বৈচিত্রে আমাদের বসতি। মানুষ, প্রকৃতি, পশু-পাখি সবই বিচিত্র। সবচাইতে বড় বিচিত্র মানুষের মন। এই মনে কতো রঙ, কতো ঢঙ, কতো কিছু খেলা করে। ভালোবাসা, ঘৃণা, হিংসা, অহংকার, অহম, স্বপ্ন সবই এই মনের খেলা। মানুষ স্বপ্ন দেখে এই মনে। স্বপ্ন মানুষের মনে অন্য একটি জগত তৈরি করে। স্বপ্ন দেখতে কেউ ভালোবাসে, কেউ করে ভয়। বেশিরভাগ মানুষের স্বপ্ন মঞ্জিলশূন্য, মনের রঙধনুতে। স্বপ্ন হয় বোধের, নির্বোধেরও। নির্বোধের স্বপ্ন থাকে ঘুমে, মঞ্জিলশূন্য, মনের রঙধনুতে। বোধের স্বপ্ন সবাই দেখে না। সবার মনে বোধ থাকে না। যাদের বোধ থাকে তারা অধীর হয় অন্য মনে বোধ জাগাতে। কৃষকের মতো তারা তৃষ্ণার্ত হয় আলোর চাষে। এই তৃষ্ণাবোধ তাদেরকে অধীর করে। অনেকের ক্ষেত্রে আবার তৃষ্ণাবোধটাই সমস্যা হয়ে যায়, তারা আর অন্ধকারের সাথে আপোষ করতে পারে না। যারা ঘুমে স্বপ্ন দেখেন তারা স্বপ্নে নয়, থাকেন অবচেতনে। বোধের স্বপ্ন হয় চেতনে, জাগরণে। চেতনার স্বপ্ন মানুষ দেখে জেগে, চোখ-কান খোলা রেখে। আদি থেকে মানবসমাজে চেতন আর অবচেতনের একটা দ্বন্দ্ব আছে। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে চেতন-অবচেতন মূলত মস্তিষ্কের খেলা। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, দেহ এবং মন নিয়ন্ত্রণ করে মস্তিষ্ক। মস্তিষ্ককে তারা বলেছেন মানবের দেহ ও মনের রাজধানী। এই মস্তিষ্কের আছে হাজারো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। বিজ্ঞানের ভিত্তি ও বিশ্লেষণ উভয়ই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠিত। কোন বিষয়ে বিজ্ঞান তার পদ্ধতি ব্যবহারে ব্যর্থ হলে তা আর সত্য বলে স্বীকার করে না, হোক এটা মহাসত্য। বিজ্ঞানীদের মতে, যা বাস্তবে পর্যবেক্ষণ সম্ভব নয়, তা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতেও নয়, হোক প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ। তবে অনেক কিছু প্রত্যক্ষ ইন্দ্রিয়ে অনুভব সম্ভব না হলেও যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পরোক্ষভাবে ধরা যায়। যেমন, এটমের গঠন, বৈদ্যুতিক-চৌম্বক শক্তি, এক্স-রে ইত্যাদি। বিজ্ঞান যে কোনো বিষয়ে উপযুক্ত পর্যবেক্ষণের পর তার সংজ্ঞা নির্ধারণ করে। বিজ্ঞানীদের সাথে সাধারণ মানুষের ব্যবধানÑ সাধারণ মানুষ যে কোনো বস্তু সাধারণভাবেই দেখেন, বিজ্ঞানী আর দার্শনিকরা পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি প্রশ্ন উত্থাপন করেনÑ এটি কী এবং কীভাবে? কেনো এবং কী উদ্দেশ্যে, তা বিজ্ঞানের কোনো বিষয় নয়। আমরা স্বপ্ন নিয়ে কথা বলছিলাম। স্বপ্ন নিয়েও বিজ্ঞানীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব আছে। আমরা বৈজ্ঞানিক দ্বন্দ্বে এখানে জড়াবো না, শুধু তাদের বক্তব্যকে মাথায় রাখলাম নিজেদের বক্তব্য সমর্থনে। আমাদের আলোচ্য বিষয় চিন্তার মুক্তি, যা চেতন-অবচেতনের স্বপ্নের সাথে সরাসরি জড়িত। এ দু স্বপ্নে রয়েছে বিজ্ঞানীদের দ্বন্দ্ব, যা নিয়ে আমরা ইতোমধ্যে আলোচনার সূত্রপাত করেছি। বিজ্ঞান ঘুমের স্বপ্নকে অবচেতন মনের বহির্প্রকাশ বলেছে। আর জাগ্রত স্বপ্নকে বলেছে মস্তিষ্কের সৃজন বা সচলতা। ঘুমের স্বপ্ন আমাদের আজকের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, জেগে থাকা মানুষের স্বপ্ন। যারা ঘুমে, স্বপ্ন দেখছেন কিংবা দেখছেন না, আমরা তাঁদেরকে জাগিয়ে স্বপ্ন দেখাতে চাই। কাউকে ঘুম থেকে জাগালে সে ঘুম ভাঙায় বিরক্তি কিংবা রাগ দেখাতে পারে। আরো মজার ব্যাপার, কেউ কেউ অবচেতনের স্বপ্নভঙ্গের মনোকষ্টে ক্ষুব্ধতা প্রকাশ করতে পারেন। তাতে চেতনাসম্পন্নদের কিছু আসে যায় না। গভীর অন্ধকার ডিঙিয়ে সুবেহ সাদেকে আলোর স্বপ্নে সে মুয়ায্যিনের মতো বলতেই থাকে- ‘আস্সালাতু খাইরুম মিনান-নাউম’ নামায ঘুম থেকে উত্তম। কিংবা সে প্রশ্ন করে- ‘রাত পোহাবার কতো দেরি, পাঞ্জেরী?’ কালিক কালোস্রোতে ডুবে থাকা মানুষগুলো বোধের স্বাপ্নিকদের করেন অবহেলা, উপেক্ষা, ঘৃণা, অপমান, সন্দেহ। নির্বোধরা সর্বদাই চেষ্টা করেন বোধসম্পন্নদেরকে তাড়িয়ে দিয়ে শুধু ঘুমের ভেতর অবচেতনের স্বপ্ন দেখতে। কারো কারো একবার ঘুম ভেঙে গেলে দ্বিতীয়বার আসে না। কেউ কেউ ঘুম থেকে জেগে দেখেন বেলা শেষ, আর অনেকে ঘুমে ঘুমে যান চলে অনন্তের পথে। বেলা শেষে যাদের ঘুম ভাঙলো, তারা তবু ওদের থেকে ভালো যাদের ঘুম কোনোদিন ভাঙেনি। কেউ কেউ গভীর রাতে হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে সাধকদের সফলতায় প্রলুব্ধ হয়ে বাইপাসে সফল হতে গিয়ে প্রচণ্ড হুচটে শূন্য হাত মাথায় রাখেন। অথচ দিনের আলোয় চেতনবোধের স্বাপ্নিকেরা তাঁদেরকে কতোবার জাগাতে চেষ্টা করেছেন। বলেছেন- সফল হতে সাধন চাই, জেগে ওঠো, সাধন করো। তখন তারা ওদেরকে লাল চোখ দেখিয়েছেন। তাদের ধারণা ছিলো, হাওয়ায় ফানুস উড়িয়ে আকাশের চাঁদ ধরে আনা খুব সহজ। তারা যদি আমার শৈশবে দেখা আবহাওয়া অফিসের সেই বিশাল এবং শক্তিশালী ফানুসের আকাশ-জমিনের মধ্যপথে ফেটে যাওয়ার দৃশ্য দেখতেন, তবে আর ফানুসে বসে আকাশের চাঁদ ধরার স্বপ্ন দেখতেন না। আমি কতো দেখেছি সেই ফানুস ফেটে যেতে, কতো দেখেছি মধ্যপথে অপরিকল্পিত মানুষকে ঝরে যেতে। পৃথিবীর মানুষের মনে আলো জাগানোর স্বপ্ন যাদের চেতনে-বোধে খেলা করে তারা রঙধনুর এই ফানুসে পৃথিবী আটকে গেলে তৃষ্ণার্ত হয়। তারা এই তৃষ্ণার কথা বলে ভাষায়, ছন্দে, বাক্যে, কাব্যে, শিল্পে, নন্দনে। তৃষ্ণার্ত প্রেমিকের কথা বাতাসে আবেগ সৃষ্টি করে। সেই আবেগ অনেকের হৃদয় স্পর্শ করে। এটা অনেকটা বেহালার মতো। বেহালায় স্পর্শ করলে সুর ওঠে, এই সুর মোহগ্রস্ত করে। তবে আবেগ আলোকিত হলে নির্বোধে জাগে বোধ, অবচেতনে আসে চেতন, মনে-মননে হয় উন্নয়ন। আর যদি এই আবেগ যায় অন্ধকারে, তবে নিয়ে আসতে পারে ধ্বংস, ক্ষয়, লয়।
আমরা জাতি হিসেবে স্বাধীনতার জন্য বেশ দীর্ঘ যুদ্ধ করলাম- পলাশি থেকে পল্টন, ১৭৫৭ থেকে ১৯৭১। সময় মোটেও কম নয়। প্রচুর রক্ত ও প্রাণ গিয়েছে এই যুদ্ধে। গিয়েছে মা-বোনদের ইজ্জত। বিনিময়ে আমরা কিছুই পাইনি, অকৃতজ্ঞের মতো তা বলবো না। কিন্তু ত্যাগানুসারে এগিয়ে যেতে পারিনি, এ সত্য। অথচ আমাদের পরে স্বাধীন হওয়া অনেক জাতিই আমাদের থেকে বেশি এগিয়ে গেলো। উদাহরণ হিসেবে মালয়েশিয়ার কথা বলতে পারি। আমরা কেনো তেমন পারিনি? এ প্রশ্নের উত্তর এখন আর খুব কঠিন নয় যদি কারো সামনে আমাদের স্বাধীনতা-উত্তর রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক অবস্থা স্পষ্ট থাকে। প্রকৃত অর্থে আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধ কোনো সুপরিকল্পিত আন্দোলন ছিলো না। পলাশির পর মীর কাসেমের নেতৃত্বে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিলো তারই ধারাবাহিকতায় দীর্ঘ বৃটিশবিরোধী আন্দোলন খণ্ড খণ্ডভাবে চলে ১৯৪৭ পর্যন্ত। ১৯৪০ থেকে ৪৭ পর্যন্ত বৃটিশবিরোধী আন্দোলন মোড় নেয় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গায়। এই আন্দোলনই ভারত বিভক্ত করে, যা ছিলো ইংরেজদের ‘বিভক্ত করে শাসন করো’ নীতির সফলতা। হিন্দুরা বলবেন- ভারত ভাঙায় মুসলমানরা দায়ী, আর মুসলমানরা বলবেন হিন্দু। মুসলিম লীগ বলবেন কংগ্রেস, আর কংগ্রেস বলবেন মুসলিম লীগ। আমরা ইতিহাসের এই দীর্ঘ আলোচনায় এখানে যাবো না। তবু যারা এ বিষয়ে আরো বেশি জানতে আগ্রহী তারা পড়তে পারেন আমার লেখা ‘দ্রাবিড় বাংলার রাজনীতি’, ‘লাহোর থেকে কান্দাহার’ কিংবা ‘সুকুতে মাশরিকি পাকিস্তান’ ইত্যাদি। আমরা কথা বলছি এদেশের সাধারণ মানুষের স্বপ্ন নিয়ে। প্রশ্ন হতে পারে, সাধারণ মানুষ কি কোনো স্বপ্ন দেখে? উত্তর কঠিন। আমাদের পর্যবেক্ষণ থেকে বলতে পারি, কেউ কেউ দেখলেও বেশিরভাগই দেখেন না। এখানে সব স্বপ্ন দেখেন নেতারা। নেতারা তাদের ব্যক্তিগত, পরিবারগত কিংবা দলগত স্বার্থে স্বপ্ন তৈরি করে তৃণমূল মানুষের কথা বলে তা বাস্তবায়নের জন্য কর্মসূচি দিয়ে নানা রঙে, নানা ঢঙে কথা বলেন। তাঁদের কথা শুনে আমরা সাধারণ মানুষের রক্তে কল্লোল সৃষ্টি হয়- অবচেতনে জাগে রঙের স্বপ্ন। এই স্বপ্নে আমরা হই তাদের সিঁড়ি। তারা এই সিঁড়ি দিয়ে হেঁটে দৌড়ে ক্ষমতার মালিক হয়ে আত্মপ্রবৃত্তির সেবা করেন। আমরা গাধার মতো মুলো দেখে দৌড়াই। তাঁরা খুব সুন্দর জাল ফেলে রাখেন আমাদের শিকার