পরিশিষ্ট
আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ায় সী-বিচে মলিন চেহারায় হাটছেন চল্লিশ/ একচল্লিশ বছরের এক বৃদ্ধ। বৃদ্ধই বলতে হবে। কারণ একচল্লিশ হলেও তাকে দেখাচ্ছে একাশির মত। উস্কো-খুস্কো চুল, যার বেশির ভাগই পাঁকা। চামড়ায় ভাজ পড়ে গেছে। শরীরে দুর্বলতার সবগুলো আলামত সুস্পষ্ট।
অনেকক্ষণ ধরেই বৃদ্ধকে লক্ষ্য করছিলো মিলান। পনের বছরের ফুটফুটে কিশোর। বছর তিনেক আগে সে তার মায়ের সাথে জার্মানি থেকে আমেরিকায় এসে সেটেল্ড্ হয়েছে। মিলান জন্মসূত্রে জার্মান হলেও সে তার মায়ের কাছে শুনেছে তার বাবা-মা’র জন্মভূমি দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশ-বাংলাদেশে। সে কখনো বাংলাদেশে যায় নি। কোনো একদিন যাবে।
প্রকৃতি এই পৃথিবীটাকে একটি গোছানো পরিকল্পনায় সাজিয়েছে। কাকতাল বলে সৃষ্টি রহস্যে কিছু নেই। এর অন্যতম প্রমাণ হলো, এই পৃথিবীর ৬শ কোটি মানুষের মধ্যে হুবহু একই চেহারা, একই শারীরিক গঠন প্রণালীর দুইজন মানুষ খোঁজে পাওয়া যায় না। এছাড়া প্রত্যেক জাতির শারীরিক রং, গঠন প্রণালীও আলাদা।
কুচকুচে কালো গায়ের রং দেখলেই বুঝা যায় লোকটি আফ্রিকা অঞ্চলের হবে। অবশ্য এই কালো’র মধ্যে মায়া-মায়া চেহারা হলে ওয়েষ্টইন্ডিজ হতে পারে। ব্রায়ান লারারা কালো হলেও দেখতে ভালো লাগে।
গায়ের চামড়া সাদা হলেও চেহারা যদি হয় ধবল রোগীর মত ফ্যাকাশে, তাহলে কারো বুঝে নিতে কষ্ট হয় না লোকটি আমেরিকান। শারীরিক উচ্চতার সাইজ দেখলেই চীন-জাপান-কোরিয়ার মানুষকে চিনে ফেলা যায়।
চেহারার কন্ডিশন ও নাকের প্রশস্ততা দেখলেই কাউকে আর বলে দিতে হয় না বেচারী মনিপুরী।
একই মানদন্ডে মিলান যখন এশিয়ার কাউকে দেখে, দক্ষিণ এশিয়ার, বিশেষ করে একটু বয়স্ক কাউকে, তখন খুটিয়ে খুটিয়ে দেখে। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। এদের মধ্যেই সে তার বাবাকে খোঁজে বেড়ায়। যদিও সে তার মা মুসকানের কাছ থেকে জেনেছে তার জন্মের সাত মাস আগেই জটিল দুরারোগ্য ব্যধিতে তার বাবা মারা গেছেন।
আস্তে আস্তে বৃদ্ধের কাছে গেল মিলান। জিজ্ঞেস করবেনা করবেনা বলেও শেষ পর্যন্ত জিজ্ঞেস করে বসলো-
‘আংকেল, কে আপনি? আপনাকে এমন দেখাচ্ছে কেন? আপনার কি খুব কষ্ট?’
চোখ নামিয়ে মিলানের দিকে তাকালেন বৃদ্ধ। এতক্ষণ তিনি তাকিয়ে ছিলেন আকাশের দিকে। গত পনের বছর ধরেই তিনি এই কাজটি করেন। মাঝে-মধ্যে হতাশ ভঙ্গিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকেন উপরের দিকে, আনমনা ভঙ্গিতে।
বৃদ্ধ ভাল করে তাকালেন মিলানের দিকে। ফুটফুটে মায়াবী চেহারার একটি ছেলে। ভীষণ মায়াকাড়া চেহারা। চেহারাটাও আবার খুব পরিচিত মনে হচ্ছে। কোন্ একটি চেহারার সাথে যেন খুব মিল রয়েছে। অনেক চেষ্টা করেও তিনি মনে করতে পারলেন না সেই চেহারাটি কার? মাথা নিচু করে ভাবতে লাগলেন তিনি।
মিলান বললো, ‘আংকেল, ক্যান্ আই হেল্প য়্যূ?’
