এক:
এই রিকশা যাবি...এই রিকশা যাবে...এই রিকশা যাবেন? অনেকক্ষণ দাড়িয়ে আছি কাটাঁবনের মোড়ে। আমার অবাক লাগে রিকশা ওয়ালারা এত ভাল অংক কোথায় শিখলো? বাসের ভাড়া বৃদ্ধির সংগে দ্বিগুন অনুপাতে তারাও ভাড়া বাড়িয়েছে। কাটাবন থেকে প্রেসক্লাব- কেউ যেতে রাজি নয়। দুএকজন রাজী হলেও ভাড়া হাকছে ৪০ টাকা। অথচ এটা আমার রিকশা ভ্রমনের প্রিয় একটি পথ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর দিয়ে কলা ভবন ছুয়ে কার্জন হলের সামনে দিয়ে প্রেসক্লাব। অন্য সময় রিকশা জোড়ে চালাতে তাগাদা দিলেও এ পথে আমি কখনো এসব করিনি। আজও যখন ৩০ টাকা ভাড়ায় এক ভাবুক টাইপের রিকশাওয়ালা প্রেসক্লাব যেতে রাজি হয়ে আয়েশী ভংগিতে প্যাডেল মারতে শুরু করেছে, পাঁচটাকা বেশি দেয়ার বেদনা মিলিয়ে গিয়ে একটা সুখের আবেশে আম্ওি হারিয়ে গেলাম পাঁচটি বছর আগেকার সময়ে। রিকশা ওয়ালার মুখে কেমন জানি সুরের স্কেলটা ওঠা নামা করছে। উহো হোহো হোহো হোহো হো।
দুই:
ঢাকায় ইদানিং বৃষ্টি হচ্ছে। সকালেও মুসলধরে বৃষ্টি হয়েছিল। আকাশের বুকে ব্যাথার আলামত স্পষ্ট। মেঘেরা আবার একজোট হয়েছে। ঠান্ডা বাতাসের আগাম বার্তায় আকাশের বুক ভারি হয়ে ওঠেছে। নীলক্ষেত মোড় হয়ে এই মাত্র রিকশাটা আমাকে নিয়ে গেছে প্রিয় ক্যাম্পাসে। আমার ভাবুক রিকশাওয়ালার সুরটা এবার কথার বিদ্যুতে ঝলসে উঠেছে। আষাঢ় মাইসা ভাসা পানিরে.....
তিন:
বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি পড়াশুনার ধার ধারিনি। আড্ডার ওপর অনার্স মাস্টার্স থাকলে আমি ওই বিভাগের শিক্ষক হয়ে যেতাম। নিজেকে মাঝে মাঝে বানর বা ছাগল মনে হয়। কারণ ক্যাম্পাসের প্রতিটি গাছ আর ঘাস আমার চেনা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কয়টা গ্র“পে যে আমার হাজিরা দিতাম তার ইয়াত্তা নেই। এর ফাঁকে আমার চোখ খুজে ফিরত আবিস্কারের নেশায়। রবীন্দ্রনাথ এর অনেক সাহস ছিল বলে তিনি শিশির নাম দিয়ে তার ভালবাসার গল্পটা শুরু করেছিলেন। আমার এত্ত সাহস নেই। আমি আমার “ক” কে খুজঁতাম। ক ছিল আমার একটি প্রকল্প। ক্যাম্পাসের সব মেয়ের সৌন্দর্য যোগ করে নিজের জন্য একজনকে তৈরী করা। আমার বেশ পছন্দ হয়েছিল আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের একটি মেয়ের চোখদুটি। আমার রাগ লাগতো। মন খারাপ করা সৌন্দর্য। ওর কাছাকাছি ছিল ফারহানা যাকে আমি সুনয়না নাম দিয়েছিলাম। সুনয়না আমার বান্ধবী ছিল বলে একটু পক্ষপাতিত্ব করেই ওর চোখদুটো আমার প্রকল্পের জন্য নির্দিষ্ট করেছিলাম। সত্যি কথা বলতে তাতে মনের সায় ছিলনা। চোখ তো পেলাম। এবার চোখের ভ্রু। অনেক কষ্ট হয়েছিল ভ্রু বাছাই করতে। আজকাল মেয়েরা সব ভ্রুকেই বিউটি পার্লারের বদৌলতে এক করে ফেলেছে। তারপরও আমার মিশন চলতে থাকলো। কপাল জোড়া একটি ভ্রুর দেখা পেয়েছিলাম। কারো ভ্রু এত লম্বা হয়! মেয়েটি পড়তো ইতিহাসে। আমার বান্ধবিদের ওপরও কিছুটা দায়িত্ব দিয়েছিলাম। কে হাসলে গালে টোল পড়ে, কার চুলের সঙ্গে বাতাসের মিতালী, কার হাসিতে হৃদরোগের ওষুধ আছে, কার পায়ে বাজে অভিসারী ব্যঞ্জনা, কার চাহুনিতে প্রকৃতিরও কিছু আসে যায়, কার লম্বা চিকন আঙ্গলে খঞ্জনা বাজে, কার তিল দেখলে কবি সমরখন্দ বা বোখারা নয় পুরো বিশ্ব লিখে দিতেন- এমন খবর আমার কাছে পৌছে দিত। আমি পরখ করে দেখতাম। ভ্রুটা যেদিন নির্বাচন করেছিলাম সেদিন পার্টি হয়েছিল নীরবে। আমি ক্যানভাসে এসব সমাবেশ করে অবাক চোখে দেখতাম আমার ‘ক’ র অগ্রগতি। তার আবির্ভাবের ক্ষণ গননার ভাললাগার আবেশেই দিন কিভাবে পার হয়ে গেছে বুঝতে পারিনি।
আমার বান্ধবী আর বড় আপুদের একটি করে নাম দিয়েছিলাম। এসব নামে ডাকতে গিয়ে আসল নাম ভুলে গিয়েছিলাম। এ রকম ছিল লতা আপু। নাটোর বাড়ি। একারণেই বনলতা। সংক্ষেপে লতা। লতা আপুকে দেখলেই আমার অনেক প্রশ্ন মাথায় আসতো। বলতাম, আপু চাকুরটা আমি পেয়ে গেছি বেলা সত্যি....এখন আর কেউ আটকাতে পারবেনা। আমার প্রশ্ন ছিল আসলে কি বেলার বিয়ে হয়ে গেছিল? শ্যামদিকে দেখলে বলতাম, আপনিতো আমাকে মেরে ফেলবেন। আমার খাওয়ার সময় কেন আমাকে স্মরণ করতে গেলেন? হাচিতে আমার গলায় ভাত আটকে গেছিল। আর আমার পপি আপুর দেখা পেলে সেদিন কারো পাত্তা ছিলনা।
“জলজ ছায়ার মতো অদ্ভুত শব্দ,
আমার বুকের মন্দিরায়
কেঁপে কেঁপে নেচে ওঠে বারবার,
বোন, আমার এক ভিন্ন অহংকার।”
চার:
“ক” কে আমি সত্যি একেছিলাম। আমার ইচ্ছা ছিল ছবিটি নিয়ে আবারো ক্যাম্পাসে ঘুড়ে বেড়ানোর। কারো সঙ্গে মিল খুঁজে দেখতে। হয়ত কারো দেখা পেয়েও যেতে পারতাম। হয়নি কারণ..সাংবাদিকতা আমাকে ক্যাম্পাস থেকে দূরে সরিয়ে ফেললো। গভীর রাতে পত্রিকার অফিস থেকে ক্যাম্পাসে হেটে হেটে ঝড়া পাতার শব্দ শুনে হলে যেতাম। একসময় হল ছাড়তে হলো। আগেই ক্যাম্পাস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলাম। তাই ক্যম্পাস ছাড়তে কষ্ট হয়নি। শুধু বুকের বামপাশটায় অনেক দিন ব্যাথা ছিল। কিন্তু বিসিএস ভাগ্য আমাকে ঢাকা থেকেই বিতাড়িত করছে। তবুও প্রশিক্ষণের সুবাদে অনেক দিন পর প্রিয় ক্যাম্পাসের প্রিয় পথে। কিন্তু আর মাত্র ১৫ দিন। এখন যেভাবে রিকশাটা ক্যাম্পাস ছেড়ে যাচ্ছে, আমাকেও যেতে হবে। ওদিকে আকাশের বুকের ব্যাথাটাও বেড়েছে। হুহু করে জলধারায় ভাসিয়ে দিচ্ছে সব। কিন্তু মানুষের এক্ষেত্রে অনেক সীমাবদ্ধতা। রিকশার হুড খুলে দিলাম। আ-ষা-ঢ় মা-ই-সা ভা-সা পানি---রে। আমার কান্না এ পৃথিবীর কেউ দেখতে পায়নি। হাহাহা।
৩১.০৫.২০১১ রাত ১১.০০ টা

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