করতে। আমরা নৃত্যের তালে সেই জালে আটকা পড়ি উজানিয়া কৈ মাছের মতো। আমরা হচ্ছি তাঁদের সোয়ারি, সিঁড়ি, শিকার, কর্মী, প্রজা, গোলাম। তাঁরা আমাদের নেতা, জমিদার, প্রভু, মাই-বাপ সবকিছু। তাঁদের স্বপ্ন আছে- তাঁরা জিলেপির মতো স্বপ্ন দেখেন। আমাদের স্বপ্ন আছে কি না জানি না। তবে আমরা স্বপ্ন দেখছি না, দেখতে পারছি না, আমাদেরকে দেখতে দেয়া হচ্ছে না কিংবা আমাদের স্বপ্ন দেখার অধিকার নেই। আমরা তাঁদের পরিকল্পিত কিংবা অপরিকল্পিত স্বপ্ন তাঁদেরই চোখের ইশারায়, মুখের কথায়, অঙ্গুলিহেলনে নিজের মতো করে সাজাই কিংবা বাস্তবায়ন করতে বাধ্য হই। আমাদের চিত্তসত্তা প্রবঞ্চনায় ইতস্তত করে বিভিন্ন জালে আটকা পড়ছে। যে পণ্ডিতরা আমাদেরকে সঠিক পথ দেখাতে পারতেন তাঁদের বেশিরভাগই আত্মপ্রবৃত্তির সেবায় ভ্রমে হারিয়ে গেছেন, আটকে আছেন। তবে তাঁদের হারিয়ে যাওয়া আমাদের মতো না-বুঝে নয়, তারা সুখের নেশায় ঘুমে অথবা স্বার্থ চরিতার্থের ঘষ্টানোতে আছেন। সবকিছুর উর্ধে উঠে তারা মঙ্গলার্থক কিছু করতে পারছেন না। তাদের চিন্তা থেকে সাধারণ মানুষের কথা বেরিয়ে আসছে না। তাঁরা সাধারণ মানুষের কাছেও যান না, দূরে বসে বইয়ের পাতায় সাধারণ মানুষের চরিত্র পড়ে গবেষণা করে বাহ বাহ আর পুরস্কার লাভের চেষ্টায় উপর-পথে দৌড়াতে থাকেন। একেকজন গবেষকের ইন্তেকালের পর তাঁদের জীবনীগুলোতে পুরস্কার আর সম্মাননা লাভের তালিকা দেখলে খুব হাসতে ইচ্ছে করে। তাঁদের কেউ কেউ আবার কোন পুরস্কার তার পাওয়া উচিৎ ছিলো আরো আগে, তা নিয়ে যখন মনোকষ্ট প্রকাশ করেন তখন লজ্জাও যেনো লজ্জা পায় বিবেকের কাছে। অনেকে লবিং করেন পুরস্কার আর স্বীকৃতি লাভের লোভে। আর কতো লজ্জার কথা বলবো। যাদের চেতনশক্তি লুপ্ত, মনে অহম নেই, সেই চিন্তকেরা সারাক্ষণ চিন্তা করেন হয়তো নিজের কথা, নয়তো নিজের পরিবারের কথা কিংবা দল, নেতা, জমিদার, সরকার ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকার প্রভুদের স্বার্থের কথা। এই দেশ, মাটি, মানুষ নিয়ে তাদের অন্তরে তেমন ভাবনা আছে বলে কার্যত প্রমাণ মেলে না। যা প্রমাণ হয় সবই তাঁদের স্বার্থিক কারণ। নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির লক্ষ্যে তাঁরা আমাদেরও দৃষ্টিভ্রমের চেষ্টা করেন। তাঁরা পণ্ডিত, তাই আমরা কিছুটা হলেও বিভ্রান্ত হই তাঁদের প্রচেষ্টায়। তাঁরা আমাদেরকে না জাগিয়ে বরং দেশি-বিদেশি শাসক-শোষকদের স্বার্থে জাগ্রতদেরকে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করেন। বিনিময়ে লাভ করেন জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পুরস্কার। এই পুরস্কারগুলো সম্পর্কে মার্কস-এঙ্গেলস ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দে তাঁদের ‘কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার’-এ বলেছেন, ‘যেসব বৃত্তি এতোকাল সম্মানিত হয়ে ছিলো এবং মানুষ তাদের সশ্রদ্ধ বিস্ময়ের চোখে দেখতো, বুর্জোয়ারা তার প্রত্যেকটির মহিমা কেড়ে নিয়েছে। চিকিৎসক, আইনজীবী, পুরোহিত, কবি, বৈজ্ঞানিককে তারা তাদের ভাড়া-করা মজুরি শ্রমিকে পরিণত করেছে।’ মার্কস-এঙ্গেলসের এই কথাগুলো কি বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বাস্তব নয়? বাংলাদেশ পৃথিবীর মানচিত্রে এমন একটি অঞ্চল যাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে হাজারো সমস্যা। আজ আমাদের পণ্ডিতদের কাছে প্রশ্নÑ তাঁরা কি এই দেশ এবং জাতির সমস্যাগুলোকে ছানবিন করে কিছু সমাধানের দিকনির্দেশনা দিতে পেরেছেন? এটাতো তাঁদের কাজ ছিলো। কবি ইকবাল ভারতের মুসলমানদের অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-সামাজিক মুক্তির কথা ভেবেছেন, যা থেকে ভুল হোক শুদ্ধ হোক চৌধুরী রহমত আলী কর্তৃক পাকিস্তান শব্দের উৎপত্তি। অতঃপর জিন্না, সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা, ভাসানী, মুজিব প্রমূখরা বাস্তবায়িত করেছেন পাকিস্তান রাষ্ট্র। নেতৃত্বের ভুলে পাকিস্তান আত্মহত্যার পথে পা দিলো রাষ্ট্রভাষা বিতর্কে। রাষ্ট্রভাষার বিতর্ক তো পাকিস্তান জন্মের আগেই শুরু হয়ে গিয়েছিলো ভারতে। এ বিতর্কে বাংলার পক্ষ নিয়ে যুক্তি-তর্ক করেছেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী প্রমূখ পণ্ডিতেরা। অতঃপর পাকিস্তানে এসে তমদ্দুন মজলিসের চিন্তকেরা পাক-শাসকদের মুখোমুখি আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন; আর সালাম, বরকত, রফিক, জব্বাররা রক্ত দিয়ে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছেন। চিন্তক আবুল মনসুর আহমদ ছয় দফা প্রণয়ন করে দিলে শেখ মুজিবুর রহমান প্রমূখ তা বাস্তবায়নে কাজ করেছেন। এরপরই এসেছে একাত্তরের স্বাধীনতা। শুধু কি তাই? একাত্তরের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে জাতীয় কবি করলেন, তাতেও আবুল মনসুর আহমদের চিন্তার স্পর্শ আছে। আবুল মনসুর আহমদ তাঁর ‘বাংলাদেশের কালচার’ গ্রন্থে আমাদেরকে প্রচুর চিন্তার উপাদান দিয়েছেন। আবুল মনসুর আহমদের চিন্তার সাথে দ্বিমত থাকতে পারে, তবে তিনি যে একজন মুক্তচিন্তক ছিলেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আবুল মনসুর আহমদ প্রমূখদের দূরে রেখে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন এমন কিছু লোককে পাণ্ডিত্যের আসনে স্থান দিলেন যাঁরা মোসাহেবী ছাড়া আর কিছুতেই পাণ্ডিত্য দেখাতে জানতেন না, তখনই শুরু হয় এই রাষ্ট্রের সোয়াবারো। তোষামোদী পণ্ডিত আর রাজনীতিবিদরা বঙ্গবন্ধুকে ‘তেল’ দিতে দিতে ধ্বংস করে দিলেন। অতঃপর বিগত দিনগুলোতে আমাদের পোশাকি পণ্ডিতেরা প্রতিটি সরকারকে ‘তেলে’ ডুবিয়ে ধ্বংস করেন, বিনিময়ে তাঁরা সরকারি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা, সরকারি খরচে বিদেশ ভ্রমণ, ছোট-বড় বিভিন্ন সরকারি পুরস্কার ইত্যাদি লাভ করেন। এম্বেসীগুলো তাঁদেরকে মাঝেমধ্যে দাওয়াত করে টিপ্স দিলে তাঁরা ওদের স্বার্থেও পাণ্ডিত্যময় কথা বলেন। আমরা সবাইকে এক পাল্লায় বিবেচনা করে দেখছি না। তবে বেশিরভাগের অবস্থা তাই। যাঁরা ভিন্নমত প্রকাশ করেন তাঁদের মুখ বন্ধ করতে সরকার কিংবা বিদেশি এজেন্সিগুলো প্রথমে দালাল পণ্ডিতদেরকে স্বমতে নিয়ে আসে। এই পণ্ডিতেরা প্রথমে এমনভাবে বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে আলোচনা শুরু করেন যাতে জনরায় ওই ভিন্নমতের বিরুদ্ধে তৈরি হয়ে থাকে। অতঃপর যে কোনো ইস্যুতে থামিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা। সরকারের পক্ষে একজন ব্যক্তি কিংবা একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ইস্যু তৈরি করা কোনো বিষয়ই নয়। এভাবেই চলছে অনেকদিন থেকে আমাদের এই দেশ। অথচ পণ্ডিতদের উচিৎ ছিলো তারা রাষ্ট্র-পররাষ্ট্র বিষয়ক আলোচনা-পর্যালোচনায় পাণ্ডিত্য দেখাবেন। উন্নত পৃথিবীর ইতিহাস তাই বলে। আমাদের পণ্ডিতরা কেনো দল কিংবা ব্যক্তির চামচা হবেন? দল কিংবা দলের নেতা-নেত্রীর স্বার্থে কলমবাজী-গলাবাজী-রক্তারক্তি এসব তো কর্মীদের কাজ। ভাঁড় পণ্ডিতদেরকে একটা দলের প্রচারসম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া যায়, এর বেশি নয়। এর বেশি কিছু দিলে তাঁরা ব্যর্থতার পরিচয় দেবেন। অতীতে তাঁদের ব্যর্থতার কথা সাধারণ মানুষও জানে। মানুষ এখন বোঝে উনি-তিনি সবাই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। ওরা-তাঁরা সবাই ক্ষমতার মসনদে বসতে তৃণমূল মানুষের প্রেমকে নাট্যকর্মীদের মতো মঞ্চে উঠিয়ে চোখ দিয়ে কৃত্রিম জল ঝরাচ্ছেন। মানুষের কষ্টে পা রেখে তারা কৃত্রিম জল নিঃসরনে খুব দক্ষ। তাঁরা নিজের জন্য দেশ-জাতির স্বার্থকে দেশি কিংবা বিদেশি প্রভুদের চরণে উৎসর্গ করতে পারেন। বাংলাদেশের পণ্ডিতরা যেভাবে দলীয় রাজনীতিতে কিংবা অসৎ অর্থের মালিকদের গোলামীতে আবদ্ধ, তাতে জাতির আগামী নিয়ে খুব ভাবতে হয় এবং তাঁদের কার্যক্রম সাধারণ মানুষকেও লজ্জিত করে। এই পণ্ডিতদের প্রতি মাঝেমধ্যে করুণাও হয়। এই করুণা আরো বেশি হয় তাঁদের অন্ধকারে সাঁতার কাটতে দেখে। পণ্ডিতদের যাঁরা এখনো এই মানসে জাতীয় পর্যায়ে পরচর্চা, পরদ্বেষ, অনিষ্টকর কথা, ন্যাকামো, তোষামোদ ইত্যাদিতে জড়িত তাঁদের দ্রুত প্রত্যাবর্তন কাম্য। কারণ, এই বাংলাদেশ আমার-আপনার। আপনি-আমি এই বাংলাদেশের। এ দেশকে বাঁচানো আমাদের দায়িত্ব। মনে রাখতে হবে, এই বাংলাদেশকে শুধু বাঁচালেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যাবে না। এদেশকে বিশ্বের সাথে প্রতিযোগিতায় বিজয়ী করার চেষ্টা চালাতে হবে। এ স্বপ্ন নিয়েই আমাদের পথচলা।
