্মারকপত্র প্রদানের মাধ্যমে। কোন সংগঠনের ব্যানারে নয়, মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্বজন এই মিছিলে অংশগ্রহণ করেছিলেন, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তাঁরা কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। সেই থেকে রাসত্মায় আছি_৩৮ বছর কেটে গেছে বিচারের অপেক্ষায়।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহের উদ্যোগ প্রথম গ্রহণ করেছিল সৈয়দ নজরম্নল-তাজউদ্দীন নেতৃত্বাধীন মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকার। মন্ত্রিপরিষদ সচিব এইচটি ইমাম '৭১-এ পাকিসত্মানী হানাদার বাহিনী এবং তাদের সহযোগীদের গণহত্যা, নির্যাতন, লুণ্ঠন, গৃহে অগি্নসংযোগ, অপহরণ প্রভৃতি তদনত্ম করে প্রতিবেদন পাঠাবার নির্দেশ দিয়েছিলেন জেলা ও থানা পর্যায়ের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের। বঙ্গবন্ধু '৭২-এর ২৪ জানুয়ারি দালাল আইন প্রণয়ন করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আরম্ভ করেন। এই বিচারের সমস্যা ছিল প্রচলিত ফৌজদারি আইনে। ১৮৯৮ সালে প্রণীত ফৌজদারি কার্যবিধিতে গণহত্যা, মানবতার বিরম্নদ্ধে অপরাধ, শানত্মির বিরম্নদ্ধে অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের বিচারের কোন সুযোগ নেই। এসব অপরাধ আইনশাস্ত্রে সংজ্ঞায়িত হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নাৎসি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য গঠিত 'আনত্মর্জাতিক সামরিক ট্রাইবু্যনাল' যা নুরেমবার্গ ট্রাইবু্যনাল নামে পরিচিত তার নীতি প্রণয়নের সময়। এসব অপরাধে হিটালারের সরকার, দল ও বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিচার ও শাসত্মি হয়েছিল। একই নীতি অনুসৃত হয়েছে জাপানী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময় টোকিও ও ম্যানিলা ট্রাইবু্যনালে।
ফৌজদারি আইনে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরম্নদ্ধে অপরাধের বিচার সম্ভব নয় বলেই বঙ্গবন্ধুর সরকার ১৯৭৩ সালের ২০ জুলাই এসব অপরাধের জন্য দায়ী সংগঠন, বাহিনী ও সহযোগীদের বিচারের জন্য 'আনত্মর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবু্যনালস) আইন' প্রণয়ন করেন। ভবিষ্যতে কেউ যাতে এই আইন বাতিল বা চ্যালেঞ্জ করতে না পারে তার জন্য এটি প্রণয়নের আগে সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে।
১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর সহযোগীদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে দালাল আইন বাতিল করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করে, তাদের কারামুক্ত করে দল করার অধিকার দিয়েছিলেন বটে_ '৭৩-এর আইন বাতিল করতে পারেননি, এটি সংবিধানের দ্বারা সুরক্ষিত হওয়ার কারণে। ১৯৯১-এর ডিসেম্বরে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে সমঝোতার সুযোগে জামায়াতে ইসলামী যখন সংবিধান লঙ্ঘন করে শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধী ও পাকিসত্মানী নাগরিক গোলাম আযমকে দলের আমির ঘোষণা করে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম যৌক্তিক কারণে বিক্ষুব্ধ হয়েছিল। এরই পরিপ্রেৰিতে বিশেষ ট্রাইবু্যনালে গোলাম আযমসহ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং তাদের রাজনীতি নিষিদ্ধকরণের দাবিতে গঠিত 'একাত্তরের ঘাতক দালাল নিমর্ূল কমিটি।' এরপর শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে সর্বদলীয় '... জাতীয় সমন্বয় কমিটি' গঠিত হয়েছে, যুদ্ধাপরাধের দায়ে গোলাম আযমের প্রতীকী বিচার অনুষ্ঠিত হয়েছে গণআদালতে, তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ পর্যনত্ম সর্বসত্মরের মানুষ এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।
