![]()
আপনারে লয়ে বিব্রত রহিত
আসে নাই কেহ অবনী `পরে
সকলের তরে সকলে আমরা
প্রত্যেকে মোরা পরের তরে।
মানব-জীবনের লক্ষ্য ও কর্মকান্ডের মূল লক্ষ্য কি হওয়া উচিৎ তা-ই আমরা জানতে পারি এই কাব্যাংশ থেকে; মানুষের এই জীবনের আলেখ্যের মূল রচিয়তা কবি কামিনী রায়। কীর্তনখোলা নদীর তীরে অবস্থিত পরাধীন ব্রিটিশ ভারতের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী অঞ্চল বঙ্গ প্রদেশস্থঃ চন্দ্রদ্বীপ; যা বর্তমানে বরিশাল নামে পরিচিত, অগ্নিযুগে ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন-সংগ্রামে এর অবদান অতুলনীয়। এ অঞ্চল থেকে আমরা পেয়েছি অসংখ্য জগৎ বিখ্যাত শিল্পী-সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, দার্শনিক ও রাজনীতিবিদ যাদের মধ্যে শিল্প-সাহিত্য ক্ষেত্রে “রূপসী বাংলার” কবি জীবনান্দ দাশের পরেই প্রধান হচ্ছেন কবি কামিনী রায়। তিনি একাধারে ছিলেন একজন কবি, সমাজকর্মী এবং নারীবাদী লেখিকা; তদুপরি তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের প্রথম মহিলা স্নাতক।
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়ঃ
কবি কামিনী রায় তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের চন্দ্রদীপ (বরিশাল জেলা)-এর অন্তর্গত বাকেরগঞ্জ মহুকুমার বাসন্ডা গ্রামে ১৮৬৪ সালের ১২ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম চন্ডীচরণ সেন এবং মাতার নাম বামাসুন্দরী দেবী; কামিনী রায় ছাড়াও তাদের আরেকটি কন্যা ও একটি পৃত্র সন্তান ছিলো। তার পিতা বৈচারিক পেশায় নিয়োজিত থাকলেও ব্রাহ্ম মতের একজন অন্যতম প্রধান ব্যক্তি ছিলেন এবং সাহিত্য ও সংস্কৃতি সেবী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ১৮৯৪ খ্রীস্টাব্দে কামিনী রায়ের সাথে সাথে কেদারনাথ রায়ের বিয়ে হয়। তাদের ৩ টি সন্তান জন্মায়। প্রথম সন্তানটি জন্মের কিছুদিনের মধ্যেই (১৯০০ সালের দিকে) মারা যায়, তার নাম জানা যায়-নি; অপর দুই সন্তানের নাম ছিলো লীলা রায় ও অশোকরঞ্জন রায়। ১৯০৩ সালে কামিনী রায়ের বোন কুসুম, ১৯০৬ সালে প্রথমে ভাই ও পরে বাবা মারা যায়। ১৯০৮ সালে তার স্বামী কেদারনাথ রায় ঘোড়ায় গাড়ী উল্টে গিয়ে আঘাত পেয় মারা যান এবং এর কয়েক বছরের মধ্যে তিনি সন্তান লীলা ও অশোককেও হারান। এভাবে মাত্র ৭ বছরের মধ্যে প্রায় সকল আপনজনকে হারিয়ে তিনি একেবারে নি:স্ব হয়ে ভেঙে পড়েন। এর এই ব্যঅথ্যাতুর হৃদয়ের প্রতিচ্ছবি আমরা তার রচনায় খুজে পাই।
শিক্ষা ও কর্মজীবনঃ