আমাদের স্বপ্ন অবচেতনের নয়, চেতনের। অবচেতনের স্বপ্ন জাগলে হাওয়া হয়ে যায়। আমরা এমন স্বপ্ন দেখতে চাই যা সুপরিকল্পিত, সুচিন্তিত, চেতনাসম্পন্ন, জাগ্রত। আমাদেরকে এ স্বপ্ন দেখানোর দায়িত্ব ছিলো পণ্ডিতদের। বিগতদিনের হিসাব-নিকাশে দেখি বাংলাদেশের পরিচিত পণ্ডিতরা ব্যর্থ হয়েছেন নিজেরা স্বপ্ন দেখতে, আমাদেরকে দেখাতে। পণ্ডিতরা দেশ-জাতির স্বপ্ন বাস্তবায়নের পরিকল্পনা তৈরিতে পাণ্ডিত্য দেখাতে ব্যর্থ হওয়ায় আজ আমরা ব্যর্থ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা, চিকিৎসা সর্বক্ষেত্রে। আমাদের পণ্ডিতরা কেনো ব্যর্থ হলেন? এই প্রশ্নের উত্তর যদি আমরা নতুনেরা খুঁজে বের করতে না পারি তবে আগামী হাজার বছরেও এ জাতির উন্নয়ন অসম্ভব হয়ে থাকতে পারে। আমাদের দেশে অতীতে বিভিন্ন অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে অনেক আন্দোলন, সংগ্রাম, যুদ্ধ সংঘটিত হলেও চিন্তার মুক্তির জন্য এখানে পণ্ডিতেরা উদ্যোগ নিতে পারেননি। অথচ একাত্তরের স্বাধীনতার পর সুপরিকল্পিত জাতি গঠনে, উন্নয়নে চিন্তার মুক্তির একটি বিপ্লব আবশ্যক ছিলো।
আমরা কেনো মুক্তচিন্তার কথা বলছি?
আমরা কেনো মুক্তচিন্তার কথা বলছি? প্রশ্ন বটে। সহজ উত্তর- আমরা মুক্তি চাই, স্বাধীনতা চাই, আমরা হাসতে চাই প্রাণ খুলে, কাঁদতে চাই ইচ্ছেমতো। আমরা জানি, ব্যক্তি কিংবা রাষ্ট্রের মুক্তি ও স্বাধীনতার প্রথম শর্ত চিন্তার মুক্তি। তাই আমরা এদেশের স্থায়ী এবং প্রকৃত স্বাধীনতার জন্য প্রথমে চিন্তার মুক্তি চাই। আমরা চাই এমন স্বাধীন রাষ্ট্র যেখানে থাকবে নাগরিকের ব্যক্তিস্বাধীনতার মৌলিক এবং পূর্ণাঙ্গ অধিকার। আমরা গড়তে চাই এমন একদল চিন্তক যাঁরা এই রাষ্ট্রের প্রতি কিংবা এই রাষ্ট্রের মাটি আর মানুষের জন্য থাকবেন বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ। যদি কোনো অসূর অশুভ দৃষ্টি দেয়, তবে তাঁরা চিৎকার দিয়ে গোটা জাতিকে ঘুম থেকে জাগিয়ে প্রতিরোধ গড়বেন। এই দেশের স্বার্থ রক্ষার্থে তাঁরা গোটা জাতিকে জাগিয়ে রাখতে সচেষ্ট থাকবেন সারাক্ষণ। আমরা চাই এই দেশের সাধারণ মানুষের সেই স্বাধীনতার অধিকার, যাতে সুখে সে প্রাণ খুলে হাসতে এবং দুঃখের সময় চিৎকার দিয়ে ইচ্ছেমতো কাঁদতে পারে। এই যে ‘চাই’ তা-ও আমরা বাংলাদেশের সংবিধানের তৃতীয় ভাগের মৌলিক অধিকার অধ্যায়ের চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাকস্বাধীনতা শীর্ষক আইনের ৩৯ নং ধারার ১ উপধারায় চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দানের এবং ২ উপধারার ‘ক’-তে প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার যে কথা বলা হয়েছে সেই সাংবিধানিক অধিকার নিয়ে মুক্তভাবে বলতে চাই। আর চিন্তার মুক্তি ছাড়া মুক্তভাবে বলা, মুক্তভাবে চলা, মুক্তভাবে খাওয়া-দাওয়া-ঘুম কিছুই সম্ভব নয়। তাই আমরা মুক্তচিন্তার কথা বলছি। আমরা মনে করি, মঙ্গলাত্মক চিন্তার মুক্তির জন্য বাংলাদেশে এমন এক মুক্ত-স্বাধীন চিন্তক দলের প্রয়োজন যাঁদের জ্ঞানে, বুদ্ধিতে, কর্মে থাকবে দেশপ্রেম, মানবপ্রেম, প্রকৃতিপ্রেম। যাঁদের মধ্যে থাকবে না লোভ, উচ্চাকাক্সক্ষা, হিংসা-দ্বেষ, লৌকিকতা, অহংকার ইত্যাদি। মোটকথা, উন্মুক্তচিত্তে মানববুদ্ধি ও মানবকল্যাণের জন্য কাজ করার লোক তৈরিই মুক্তচিন্তার চিন্তকদের মূল লক্ষ্য। সাধারণত মানুষ হয় আবেগপ্রবণ। আবেগ নিয়ন্ত্রিত না হলে মানুষ ভুল করতেই পারে। আবেগপ্রবণ মানুষ মূর্খ হলে তার চারদিক থাকে অন্ধকার। তারা শাস্ত্রজ্ঞানীদের কথাকেই শাস্ত্র মনে করে চলে। শাস্ত্র আর শাস্ত্রজ্ঞানীর কথা সবসময় যে এক নয়, তা অনেকে বুঝতেও চেষ্টা করে না। এ কথা ধর্ম ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। শাস্ত্র বলতে আমরা শুধু বেদ-পুরাণ, কুরআন, বাইবেল ইত্যাদির কথা বলছি না; বলছি