১৯৯২-এর ২৬ মার্চ গণআদালতে গোলাম আযমের বিচার অনুষ্ঠানের পরদিন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া আমাকে ও নাসিরউদ্দিন ইউসুফকে তাঁর দফতরে ডেকেছিলেন। বলেছিলেন, গোলাম আযমের বিরম্নদ্ধে যুদ্ধাপরাধের কোন তথ্যপ্রমাণ যদি আমাদের হাতে থাকে আমরা আদালতে কেন যাচ্ছি না, কেন গণআদালত করে আইন নিজেদের হাতে তুলে নিচ্ছি। আমরা বলেছি ফৌজদারি আইনে, ফৌজদারি আদালতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কোন সুযোগ নেই বলেই এর জন্য '৭৩-এ বিশেষ আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। এই আইন অনুযায়ী সরকারকে ট্রাইবু্যনাল গঠন করতে হবে, মামলার বাদীও হতে হবে সরকারকে। আর গণআদালত আনত্মর্জাতিক রীতিসম্মত জনগণের প্রতিবাদ ও ক্ষোভ জ্ঞাপনের অভিব্যক্তি, গণআদালতের অর্থ আইন হাতে তুলে নেয়া নয়। ১৯৯২-এর খালেদা জিয়া ২০০১-০২-এর মতো জামায়াতপ্রেমে অন্ধ স্বৈরাচারিণী ছিলেন না। গণআদালত আয়োজনের জন্য আমাদের বিরম্নদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা করেছিলেন, ২০০২-০৩-এর মতো রাষ্ট্রদ্রোহী বানিয়ে জেলে নিয়ে নির্যাতন করেননি।
সেই থেকে বার বার বলছি, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে হবে '৭৩-এর আইনে বিশেষ ট্রাইবু্যনালে, কোন অবস্থায় প্রচলিত আইনে নয়। নিমর্ূল কমিটি গঠনের পর থেকে শুধু বিএনপি নয় জামায়াতও চাইছে আমরা যেন বিশেষ ট্রাইবু্যনালে না গিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য প্রচলিত আদালতে যাই। তারা এটা ভালভাবেই জানে ফৌজদারি আইনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্ভব নয়। ড. ফখরম্নদ্দীন আহমেদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কয়েকজন কর্তাব্যক্তি যখন বললেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হওয়া উচিত এবং ভুক্তভোগীদের কেউ যদি মামলা করেন সরকার তাদের সহযোগিতা করবে। তখন কিছু শহীদ পরিবারের সদস্য আপনজনের হত্যার জন্য থানায় বা আদালতে গিয়ে মামলা করেছেন। আবার কেউ কেউ পরিচিতি লাভের আশায়ও মামলা করেছেন। কেরানীগঞ্জে একজন মুক্তিযোদ্ধা হত্যার জন্য জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের অভিযুক্ত করে জনৈক মুক্তিযোদ্ধার মামলা দায়ের এরকমটি মনে হয়েছে। এই সুযোগে জামায়াতের কিছু লোকও '৭১-এর হত্যা, নির্যাতন, লুণ্ঠন ও গৃহে অগি্নসংযোগের দায়ে জামায়াত নেতাদের বিরম্নদ্ধে মামলা করেছে। এমনকি ছাত্রশিবিরের এক প্রাক্তন কর্মী অস্ট্রেলিয়ার এক আদালতে পাকিসত্মানী হানাদার বাহিনী এবং তাদের সহযোগীদের বিরম্নদ্ধে '৭১-এর গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে মামলা করে খবরের কাগজে ঝড় তুলেছিল। কেউ কেউ তখন আমাদের কটাক্ষ করে এমন কথাও বলেছিলেন, এত বছর আন্দোলন করে আমরা কিছুই করতে পারিনি যা অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী এক বাঙালী যুবক করে দেখিয়েছে। এই যুবকও উত্তেজিত ও উচ্ছ্বসিত হয়ে আমাকে ফোন করে বলেছিল আমরা যা পারিনি ও তা করেছে, আমাদের কাছে যা তথ্যপ্রমাণ আছে যেন ওকে পাঠাই। আমি ওকে নিরম্নৎসাহিত করে বলেছি মামলা আমলে নেয়া না হলে জামায়াত এর সুযোগ নেবে। ওকে নিবৃত্ত করতে পারিনি, আদালত মামলা গ্রহণ করেনি। পরে শুনেছি সেই যুবকই নাকি জালিয়াতির মামলায় আসামি হয়েছিল