somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

তুমি কেমন আছো

১৭ ই নভেম্বর, ২০১১ বিকাল ৩:১৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

তালতলার ঐ পুকুর পাড় তো নিশ্চয়ই চেনেন ।হয়তো খেয়াল করেছেন এক বৃদ্ধা সেখানে বসে কিছু লিখছেন ,বাতাসের শরীরে আঁকা একটা চিঠি যা কিছুতেই শেষ করতে পারছেন না । আকাশে তাকিয়ে কিছু খোঁজেন ; চিঠির উত্তর আসার কি কথা ?ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধুসর চুলে ঘাসফুল গোঁজার চেষ্টা করেন তারপর এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে দক্ষিণে হাঁটতে থাকেন । ওদিকেই তাঁর বাড়ি , শান্ত পদক্ষেপে ৪০ বছরের শীত বর্ষা এভাবেই পার হয়ে গেছে,আরও হয়তো যাবে অনেকদিন ।


শেফালী , ফুলের নামের মেয়েটির বয়স কতই বা হবে ?টেনেটুনে ১৫ই । ডানপিটে উচ্ছলতায় মাতিয়ে রাখতো বসন্তপুর গ্রাম ,সকালে এর গাছের আম তো বিকেলে মতির মায়ের মুরগী । মা হারা মেয়েটির এই যন্ত্রণা সবাই মেনেই নিতো । মতির মা অবশ্য মাঝে মাঝে ঝাড়ু হাতে তাড়া করতো ,তাতে কিছু আসতো যেতো বলে মনে হয় না পাড়ার ছেলেপুলেদের মধ্যমণি শেফালী বুবুর । বাবার শেফু !আর একজনের কাছে সে শেফালী ফুল ,কখনো শুধুই ফুল ! হাসান ,উত্তর পাড়ার মিয়া বাড়ির ছেলে ।


ফুলের নামে নাম বলেই কি মেয়েটা ফুল এতো ভালোবাসতো ? হিজলের নাকফুল ,সরিষা ফুলের মালা , বেত ফুলের দুল আর খোঁপায় কচুরি ফুল ,এই ছিলো তাঁর বায়না । হাসানকে নাকি এসব দিতেই হবে নইলে সে বউ হবে না সাফ জানিয়েছে ।

হাসান বলতো , তুমি তো নিজেই ফুল । তোমায় বরং হীরের গয়নায় সাজাবো ।



হাসান যখন যুদ্ধে গেলো শেফালী একটুও কাঁদেনি শুধু হাসানের হাত ধরে বলেছিলো ,সাবধানে থেকো ।

প্রতিরাতেই একটা করে চিঠি লিখতো হাসানকে ।

একটি মাত্র কথাই বারবার বারবার - তুমি কেমন আছো ? তুমি কেমন আছো ?

কখনো সে চিঠি পায়নি হাসান । কাকে দিয়ে পাঠাবে শেফালী ? তবুও আকাশে তাকিয়ে সে উত্তর খুঁজতো , নক্ষত্রের কাছে জানতে চাইতো , কেমন আছে মানুষটা , বেঁচে আছে তো ?


যে প্রশ্নের উত্তর শেফালী নিজেই জানে না তা কেমন করে বলবে ? ফর্সা চেহারার মেজর কিছুতেই মানতে রাজি নয় সে কথা । রাজাকার ইদ্রিস ওকে ধরে এনে মেজরের হাতে দিয়ে বলেছিলো , হাসান কোথায় আছে কেউ না জানলেও শেফালী জানে । ওই লোকটাকে সে চাচা ডাকতো । ইদ্রিস চাচা ! তিন মাস ! না ত্রিশ মাস ! জানেনা শেফালী । প্রতিরাতেই সে মরে যেতো , বারবার । বারবার । মেজর রাকিব , ক্যাপ্টেন ইমরান বা নাম না জানা অন্য কেউ ।

মৃত্যু সাথে নিয়ে আসতো ওরা ।

লাল সবুজ পতাকা হাতে অনেকের সাথে ফিরে এসেছিলো হাসানরাও ।শেফালী ফুল ফিরে না আসলেও এক ক্লান্ত মৃতদেহ ফিরে এসেছিলো বসন্তপুর গ্রামে আরও একটি অস্তিত্ব সাথে নিয়ে । অন্য সবার মতো বীর মুক্তিযোদ্ধা হাসানের কাছে তো সে মৃতই তখন । অংক শিক্ষক পিতা জীবনের সরল অংকগুলো কিছুতেই মেলাতে পারেন না । তাঁর বড় আদরের শেফু আজ এক দীর্ঘশ্বাস ! এক পূর্ণিমায় শিশুটি একরকম জোর করেই চলে এলো পৃথিবীতে । সে জানে না তার জন্য কেউ অপেক্ষায় নেই !


