`আমি প্রথার বাইরে' এই কথা দাবী করার আগে আমাদের প্রথমে বুঝতে হবে প্রথা কি। প্রথা'র আভিধানিক অর্থ রীতি, প্রচলিত আচার, নিয়ম ইত্যাদি। এখন কথা হলো, `প্রথা ভাঙছি' বললে প্রকৃত অর্থে প্রথা ভাঙা সম্ভব কি না, তা আলোচ্য বিষয়। আর কেউ যদি বলেন আমি প্রথার বাইরে থেকে সাহিত্য সৃষ্টি করছি তা হলে তা কতটুকু গ্রহনযোগ্য? দাবী করা আর কার্যকর হওয়া এক জিনিষ নিশ্চয় নয়। এক কবিকে যদি আরেক কবি বলেন-`আপনারাতো প্রথাসিদ্ধ কবি। আমি নিজেকে এর বাইরে স্থাপনে উৎসাহবোধ করি।' তখন আমি তাকে ধন্যবাদ জানাই তার সাহসের জন্য। তবে তাকে বলতে চাই-প্রথা ভাঙা, নতুনত্ব নিয়ে আসা আর বাইরে থাকা এক জিনিষ নয়। আমরা শোনা কথা বলতে গিয়ে প্রায়ই ভুল কথা বলি। বিষয়টা এরকম যে, এক মাহফিলে সবাই হাসছে। একজনকে জিগ্যেস করা হলো, ভাই হাসছেন কেনো? সে পাশের একজনকে দেখিয়ে বললো, ওনি হাসছেন তাই। এভাবে আমরা অনেকে বক্তব্য দিয়ে থাকি দেখদেখা কিংবা শোনশোনা। সাহিত্যে প্রথা ভাঙার বক্তব্য এরকমেরই একটি কথা। সাহিত্য, সংস্কৃতি, সভ্যতা যেখানে ধারাবাহিক ক্রমবিকাশের সাথে সম্পর্কিত সেখানে বাইরে থাকার কথা বলা বেমানান। নতুন সাজে সাজানো আর বাইরে থাকা নিশ্চয় এক কথা নয়। ভেঙে যে আমরা সাজাই, তা কিন্তু পুরাতনের ভেতরেই কাজ করি। এখানে মূল ধাতু কিন্তু পুরাতন-ই থেকে যায়। আর বাইরে বললে, একেবারে স্পর্শহীন হতে হবে। সাহিত্যে প্রথার বাইরে গিয়ে কিছু সৃষ্টি করা যায় না। কারন, এখানে ভাষা, শব্দ, পদ্ধতি ইত্যাদিকে ধারনের ব্যাপার রয়েছে। এখানে মূল প্রথায় থেকে নতুন নতুন সাজে সাজানো যায়। এই সাজানোটাও কিন্তু প্রথার বাইরে গিয়ে নয়। আপনি যে সাজেই সাজান না কেনো দেখবেন পৃথিবীর কারো না কারো সাথে ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় মিলে যাচ্ছে। কারন, আপনার পাঠের নির্জাস হলো আপনার সৃষ্টি। আপনি মিক্স কিংবা রিমিক্স করে ভিন্ন স্বাদ দিতে পারেন, কিন্তু এই যে জিনিষগুলো মিক্স কিংবা রিমিক্স করছেন, তা কিন্তু প্রথা থেকে ধারণকৃত। বাংলা সাহিত্য নয়, পৃথিবীর যে কোন সাহিত্যের আদি থেকে আজ পর্যন্ত চোখ হাটালে যে কোন পাঠকের সামনে বিষয়টি পরিস্কার হয়ে উঠবে। আমি যদি আমাদের চর্যাপদ থেকে চণ্ডিমঙ্গল হয়ে রামমোহন, বঙ্কিম, মধু, রবি, নজরুল, প্রমথ চৌধুরী, জীবনান্দ, ফররুখ, শাসসুর রহমান, আল-মাহমুদ হয়ে নব্বই এবং শূন্য দশকের কথা বলি তবে নতুনত্ব পাবো, কিন্তু প্রথার বাইরে কাউকে প্রতিষ্ঠিত করা যাবে