সেখানে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে যখন বিভিন্ন থানা ও আদালতে জ্ঞাত ও অজ্ঞাতনামাদের নামে '৭১-এর হত্যা, নির্যাতন ও ধ্বংসের জন্য মামলা নিয়মিত বিষয়ে পরিণত হয়েছিল এবং আমাদের বন্ধুদের কেউ কেউ ঘটা করে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন_ তখন বিচারপতি কেএম সোবহান বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন, '৭১-এর যুদ্ধকালীন অপরাধের জন্য প্রচলিত আদালতে মামলা দায়ের করার জন্য আমরা বারণ করছি। আমাদের নিষেধ উপেক্ষা করে কেউ যদি মামলা করেন তাকে আমরা জামায়াতের দোসর হিসেবে চিহ্নিত করতে বাধ্য হবো। এতে আমাদের বন্ধুরা নিবৃত্ত হয়েছিলেন বটে, জামায়াতকে পারা যায়নি। গত তিন বছরে দেশের বিভিন্ন থানায় জামায়াতের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতাদের নামে কয়েকশ' মামলা দায়ের করা হয়েছে।
২০০৮-এর নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীনে মহাজোট যে অভূতপূর্ব বিজয় অর্জন করেছে তার প্রধান কারণ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতি অঙ্গীকার। মহাজোট ক্ষমতায় আসার পর জাতীয় সংসদে যুদ্ধাপরাধীদের দ্রম্নত বিচারের জন্য সর্বসম্মত প্রসত্মাবও গৃহীত হয়েছে। প্রথমে সরকারের শীর্ষ নেতারা জাতিসংঘের সহযোগিতায় বিচারের কথা বলেছিলেন। আমরা বলেছি যে, সব দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য নিজস্ব আইন বা আদালত নেই তারা জাতিসংঘের সহযোগিতা চাইতে পারে_আমাদের একটি অসাধারণ আইন রয়েছে, অত্যনত্ম মেধাসম্পন্ন বিচারক, আইনজীবী ও তদনত্মকারী রয়েছেন; আমাদের জাতিসংঘে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের প্রসত্মাব সরকারের নীতিনির্ধারকরা ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছেন।
সরকারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের কিঞ্চিৎ অবনতি ঘটেছিল ট্রাইবু্যনালের স্থান নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে সরকারকে সহযোগিতার জন্য বিচারপতি মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানীর নেতৃত্বে একটি নাগরিক কমিশন গঠন করেছিলাম, বিচারের ক্ষেত্রে করণীয় সম্পর্কে আইনমন্ত্রীকে আমাদের সুপারিশ লিখিতভাবে জানিয়েছিলাম ২০০৯-এর ১৩ ফেব্রম্নয়ারি। এতে আমরা বিচারের স্থানের জন্য পুরনো হাইকোর্ট ভবন নির্বাচনের প্রসত্মাব করেছিলাম। পরে জানলাম এই ভবনে নয়, আবদুল গণি রোডের একটি টিনের চালের মর্চেপড়া ছোট বাড়িতে এই বিচার হবে। এ নিয়ে হইচই করে কর্তাদের টনক নড়াতে না পেরে বাধ্য হয়ে গত ডিসেম্বরে আমরা প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছিলাম। শেষ পর্যনত্ম প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আমাদের প্রসত্মাবিত পুরনো হাইকোর্ট ভবনকেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য নির্বাচন করা হয়।
পরে ঝামেলা বেধেছিল ট্রাইবু্যনালের প্রধান তদনত্ম কর্মকর্তা হিসেবে '৭১-এ পাকিসত্মানী সামরিক জানত্মা ও জামায়াত সমর্থক আবদুল মতিনের নিয়োগকে কেন্দ্র করে। আমরা তার নিয়োগ বাতিলের দাবি করায় সরকারের কিছু কর্মকর্তা আমাদের ওপর অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। এরপর প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এবং আওয়ামী লীগের একজন প্রবীণ নেতা মতিনের নিয়োগ সম্পর্কে প্রশ্ন তোলায় তাকে যেতে হয়েছে, যদিও দুজন মন্ত্রী বলেছেন মতিনের নিয়োগ নাকি সঠিক ছিল। সমপ্রতি আমাদের পাটমন্ত্রী বলেছেন, নিজামীদের সঙ্গে তিনি নাকি একমত, তারা নাকি '৭১-এ যুদ্ধাপরাধ করেনি, তারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে! জামায়াত যদি মন্ত্রীর এই মনত্মব্য আদালতে তাদের অবস্থানের পক্ষে পেশ করে মামলা জেতার জন্য ব্যারিস্টার রাজ্জাকের প্রয়োজন হবে না।