মিসির আলি বলতে আরম্ভ করলেন,
লাগামহীন জীবনের লাগাম টেনে ধরার প্রয়োজন একটি সিঁড়ির। সেই সিঁড়ির নাগাল পেতে পাড়ি দিতে হয় বিয়ে নামক সাঁকো। যে সাঁকো কেউ কেউ নিজেরাই তৈরি করে নেয় । আবার কাউকে পাইয়ে দিতে হয়।
বিয়ে মানে, তৃপ্তির ঢেকুর তোলা বিক্ষিপ্ত মুহুর্তগুলোকে একটি স্থায়ী চুক্তির মাধ্যমে একিভূত করে ফেলা। ভিন্ন মেরুর দু'টি আত্মাকে একাগ্রতার মোহনাতে সাঁতার কাটতে দেয়া।
বিয়ে মানে এমন একটি হাতের স্পর্শ, যে হাত ধরে নিশ্চিন্তে কাটিয়ে দেয়া যায় একটি জীবন। বিয়ে মানে এমন একটি আঙুল, যে আঙুল ধরে ছুটে চলা যায় দিগন্তের পানে, উল্কার গতিতে।
একটু থামলেন মিসির আলি। চেয়ারের হাতলে রাখা টাওয়েল দিয়ে ঘেমে উঠা মুখটা মুছে নিলেন। তারপর চতুর্দিকে একবার চোখ বুলিইয়ে নিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন,
বিয়ে মানে, কল্পনার ফানুস উড়ানো মানুষগুলোর মধ্য হতে বাছাইকৃ্ত ঝুটি নির্বাচন। যারা নব উদ্দমে নামবে নতুন ইনংসের গোড়াপত্তনে। যা হবে জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ট ইনিংস। প্যাড পরে যারা অনেক আগে থেকেই মানসিক প্রস্তুতি সেরে রেখেছিলো একটি রেকর্ড ভাঙা ধৈর্যশীল ইনিংসের একপ্রান্ত আগলে রাখার জন্য। যারা আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিলো উভয়েই নট আউট থাকবে। রানগুলো ফুল হবে। ফুলে ফুলে ভরে উঠবে বাগানটি। সেই ফুল থেকে আরো বীজ হবে। বীজ থেকে চারা। চারাগুলোকে পরিচর্যা দিয়ে বড় করা হবে। সেগুলোতে আবার ফুল হবে। ফুল থেকে চারা। চারা থেকে বীজ..এভাবেই পৃথিবীটা এগিয়ে যাবে নির্দিষ্ট পরিকল্পনায়।
এক কথায় বিয়ের মূল কথা হচ্ছে, বিয়ে মানে দু'টি জীবনের ঝুটিবদ্ধ হয়ে ক্রিজে পড়ে থাকা। রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে ছুটে চলা, শুধু একটি মাত্র রানের জন্যে। জীবন নামক এই ইনিংসের যাত্রাপথেও বাউন্সার আসে।ফুলটস আসে। সতর্কতার সাথে গা বাছিয়ে অগুলো ছেড়ে দিতে হয়।
আসে বডিলাইন নিখুত নিশানায় একশ মেইল গতিতে হতাশা। অনাকাঙ্খিত মুভমেন্ট। আস্থা ও দৃঢ়তার সাথে অগুলোর মোকাবেলা করে ক্রিজে পড়ে থেকে জীবনকে জয়ের বন্দরে নিয়ে গিয়ে নোঙর করানোর জন্য যে সামাজিক চুক্তি হয়ে থাকে, তার নামই হচ্ছে বিয়ে।
ক্লান্ত শ্রান্ত মিসির আলি সবাইকে শুভ কামনা জানিয়ে বসে পড়লেন। বুঝাই যাচ্ছে আরো কিছু, অনেক কিছু বলবার ছিলো তাঁর। পড়ন্ত শরীর থেকে সাপোর্ট পাচ্ছেন না। তুমূল হাততালির মাধ্যমে ধন্যবাদ জানানো হলো মিসির আলির বক্তব্যকে।
আলোচনা পর্ব শেষ হলো। শেষ হলো খাবার-দাবারের পর্বও। নতুন জামাই মুখে রুমাল ঠেসে বসে আছেন। তাকে ঘীরে রয়েছে সাত আট জন কিশোরী। মধ্যেখানে বিশাল সাইজের একটি থালা। থালার মধ্যে আস্তো একটি মুরগী(অথবা মুরগা!) দাঁড়িয়ে আছে। মুরগীটির সারা গায়ে আলো প্লাস্টার করা। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হবে এই মুরগটির রান নিয়ে টানাটানি।
খাওয়া-দাওয়া শেষে মেহমানরা একে একে চলে যেতে লাগলেন। ওসি( রমনা থানা) জনাব জোয়াদুল করীম জর্দা দেয়া একটি পান মুখে পুরে বেরিয়ে পড়লেন জনগনের সেবা করতে। বাড়তি ইনকামের মাধ্যমে দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতির উন্নয়নে কিছুটা হলেও অবদান রাখতে। মাজেদা খালাও চলে গেছেন। উনার মাইগ্রেনের ব্যথা উনাকে বেশিক্ষণ থাকতে দিতে রাজি হয় নি। মিসির আলির হার্টের প্রবলেমটা একটু বেড়েছে। তিনি আজ থেকেই যাবেন।
