somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাংলাদেশে বাম-স্যাকুলার এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের রাজনৈতিক চিন্তা

১৭ ই জুলাই, ২০১০ সকাল ৮:২২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বাংলাদেশের বাম-স্যাকুলারদের রাজনীতি সর্বদাই অন্যদের ছত্রছায়ায় চলেছে। ১৯৪৭-এর পূর্বে তারা ছিলো কংগ্রেসের ছত্রছায়ায়, পাকিস্তান আন্দোলনে মুসলিমলীগের ছত্রছায়ায়, একাত্তরের পটভূমিতে ভারতের ছত্রছায়ায় মস্কোপন্থীরা আর পাকিস্তান সরকারের ছত্রছায়ায় চীনপন্থীরা, একাত্তরের পর তারা বঙ্গবন্ধুর ছত্রছায়ায় চলে আসেন, দীর্ঘদিন তারা আওয়ামীলীগের ছায়াসংগঠন হিসেবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। স্বৈরাচারী সামরিক শাসক আয়ূব খানের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম পাকিস্তানের উলামায়ে কেরামগণ আন্দোলন শুরু করলে বাম-স্যাকুলারদের একটা অংশ আয়ূব খানের সাথে দীর্ঘদিন সহযোগী হয়েছিলেন। আর বাকি অংশ মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর ছত্রছায়ায় এসে যান। উলামায়ে কেরাম আন্দোলনের ময়দান ছেড়ে গেলে বামরা মাওলানা ভাসানীকে সামনে রেখে ময়দান দখল করে নিলেন। কিন্তু যেহেতু মাওলানা ভাসানী স্যাকুলার কিংবা বাম ছিলেন না তাই ওরা সুবিধা করতে পারেননি। বাংলার রাজনীতির ইতিহাসে বামরা কোনোদিন স্বয়ংসম্পূর্ণ রাজনৈতিক আন্দোলন সৃষ্টি করতে পারেননি। তারা একেক সময় একেক জনের লেজুড় বৃত্তিতা করে বক্তৃতা-বিবৃতিতে ব্যক্তিগত নেতা হয়েছেন। অবশ্য প্রচারে-সাহিত্যে তাদের অবস্থান খুব দৃঢ় ছিলো। বাংলাদেশের বামরা স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছত্রছায়ায় এসে নিজেরা সাময়িক উপকৃত হলেও বঙ্গবন্ধু কোনোদিনই বাম কিংবা স্যাকুলার ছিলেন না। তাকে বাম এবং স্যাকুলার হিসেবে চিহ্নিত করতে বাংলাদেশে দু’টি গ্রুপের চক্রান্ত খুব জঘন্য রকমের।
এক. বামপন্থীরা বঙ্গবন্ধুকে বাম হিসেবে পরিচিত করতে খুব চেষ্টা করেছেন-বটবৃক্ষকে নিজেদের পক্ষে দেখানোর জন্য। নিজেদের তো কিছু করার সাধ্য নেই, তাই যিনি করে সফল হয়েছেন তাকে নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসতে পারলে খুব ভালো হয়-তাই এই চেষ্টা।
দুই. পাকিস্তান সরকার এবং তার সহচর রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসের লোকেরা এ কাজটা খুব শক্তভাবেই করেছেন। কারণ শেখ মুজিবুর রহমানকে ইসলামের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করতে না পারলে সাধারণ মানুষ রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসে যাবে না। স্বাধীনতার পর সাধারণ মানুষ যখন রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসদেরকে ধিক্কার দিতে শুরু করলো তখন আত্মরক্ষার্থে তারা শেখ মুজিবুর রহমানকে ইসলামের শত্রু হিসেবে প্রচার করতে লাগলেন। একাত্তরের রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসের প্রধান নেতা অধ্যাপক গোলাম আজম সাহেবসহ বাকিদের কাছে প্রশ্ন-আপনাদের তৎকালীন নেতা মদ্যপ ইয়াহিয়া এবং স্যাকুলার ভূট্টো থেকে কি উন্নত চরিত্রের অধিকারী শেখ মুজিব ছিলেন না? একটু নিরপেক্ষ এবং ঈমানদারীর সাথে বিবেচনা করে উত্তর দিন। শেখ মুজিবুর রহমানের চিন্তা-চেতনা ও চরিত্রে বাম কিংবা স্যাকুলারিজম আপনারা কোথায় দেখলেন? ইয়াহিয়া-ভূট্টো শুধু চরিত্রহীন স্যাকুলার নয়, নিয়মতান্ত্রিক মদ্যপও ছিলেন। জুলফিকার আলী ভূট্টো তো ঐ ব্যক্তি যিনি বিশ্বাস করতেন হযরত মোহাম্মদ (সা.) পৃথিবীর প্রথম কমিউনিস্ট। ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে তাঁর এক বক্তব্যে তিনি এ ঘোষণা দিলেন-পাকিস্তানের উলামায়ে কেরাম ভূট্টো সাহেবকে কাফের ফতোয়াও দিয়েছিলেন। পাকিস্তান জামাতে ইসলামির বড় নেতা ‘মাওলানা কাওসার নিয়াজী’ এই ফতোয়ার সমর্থনে একটি বইও তখন প্রকাশ করেছিলেন। পাকিস্তানের প্রতিটি মসজিদের জুম্মায় ভূট্টোকে কাফের ফতোয়া দিয়ে খতীবরা বক্তব্য রেখেছেন এবং একদিন কালো দিবসও পালিত হয়েছে। (নিউ ওয়ার্ল্ডওভার, ইসলাম আউর পাকিস্তান, অক্টোবর ১৯৯৮, পাকিস্তান-এ গ্রন্থের লেখক ভূট্টো সাহেবের দল পাকিস্তান পিপলস পার্র্র্র্র্টির নেতা তারেক ওয়াহীদ বাট)।
শেখ মুজিবুর রহমান এতো জঘন্য কথা কোনোদিন মুখে উচ্চারণ করেছেন বলে আমরা ইতিহাসে পাই না। জুলফিকার আলী ভূট্টোই তো প্রকৃতপক্ষে পাকিস্তান ভাঙার জন্য প্রধান দায়ী। ১৯৭০-এর নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের বিজয় হলে ভূট্টো সাহেব ঘোষণা করলেন-‘উধর তুম ইধর হাম’ অর্থাৎ ওখানে তুমি এখানে আমি। অতঃপর ঘোষণা দিলেন-‘যে পূর্ব-পাকিস্তানে এসম্বলিতে যাবে সে আর পশ্চিম-পাকিস্তানে ফিরে আসতে পারবে না, যদি আসে তবে তার পা ভেঙে দেওয়া হবে’।-(প্রাগুক্ত)
