আজ ১৫ই জুলাই।
মুনের সাথে কম্পাসের চুক্তি অনুযায়ী আজ ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে। দোকান থেকে একশ’টি তাজা গোলাপ কিনে কম্পাস সোজা পা বাড়ালো মুসকানদের বাড়ির দিকে। দ্রুত হাটছে সে। মাত্র ১৫ মিনিটের রাস্তা। অথচ এই সময়টিকে তার কাছে অনন্তকাল মনে হতে লাগলো।
মনে মনে কল্পনা করতে লাগলো মুসকানকে নিয়ে। তাকে আজ কেমন দেখাবে? সেকি আজ শাড়ী পরবে? শাড়ীর কালারটা কী হতে পারে? মাথায় আচল টেনে রাখবে কি না? ইত্যাদি অনেক কিছু ভাবতে ভাবতে কম্পাস গিয়ে উপস্থিত হলো মুসকানদের বাড়ির গেইটে। দারোয়ান কম্পাসকে চিনতো। গেট খুলে দিল। কম্পাস সোজা চলে গেল ভেতরে।
প্রায় আঠার মিনিট ড্রইং রুমে একা একা বসে অপেক্ষা করতে লাগলো কম্পাস। কারো কোনো সাড়া শব্দ নেই! ব্যাপার কি? বাসার লোকজন সব কোথায় গেলো? অবশ্য এরই মধ্যে কাজের মেয়ে চা দিয়ে গেছে। এবং যথারীতি মধ্যবিত্ত ও গ্রাম্য কোয়ালিটির চা, চিনি বেশি।
বিশ মিনিট পর বেরিয়ে এলেন এক ভদ্রলোক। গায়ে খদ্দেরের পাঞ্জাবী, পায়ে বাটা সেন্ডেল। বয়স ৬০ এর কাছাকাছি হবে, প্রাইমারী স্কুলের রিটায়ার্ট অংকের শিক্ষকের মত রসকসহীন চেহারা। সম্ভবত মুনের বাবা হবেন। এসে বললেন-
‘কাকে চাই?’
‘জি, স্লামালিকুম।’
‘ওয়ালাইকুম সালাম। আপনাকে তো আমি ঠিক...’
‘আংকেল, আমি মুসকানের বন্ধু, আমরা একসাথে পড়তাম।’
‘ও-আচ্ছা। দাঁড়িয়ে কেন বাবা। বসো বসো। তা পড়ালেখা তো শেষ। কী করছো এখন?’
‘চাকরী করছি।’
‘কোথায়?’
‘একটি মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানীতে।’
(কম্পাস ইচ্ছে করেই এই মিথ্যাটি বললো। চাকরি না করা মানে বেকার। আর বেশিরভাগ মেয়ের বাবারাই মনে করেন বেকার ছেলেরা বখাটে হয়।)
‘বাহ! বেশতো। তা তোমার বাবা মা...?’
‘আমার বাবা মা নেই।’
‘স্যরি।’
‘না চাচা, ঠিক আছে।’
ভদ্রলোক ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তা বাবা, আমাকে যে এখন একটু উঠতে হবে। এক জায়গায় প্রাইভেট টিউশনী করি। দেড় বছর হলো, রিটায়ার করেছি। টিউশনী করে নিজের খরছ চালিয়ে নিচ্ছি। তুমি বসো। তোমাকে কি চা-টা দিয়েছে কিছু?’
‘জ্বী, আমি চা খেয়েছি।’
কম্পাস একটু ইতস্ততঃ করে বললো, ‘স্যার, মুসকান বাসায় নেই?’
প্রশ্ন শুনে ভুরু কুচ্কে তাকালেন ভদ্রলোক। বললেন, ‘তুমি মুসকানের বন্ধু। সে তোমাকে দাওয়াত করেনি?’
‘দাওয়াত! কিসের?’
