somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিলেতের হাওয়া (৪২)

১৩ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১১ বিকাল ৪:৪১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দুর্গতি অব স্টুডেন্ট
মোঃ রাকিবুর রহমান। কুমিল্লা বাগিচা গাঁও এর ছেলে। চান্দিনা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করে সে। অধ্যাপক আব্দুল মজিদ কলেজ কুমিল্লা থেকে এইচএসসি। তারপর কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে ম্যানেজমেন্টে অনার্স করা অবস্থায় স্টুডেন্ট ভিসার পিঠে চড়ে চলে আসে যুক্তরাজ্যে। জানুয়ারি ২০১০ এর মধ্যভাগে। এখানে ভর্তি হতে হয়েছে আইকন কলেজে।

বললাম, কেমন আছেন?
বললো, ভাল নেই।
ভাবনায় পড়ে গেলাম আমি। স্টুডেন্টদের যাকেই জিজ্ঞেস করি, বলে ভালো নেই। এমন কাউকে কি পাবো না, যে অন্তত বলবে, মোটামুটি ভাল আছি? বললাম, কাজ পেয়েছেন কিছু?
এই সপ্তাহ দু’য়েক হলো এক রেষ্টুরেন্টে কাজ পেয়েছি। ৭০ পাউন্ড সপ্তাহ। এই টাকায় থাকা-খাওয়াই চলে না। খুব কষ্টে এডজাষ্ট করে চলতে হচ্ছে।

আমি বললাম, আমি এমন অনেক স্টুডেন্টের মোলাকাতও পেয়েছি, যারা দু’বেলা খাবার বিনিময়ে কাজ করছে। সেই অর্থে কি আপনার অবস্থা ভাল না? আচ্ছা যাইহোক, বলুন তো কেন এসেছিলেন?

সে বললো, আমার উদ্দেশ্য ছিলো দুটি। একটি ভাল ডিগ্রী অর্জন করা এবং পাশাপাশি জব করা। এখন কোনোটাই ঠিকমতো হচ্ছে না। বলতে পারেন ভাসমান নৌকায় আছি। নৌকা যে কোথায় গিয়ে থামে, কেউ জানে না।

কথাবার্তায় স্মার্ট এই ছেলের মনোবল দেখলাম অনেক বেশি। সে বললো, তবে খাওয়া দাওয়া নিয়ে আমি চিন্তিত নই। বিশ্বের কোটি কোটি ইহুদী-খ্রীষ্টান, যারা আল্লাহকে মানে না, আল্লাহ যদি তাদেরও খাওয়ায়, তাহলে আমাকে কেন খাওয়াবে না। আল্লাহর প্রতি আমার অগাধ বিশ্বাস।

আমি বিড়বিড় করে বললাম, আল্লাহ ভরসা।
সে বললো, কিছু বললেন?
আমি বললাম, ইয়ে মানে, দেশের শিক্ষা এবং এখানকার শিক্ষা, দ’ুটোর মধ্যে কি কোনো পার্থক্য চোখে পড়ে?

সে জানালো, দেশের শিক্ষা থিওরীক্যাল। আর এখানকার শিক্ষা প্রাক্টিক্যাল। দেশে পড়ালেখা করা হয় পরীক্ষায় ভাল রেজাল্ট করার জন্য আর এখানে পড়ালেখা করা হয় বেশি বেশি জানার জন্য।

আমি বললাম, দেশের ছাত্রদের উদ্দেশ্যে আপনার পরামর্শ কী?
সে বললো, আমি পরিষ্কার ভাষায় বলবো, যাদের টাকা আছে, খরচ করে পড়তে পারবে, কেবল তারাই যেন আসে। রোজগারের ধান্দায় এসে যেন জীবন নষ্ট না করে।

রাকিবুর রহমানের সাথে কথা শেষ করে কথা বললাম আল আমিনের সাথে। হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর থানা চাতলী গ্রামের আল আমিন। সিলেট কাজিরবাজার মাদরাসায় পড়া লেখা করেছেন ৯৬ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত। পাশাপাশি বরইকান্দি মাদ্রাসা থেকে দাখিল দিয়ে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন সিলেট ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে। স্টুডেন্ট ভিসায় যুক্তরাজ্যে এসেছেন ২৭ অক্টোবর ২০০৯ সালে। ভর্তি হয়েছেন ব্রিট কলেজে। আল আমিন একটি ইমামতি ঝুটিয়ে নিয়েছেন। সপ্তাহে একশ পাউন্ড। কোনো রকমে চালিয়ে নিচ্ছেন আর কি।

