তালতলার ঐ পুকুর পাড় তো নিশ্চয়ই চেনেন ।হয়তো খেয়াল করেছেন এক বৃদ্ধা সেখানে বসে কিছু লিখছেন ,বাতাসের শরীরে আঁকা একটা চিঠি যা কিছুতেই শেষ করতে পারছেন না । আকাশে তাকিয়ে কিছু খোঁজেন ; চিঠির উত্তর আসার কি কথা ?ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধুসর চুলে ঘাসফুল গোঁজার চেষ্টা করেন তারপর এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে দক্ষিণে হাঁটতে থাকেন । ওদিকেই তাঁর বাড়ি , শান্ত পদক্ষেপে ৪০ বছরের শীত বর্ষা এভাবেই পার হয়ে গেছে,আরও হয়তো যাবে অনেকদিন ।
শেফালী , ফুলের নামের মেয়েটির বয়স কতই বা হবে ?টেনেটুনে ১৫ই । ডানপিটে উচ্ছলতায় মাতিয়ে রাখতো বসন্তপুর গ্রাম ,সকালে এর গাছের আম তো বিকেলে মতির মায়ের মুরগী । মা হারা মেয়েটির এই যন্ত্রণা সবাই মেনেই নিতো । মতির মা অবশ্য মাঝে মাঝে ঝাড়ু হাতে তাড়া করতো ,তাতে কিছু আসতো যেতো বলে মনে হয় না পাড়ার ছেলেপুলেদের মধ্যমণি শেফালী বুবুর । বাবার শেফু !আর একজনের কাছে সে শেফালী ফুল ,কখনো শুধুই ফুল ! হাসান ,উত্তর পাড়ার মিয়া বাড়ির ছেলে ।
ফুলের নামে নাম বলেই কি মেয়েটা ফুল এতো ভালোবাসতো ? হিজলের নাকফুল ,সরিষা ফুলের মালা , বেত ফুলের দুল আর খোঁপায় কচুরি ফুল ,এই ছিলো তাঁর বায়না । হাসানকে নাকি এসব দিতেই হবে নইলে সে বউ হবে না সাফ জানিয়েছে ।
হাসান বলতো , তুমি তো নিজেই ফুল । তোমায় বরং হীরের গয়নায় সাজাবো ।
হাসান যখন যুদ্ধে গেলো শেফালী একটুও কাঁদেনি শুধু হাসানের হাত ধরে বলেছিলো ,সাবধানে থেকো ।
প্রতিরাতেই একটা করে চিঠি লিখতো হাসানকে ।
একটি মাত্র কথাই বারবার বারবার - তুমি কেমন আছো ? তুমি কেমন আছো ?
কখনো সে চিঠি পায়নি হাসান । কাকে দিয়ে পাঠাবে শেফালী ? তবুও আকাশে তাকিয়ে সে উত্তর খুঁজতো , নক্ষত্রের কাছে জানতে চাইতো , কেমন আছে মানুষটা , বেঁচে আছে তো ?
যে প্রশ্নের উত্তর শেফালী নিজেই জানে না তা কেমন করে বলবে ? ফর্সা চেহারার মেজর কিছুতেই মানতে রাজি নয় সে কথা । রাজাকার ইদ্রিস ওকে ধরে এনে মেজরের হাতে দিয়ে বলেছিলো , হাসান কোথায় আছে কেউ না জানলেও শেফালী জানে । ওই লোকটাকে সে চাচা ডাকতো । ইদ্রিস চাচা ! তিন মাস ! না ত্রিশ মাস ! জানেনা শেফালী । প্রতিরাতেই সে মরে যেতো , বারবার । বারবার । মেজর রাকিব , ক্যাপ্টেন ইমরান বা নাম না জানা অন্য কেউ ।
মৃত্যু সাথে নিয়ে আসতো ওরা ।
লাল সবুজ পতাকা হাতে অনেকের সাথে ফিরে এসেছিলো হাসানরাও ।শেফালী ফুল ফিরে না আসলেও এক ক্লান্ত মৃতদেহ ফিরে এসেছিলো বসন্তপুর গ্রামে আরও একটি অস্তিত্ব সাথে নিয়ে । অন্য সবার মতো বীর মুক্তিযোদ্ধা হাসানের কাছে তো সে মৃতই তখন । অংক শিক্ষক পিতা জীবনের সরল অংকগুলো কিছুতেই মেলাতে পারেন না । তাঁর বড় আদরের শেফু আজ এক দীর্ঘশ্বাস ! এক পূর্ণিমায় শিশুটি একরকম জোর করেই চলে এলো পৃথিবীতে । সে জানে না তার জন্য কেউ অপেক্ষায় নেই !
অবাধ্য ছেলেপুলেরা শেফালী বুবুকে এখন আর ভালোবাসেনা ,ওরা ঢিল ছোঁড়ে এক পাগলীকে । যে তালতলার পুকুর পাড়ে বসে অদৃশ্য চিঠি লেখে ।এই পুকুর পাড়েই কেউ তাকে একদিন হীরের গয়নায় সাজাতে চেয়েছিলো । মাকে বাঁচাতে দুহাত আগলে সামনে দাঁড়ানো শিশুটি একটা কথাই ভাবে - যেভাবেই হোক মাকে রক্ষা করতে হবে । মা যদিও তাকে তখন শত্রুপক্ষই ভাবেন । মা সবসময় এমন থাকেন না তো ,মাঝে মাঝে কতো আদর করেন !এক রাজকন্যার গল্প শোনান , রাজকন্যা কি করতো , কেমন দেখতে ছিলো এগুলো তো মা ই ওকে বলেছেন । বুদ্ধিমান শিশুটি জানে রাজকন্যার নাম শেফালী । রাজকন্যার গল্প করার সময় মা অনেক হাসতেন , শুধু রাজপুত্রের নাম জানতে চাইলেই কেমন বদলে যেতো তার চেহারা !
খুব রেগে গিয়ে বলতেন - যা !যা ! সব শকুনের দল ! আমায় ছিঁড়ে খেতে চাস ?
সেই শিশুটি আজ ৩৯ বছরের এক মানুষ । এক মমতাময়ী মা ,একজন সফল চিকিৎসক । এখন আর কেউ তাকে এড়িয়ে চলে না । জারজ বলে না । বরং সমীহ করে । গ্রামের মানুষ বলে , শেফালীর মেয়েটা বসন্তপুরের গর্ব । এতো বড় ডাক্তার ! সে কিনা গ্রামেই ফিরে এলো ! ওরা জানে না সে তার কথা রেখেছে । সে তার মায়ের কাছে এসেছে । ছোট্ট বেলার মতো মাকে সে আগলে রাখবে সব বিপদ থেকে । যুদ্ধে যার জন্ম সে কেমন করে মাকে ভুলে থাকবে ।
মাকে এখন কেউ ঢিল ছোঁড়ে না । কেউ পাগলী বলে না । মা এখন নিয়মিত তালতলার পুকুর পাড়ে বসে বাতাসের শরীরে চিঠি লেখেন , সেই একটি বাক্য - তুমি কেমন আছো ? নাকি অন্য কিছু ? আমি , তোমাদের এখনকার ভাষায় বলা সেই যুদ্ধ শিশুটি গভীর মমতায় সেদিকে তাকিয়ে থাকি । আমার মা ! রাজকন্যা শেফালী !
১৭/১১/২০১১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