অবাধ্য ছেলেপুলেরা শেফালী বুবুকে এখন আর ভালোবাসেনা ,ওরা ঢিল ছোঁড়ে এক পাগলীকে । যে তালতলার পুকুর পাড়ে বসে অদৃশ্য চিঠি লেখে ।এই পুকুর পাড়েই কেউ তাকে একদিন হীরের গয়নায় সাজাতে চেয়েছিলো । মাকে বাঁচাতে দুহাত আগলে সামনে দাঁড়ানো শিশুটি একটা কথাই ভাবে - যেভাবেই হোক মাকে রক্ষা করতে হবে । মা যদিও তাকে তখন শত্রুপক্ষই ভাবেন । মা সবসময় এমন থাকেন না তো ,মাঝে মাঝে কতো আদর করেন !এক রাজকন্যার গল্প শোনান , রাজকন্যা কি করতো , কেমন দেখতে ছিলো এগুলো তো মা ই ওকে বলেছেন । বুদ্ধিমান শিশুটি জানে রাজকন্যার নাম শেফালী । রাজকন্যার গল্প করার সময় মা অনেক হাসতেন , শুধু রাজপুত্রের নাম জানতে চাইলেই কেমন বদলে যেতো তার চেহারা !

খুব রেগে গিয়ে বলতেন - যা !যা ! সব শকুনের দল ! আমায় ছিঁড়ে খেতে চাস ?


সেই শিশুটি আজ ৩৯ বছরের এক মানুষ । এক মমতাময়ী মা ,একজন সফল চিকিৎসক । এখন আর কেউ তাকে এড়িয়ে চলে না । জারজ বলে না । বরং সমীহ করে । গ্রামের মানুষ বলে , শেফালীর মেয়েটা বসন্তপুরের গর্ব । এতো বড় ডাক্তার ! সে কিনা গ্রামেই ফিরে এলো ! ওরা জানে না সে তার কথা রেখেছে । সে তার মায়ের কাছে এসেছে । ছোট্ট বেলার মতো মাকে সে আগলে রাখবে সব বিপদ থেকে । যুদ্ধে যার জন্ম সে কেমন করে মাকে ভুলে থাকবে ।


মাকে এখন কেউ ঢিল ছোঁড়ে না । কেউ পাগলী বলে না । মা এখন নিয়মিত তালতলার পুকুর পাড়ে বসে বাতাসের শরীরে চিঠি লেখেন , সেই একটি বাক্য - তুমি কেমন আছো ? নাকি অন্য কিছু ? আমি , তোমাদের এখনকার ভাষায় বলা সেই যুদ্ধ শিশুটি গভীর মমতায় সেদিকে তাকিয়ে থাকি । আমার মা ! রাজকন্যা শেফালী !

১৭/১১/২০১১
৭টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আমি ক্রিকেটার বলে বেঁচে গেলাম” — নাঈম হাসানের কান্না এবং সাধারণ মানুষের প্রশ্ন

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ১৩ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:১৯

একজন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার মাঝরাতে বিমানবন্দর থেকে বাসায় ফিরছিলেন। জাতীয় দলের জার্সি পরে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন, আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন, অসংখ্য মানুষ তাকে চেনে। অথচ কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে নিজের পরিচয় প্রমাণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্রাজিলের ম্যাচগুলো কবে কখন কোথায় এবং কার সঙ্গে?

লিখেছেন শিমুল মামুন, ১৩ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:১৪


একনজরে ব্রাজিলের গ্রুপ পর্বের ফিক্সচার (Brazils Group Stage Fixtures at a Glance)
প্রথম ম্যাচ (প্রতিপক্ষ মরক্কো): ১৪ জুন ২০২৬। বাংলাদেশ সময় ভোর ৪টায় নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে এই... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১

কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাগরিকের অপমান ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির সংকট: ক্রিকেটার নাঈম হাসানের ঘটনা

লিখেছেন নতুন নকিব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪০

নাগরিকের অপমান ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির সংকট: ক্রিকেটার নাঈম হাসানের ঘটনা

ক্রিকেটার নাঈম হাসানের ছবিটি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

ক্রিকেটার নাঈম হাসানের সঙ্গে পুলিশের আচরণ নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে, তা কোনো বিচ্ছিন্ন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×