না। কেউ যদি চর্যাপদ পাঠ শেষে রবীন্দ্রনাথ পাঠ করেন তবে তার কাছে দু'এ আকাশ-পাতাল ব্যবধান মনে হবে। কিন্তু যদি ধারাবাহিকভাবে একেরপর এক পাঠ করে আসেন তবে দেখা যাবে এখানে পরিবর্তনের ক্ষেত্রে চেইন অফ কামান্ড রয়েছে। আবার পাশাপাশি যদি আমরা বিশ্ব সাহিত্যকে সামনে নিয়ে আসি তবে দেখবো কোথাও না কোথাও কারো না কারো সাথে রবীন্দ্রনাথের মিল রয়েছে। এমনি যদি আমরা উর্দু সাহিত্যে শরফ উদ্দিন গঞ্জেশেকর থেকে গালিব, তকি মীর, ইকবাল হয়ে ফয়েজ আহমদ ফয়েজ পর্যন্ত দেখি তবে দেখবো একই রীতির ভেতর ক্রমবিকাশ ঘটেছে যুগে যুগে। হিন্দি সাহিত্যের আদিকাল, ভক্তি কাল, রীতি কাল, আধুনিক কাল যদি আমরা পর্যালোচনা করি তবে দেখবো একটা ধারাবাহিকতা রয়েছে। হিন্দি সাহিত্যের আদি কবি গোরনাথ থেকে কবির, রহিম, সাইম্বো, সমদাট সুরী, সারংদার, নীলা সিং, গুরু নানক, ধর্মদাস, মালিক মুহাম্মদ জৈসী, সুন্দর দাস, রমা, কৃষ্ণ প্রমূখ হয়ে যদি আমরা ক্রমধারা গুলো আলোচনা করি তবে দেখবো ক্রমবিকাশটা সর্বদা-ই এগিয়েছে প্রথাকে একটু একটু সংস্কার করে। প্রথার বাইরে গিয়ে নয়। আবার এই ক্রমবিকাশের মধ্যেই উর্দু এবং হিন্দি ভাষার অস্তিত্ব। তেমনি যদি ইংলিশ সাহিত্যে উইলিয়াম ল্যাংল্যাগু থেকে জেফরি চসার, রুপার্ট ব্র“ক, জুলিয়ান গ্রেনফেল, এলিয়ট, পাউন্ড, ইয়েটস প্রমূখ পর্যন্ত ক্রমবিকাশটা দেখি তবে নতুনত্ব প্রচুর পাবো, কিন্তু কাউকে প্রথার বাইরে দাঁড় করানো যাবে না। এখন কথা হলো, যদি কেউ ইতিহাসের মধ্যখান থেকে কোন পর্ব বাদ দিয়ে আলোচনা করেন তবে তাঁর পাঠক বিভ্রান্ত হতে পারে, কিন্তু আলোচনাকে সত্য বলা যাবে না। ইতিহাসের একটা ক্রমবিকশের ঘটনা আছে। মধ্যখান থেকে একটা পর্ব বাদ দিলে আর ক্রমবিকাশের ধারাবাহিকতা থাকে না। প্রথার বাইরে থাকার কথা বলে কেউ কেউ আতলামী করেন। কিন্তু তা করেন মূলত ইতিহাসের অজ্ঞতার কারনে। সাহিত্যে যে বিভিন্ন যুগ আমরা দেখি তা কিন্তু রাতারাতি সৃষ্টি হয়নি। কবিতা কিংবা সাহিত্যে মূলত কোন যুগের অস্তিত্ব দিন-তারিখ দিয়ে পৃথক করা অসম্ভব। এটা গবেষকরা গবেষনা করে বের করেছেন একটু এদিক-সেদিক করে। কিন্তু আমরা যদি যুগগুলোর সাহিত্যকে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করি তবে দেখবো পরিবর্তনগুলো নদীর স্রোতের মতো একটা ধারাবাহিক নিয়মে হয়েছে এবং আগামীতেও হবে।