শুধু রূপা যায়নি এখনো। একপাশে দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ। বড় মায়া লাগছে দেখতে। ইচ্ছে করছে কাছে যাই। হাত ধরি। আমি জানি, এখন যদি আমি তার কাছে গিয়ে একবার শুধু ওর হাতটি ধরি, আনন্দে কেদে ফেলবে সে। কিন্তু আমি তো সেটা করতে পারব না। বাবা স্পষ্ট করে বলে গেছেন,
বাবা হিমালয়। মায়া থেকে দূরে থাকবে। ইহা বড়ই কঠিন চিজ। অক্টোপাসের মতো জড়িয়ে রাখে। কাছে রাখে। তোমাকে বিশেষ কারো মায়ার জালে আবদ্ধ হইয়া থাকিলে চলিবেনা। যখনই দেখিবে মায়ার জাল পেচাইয়া ফেলিবার জন্য আগাইয়া আসিতেছে, তৎক্ষনাৎ সেই স্থান পরিত্যাগ করিবে।
মায়াকে আমি এখনো পুরোপুরি জয় করতে পারিনি। মাঝেমধ্যে খেই হারিয়ে ফেলি। আবার লাইনে আসতে চেষ্টা করি। এই অর্থে মহাপুরুষ তৈ্রির ব্যর্থ কারিগর আমার বাবার নির্দেষ অনুযায়ী এখন আমার এখান থেকে সরে যাওয়ার কথা। কিন্তু আমি যেতে পারছি না। আমি দেখতে চাই মাজারুল বউ নিয়ে যখন বের হবে, তখন অবস্থাটা কী হয়?
এদেশের অতি পরিচিত একটি সংস্কৃতি হলো, কনেকে উঠিয়ে দেবার সময় কান্নাকাটি করা। অনেক প্রকার কান্না আছে জগতে। আমার হাতে এখন প্রচুর সময়। সময় কাটানোর জন্য কিছু একটা নিয়ে ব্যস্ত থাকা দরকার আমি মনে মনে কান্নার শ্রেণী বিন্যাস করতে শুরু করলাম।
আসল কান্নাঃ- ( যে কান্না ভেতর থেকে বের হয়)
নকল কান্নাঃ- (যে কান্নার কোনো মূল ভিত্তি নেই)
কষ্টের কান্নাঃ- ( ব্যথা বা যন্ত্রনার সময়)
আনন্দের কান্নাঃ- ( অতি খুশিতে চোখে পানি আসা
মেঁকি কান্নাঃ- ( কান্নার ভাব ধরা
গ্লিসারিন কান্না ;- ( নাটক-সিনেমার কান্না)
লোক দেখানো কান্নাঃ- ( না কাঁদলে খারাপ দেখায় বলে কাঁদা)
মন ভুলানো কান্নাঃ- ( স্বার্থ উদ্ধারের জন্য কাঁদা)
নির্বাচনি কান্নাঃ- ( প্রার্থীরা ভোটারের মন গলাতে যে কান্না করেন)
মৃত্যু কান্নাঃ- (আপনজনদের মৃত্যুতে যে কানাকাটি করা হয়)
ভয়ের কান্নাঃ- ( কাউকে ভয় পেয়ে কেঁদে ফেলা)
ক্ষুধা কানাঃ- ( ছোট বাচ্চারা ক্ষিধে পেলে চিতকার করে কাঁদে)
কারণ ছাড়া কান্নাঃ-( একদম শিশুবাচ্চাদের কান্না)
কান্নার রকমফের নিয়ে ভাবতে ভাবতে মনে হলো হাসিও তো আছে অনেক প্রকার।
অট্ট হাসি ( হা হা শব্দে হাসা)
চাঁপা হাশি ( দাঁত বের না করে হাসা)
আনন্দের হাসি ( সাধারণত আনন্দ পেলে যে হাসি বের হয়)
কষ্টের হাসি ( দুঃখের সময়ও মানুষ হাসির মত মুখ করে)
ব্যাঙ্গ হাসি ( ব্যাঙ্গ করে হাসা)
পাইকারি হাসি ( নেতানেত্রীরা জনসভায় হাত নেড়ে নেড়ে যে হাসি দেন)
কৃ্ত্রিম হাসি ( ছবির পোজ দেয়ার সময়)
পাগলা হাসি ( পাগলেরা কোনো কারণ ছাড়াই হাসে)
জোর করে হাসি ( শিশুদের কাতুকুতু দিয়ে হাসানো)
ঘুম হাসি ( শিশুরা ঘুমালে জরার মা না কার মা নাকি এসে ঘুমন্ত শিশুকে কাতুকুতু দেয়। ফলে শিশুরা ঘুমের মধ্যেই হাসে)
তৈল হাসি (বসের মনরঞ্জনে হাত কচলানো হাসি০
ভিলেন হাসি ( সিনেমার ভিলনদের হাসি- উ হা হা! উ হা হা!!)
চলবে

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