কামিনী রায়ের পড়াশুনার হাতেখড়ি তার পরিবারের মধ্যেই; বিশেষতঃ মায়ের কাছে। বাড়ীতেই তিনি বর্ণপরিচয় ১ম ও ২য় ভাগ এবং শিশুশিক্ষা শেষ করে ৯ বছর বয়সে স্কুলে ভর্তি হন এবং ঐ বছরই আপার প্রাইমারী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে প্রথম স্থান অর্জন করেন। এরপর ১৪ বছর বয়সে তিনি মাইনর পরীক্ষা দিয়ে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। কামিনী রায় ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বেথুন ফিমেল স্কুল হতে এন্ট্রান্স (মাধ্যমিক-এর সমমানের) পরীক্ষা ও ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে ফার্স্ট আর্টস (উচ্চ মাধ্যমিক-এর সমমানের) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এই বেথুন কলেজ হতে তিনি ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে ভারতের প্রথম নারী হিসেবে সংস্কৃত ভাষায় সম্মানসহ স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর তিনি বেথুন কলেজেই শিক্ষকতা শুরু করেন এবং পরবর্তীতে অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন।
সাহিত্য-রচনাঃ
কবি কামিনী রায় খুব অল্প বয়স থেকে সাহিত্য চর্চায় মনো নিবেশ করেন; মাত্র ৮ বছর বয়সে তিনি প্রথম কবিতা লিখেন। ১৮৮৯ সালে প্রকাশিত “আলো ও ছায়া” কামিনী রায়ের প্রথম কাব্য গ্রন্থ ; যার মাধ্যমে তিনি তৎকালীন পাঠক-সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হোন। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কাব্যের মধ্যে রয়েছে নির্মাল্য (১৮৯১), মাল্য ও নির্মাল্য (১৯১৩), দ্বীপ ও ধূপ (১৯২৯), মহাশ্বেতা, পুন্ডরীক।
শিশুদের জন্য লিখিত গ্রন্থসমূহ হচ্ছে পৌরাণিকী (১৮৯৭), গুঞ্জন (১৯০৫), বালিকা শিক্ষার আদর্শ (১৯১৮), ঠাকুরমার চিঠি (১৯২৪) প্রভৃতি।
তার অনুবাদ গ্রন্থের মধ্যে ধর্ম্মপুত্র (১৯০৭) সবিশেষ উল্লেখ যোগ্য।
সনেট জাতীয় কাব্যের মধ্যে রয়েছে অশোক সঙ্গীত (১৯১৪), জীবন পথে (১৯৩০)।
তাঁর চন্দ্রাতীরের জাগরণ নাট্যকাব্যটি বিশেষ জনপ্রিয় হয়েছিল; এবং তার লেখা অন্যান্য নাটকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে অম্বা (১৯১৫)।
স্বামী-সন্তান ও নিকটাত্মীয়দের অকাল-মৃত্যুর ফলে তার সাহিত্যের মধ্যে একধরণের ব্যাথ্যাতুর ও নৈসর্গপ্রিয়তার ভাব লক্ষ্যনীয়। ব্যক্তিগত বেদনা, দেশ প্রেম, জীবন চিন্তার নানাভাব বিভিন্ন রূপকল্পনা ও প্রতিমার মধ্য দিয়ে তাঁর কাব্যে নতুন রূপে প্রকাশ করেছেন; তার লেখায় মানবতাবোধ এবং নৈতিকতা প্রকাশই মূখ্য হয়ে দেখা দেয়। তবে ব্যক্তিগতভাবে তিনি রবীন্দ্র মন ও মানস দ্বারা প্রবলভাবে প্রভাবিত ছিলেন। আবার সংস্কৃত ভাষায় ব্যুৎপত্তি লাভের কারণে তার সাহিত্য-রচনাগুলো বিশেষভাবে সংস্কৃত অলংকরণ ও ভাবধারা দ্বারা প্রভাবিত।
নারী উন্নয়নেঃ