একটা সময় ছিলো, যখন যুক্তরাজ্যে আলেম উলামারা সংখ্যায় ছিলেন কম। তখন তাদের ডিমান্ড ছিলো বেশি। কেউ কেউ টিউশনি করেই অনেক টাকা কামিয়ে ফেলতেন। আজ আর সেই দিন নাই। রাস্তার মোড়ে মোড়ে মেসাব পাওয়া যায়। অনেকে ডিজিটাল ফর্মূলার ভিজিটিং কার্ড বন্টন করছেন। সেদেশে দুইশ’ ভিজিটিং কার্ড তৈরি করতে ন্যুনতম ৫০ পাউন্ড দরকার। ৫০ পাউন্ড মানে ৫ হাজার টাকা। হুজুররা এই মুশকিল আসানের তরীকা বের করে ফেলেছেন। অ৪ সাদা কাগজ কেটে টুকরো টুকরো করে কার্ড তৈরি করেছেন। নমুনা-

আরবী পড়াইতে চাই
আপনার সন্তানকে অত্যন্ত যত্নের সাথে সহি শুদ্ধ করে
ঘরে গিয়ে আরবী পড়াইতে চাই।
হাঃ মাওঃ ------------------
মোবাইল ০০০০০০০০০০০
(নূরানীতে বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত)

বাদ মাগরিব মুরগীর ভাজি করারসকসহীন হাত পা এবং আলু নিয়ে বসা হলো। ভদ্রভাষায় যার নাম চিপস এন্ড চিকেন। তখন এসে উপস্থিত হলেন আরো একজন স্টুডেন্ট। এই স্টুডেন্ট একটু ব্যতিক্রমধর্মী। কারণ তিনি বাঙালি নন। সৌদি আরবি। তার নাম আব্দুল আজিজ বিন আব্দুর রহমান। সৌদি কিং ফ্যামিলির খুব কাছের লোক। আব্দুল আজিজের দুই কাজিন সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ দু’টি মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী হিসেবে কাজ করছেন। একজন বাণিজ্যমন্ত্রী, অন্যজন মানবাধিকার মন্ত্রী। আতাউর ভাই আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন একজন লেখক হিসেবে।

আমি বললাম, আপনার আত্মীয় অই মন্ত্রীদের নাম কি?
তিনি বললেন, স্যরি। আর আপনি লিখবেন জানলে তো আমি এটুকু পরিচয়ই দিতাম না। এখানে আমি পড়তে এসেছি আমার যোগ্যতায়। কারো তদবিরে নয়। কারো সহযোগিতায় নয়।
বললাম, আচ্ছা ঠিক আছে। কোন্ কলেজে পড়ছেন?
বললেন, ল’কলেজে।
কতদিন হলো এসেছেন?
২০ মাস।
কাজ করছেন কিছু?
বললেন, অবশ্যই। পড়ালেখার পাশাপাশি আইন প্রাক্টিস করছি ‘ল ইয়ার’ হিসেবে।


খিদমাহ থেকে বের হলাম রাত ১টায়। আমি ও নেজাম। বাস নং টুয়েন্টি ফাইভ ধরে আমরা চলে এলাম অলগেট। সেখান থেকে ৬৭ নং বাস চেপে ৫/৭ মিনিটে চলে যাবো শর্ডইচ।

অলগেট এসে পড়লাম গ্যাড়াকলে। ৬৭নং বাস রাত ১২টা ৩০ মিনিটের পর বন্ধ হয়ে যায়। এখন উপায়? অবশ্য খুব বেশি দূরও নয়। ১৫/২০ মিনিট হাটলে চলে যাওয়া যাবে। ৭ দিনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগালাম। হেটে একটু সামনে চলে গেলাম। সেখান থেকে ১৪৯ নং বাস ধরলাম। ১৪৯ নং বাসও শর্ডইচ হয়ে যায়।