‘গত মাসের ২৩ তারিখেই তো তার বিয়ে হলো। সে এখন স্বামীর সাথে জার্মানী আছে। অবশ্য খুব তাড়াহুড়োর বিয়ে তো, বলার মতো পরিবেশ ছিলো না। তুমি কিছু মনে করো না বাবা।’
বাকরুদ্ধ হয়ে কিছুক্ষণ ঝিম মেরে বসে থাকলো কম্পাস। যা শুনছে, সেটাকে সত্যি বলে মেনে নিতে পারছে না। হয়ত সে স্বপ্ন দেখছে। চোখ দু’টো ভিজে উঠলো তার। টলতে টলতে বেরিয়ে এলো মুসকানদের বাড়ি থেকে।
মুসকান কেনো এমন করলো! কী কারণ থাকতে পারে! সে তো স্বপ্ন দেখতে চায়নি। তাকে জোর করে এ পথে টেনে আনলোই বা কেনো! আনলোই যদি, তবে কেনো আবার এই পরিহাশ!
স্মৃতির কোনে বার বার উঁকি দিতে থাকলো অতীত। তার মনে পড়লো...
এই তো বছরখানেক আগে মুসকানকে ভর্তি করা হয়েছিল হাসপাতালে। ডাক্তাররা মুসকানের মধ্যবিত্ত বাবাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বলেছিলেন, ‘দেখুন, আপনার মেয়ের একটি কিডনী পুরোপুরি ডেমেজ হয়ে গেছে। বড় দেরি করে ফেলেছেন আপনারা। ৭ দিনের মধ্যে অন্যটিও অকার্যকর হয়ে যেতে পারে বলে আমাদের আশংকা। এখন মেয়েকে বাঁচানোর একটাই উপায়, ৭ দিনের মধ্যে অন্তত একটি কিডনীর ব্যবস্থা করা।’
মুসকানের গরীব বাবার পক্ষে কোনো অবস্থাতেই সম্ভব ছিল না কিডনী যোগাড় করা। কয়েক লক্ষ টাকা খরছ করে যে কিডনী কিনবেন, সে সামর্থও ছিল না। ফলে নিরুপায় হয়ে চোখের অশ্র“ ফেলছিলেন আর ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে মেয়ের এগিয়ে যাওয়া দেখছিলেন।
কম্পাস আবেগে নয়, মানবিক দায়বদ্ধতায়ই তার একটি কিডনী দান করেছিল মুসকানকে। অবশ্য এটা কেবল সে জানে আর জানেন অস্ত্রপাচারকারী ডাক্তার। মুসকান এবং তার বাবাকে হাসপাতাল থেকে জানানো হয়েছে এক মহৎ লোক তার পরিচয় গোপন রাখার শর্তে কিডনী দিতে রাজি হয়েছেন।
কম্পাস ইচ্ছে করেই তার এই মহানুভবতার কথা মুসকানের কাছে গোপন রেখেছিল। সে চেয়েছে মুসকানের অন্তর থেকে কোনো কারণ ছাড়াই আবেগ বেরুক তার জন্য। মুসকান যদি জানে কম্পাস তার একটি কিডনী দিয়ে তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে, তাহলে মুসকানের মনে গভীর কৃতজ্ঞতাবোধের জন্ম হবে। ঋণ শোধের ব্যাপার আসবে। ঋণ, কৃতজ্ঞতা, ধন্যবাদ জাতীয় শব্দগুলোর সাথে ভালবাসার সম্পর্ক স্থায়ী হয় না...
কম্পাসের খেয়াল হলো, মুনের বাবা বলেছেন গত মাসের ২৩ তারিখ মেয়ের বিয়ে হয়েছে। তাহলে তারিখটি ছিল ২৩শে জুন ২০০৯। ২শ ৫২ বছর আগে পলাশীতেও ওয়াদাভঙ্গ এবং পক্ষ ত্যাগের একটা ঘটনা ঘটেছিল। সেটা ছিল ১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন। তাহলে কি ২৩শে জুনের জন্মই হয়েছে প্রতারণার জন্য...?