তাহলে পাকিস্তান ভাঙার জন্য গাদ্দার শেখ মুজিব, না ভূট্টো সাহেব এবং আপনারা কোন যুক্তিতে ইয়াহিয়া-ভূট্টোর পক্ষ নিলেন? ৭১-এর স্বাধীনতাপূর্ব শেখ মুজিবের ছাত্র রাজনীতি কিংবা জাতীয় রাজনৈতিক জীবনে স্যাকুলারিজম পেলেন কোথায়? শেখ মুজিবের রাজনীতি শুরু হয়েছিলো মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী, মাওলানা আতহার আলী, মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগিশ প্রমুখদের চিন্তা-চেতনায় পরিচালিত রাজনৈতিক আন্দোলনের কর্মী হিসেবে। মাওলানা আতহার আলী সাহেবের সাথে শেখ মুজিবুর রহমানের এতো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিলো যে, শেখ সাহেব তাঁকে দাদা ডাকতেন। আর মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরীর সংস্পর্শে তাঁর যাওয়া-আসা হতো প্রায়ই। তারা দুজন একই এলাকার লোক। মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী সেই সময়ে যেমন বড় আলেম ছিলেম তেমনি বিএ পাশ ছিলেন, ফলে স্কুল-মাদ্রাসার সকল শিক্ষিতের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ছিলো। একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর পূর্বেই মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরীর ইন্তেকাল হয়ে যায়। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি পাকিস্তানের সামরিক শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াই করে গেছেন।
সে যাই হোক, শেখ সাহেব তো কোনোদিনই বাম রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন না। স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁর অবস্থানটা যখন বটবৃক্ষের মতো হয়ে গেলো তখন বামরা দল বেঁধে তাঁর ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছিলেন। একাত্তরে তিনি পাকিস্তানের জেলে বন্দী থাকতেই তৎকালীন মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজ উদ্দিন, ড. কামাল হোসেন প্রমুখদের মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশের রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করেছিলো। কিন্তু শেখ সাহেব জেল থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশে ফেরার পর একদিন তাজ উদ্দিনকে ধমক দিয়ে বললেন-‘তাজ উদ্দিন ঐ বেটি (ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্ধিরা গান্ধী) যা বলেছে তুই চোখ বুজে মেনে নিলি, কী লিখেছে তা দেখে কি দস্তখত করেছিস? জিজ্ঞেসও করিস নাই কিসে দস্তখত দিচ্ছিস?’ (গিয়াস কামাল চৌধুরী, সাক্ষাৎকার, ইকরা-দ্বিতীয় সংখ্যা, মার্চ ২০০১, বার্মিংহাম, ইউকে)।
পূর্ব-পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়নের যুগ্মসম্পাদক এবং ‘বাংলাদেশ ফেডারেল ইউনিয়ন অব জার্নালিস্ট’-এর প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি, ভয়েস অফ আমেরিকার বাংলা বিভাগের সাবেক বাংলাদেশ প্রতিনিধি, গিয়াস কামাল চৌধুরীর মতে-‘বঙ্গবন্ধু ভারতের সাথে গোলাম-মুনিবের ন্যায় চুক্তির ব্যাপারে ক্ষুব্ধ ছিলেন বলেই শেষ পর্যন্ত ভারতের সাথে বাণিজ্য চুক্তি অগ্রসর হতে দেননি। ১৯৭৪ ইংরেজিতে ইন্ধিরা গান্ধীর বাংলাদেশ সফরকেও বঙ্গবন্ধু সুনজরে দেখেননি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন আমরা কোন ফাঁদে পা দিয়েছি’।
শেখ মুজিবুর রহমান স্যাকুলার এবং ভারতের দালাল না হওয়ার পক্ষে গিয়াস কামাল চৌধুরীর স্বাক্ষী এজন্যই গুরুত্বপূর্ণ, যেহেতু সাংবাদিক হিসেবে তিনি খুব কাছ থেকে শেখ সাহেবকে শুধু দেখেননি বরং ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে নির্মল সেন, আতাউস সামাদ এবং তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের বাকশাল নীতির বিরুদ্ধে সংগঠিত সাংবাদিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। শেখ সাহেব যে ইসলামদ্রোহী স্যাকুলার ছিলেন না তার বড় প্রমাণ-একাত্তরে রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসরা এতো অপকর্ম করার পরও তিনি শুধু ইসলাম এবং উলামায়ে কেরামদের শ্রদ্ধার্থে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে দিয়েছিলেন। খুলে দিয়েছিলেন বাম মুক্তিযোদ্ধাদেরকর্তৃক বন্ধ করে দেওয়া সকল মাদ্রাসা, মসজিদ এবং ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই জুলাই, ২০১০ সকাল ৯:০৪
১২টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×