যে নারী পেট-পিটের দায় সতীত্ব বিক্রি করে পতিতা হয় তাকে সমাজ ছিঃ বলে। হয়তো এই ঘৃণিত নারী তার বাঁচার সবগুলো সৎ পথে চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে একমুঠো নুন-ভাত, ঔষধ কিংবা বস্ত্র-বাসস্থানের জন্য এ পথে পা দিয়েছে, যা এই সমাজের অনেকেরই খবর নেই। তবুও আমরা তাকে ছিঃ বলছি। কেনো বলছি? সে দেহ বিক্রি করে বলে! দেহ বিক্রিটা কি খুবই খারাপ? আমরা সবাই নিশ্চয় বলবো, হ্যাঁ, অবশ্যই খারাপ। কিন্তু আমি যদি জিগ্যাস করি, যে সম্মানিত লোকটি টাকা-খ্যাতি-পদ-পদবীর জন্য স্বৈরাচার, পরাশক্তি, বিদেশি এজেন্ট, কালো টাকার মালিক, ভূমিখেকো প্রমূখদের কাছে নিজের সত্তা এবং বিবেক বিক্রি করে তার সাথে সমাজের ঘৃণিত ঐ পতিতা নারীর ব্যবধান কতটুক, তখন আপনার-আমার উত্তর কি? আমি যদি বলি কোনো ব্যবধান নেই, আপনি কি সহমত জানাবেন? হয়তো জানাবেন, হয়তো জানাবেন না। তা সবার নিজের সত্তা এবং বিবেকের স্বচ্ছতার বিষয়। আমরা সবাই জানি, সত্তার আভিধানিক অর্থ-অস্তিত্ব, স্থিতি, বিদ্যমানতা, সাধুতা, শ্রেষ্ঠত্ব। আর বিবেক-অন্তর্নিহিত সেই শক্তি যা দিয়ে মানুষ সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়, ভালোমন্দ বিবেচনা করতে পারে। যে নারী পেটের দায় বিবেকশূন্য হয়ে নিজের নারীত্বকে অসৎ লোকের কাছে বিক্রি করে; আপনি কি বলবেন তাঁর সৎ নারীসত্তা অবশিষ্ট্য আছে? আচ্ছা, যে লেখক-সাহিত্যিক-সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবী নিজ বিবেক আর মেধাকে টাকা কিংবা অন্য কিছুর বিনিময় অসৎ লোকের কাছে বিক্রি করে তাঁর সাথে এই পতিতা নারীর ব্যবধান কি? যদি ব্যবধান না থাকে তবে আমরা যখন একজনকে ছিঃ বলি তখন আরেকজনকে বলতে আপত্তি কোথায়? যে নারী তার কিংবা পরিবারের জীবন বাঁচাতে কোনো অসৎ পুরুষের সাথে যৌনতায় লিপ্ত হয়, তাকে তবু একবার ক্ষমা করা যায়, কিন্তু সেই লেখক-বুদ্ধিজীবী-সাংবাদিক কিংবা বিবেকবানদেরকে আমরা কি জন্য ক্ষমা করবো যারা বিলাসিতার তাগিদে অসৎ লোকের প্রসংশা করে বক্তব্য-বিবৃতী দেন, কবিতা-প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখেন? টাকার জন্য, পদের জন্য, পদবীর জন্য?! সামান্য এগুলোর জন্য বিবেকের বিক্রি! তা হলে ঐ পতিতা নারীর দোষ কি যে টাকার জন্য, অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-চিকিৎসার জন্য দেহ বিক্রি করে? আমি আজ অন্যদেরকে কিছু বলতে চাই না। বলতে চাই যারা শিল্প-নন্দন-সুন্দর চর্চার দাবী করে সাহিত্যের মতো পবিত্র কর্মে জড়িত থেকে প্রতিদিন বিরাট মূল্যহ্রাসে নিজের বিবেক বিক্রির হিড়িক লাগিয়েছেন, তাদেরকে। টাকার জন্য এই পবিত্র কর্ম ছাড়া আর কি কিছু তাদের করার ছিলো না? ঐ কালোবাজীরীর মতো তিনিও কেনো একটা কালো কর্মে জড়িয়ে প্রচুর টাকার মালিক হলেন না, যার প্রসংশা তিনি করছেন? বিশ্বাস করুন, এই বিবেক বিক্রেতা লেখকদেরকে দেখলে আমার কেনো জানি মনে হয় সেই পতিতা নারীদের কথা, যারা বোরখার মতো পবিত্র পোষাক পরে (সিলেটের মহামান্য ডিসির ভবনের সামনে-আদালত পাড়ায়-পুলিশ কমিশনারের প্রধান কার্যালয়ের সামনে-সিটি কর্পোরেশনের কার্যালয়ের সামনে) রাস্তায় দাঁড়িয়ে খদ্দের খুঁজে। আমরা যখন তারুণ্যে, তখন মাঝেমধ্যে সন্ধ্যার পর দলবদ্ধ হয়ে লাঠি হাতে ওদেরকে তাড়াতাম। কিন্তু এখন কেউ আসেনা পুলিশ আর র্যাবের ভয়ে। আমি স্বীকার করি, আইন নিজের হাতে উঠানো অনুচিৎ, কিন্তু আইন প্রয়োগকারীরা তো এক্ষেত্রে