ভাবনার জগতে চলে গিয়েছিল কম্পাস। কঠিন বাস্তবে ফিরে এলো। এখন প্রকৃতির কাছে তার একটাই চাওয়া, মুন যেন কখনো জানতে না পারে তাকে কম্পাসের একটি কিডনী বাঁচিয়ে রেখেছে। তাহলে সে বিব্রতকর অনুতাপের আগুনে পুড়বে। কম্পাস তারপরেও চায় না মুসকান কখনো কষ্ট পাক।
কিছুদিনের মাথায় কম্পাসের কাছে একটা চিঠি এলো, লিখেছে মুসকান। গুটিগুটি হাতের অক্ষর। কোনো রকম ভূমিকায় না গিয়ে সরাসরি মূল পয়েন্টে চলে এসেছে সে।
সে লিখেছে-
কম্পাস,
জীবন আবেগ দিয়ে চলে না। জীবনের জন্য পাথেয় দরকার। কথাটি তুমিই একদিন আমাকে বলেছিলে।
বাস্তবতা জেনে গেছো নিশ্চই। বাবার বন্ধুর ছেলে জামান। তোমার আমার সম্পর্কের কথা তো বাবার জানা ছিলো না। এক সপ্তাহের মধ্যেই কীভাবে যে কী হয়ে গেলো-বুঝতেই পারিনি!
মা মারা যাবার পর থেকে আমিই আমার বাবার একমাত্র সম্ভল। আমাকে আঁকড়ে ধরেই বেঁচে ছিলেন আমার বাবা। তুমি জানো আমার বাবা সীমিত আয়ের মানুষ। তবুও কখনো এমন হয়নি যে, আমি কিছু চেয়েছি আর তিনি দেন নি।
আমার বাবা, আমার সেই বাবা আমার কাছে এসে যখন বললেন, মা মুসকান, একজন বাবা হিসেবে আমি তোকে যতটুকু দেয়ার কথা ছিলো, গরীবির কারণে ততটুকু তোকে দিতে পারিনি রে মা। আমি জানি তুই জীবনে অনেক দূর যাবি। তোর এই অক্ষম বাবাটিকে ক্ষমা করে দিস।
আমি বুঝতে পারছিলাম না বাবা হঠাৎ এই প্রসঙ্গে কথা বলছিলেন কেনো! বললাম, কী হয়েছে বাবা, আজ হঠাৎ অসব কথা কেনো? আর আমি কি কখনো কোনো অভিযোগ করেছি? অথবা আমার থেকে কি এমন কোনো আচরণ প্রকাশিত হয়েছে, যাতে তোমার মনে হলো আমি তোমার উপর অখুশি?
তোমাকে খুশি করার জন্য বলছি না বাবা। বাবা সকলেরই থাকে। তোমার মতো বাবা থাকে লাখে একজন।আমি ভাগ্যবান, আমি তোমাকে বাবা হিসেবে পেয়েছি। পূণঃজনম বলে কিছু যদি থাকতো, আর আমি যদি একশ'বার জন্ম নিতাম, প্রতিবারই তোমাকে বাবা হিসেবে পেতে চাইতাম।
জানো কম্পাস, আমি কিন্তু তখনো বুঝতে পারিনি বাবা কী বলতে চাইছিলেন। তখন আমার বাবা আমার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বললেন,
আমি সেটা জানিরে মা। আচ্ছা, আমি যদি কখনো তোর কাছে কিছু চাই, তুই কি দিবি?
আমি বললাম, কী বলছো বাবা! তুমি আমার হাতে একটি ছুরি দিয়ে একবার শুধু বলে দেখো, গলায় চালা। তোমাকে আর কারণ ব্যাখ্যা করতে হবেনা, আমি তোমার কথা পালন করবো।
আমার বাবার চোখে পানি এসে গেলো। আমাকে বুকে টেনে নিলেন। তারপর যে কথাটি শোনালেন,ভয়ংকর প্রস্তাবটি দিলেন, আমার মনে হলো পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেছে আমার! আকাশ বুঝি কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার মাথায় ভেঙে পড়তে যাচ্ছে!