বিজ্ঞান, দর্শন, গণিত, চিকিৎসা, রাজনীতি, অর্থনীতি ইত্যাদিকেও। বর্তমান বাংলাদেশে যাঁরা শাস্ত্রজ্ঞানী বলে পরিচিত তাঁদের অনেকের কথায় স্পষ্ট যে, সমসাময়িক মানুষের সুখ-দুঃখ, ভাবনার খবর তাঁরা রাখেন না। আর যাঁরা রাখেন তাঁদের অনেকের চলমান সমাজের সমস্যাগুলোর প্রভেদজ্ঞান কিংবা সমস্যাগুলোর বিরুদ্ধে লড়বার উদ্যম নেই। এখানে আলেম-ওলামার অবস্থা যেমন, তেমনি পাশ্চাত্য-শিক্ষায় শিক্ষিতদের অবস্থাও। আলেমরা এখন বেশিরভাগই কুরআন-হাদীসের শুধু ‘মতন’ পড়েন এবং পড়ান। কুরআন-হাদীস এখন তাঁদের অনেকের কাছে খতমের বই। টাকা রুজির মাধ্যম। খতমে কুরআন, খতমে বোখারী আর তাবিজ ব্যবসায় তাঁরা এখন খুবই মশগুল। তাঁরা শুধু তাঁদের ব্যক্তিগত স্বার্থে বোখারী খতমের নামে কুরআনের গুরুত্বকে হ্রাস করে দিচ্ছেন সাধারণ মানুষের অন্তরে। কুরআন খতমের মজুরী তাঁরা নির্ধারণ করেছেন মাত্র এক/দুই হাজার টাকা, আর বোখারী খতমে দশ/বিশ হাজার টাকা। মানুষের অবস্থাও যেনো এমন যে তারা আর খতম পড়ায় না আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, তারা যেনো মানুষকে দেখাতে চায় কে কতমূল্যে খতম পড়িয়েছেন। এজন্য অবশ্যই দায়ী আমাদের আলেম-ওলামা। তাঁরা ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা বলেন, আর সমসাময়িক সাধারণ মানুষের সাথে ইসলামের প্রকৃত সম্পর্ক গড়তে সম্পূর্ণ গাফেল থাকেন। তাঁদের আলোচনায় ফাজায়েল আসে, মাসায়েল নয়। আর মাসায়েল এলেও তা একশো কিংবা পাঁচশো বছর আগের সমাজের প্রেক্ষিতে। ইসলামপন্থী দলগুলোর অবস্থা এখানে আরো করুণ। নেতারা যেনো মূর্খতার প্রতিযোগিতায় দৌড়াচ্ছেন। তাঁরা রাজপথ কাঁপিয়ে বলছেন, ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। কিন্তু উপস্থাপনায় আনতে পারেননি ইসলামী রাষ্ট্রের একটি পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা। তাঁরাও রাজনৈতিক মিথ্যাচার করেন, অপপ্রচার করেন অন্যান্য বাম ও ডান দলগুলোর মতো। সহজ করে বললে স্বীকার করতে হয়- এদেশে মার্কসবাদীরা যেমন সামাজিক জ্ঞানের অভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন তেমনি ইসলামপন্থীরাও। সবাইকে আমরা দেখেছি, শাস্ত্রীয় জ্ঞানে ক্ষমতাচর্চার রাজনীতি করে সাধারণ মানুষকে মুক্তির আবেগপ্রবণ স্বপ্ন দেখিয়েছেন, কিন্তু মুক্তির বাস্তবিক কোনো ফর্মূলায় আসতে পারেননি। এখানে মার্কসবাদীরা যেমন ব্যর্থ কার্ল মার্কসের মানুষ-মুক্তির আকুতি উপস্থাপনে, তেমনি ইসলামপন্থীরাও ব্যর্থ হয়েছেন হযরত মুহাম্মদ (স.) এর ‘রাহমাতুল্লিল আলামিন’র চরিত্র উপস্থাপন করতে। কার্ল মার্কসের প্রতি পূর্ণাঙ্গ সম্মান রেখে বলতে চাই, তিনি ছিলেন বই-পাঠের গবেষক, বাস্তব সমাজের অভিজ্ঞতা তাঁর তেমন একটা ছিলো না। তিনি লন্ডনের লাইব্রেরীতে বসে বই পড়ে পড়ে তত্ত্ব দিয়েছেন। এখানে হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর অবস্থা ভিন্ন। আজীবন তিনি ছিলেন মানুষের সুখ-দুঃখে, হাসি-কান্নায়, যুদ্ধে-সংগ্রামে খুব কাছাকাছি। পৃথিবীর অত্যন্ত জঘণ্য মানুষগুলো তাঁর চেষ্টা-সাধনায় জ্ঞানের পথে, আলোর পথে বিকশিত হয়েছিলেন। ভালোবাসা দিয়েছেন তিনি আত্মীয়, গরীব-মিসকিন, পাড়া-প্রতিবেশি, প্রকৃতি-পশু-পাখি ইত্যাদি সবদিকে। তাঁকে তৎকালীন সর্বোচ্চ ক্ষমতা কিংবা সর্বসুন্দরী নারী উপহার দিয়ে আদর্শচ্যূত করতে চাইলেও পারেনি মক্কার নেতা-কর্তারা। তিনি মানুষকে বুঝেছেন, বুঝাতে চেয়েছেন মানুষের কাছে গিয়ে। শাস্ত্রের কথা তিনি বুঝিয়েছেন মানুষের হৃদয়স্পর্শী কথা দিয়ে। আমরা যাকে হাদিস বলে জানি তা তো হযরত মুহাম্মদ (স.) কর্তৃক কুরআনের ব্যাখ্যা। এই ব্যাখ্যাকে আরো গতিশীল করেছেন সাহাবায়ে কিরাম। অতঃপর আল্লাহ, রাসুল ও সাহাবায়ে কিরামদের নীতি সামনে নিয়ে যুগে যুগে হয়েছে সময় ও সমাজানুসারে কুরআনের আরো ব্যাখ্যা, যাকে আমরা তাফসির বলি। তাফসির যে যুগে যেখানে হবে সেই যুগানুসারে সেখানকার সমস্যার আলোচনা তাতে থাকবে, এটাই নিয়ম। যাঁরা কুরআনে সবকিছু আছে বলে প্রতিদিন কথা বলেন তাঁরা নিজেরাও কোথায় কী আছে বলতে পারবেন না। তা ছাড়া কুরআন-হাদিসের সাথে বাংলার