তৎকালীন সময়ে মেয়েদের শিক্ষাও বিরল ঘটনা ছিল, সেই সময়ে কামিনী রায় নারীবাদে বিশ্বাসী হয়ে উঠেছিলেন। লিখেছিলেন সকল অসঙ্গতির বিরুদ্ধে ও নারী জাগরণের পক্ষে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে; বিশেষতঃ করে নারী কল্যাণে তার অগ্রণী ভূমিকা ছিল। কামিনী রায় ভারতের প্রথম মহিলা অনার্স গ্র্যাজুয়েট এবং তিনি সব সময়ই শিক্ষানূধ্যায়ীদের ভালবাসতেন; উৎসাহ দিতেন, সহযোগীতা করতেন অন্য নারী সাহিত্যিকদের। তিনি ১৯২৩ এক সম্মেলণে বরিশাল আসলে কবি বেগম সুফিয়া কামালের সাথে পরিচিত হয়ে তাকে লেখা-লেখির বিষয়ে প্রবল উৎসাহ দেন এবং মনোনিবেশ করতে বলেন। তিনি ১৯২২-২৩ সালে নারী শ্রম তদন্ত কমিশনের সদস্য ছিলেন।
স্বীকৃতি ও সম্মনণাঃ
সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে নারী জাগরণে আসামান্য অবদান এবং তৎকালীন পশ্চাদপদ সমাজের মধ্যে থেকেও প্রথম স্নাতক সম্মান ডিগ্রী অর্জন করায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কবি কামিনী রায়ের স্মরণে ১৯২৯ সাল থেকে “জগত্তারিনী পুরস্কার” প্রবর্তন করেছে। তিনি ১৯৩০ সালে বঙ্গীয় লিটারারি কনফারেন্সের সভাপতি ও ১৯৩২-৩৩ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
মৃত্যুঃ
শেষজীবনে কবি কামিনী রায় ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্যের হাজারীবাগে বসবাস করতেন এবং ১৯৩৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর এখানেই তার জীবনাবসান ঘটে।
একটি কবিতাঃ
পাছে লোকে কিছু বলে
করিতে পারি না কাজ
সদা ভয় সদা লাজ
সংশয়ে সংকল্প সদা টলে-
পাছে লোকে কিছু বলে।
আড়ালে আড়ালে থাকি
নীরবে আপনা ঢাকি,
সম্মুখে চরণ নাহি চলে
পাছে লোকে কিছু বলে।
হৃদয়ে বুদবুদ মত
উঠে চিন্তা শুভ্র কত,
মিশে যায় হৃদয়ের তলে,
পাছে লোকে কিছু বলে।
কাঁদে প্রাণ যবে আঁখি
সযতনে শুকায়ে রাখি-
নিরমল নয়নের জলে,
পাছে লোকে কিছু বলে।
একটি স্নেহের কথা
প্রশমিতে পারে ব্যথা,-
চলে যাই উপেক্ষার ছলে,
পাছে লোকে কিছু বলে।
মহৎ উদ্দেশ্য যবে,
এক সাথে মিলে সবে,
পারি না মিলিতে সেই দলে,
পাছে লোকে কিছু বলে।
বিধাতা দেছেন প্রাণ
থাকি সদা ম্রিয়মাণ;
শক্তি মরে ভীতির কবলে,
পাছে লোকে কিছু বলে।
বাংলা কাব্যে নীতি-নৈতিকতার প্রসার ঘটে উনবিংশ শতাব্দীর শেষ ও বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে, যেখানে অন্যতম নারী সদস্য হিসেবে কবি কামিনী রায়কে আমরা নেতৃত্ব দিতে দেখি। আজ এই মহীয়সী নারীর মৃত্যু বার্ষিকীতে এক নারীর পক্ষ থেকে রইলো অপার শ্রদ্ধাঞ্জলি!
অঞ্জলি লহ মোর~ ~ ~
.
লেখার সূত্রঃ
উইকীপিডিয়ায়.
বাংলাপিডিয়ায়.
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০১১ রাত ১২:৩৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