রাত দু’টা হয়ে গেছে। রাস্তায় বয়স্ক মানুষ খুব একটা নেই। ১৫ থেকে ২৫ বছরের ছেলে মেয়ের সংখ্যাই বেশি। এবং মোটামুটি সবাই ড্রাংক। অনেকে হাটতেও পারছে না। হেলে পড়ছে, কেউ কেউ মাতাল হয়ে রাস্তায় শুয়ে আছে। আমার বাঙালি ভাই-বোনও আছে। পার্থক্য কেবল এটুকুই, ওদের গায়ের রং অতিরিক্ত সাদা অথবা কুচকচে কালো। আর আমার ভাইবোনদের রং উজ্জ্বল বাদামী।

আমি ও নেজাম বাসে দাঁড়িয়ে আছি। দেখলাম অবস্থা বেসামাল। পুরো বাস মদের বকবকে গন্ধে ভরে গেছে। আমাদের ডানে বামে আগে পিছে গায়ের সাথে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়েছে মেয়েরা। অস্বস্তিতে কাবু হয়ে আছি আমরা। ওদের শরীরের অনাকাংখিত স্পর্শ এবং ব্রেকের তালে তালে হেলে দুলে এসে ঝাপিয়ে পড়া ওদের শরীরের ধাক্কায় আমরা মজলুম। কোনো রকমে কয়েক মিনিটের এই অত্যাচার সহ্য করে বাস থেকে নামলাম আমরা। প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নিলাম। স্বস্থির নিঃশ্বাস।

এই যে ছেলেমেয়েরা রাত দু’টা তিনটায় ঘরে ফিরছে, কেউ তাদের কিছু বলবে না। বলতে পারবেও না। অভার এইটটিন হয়ে গেলে তো ছেলে মেয়েরা তাদের বাবা মাকে লাথি মেরে ফেলে চলে যায়। সেটা ভিন্ন কথা।

মেয়ের বয়স যাই হোক, ৯ হোক আর ১৩, তাকে আর শাসন করার অধিকার কোনো মা বাবার থাকে না। মেয়ে দুদিন ছেলে বন্ধুর সাথে রাত কাটিয়েছে অথবা রাত তিনটায় বাড়ি ফিরেছে বলে মা বাবা যদি অই গুণধর কন্যাকে শক্ত করে একটা ধমকও দেন, আর মেয়ে যদি পুলিশে কমপ্লেইন করে বসে, তাহলে অই মা বাবার আর রক্ষা নেই। নিজের সন্তান বে পথে চলে যাচ্ছে, তবুও মা বাবা তাকে শাসন করতে পারবেন না, কারণ সভ্য দেশে সে সুযোগ নেই।
(ভাগ্যিস আমরা সভ্য জাতি হতে পারি নি। )


ক্রমশ


৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নবীজির শেখানো এক অনন্য আমল

লিখেছেন নতুন নকিব, ১১ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৯:০৩

দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নবীজির শেখানো এক অনন্য আমল

ছবি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

মানুষের জীবন মূলত অসংখ্য ছোট-বড় সিদ্ধান্তের সমষ্টি। প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি মোড়ে আমাদের কোনো না কোনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

লিখেছেন আঘাত প্রাপ্ত একজন, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:২৬

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

[সম্ভাবনার ক্রমানুসারে নয়ঃ]

আর্জেন্টিনা: আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ তার ডিফেন্স আর ইনজুরি । ৩৮ বছরের তরুণ(!) সেন্টারব্যাক ওতামেন্দি আর কমপক্ষে এক হালি হাফ-ফিট ফুটবলার নিয়ে ১৯ জুলাই পর্যন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ শরৎ বন্দনা

লিখেছেন ইসিয়াক, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:৫৯


শরৎ এলেই আকাশ জুড়ে সাদা মেঘের ভেলা
দিনমণি আর মেঘমালার লুকোচুরি খেলা।

রুম ঝুমঝুম নূপুর পায়ে ছুটছে নদীর ঢেউ
ভাটিয়ালি গাইছে গান অচিন সুরে কেউ।

বিলে ঝিলে শাপলা পদ্ম... ...বাকিটুকু পড়ুন

×