সমাজের সম্পর্ক কতোখানি, তাও আমরা অনেকে জানি না। বাংলাদেশের আলেমরা কুরআন-হাদিসের সাথে বাংলার সমাজকে বিশ্লেষণ করতে বিগত দিনে ব্যার্থতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁরা আমাদের রাষ্ট্র এবং সমাজের সমস্যাগুলোর কুরআনিক সমাধান দিতে পারেননি। পারেন নি হাদীসকে সমাজের কাছাকাছি নিয়ে যেতে। তাই দেখা যায় এই সমাজের মুসলমানরা ধর্ম মানলেও শাস্ত্রের ধর্ম জানেন না, মানেনও না। এখানে সবাই নিজের মনের মতো করে একটা সামাজিক ইসলাম তৈরি করে নিয়েছেন। বর্তমানে আবার ইসলাম হয়ে যাচ্ছে দলীয়। সব ইসলামী দলেরই নিজস্ব কিছু নোটবই আছে ইসলামের ব্যাখ্যা দিয়ে। এগুলো কর্মীদের জন্য পড়া বাধ্যতামূলক। পর্যবেক্ষণে দেখা যায় এই বইগুলো পড়ে বেশিরভাগ কর্মী চিন্তার বন্ধ্যাত্ব নিয়ে শুধু নিজেদেরকেই মুসলমান কিংবা খাঁটি মুসলমান মনে করে, বাকীরা গোমরাহ-পথভ্রষ্ট, কেউ কেউ তো ভিন্নমতের ইসলামিকদেরকে মুসলমানই বলতে রাজি না। তা ছাড়া আছে এখানে সামাজিক বা আচারগত ইসলাম। এই ইসলামে রয়েছে এমন প্রচুর ভুল-ভ্রান্তি, যা ক্ষেত্রবিশেষ ক্ষতিকরও। হিন্দু ধর্মের শাস্ত্রগুলো তো (তাদের ধর্মমতে) ঠাকুর ছাড়া সাধারণ হিন্দুদের পড়া পাপ। তাই সাধারণ হিন্দুরা এখানে ঠাকুরদের হুকুমে চলতে বাধ্য। আমি অনেক হিন্দু পরিবারের ওপর ঠাকুরদের নির্যাতনের চিত্রও খুব কাছে থেকে দেখেছি। হিন্দু ধর্মের বৈষম্য-নীতি আজও মানুষকে করে রেখেছে মুনিব-গোলাম। শাস্ত্রগুলোতে নারীদের অধিকার খুবই গৌণ। ভারতে শাস্ত্রের বিভিন্ন আইন পরিবর্তন করে নারীদেরকে কিছু অধিকার দিলেও বাংলাদেশের ঠাকুরেরা তাতেও ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। এখনও আমাদের হিন্দু মেয়েরা পিতার সম্পত্তিতে কোনো অংশ পায় না। একটা হিন্দু নারী মঙ্গলাচরণের পর মূলত পিতার ঘরের সকল অধিকার হারায়। সম্পত্তিতে সে স্বামীর ঘরে-পিতার ঘরে কোথাও কিছু পায় না। সে আজীবন থাকে অন্যের অনুগ্রহের ওপর নির্ভরশীল। ব্রাহ্মণ ছাড়া যেহেতু হিন্দু সমাজে আচার-ধর্ম চলে না, তাই তাঁরা ব্রাহ্মণদের কাছে জিম্মি থাকেন। আমি এমনও অনেক পরিবারের কথা জানি, মেয়ের সাথে ছেলে খারাপ সম্পর্ক গড়তে চায়, মা-বাপ জানেন, তবু কিছু বলছেন না এই ছেলে ব্রাহ্মণপুত্র বলে। অনেক মেয়ে অতিষ্ঠ হয়ে পরামর্শের জন্য এলে আমি রাজা রামমোহন রায়ের কথা তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিতাম। হিন্দু ধর্মে ব্রাহ্মসমাজ গড়ে রাজা রামমোহন রায় যে চিন্তার মুক্তি আন্দোলন শুরু করেছিলেন তা আমি তাদেরকে সবক দিতাম। এভাবে বেশকিছু হিন্দু ছেলে-মেয়ের চিন্তায় পরিবর্তন আনতে পেরেছি বলে মনে হয়। আমার মাঝেমধ্যে ভাবতে কষ্ট হয় শিক্ষিত হিন্দু ছেলে-মেয়েরা কেনো রাজা রামমোহন রায়ের চিন্তাকে আরো সামনে নিয়ে গেলো না। আমরা রবীন্দ্র-ভক্ত বলে নিজেদেরকে দাবি করি অথচ তিনি নিজেও ছিলেন রাজা রামমোহন রায়ের ব্রাহ্মসমাজের প্রচারক। আমরা কি বুঝতে পেরেছি রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গান, প্রবন্ধ আর গল্পের মর্মকথা। আমরা ঈশ্বরচন্দ্রকে বিদ্যাসাগর বলি, আমরা কি জানি তিনিও যে রাজা রামমোহন রায়ের ব্রাহ্মসমাজের প্রচারক ছিলেন। বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুও ছিলেন এই দলে। কিন্তু আমরা কি তাদের চিন্তাকে ধারণ করতে পেরেছি মুক্তমনে? মুসলমানেরা না-হয় তাদের সাহিত্য থেকে রস নিয়ে ক্লান্ত হলেন, হিন্দু শিক্ষিতরা কি এখান থেকে চিন্তা-আদর্শ নেওয়ার কথা ছিলো না! বর্তমান হিন্দু শিক্ষিতরাও চিন্তার বন্ধ্যাত্বে আছেন বলেই ব্রাহ্মণসমাজের ভয় কাটিয়ে রবীন্দ্রনাথ প্রমূখদের মতো রাজা রামমোহন রায়ের ব্রাহ্মসমাজের প্রচারক হতে পারছেন না। রাজা রামমোহন রায়ের পরে হিন্দু সমাজে আর এতো বড় মুক্তচিন্তক সংস্কারকের নাম আমরা দেখতে পাই না। আমাদের বিক্রমপুরের ছেলে অতীশ দীপঙ্কর তাঁর দর্শন দিয়ে গোটা তিব্বতের সভ্যতাকে গড়ে দিলো, কিন্তু আমরা তাকে ধারণ করতে পারলাম না। আমাদের বাংলার বৌদ্ধরা আর নতুন অতীশ দীপঙ্কর জন্ম দিতে পারলেন না। মোটকথা, সর্বত্রই চিন্তার বন্ধ্যাত্ব এক মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। যে যার ধর্ম পালন করবে, কিন্তু কমপক্ষে নিজের ধর্মগ্রন্থ পড়ার এবং বুঝার যোগ্যতা তো অর্জন করতে হবে। শাস্ত্রের পণ্ডিত মোল্লা-মৌলভী, ব্রাহ্মণ, পাদ্রী, রাব্বীকে মানুন, তাতে বাধা নেই, কিন্তু শাস্ত্রের সাথে ওদের সম্পর্ক কতটুকু তা দেখারও তো একটা বিষয় আছে। কমপক্ষে শিক্ষিত সমাজের কর্তব্য এটা। আমাদের রাষ্ট্রীয় আইনশাস্ত্রের অবস্থাও খুব ভালো নেই। সাধারণ মানুষ জানেই না এই শাস্ত্রের কোথায় কী আছে। এমনকী বেশিরভাগ রাজনীতিকরাও জানেন না এদেশের সংবিধানের ধারাগুলোর কথা। এদেশের স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসায় শুধু নোটের উপর আছে ছাত্র-শিক্ষকেরা। মুখস্থবিদ্যা আর অন্ধত্ব একই কথা। তাই আমরা বলি, যে শিক্ষার পদ্ধতি পরাধীনযুগে তৈরি, তা দিয়ে চিন্তার মুক্তি অসম্ভব। এদেশের স্বাধীনতাকে কার্যকর করতে, মানুষের দৈহিক ও মানসিক মুক্তি আনতে, উন্নয়নের জন্য প্রথমে শিক্ষা পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। আর এই শিক্ষাপদ্ধতির পরিবর্তন কখনও সম্ভব হবে না যদি এখানে চিন্তার মুক্তি অর্জিত না হয়। আমরা চিন্তার মুক্তির লক্ষ্যেই আজ মুক্তচিন্তার কথা বলছি।
মুক্তচিন্তা কী চায়
মুক্তচিন্তা কী চায়? সে চায় এমন এক চিন্তক গ্র“প, যারা নিয়ে আসবে চিন্তার মুক্তি, চিন্তার উন্নয়ন, এবং সমাজ গঠনের এমন সুপরিকল্পনা যা সুন্দর ও সুস্থ সমাজ নির্মাণে সাহায্য করবে। আমরা বলবো, এটাই মুক্তচিন্তার মূল লক্ষ্য। মুক্তচিন্তা কোনো রাজনৈতিক দল নয়, এখানে বেশি মানুষ থাকাটাও খুব জরুরি নয়। প্রয়োজন মাত্র এমন একজন চিন্তকের, যিনি আকাশ-সমুদ্র-বিশাল মাঠ ইত্যাদি মনের গভীরে দেখেন। মুক্তচিন্তা মূলত বাংলার মাটি আর মানুষ সংশ্লিষ্ট চিন্তকদের একটি মননশীল আন্দোলন। যাঁরাই বাংলাদেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, ধর্ম, রাজনীতি, সমাজ, প্রকৃতি ইত্যাদি নিয়ে কাজ করবেন তাঁরাই পাবেন মুক্তচিন্তার চিন্তকদের কাছ থেকে চিন্তার সঠিক উপাদান। চিন্তার জগতে মুক্তচিন্তা সকলের, সকলে মুক্তচিন্তার। প্রশ্ন আসতে পারে, চিন্তার মুক্তি বা উন্নতি জিনিসটা কী? আমরা বিজ্ঞানের ভাষায় বলবো, চিন্তা মানুষের নিজস্ব অভিজ্ঞতা এবং তা মস্তিষ্কের একটি বিষয়। আমরা জানি, প্রত্যেক প্রাণীর আছে দৈহিক এবং আত্মিক দুটি দিক, আছে অনেকগুলো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এগুলো নিয়ন্ত্রণ করে যে জিনিস তার নাম ‘মস্তিষ্ক’। স্নায়বিক-মানসিক ক্রিয়াগুলোর বাস্তবায়নের জন্য ধাপে ধাপে যে দীর্ঘ প্রক্রিয়া প্রয়োজন তা সম্পাদনে মস্তিষ্ক কেন্দ্রীয় অফিস হিসেবে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। বিজ্ঞানীরা বলেন, প্রায় এক সহস্রকোটি স্নায়ুকোষ (নিউরন) নিয়ে গঠিত এই মস্তিষ্ক। এতে আছে অসংখ্য যোগাযোগ পথ, অসংখ্য বিশ্লেষণ কেন্দ্র, একটি বিশাল স্মৃতিভাণ্ডার। স্নায়ুকোষগুলোর সামগ্রিক অবস্থান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, একটি মানুষের জীবনধারণ, আচরণ, অনুভূতি ও চিন্তাধারা, এককথায় তার সামগ্রিক অস্তিত্বের মূল কাঠামো নির্ধারণ করে এই স্নায়ুকোষগুলো। বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে আবিষ্কার করেছেন, মস্তিষ্কের একদিকে সংবেদী ইন্দ্রিয়াদি ও গ্রাহী যন্ত্রের সাহায্যে দেহের বিভিন্ন অংশও বহির্জগতের সাথে যুক্ত। অন্যদিক অন্যপথে বিভিন্ন দেহযন্ত্র ও গতিসঞ্চালক পেশি পর্যন্ত বিস্তৃত। কোনো না কোনো একটি পর্যায়ে, কোনো না কোনো পন্থায় স্নায়বিক অস্তিত্ব মানসিক অস্তিত্বে রূপান্তরিত হয়। কিন্তু কেউ যদি প্রশ্ন করে সেই পর্যায় এবং পন্থা কী? তখন আমাদের বলতে হবে, বিজ্ঞান এক্ষেত্রে এখনো নীরব, তাই আমরা আর কিছু বলতে গেলাম না। আমরা শুধু বলবো, মানসিকতার উন্নয়নটাই মূলত চিন্তার উন্নয়ন। জন্মকালে মানুষের মস্তিষ্কের অনেক শক্তি সুপ্ত ও সম্ভাবনাময় থাকে, এগুলো পরিপূর্ণ হলেই মানুষ ব্যক্তিত্বশীল হয়। ব্যক্তিত্বশীল মানুষ কোনো

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