‘নো থ্যাংকস।’
‘নো থ্যাংকস বললে তো হবে না। আপনাকে খুব বিধ্বস্থ দেখাচ্ছে। চেহারাও কেমন ফ্যাকাশে লাগছে। মনে হচ্ছে আপনি অসুস্থ। নিশ্চয়ই আপনার হেল্প দরকার। আমার নাম মিলান। আংকেল, আপনি কিন্তু এখনো আপনার নাম বলেন নি।’
বৃদ্ধ ছেলেটির আচরণে মুগ্ধ হলেন। সচরাচর এই কালচার বিদেশী ছেলে-মেয়েদের মাঝে দেখা যায় না। রাস্তায় পড়ে কাত্রাতে থাকলেও ‘এক্সকিউজ মী’ বলে পাশ কাটিয়ে চলে যাবে। ফিরেও তাকাবে না। মুরব্বিদের শ্রদ্ধা ও মান্য করে বিনয়ের সাথে কথা বলার শিক্ষা এদেশের ছেলে মেয়েরা তাদের মা বাবার কাছ থেকে পায় নি। এই ছেলেটির কথাবার্তা বৃদ্ধের খুব ভাল লাগলো। তিনি বললেন-
‘আমি কম্পাস। কম্পাস চৌধুরী।’
‘কম্পাস আংকেল, আপনার কি খুব কষ্ট?’
‘না বাবা, আজ আর আমার কোনো কষ্ট নেই। সব কষ্ট জয় করে ফেলেছি আমি। আচ্ছা কি যেন নাম বললে তোমার?’
‘মিলান।’
‘মিলান, তোমার এজ কী?’
‘ফিফটিন ইয়ারস।’
‘আমিও তাই আন্দাজ করেছিলাম। সম্ভবত তোমার জন্মের কয়েক মাস আগে হবে, পনের বছর আগে একটি বিশেষ কারণে প্রচন্ড আবেগতাড়িত হয়ে আমি আমার আমেরিকার ভিসা, পাসপোর্ট টিকেট সবকিছু ফেলে দিয়েছিলাম নদীতে। প্রকৃতি আবেগ তাড়িত হয় নি। তাড়াহুড়া প্রকৃতির পছন্দ না। আমি যখন সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব প্রায়, যখন বলতে গেলে ঠিকমত দু’বেলা খাবারই যোগাড় করতে পারছিলাম না, দারিদ্র যখন আমার সাথে গভীর সখ্যতা গড়ে তুলেছে, ঠিক তখনি প্রকৃতি আমাকে বিশেষ ব্যবস্থায় পাঠিয়ে দেয় এখানে। কীভাবে পাঠানো হলো, সেটাও এক রহস্য। অবশ্য সেই রহস্য জানার কোনো ইচ্ছেই আমার হয় নি। কী দরকার! থাকুক কিছু রহস্য অমীমাংসিতই।’
মিলান বললো, “আংকেল, অই যে! গাছের আড়ালে উল্টোদিকে মুখ করে বসে আছেন, উনি আমার মা। সেই ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি আমার মা হঠাৎ হঠাৎ আনমনা হয়ে কোথায় যেন হারিয়ে যান। কী যেন ভাবেন। তখন তার দু চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে পানি। যতবার জিজ্ঞেস করেছি-
‘মা, কী হয়েছে তোমার? কাদঁছো কেন?’
আমার মা জবাব দিয়েছে, ‘না বাবা, কিছু না।’
আজ সকাল থেকেও দেখছি আমার মায়ের মন খারাপ। আজ অন্যদিনের তুলনায় একটু বেশি খারাপ। চাচা, আপনি তো খুব সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলেন। আপনি কি আমার মায়ের সাথে একটু কথা বলবেন? আমার কেন জানি মনে হচ্ছে আপনি আমার মায়ের সাথে কিছুক্ষণ কথা বললে আমার মায়ের মন ভাল হয়ে যাবে। চাচা, মাকে ডাকবো?”
কম্পাস সম্মতিসূচক মাথা নাড়লেন। মিলান ছুটে যেতে লাগলো মায়ের দিকে...
শেষ

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