নাকে সরিষার তৈল দিয়ে আছেন। দিনদিনে বিষয়টি আরো বেরে যাচ্ছে। আমি একবার প্রতিবাদ করতে চেয়েছিলাম, বন্ধুরা বললেন-তুমি এসবে গেলে মিডিয়া কিংবা প্রশাসন তোমাকে আব্দুর রহমান-বাংলাভাই বানিয়ে স্তব্ধ করে দিবে। বন্ধুদের একথা যৌক্তিক মনে হলো। আমার যখন খুব ইচ্ছে করে বিবেক বিক্রেতা কবি-সাহিত্যিক-প্রাবন্ধিক-সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে বিবেক নিয়ে দাঁড়াতে তখন গুরুজনদের কেউ কেউ থামিয়ে রাখেন এই বলেÑতুমি এভাবে কথা বললে নিঃসঙ্গ হয়ে যাবে। ওদের সংখ্যা বেশি, ওরা তোমার কথাগুলোকে সাধারণভাবে নিবে না। হয়তো কেউ কেউ সুযোগ পেলে ক্ষতি করে দিবে। শ্রদ্ধাভাজন গুরুজনদের পায়ে হাত রেখে আমি বলতে চাইÑকাউকে না কাউকে তো এই কথাগুলো বলতে হবে। আপনি কিংবা আপনারা যখন নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে চাচ্ছেন, তখন আমার থেকেই বলা শুরু হোক। ওরা একদিন ক্ষুব্ধ হয়ে হয়তো আমাকে নিঃসঙ্গ করে দেবে। হয়তো অতি-ক্ষুব্ধতায় ওরা খুনি হয়ে আমাকেও সক্রেটিস, আবু হানিফা, ইমাম হাসান-হোসাইন, হুমায়ূন আজাদ প্রমূখের মতো হত্যা করবে; এইতো কথা। তবু আমাকে বলতে হবে, যদিও এই বলা হয় আমার জীবনের শেষ বলা। আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি আজকে যাদেরকে কষ্ট দিচ্ছি, তাদের সবার কাছে। না, মোটেও ভয়ে নয়। এই ক্ষমা শুধু তাদের প্রতি ভালোবাসা আছে বলে। আমার বিশ্বাস, আজকের এই কথাগুলো হয়তো তাদের বিবেককে জাগিয়ে দেবে। হয়তো তারা আজকের পর আর পতঙ্গপালের মতো কোথাও বিবেক বিক্রি কিংবা হত্যা করতে যাবেন না। হয়তো আজকের পর জাগ্রত বিবেক নিয়ে তারা আমাকে স্নেহ করবেন এজন্য যে, বিভ্রান্তির ঘুম থেকে জাগিয়েছি বলে। আর যদি মক্কার সেই আবু লাহাবের মতো তারা আকাশস্পর্শী অন্ধকারে ডুবে আমার দু’হাত ধ্বংসের প্রার্থনা করেন তখন অন্ধদের প্রতি করুণা দেখানো ছাড়া আর কিছু করার নেই। সময়ের আবুল হেকম যদি ইতিহাসে আবু জেহেলের মর্যাদা পায়, তবে আমি তো বিবেককে হত্যা করে তাকে সম্মান প্রদর্শন করতে পারি না। কেউ বলতে পারেন, তা আমার পাগলামী। এই পাগলামির নাম কি-কালিক মোহশূন্যতা নয়? আমি বিল্লিশাহ কিংবা মনসুর হেল্লাজের মতো সময়ের ঘরে পাগল হতে রাজি, তবু কালের কালো স্রোতে মাথা নতিয়ে ঝরতে রাজি নয়। আমি যা বলছি তা আমার বিশ্বাস-ঈমান, তা মোটেও অহংকার নয়। একখণ্ড অহম আমাকে কালের ঘরে ইমাম হোসেনের সন্তান হিসেবে ইয়াজিদের মুখোমুখি বিবেকসম্পন্ন করে রাখে প্রতিদিন। যারা গরীব মানুষের রক্তচুষে কিংবা দেশের সম্পদ লুঠে ধনের পাহাড় গড়ে, অতঃপর এই ধন থেকে দান করে দাতা হয়, তাদেরকে শ্রদ্ধা কিংবা সম্মান যদি কারো বিবেক করতে না পারে তবে কি তাকে অপরাধী বলা যাবে? আমি এই মানুষগুলোর স্বরূপ জানার পর তাদেরকে আর শ্রদ্ধা জানাতে পারছি না বলে দুঃখিত। এই কথাগুলোর জন্য কেউ আমাকে বাঁকাচোখে দেখলেও আমি তা হজম করে নেবো-
‘তবু কেনো ক্রমাগত খিড়কির পাশে ফেরিওলার হাক-ডাক
বিরাট মূল্যহ্রাস! বিরাট মূল্যহ্রাস! আত্মার বাজারে বিরাট মূল্যহ্রাস
আত্মা বিক্রির হিরিক পড়েছে
অথচ আমার ঘুম আসে না আতরের ঘ্রানে!
অতঃপর শ্বাসরুদ্ধকর বাতাসে জেগে থাকি সারারাত
আমি হয়তো কারো ভালোবাসার উপকরণ
কিংবা কারো বাঁকাচোখের গালি
সবই আতরের মতো হজম করি দেহ আর মনে’
( সৈয়দ মবনু, ঈর্ষাম্বিত অনাদর,আত্মার অনুবাদ, পৃ.২১)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