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য '৭৩-এর আইন অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত ট্রাইবু্যনাল গঠিত হলেও এটিকে এখনও পূর্ণাঙ্গ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ বলা যাবে না। এখনও যথেষ্ট সংখ্যক আইনজীবী ও তদনত্ম কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়নি, পুরনো হাইকোর্টের সামান্য অংশ ট্রাইবু্যনালকে বরাদ্দ করা হয়েছে, পুরো অংশজুড়ে এখনও সেখানে আইন কমিশনের দফতর রেখে দেয়া হয়েছে। ভবনের নিরাপত্তার কোন ব্যবস্থা নেই, এখনও ট্রাইবু্যনালের নিয়মাবলীর গেজেট প্রকাশ করা হয়নি। প্রয়োজনীয় পরিবহন, গবেষণাসামগ্রী, আসবাবপত্র কোন কিছুই নেই। এক কথায় বলা যায়, ট্রাইবু্যনালকে পুরীর মন্দিরের ঠুঁটোজগন্নাথ বানিয়ে রেখে দেয়া হয়েছে। ট্র্রাইবু্যনালকে কার্যক্ষম ও গতিশীল করার জন্য গত ৭ জুলাই (২০১০) আমরা এর সঙ্গে যুক্ত সরকারের সাতজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীকে চিঠি দিয়ে ৯টি প্রসত্মাব করেছিলাম, কোন কাজ হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। এ চিঠিতে আমরা একটি উদ্বেগের কথা বলেছিলাম। সমপ্রতি জামায়াতের পাঁচজন শীর্ষ নেতার গ্রেফতার এবং নিকট অতীতে বিভিন্ন থানায় দায়েরকৃত '৭১-এর অভিযোগ সংক্রানত্ম মামলার পুনরম্নজ্জীবন লক্ষ্য করে আশঙ্কা হচ্ছে, আমাদের আঠার বছরের আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের শহীদ পরিবার, নির্যাতিত, ভুক্তভোগী ও মুক্তিযোদ্ধাসহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক বাঙালীর সকল স্বপ্নের সলিল সমাধি রচিত হতে যাচ্ছে।
সরকার গত ২৯ জুন জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামী, সাধারণ সম্পাদক আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে গ্রেফতার করেছে। আদালতের নির্দেশ অগ্রাহ্য করে একটি মামলায় উপস্থিত না হওয়ার কারণে আদালত তাদের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে এবং তাদের যথারীতি গ্রেফতার করা হয়। পরদিন এই মামলায় তারা জামিন পেলেও তাদের বিরম্নদ্ধে পূর্বে দায়েরকৃত যেকটি মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়_অন্যতম হচ্ছে '৭১-এর হত্যা ও নির্যাতন। এরপর জামায়াতের অপর দুই প্রধান নেতা কামরম্নজ্জামান ও কাদের মোলস্নাকে সরাসরি '৭১-এর গণহত্যার মামলায় গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ ও মাঠপর্যায়ের তদনত্ম আরম্ভ হয়ে গেছে, যে বিষয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য গঠিত ট্রাইবু্যনালের তদনত্ম সংস্থা ও প্রসিকিউশন কিছুই জানেন না। বিএনপি ও জামায়াত চেয়েছিল '৭১-এর যুদ্ধাপরাধের বিচার যেন ফৌজদারি আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী হয়। ট্রাইবু্যনালকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ প্রদর্শন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিএনপি-জামায়াতের অভিপ্রায় অনুযায়ী '৭১-এর ঘাতকদের বিচার নিয়ে গেছে ফৌজদারি আদালতে।