আমার লেখা পড়ে কারো মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, আমি প্রথা ভাঙার বিপক্ষে? না, আমি ভাঙার বিপক্ষে নয়। বরং আমি প্রথা ভেঙে নতুন কিছু করার পক্ষে। কিন্তু ভেঙে নতুন যা হচ্ছে তাও যে প্রথার বাইরে যাচ্ছে না। একটি বেতকে নীচ থেকে দেখলে যা, উপর থেকে দেখলেও তা। আবার এর উপর আপনি যতই রঙ দেন, তা বেত-ই থেকে যাবে। আপনি চেয়ার, টেবিল, বিছানা, আলমারি ইত্যাদি সবই বানাতে পারেন বেত দিয়ে, কিন্তু তা বেত-ই থেকে যাবে। আমরা এটাকে এক নামে বলি-বেতের মাল। তাই বলি প্রথা ভেঙে নতুন করে যা তৈরী হয় তা প্রথার ভেতরেই থাকে। প্রথার বাইরে মানুষ যায় না। দর্শনে একটা কথা আছে-যাওয়া বলে কিছু নেই, বরং ঘুরে ফিরে আসা। এই হলো মূল কথা। আমরা যদি জর্মান দার্শনিকদের ইতিহাস পড়ি তবে দেখবো হেগেলের পর একদল দার্শনিক তৈরী হলেন হেগেলকে অস্বীকার করে। তারা হেগেলকে মানেন না, মানবেন না। তারা হেগেল থেকে বেরিয়ে যাবেন। এই সময়ে হেগেল অচল। এই গ্র“পে স্বয়ং কার্ল মার্কসও ছিলেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য তারা হেগেলের বাইরে যেতে পরেননি। ইতিহাসে তারা নিউ হেগেলিয়ান নামে পরিচিত। কার্ল মার্কস খুব চিন্তক মানুষ ছিলেন, তিনি যখন দেখলেন হেগেলকে আস্বীকার করার নামে মূলত হেগেল চর্চাই হচ্ছে, তখন তিনি আবার স্বীকার করেনিলেন-হেগেলকে গুরু বলে। রবীন্দ্রনাথের প্রথা ভেঙেছেন নজরুল, কথাটা ঠিক। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ-নজরুল কেউ প্রথার বাইরে যেতে পারেননি। বলয় ভাঙা, প্রথা ভাঙা আর প্রথার বাইরে যাওয়া এক কথা নয়। এই নিয়ে কারো সন্দেহ থাকার কথা নয় যে, আমি প্রথা ভাঙার পক্ষে না বিপক্ষে। প্রথা যদি আমরা না ভাঙি তবে নতুন প্রথা সৃষ্টি হবে না। তাই আমাদেরকে প্রথা ভাঙতেই হবে। কিন্তু কেউ যখন প্রথা ভাঙাকে প্রথার বাইরে থাকা বলে ঘোষনা করেন তখন আমার আপত্তি দেখা দেয়। কারন, প্রথা ভেঙে প্রথা তৈরি করা যায়, কিন্তু প্রথার বাইরে একটি মূহুর্তও দাঁড়ানো যায় না। মানুষকে কোন না কোন প্রথায় থাকতে হয়। এটা মানুষের জন্মগত বাধ্যতামূলক বিষয়। এটা আদি থেকে আজ পর্যন্ত চলছে এবং চলবে অন্ত পর্যন্ত। মানুষ যখন তার মূর্খতার কারনে বুঝলো যে, ইতিহাস সে নিজে সৃষ্টি করছে তখনই এই প্রথার বাইরে দাঁড়িয়ে ইতিহাস সৃষ্টির স্বপ্ন তার ভেতরে মিসাইলের মতো দ্রুত চলতে থাকে। অথচ ইতিহাস কোনদিন মানুষ সৃষ্টি করতে পারে না। মূলত ইতিহাসই মানুষকে বাহন বানিয়ে সামনে এগিয়ে যায়। মানুষ মূলত ইতিহাসের উপাদান।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

