বিতর্ক, হয় আমাদের জীবনের বিধাতা প্রদত্ত অন্যতম অনুসঙ্গ অথবা বিতর্ক আমদের অতি পছন্দের একটি জিনিষ । বিতর্ক না হলে যেন বাঙ্গালীর কোন কাজই সঠিকভাবে শেষ হয় না । দেশের জনপ্রিয় একজন লেখক অকাল প্রয়াত হয়েছেন। শরীরে বাসা বেঁধেছিল মরনব্যাধি ক্যান্সার। পৃথিবীর সবচাইতে নামকরা ক্যান্সার হাসপাতালে চিকিৎসার পরও তাকে বাঁচানো যায় নি। এ বিষয়টি দুঃখ ছাড়া আর কিছু হবার নয়। এখানেও তো আমাদের বিতর্ক তৈরি করতেই হবে তা নইলে চলে কি করে।
প্রথা অনুযায়ী প্রথিতযশা ও বরেন্য ব্যক্তিদের ন্যায় লেখককে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বস্তরের জনসাধারনের শ্রদ্ধা জানানোর ব্যবস্থা করা হয়। সেখানে বিতর্কের সূত্রপাত করেন বর্তমানে জাতীয় সংসদের মাননীয় বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ জ্বনব জয়নাল আবেদীন ফারুক। তিনি দাবী করেন এই শ্রদ্ধা নিবেদন পর্বটি পরিচালনার দায়িত্ব যেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট না করে এটা তার পরিবার বা সরকারের পক্ষ থেকে করা হোক। সাথে সাথে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের পক্ষ থেকে কড়া প্রতিবাদ প্রকাশ করায় এই বিতর্কটি হালে পানি পায় নি। চিফ হুইপের বক্তব্য শুনে আমার ক্ষোভ না জেগে হাসি পেয়েছে। কারন প্রখ্যাত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের প্রয়ানে বরাবরই এই কাজটি করে থাকে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। এতে কোনদিন কোন প্রশ্ন ওঠেনি উঠবার কথাও নয়। আমার তার মন্তব্যে হাসি পেয়েছে এই কারনে যে আজ হুমায়ুন আহম্মেদ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং অনেক বেশী জনপ্রিয় । কিন্তু এর আগে অনেকের প্রয়ান ঘটেছে যারা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হলেও অতটা জনপ্রিয় ছিলেন না। তাদের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য এত মানুষের ঢল নামে নি। জোট কিন্তু তাদের শ্রদ্ধা জানানোর পর্বটিও সম্পন্ন করেছে একই রকম গুরুত্ব দিয়ে। একটি বিষয় আপনারা লক্ষ্য করে থাকবেন শ্রদ্ধা জানানোর স্থান এবং পেছনের ব্যনারটির ডিজাইন কিন্তু ধারাবাহিকভাবে একই রকম । আমার প্রশ্ন যাদের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য মানুষের ঢল নামে না আবার তারাও জাতিকে দিয়েছেন অনেক কিছু তাদের প্রয়াণে জাতির পক্ষ থেকে ঋণ শোধ করবার যে প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ দিন ধরে চালু রেখেছে জোট সেখানে বিতর্ক সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য কি? যাই হোক এই বিতর্কটি যেহেতু টেকেনি তাই এ নিয়ে বিশেষ বলবার নেই। শেষ পর্যন্ত তার শ্রদ্ধা জানানোর পর্বটি শান্তিপূর্নভাবে শেষ হয়েছে।
আসল বিতর্ক শুরু হয় তার দাফনের যায়গা নিয়ে। এটি নিতান্তই হুমায়ূন আহম্মেদের পারিবারিক বিতর্ক হলেও জনপ্রিয়তার কারনে দেশের মানুষ ও তার ভক্ত পাঠক উৎসুক হয়ে দৃষ্টিপাত করেছে সেদিকেই। পরিবারের সকলের ২য় পক্ষের স্ত্রী শাওন ব্যতিত সকলের দাবী ছিল তাকে ঢাকার কাছাকাছি এমন কোন স্থানে সমাহিত করা হোক যাতে তার ভক্ত ও পাঠকরা যে কোন সময় সেখানে গিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে পারে। শাওনের দাবীছিল তার প্রিয় স্থান নুহাস পল্লীতেই তাকে সমাহিত করা হোক।