জামায়াতের আবদুল মতিন ট্রাইবু্যনাল থেকে সরে যাওয়ার পর আমরা জানতে চেয়েছিলাম এই ব্যক্তিকে কে বা কারা কাদের সুপারিশে নিয়োগ দিয়েছেন এটা আমাদের জানা দরকার। শর্ষের ভেতর ভূত থাকলে সেই শর্ষে দিয়ে যেমন ভূত তাড়ানো যায় না, একইভাবে সরকার ও প্রশাসনে যদি যুদ্ধাপরাধীদের প্রকৃত দোসরদের অবস্থান যদি অব্যাহত থাকে সেই সরকার বা প্রশাসনের নিকট যুদ্ধাপরাধের বিচার আশা করা যায় না। '৭১-এর যুদ্ধকালীন অপরাধের জন্য যদি জামায়াত নেতাদের প্রচলিত আদালতে বিচার হয় এবং ফৌজদারি আইনের সীমাবদ্ধতার কারণে তারা যদি উপযুক্ত শাসত্মি না পান তার দায় প্রশাসনের ঘাপটি মেরে বসে থাকা জামায়াতীদের নয়, গোটা মহাজোট সরকারকে বহন করতে হবে। নিজামী-মুজাহিদ-সাঈদী-কামরম্নজ্জামান, কাদের মোলস্না ও অন্য জামায়াত নেতাদের যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রচুর লিখিত, চলচ্চিত্রিক, আলোকচিত্র ও তথ্যপ্রমাণ দেশে ও বিদেশে রয়েছে ঠিকই, তবে এদের বিচারের এখতিয়ার একমাত্র 'আনত্মর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবু্যনাল'-এর ফৌজদারি আদালতের নয়।
আমাদের জানা দরকার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং আমাদের পুলিশের কর্মকর্তারা আইনকানুন কিছু না জেনেই কি জামায়াতের নেতাদের বিরম্নদ্ধে যুদ্ধকালীন অপরাধের মামলা দায়ের করেছেন? তারা কি আশা করেন রিমান্ডে নেয়া নিজামী, কামরম্নজ্জামান, কাদের মোলস্নারা গড় গড় করে বলে দেবেন '৭১-এ তারা কীভাবে এসব অপরাধ করেছেন? শুধু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অভিযুক্ত করছি কেন, আমাদের আইন প্রতিমন্ত্রীও তো বলেছেন যুদ্ধাপরাধীদের ধরা হয়েছে, বিচার শুরম্ন হয়েছে এবং এ বছরের ভেতর বিচার শেষও হয়ে যাবে। প্রতিমন্ত্রী সব জানেন, অথচ যেখানে বিচার হবে সেই ট্রাইবু্যনাল কিছুই জানে না।
যে আদালতে নিজামীদের '৭১-এর অপরাধের বিচারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে সেই আদালতের বিচারক এবং তদনত্মকারী কর্মকর্তাকে আমি তিরিশ লাখ শহীদ পরিবারের একজন প্রতিনিধি হিসেবে বিনীত আবেদন জানাতে চাই_আপনারা '৭৩-এর আনত্মর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবু্যনালস) আইনটি পড়ুন। দয়া করে বলুন, ফৌজদারি কার্যবিধিতে গণহত্যা, মানবতার বিরম্নদ্ধে অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের বিচারের কোন সুযোগ নেই, এর এখতিয়ার একমাত্র 'আনত্মর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবু্যনালের।' এক অপরাধে একজন ব্যক্তির দুবার বিচার করা যায় না। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ফৌজদারি আদালতে হলে নবগঠিত আনত্মর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবু্যনাল এবং মহাজোট সরকারের অঙ্গীকার মসত্ম প্রহসনে পরিণত হবে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বলব, ছাত্রলীগের মধ্যে শুধু শিবির ঢোকেনি, আওয়ামী লীগেও জামায়াত ঢুকেছে। এদের দলে রেখে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দূরে থাক আপনার এবং আমাদের রাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সম্পর্কে আমরা যারপরনাই শঙ্কিত। আপনার সরকারের সময়কালে আনত্মর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবু্যনাল যদি শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের অর্থবহ ও মানসম্পন্ন বিচার করতে না পারে_আর কখনও এই বিচার সম্ভব হবে না।
১৮ জুলাই ২০১০
১৮. ২০ শে জুলাই, ২০১০ দুপুর ১:০৭
নাজনীন১ বলেছেন: পোস্ট থেকে জানা গেল অনেক কিছু। আবার শাহরিয়ার কবিরের লেখা থেকে আরো কিছু জানা গেল। তার মানে সরকারের সাথে ট্রাইবুনাল কমিটির সমন্বয়তা নেই, এটাই পরিষ্কার বোঝা গেল।
১৯. ২০ শে জুলাই, ২০১০ বিকাল ৫:০১
ওরাকল বলেছেন: মেজো ছেলে বলেছেন: ওরাকল সাব, ম্যাতকার কইরা কি লাভ? আগের গল্পটা তো মিথ্যা হইলো