বললেন, মা রে, আমি তোর বিয়ে ঠিক করে ফেলেছি। আগামী কালই বরপক্ষ তোকে উঠিয়ে নিয়ে যাবে। বলেই আমার বাবা বাচ্চা শিশুদের মতো হু হু করে কেঁদে উঠলেন। আমার বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে তখন আর আমার বলার কিছু ছিলো না।
ঘটনার ধাক্কা বুঝে উঠার আগেই বিয়ে হয়ে গেলো। আমি পারলাম না কম্পাস। আমি আমার বাবাকে কষ্ট দিতে পারলাম না। আই এম সরি।
তাছাড়া তখন শুনলাম তোমার চাকরিটাও চলে গেছে। আবার হুট করে বাবা আমার বিয়েটাও ঠিক করে ফেলেছেন।ভাবলাম যা হচ্ছে, প্রকৃ্তির ইশারাতেই হচ্ছে।আমি তুমি আমরা সকলেই প্রকৃ্তির মহা পরিকল্পণার কাছে বন্দি। আমাদের কার কী করার আছে?
আর যা হয়েছে ভালোই হয়েছে মনে করি। আমি তোমার গলার মালা হতে চেয়েছিলাম, তোমার কাধের বোঝা হতে নয়।তোমার দুঃসময়ে তোমাকে সাহায্য করতে না পারি, অন্তত তোমার কাধে চেপে বসে তোমার কষ্টকে আর বাড়ানো হলো না। ভাল থেকো। পারলে ক্ষমা করে দিও।
মুন জামান।
সত্যিই জীবন আবেগ দিয়ে চলে না। জীবন চলে তার নিজস্ব গতিতে। কথাটি মুন যদি প্রথম দিনেই বুঝে যেত, তাহলে ভাল হত।
কম্পাস আজ নিজেকে মুক্ত ভাবতে পারছে। তার কাছে মনে হচ্ছে, কারো প্রতি বাড়তি দায়-দায়িত্বের ঝামেলা থেকে বাঁচা গেছে। মুসকান ঠিকই করেছে। সে সাময়িক মোহের মায়াজালকে উপযুক্ত সময়ে ছিড়ে ফেলতে পেরেছে। চিরকুটের নাম দেখেই বুঝা যাচ্ছে তার স্বামীর নাম জামান। কত স্বাভাবিকভাবেই না লিখেছে ‘মুন জামান।’ জামান কে বিয়ে করে সে সম্ভবত সুখেই আছে। সে হয়ত জামানের মধ্যেই খুঁজে বেড়াচ্ছে জৈবিক চাহিদার উষ্ণ জলাশয়ে প্রাত্যহিক স্নানাতুর একজন স্ত্রী সোহাগী স্বামীকে। মন্দ কি?
কম্পাস চেষ্টা করতে লাগলো তার জীবন থেকে মুসকান অধ্যায়টি মুছে ফেলতে। কে যেন বলেছিলেন-“এই পৃথিবী তোমাকে কী দিল, সেটা বড় কথা নয়, তুমি পৃথিবীকে কী দিতে পারলে, সেটাই বড় কথা।”
এর ব্যাখ্যা যদি হয় “এই পৃথিবীকে তুমি তোমার শ্রেষ্ঠটুকুন দেবে। বিনিময়ে পাবে পাঁজরে তাচ্ছিল্যের লাথি। পাবে প্রতারণা। পাবে চরম উপেক্ষা, অবজ্ঞা। তারপরও তুমি দিয়েই যাবে”, তাহলে কী আর করা!
এই মুসকানই একদিন তাকে বলেছিলো, ‘কম্পাস, তোমার জন্য আমি হাসতে হাসতে জীবনটা দিয়ে দিতে পারি। হাজার বছর অপেক্ষা করতে পারি। গাছতলাতে জীবন কাটাতে পারি। তুমি পাশে থাকলে না খেয়ে কাটিয়ে দিতে পারবো দিনের পর দিন, অনেক দিন। আমার জীবনের প্রথম পছন্দ তুমি। তুমিই শেষ পছন্দ। মেয়েরা একবারই কাউকে মন থেকে গ্রহণ করে। কাউকে একবার মনের আঙিনায় স্থান দিয়ে দিলে সেখানে আর কাউকে বসানো যায় না...’
সেই মুসকান আজ অন্যের ঘরণী!
...চলবে

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