শেষ পর্যন্ত আজ (২৪ জুলাই) সকালে তার মরদেহ রওনা হয়েছে নুহাশ পল্লীর দিকেই। একদিক দিয়ে বিষয়টি সঙ্গতই হয়েছে। লেখকের শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী ( শাওনের ভাষ্য মতে) তার প্রিয় স্থান নুহাস পল্লীতেই তিনি সমাহিত হচ্ছেন। জীবনের শেষ দিনগুলো তিনি কাটিয়েছেন শাওনের সাথেই । তাই এধরনের কথা শাওনকে বলে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক । আমার কাছে শাওনের বক্তব্যের দুটি বিষয় খটকা লেগেছে এক. ন্ডমায়ূন আহম্মেদ অনেক বেশী জনপ্রিয় হলেও তিনি ছিলেন নিভৃতচারী ও আতœকেন্দ্রীক উনি নিজে বলবেন আমাকে নিয়ে অনেক টানাটানি হবে এটা বিশ্বাস করা শক্ত মনে হয়েছে। বরং বিডি নিউজকে দেয়া তার স্বাক্ষাতকারটিতেই যেন তাকে খুঁজে পাওয়া যায়। সেই স্বাক্ষাতকারে তিনি বলেছিলেন তার কবর সাধারনের মাঝে আজিমপুরের মত কোন স্থানে হওয়া উচিৎ। দ্বিতীয় খটকাটি হচ্ছে এই কথাটি শুধু শাওনকেই বলে গেলেন লেখকের যদি এটাই শেষ ইচ্ছা হতো তাহলে তিনিতো অন্য কাউকেও বলতে পারতেন। আবার শাওনের কথামত অপারেশান থিয়েটারে ঢোকার আগে যদি কথাটি বলে থাকেন সেখানে অন্যদেরও থাকবার কথা। শাওন অনেক আবেগপ্রবণ ভাবে তাকে নুহাস পল্লীতে কবর দেয়ার কথা মিডিয়াকে বলেছেন ঠিক কিন্তু কখনই এটা বলেননি যে হুমায়ূন আহম্মেদের এই অন্তিম ইচ্ছার কথা আর কেও শুনেছেন। হতেও পারে হয়ত নিভৃতচারী লোকটি শুধুতার প্রিয় স্ত্রীকেই কথাটা বলেছেন। আবার হুমায়ূন আহম্মেদ যদি এটা মনে করে থাকেন তাকে নিয়ে অনেক টানাটানি হবে তাহলে হয়ত শাওন একা তার ইচ্ছার বাস্তবায়ন ঘটাতে সক্ষম নাও হতে পারেন সেক্ষেত্রে অন্য কাউকে বলে যাওয়াটাই ছিল বিশ্বাসযোগ্য যাতে টানাটানি হলে তারা শাওনকে সাহায্য করতে পারেন তার ইচ্ছা বাস্তবায়নের জন্য। হুমায়ূন আহম্মেদতো আর লিখতে পারবেন না ( এখানে বলা উচিৎ ছিল আর কথা বলতে পারবেন না কিন্তু আমি লিখলাম আর লিখতে পারবেন না । তার কারন তিনি কথা বলার চাইতে লিখতে পছন্দ করতেন। কাল একটা টিভি স্বাক্ষাতকারে দেখলাম তিনি বলছেন লেখকের আর মুখে বলার কিছু থাকে না তিনি তার সব কথা তার লেখাতেই প্রকাশ করেন। যেমন জাতীয় কবি নজরুল তার গানে লিখেছেন ‘‘মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই’’। হুমায়ূন আহম্মেদ তেমন কিছু লিখেছেন কিনা আমার জানা নাই।) তিনি যেহেতু আর লিখতে পারবেন না তাই এই বিতর্ক বিতর্কই থেকে যাবে।
তবে আমি বিশ্বাস করতে চাই তার শেষ সময় পর্যন্ত স্বজন এবং প্রিয় স্ত্রীর কথা মতো লেখকের শেষ ইচ্ছা পূরন হচ্ছে । নূহাস পল্লীতেই তার দাফন হচ্ছে এটাই যেন মঙ্গল। তার আতœা যেন শান্তিতে থাকে।
শেষ করেও একটা লাইন লিখতে চাই । হুমায়ূন আহম্মেদও কিন্তু মৃত্যু নিয়ে তার একটি ইচ্ছা তার গানে প্রকাশ করেছিলেন “চাদনী পশর রাইতে যেন আমার মরন হয়’’ তার মরন হয়েছে দুপুর বেলা (নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় অনুযায়ী) আর বাংলাদেশের সময়ে সেদিন ছিল অমাবশ্যার রাত। বিধাতার হয়ত এমনই ইচ্ছা ছিল।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে জুলাই, ২০১২ দুপুর ১:১১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