-> কোন গল্পটা? যদি দয়া করে বলতেন .....।

আর ড: মালেক গংদের বিচার চাওয়া যদি 'ম্যাতকার' হয় তবে চরম ঘৃণা আপনার উপর। যদা করে এম আর আখতার মুকুলের 'চরমপত্র' বইটি পড়ুন। এর পর বলুন ঐ ধাড়ি শয়তানগুলর বিচার আদও প্রয়োজন কিনা।
২০. ২১ শে জুলাই, ২০১০ ভোর ৪:১৬
মেজো ছেলে বলেছেন: ছুপ্পা ওরাকল, মুক্তিযুদ্ধে আলবদররাও মুক্তিযোদ্ধাদের ঘৃণা করতো, তোমার ঘৃণায় আমার বাল্টাও আসে যায় না। মালেক গংদের বিচার করবা? আছে নি কেউ বাইচা তোমার গোলাম আব্বুর মতো?
২১. ২১ শে জুলাই, ২০১০ বিকাল ৩:৫৪
ওরাকল বলেছেন: @মেজো ছেলে-

শাবাস ! এই যদি হয় বিচারের মাপকাঠি তবে ই হইছে :)। আগামি কাল যদি গু-আগম পটল তোলে তবে কি সে তোমার আব্বু হয়ে যাবে, যে তার আর বিচারের প্রয়োজন হবে না ?


তা হিটলারের নাম ত জান নিশ্চই :) ৫০ এর দশকের শেষ দিকে ধারনা কারা হল যে সে আত্নহত্যা করেছে সেই ১৯৪৫। তাই বলে কি তার বিচার বন্ধ ছিল ৬০ এর শেষ ভাগে?

তুমি যে হাম্বাদের পা চাটা এই ব্যাপারটা নিশচিত হলাম, নইলে স্বীকার করতে এত লজ্জা কেন 'শেখ মুজিব ঐ নরপশু গুলকে মুক্তি দিয়ে অন্যায় করেছেন।'


২২. ২১ শে জুলাই, ২০১০ বিকাল ৪:১৮
ওরাকল বলেছেন: ওরাকল বলেছেন: @মেজো ছেলে-

সেক্টর কমান্ডার ফোরাম প্রকাশিত ৫০ যুদ্ধাপরাধীর তালিকা হতে

১)ড: এ.এম. মালিক -২৩ নং (মৃত)
২)আবুল কাশেম
৩)আব্বাস আলী খান (জামাতের প্রাক্তন সেক্রেটারী জেনারেল, মুজাহিদ যার স্থলাবিষিক্ত হয়)- ৭ নং (মৃত)
৪)আখতারুদ্দিন আহমেদ
৫)এ.এস.এম. সোলায়মান-14
৬)ওবায়দুল্লাহ মজুমদার -39
৭)প্রফেসর শামসুল হক
৮)মাওলানা মোহাম্মদ ইশহাক -33
৯)নওয়াজিশ আহমেদ-৪৯ নং (মৃত)
১০)মাওলানা এ.কে.এম ইউসুফ (তত্ব আমলে নিজামী গ্রেফতার হওয়ার পরে এই লোক ছিল ভারপ্রাপ্ত আমির)-2
১১) মং সু প্রু চৌধুরী!!

 

মোট সময় লেগেছে ২.০৬৮৮ সেকেন্ড

 

সামহোয়‍্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...
© সামহোয়্যার ইন...নেট লিমিটেড | ব্যবহারের শর্তাবলী | গোপনীয়তার নীতি
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ

    কোন বিভাগ নেই