somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ক্ষমতা, অক্ষমতা ও সহযোগীতা ( শেষ পর্ব)

০৬ ই মে, ২০০৯ সন্ধ্যা ৬:৩৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পঁচিশ বছর পর........

কাক চোখের মতো শান্ত একটা দীঘি, স্থীর। সান বাধানো ঘাটে মিথুন শুয়ে আছে তিতলির কোলে মাথা রেখে। ঝিরি ঝিরি বাতাস বইছে। একটু বেশী ঠান্ডা বাতাস। কাছে কোথাও পিয়ারোর ক্ষিণ টুং টাং শব্দ ভেসে আসছে। এক সময় থেমে গেল টুং টাং। আবার বাজতে শুরু করলো। এবার মিথুন শোয়া থেকে উঠে বসলো। উঠতেই মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল। সান বাধানো ঘাটে নয় শুয়ে আছে নিজের খাটে। এসির কারোণে বেশ ঠান্ডা লাগছিল। পিয়ানোর শব্দের হদিস পাওয়া গেল। তিতলির ফোন। মিথুন প্রায়ই খেয়াল করেছে যখনই সে তিতলিকে নিয়ে ভাল একটা স্বপ্ন দেখবে তখনই সে ফোন দিয়ে ঘুম আর স্বপ্নের বারোটা বাজিয়ে দেবে। কি বিশ্রি কান্ড! যাহ!
-হ্যালো।
মিথুনের কন্ঠ যতোটা না ঘুম জড়ানো তার চেয়ে বেশী জড়িয়ে কথা বলার চেষ্টা করলো।
-তুমি কি আরো ঘুমাবে না ক্যাম্পাসে আসবে?
-এতো সকালে কিসের ক্যাম্পাস তিলি?
মিথুন তিতলিকে আদর করে তিতলির বদলে তিলি ডাকে। কখও আবার লি’র বদলে লুও হয়ে যায়, অর্থাৎ তিলু।
-ফাইজলামি কইরো না বুচেছা এখন এত সকাল না? ঘড়ি দেখছ? এখন বাজে সোয়া এগারোটা।
-তাই নাকি? রাখো আসছি।
মিথুন যখন তার বাইক কলা ভবনের সামনে থামালো তখন ঘড়ির কাঁটা একটা পার হয়েছে। এর মধ্যে তিতলি বা তিলি বা তিলু কম করে হলেও ত্রিশ বার ফোন করেছে। কোমোরে দুই হাত রেখে যুদ্ধেংদেহী ভঙ্গীতে তিতলি বলল
-তোমার কি এখন ক্লাশ আছে?
-নাহ্।
-তাইলে আসছো ক্যান?
-তোমারে দ্যাকতে
-চলো এই খানে আর বসব না।
-কই যাবা?
-পুরান ঢাকায় চলো। হাজীর বিরানী খাবো।
খাওয়াদাওয়া করে দুজন আবার কলা ভবনেই ফিরল। বাইকটা পাশে রেখে আয়েস করে একটা সিগারেট ধরিয়েছে মিথুন, পাশে বসে আছে তিতলি।
-একটার বেশী খাবানা কিন্তু।
-উহু
-আজ কি এম্বাসিতে যাবা?
-না কাল যাব।
-কয়বার গেছ এই পর্যন্ত?
-পঞ্চাশ বার তো হবেই।
-বহুৎ আগেই বলছিলাম দালাল ধরো, না উনি একা যাবেন। তোমার লগে আমার জুতাও শেষ।
-শ্যাষ হইবো না, স্বামীর লগে মেরিকা যাাইবা এহন একটু কষ্ট করবা না? এইডা কতা হইলো?
-টাকা পয়সার কি করলা?
-এইডা কোন সমস্যা না। সময় মতো ব্যবস্থা ঠিকই হইয়া যাবে।
-তোমার আব্বার কাছে চাও।
-পাগল হইছ?
-ক্যান? কি হইছে?
-তুমি জাননা যে মা আমারে লইয় আলাদা হইছে, আমি বাপের ধার ধারি না। মায়ের কি টাকা কম আছে নাকি?
-এই যে দুই বছর ধইরা চলতাছি কোন সমস্য হইছে? বরং আগের চাইতে আরো ভালো আছি। আগে তো আব্বা টাকা দিতো হিসাব কইরা। আর এখন মা দুইজনের অভাব মিটাইতে যাইয়া আরো বেশী দেয়।
-আচ্ছা তোমার বাবা মা বুড়া বয়সে এমন কাজটা করলো ক্যা?
-তিলি এই কতাডা আর জিগাইয়ো নাতো। তোমারে এক হাজার বার কইছি আমি ব্যপারটাা জানি না আর জানতেও চাই না। তার পরও আবার.... ধুর.......
মূহুর্তেই অপ্রস্তুত হয়ে গেল তিতলি।
-সরি, রাগ করলা?
-না খুশি হইছি। কতো বার কইছি এটা আমার পারিবারিক প্রাইভেসি, তার পরও বার বার সেই ভাঙ্গা রেকর্ড তুমি বাজাইতেছ। শোন তিতলি আমার বাবা আমার মায়রে বুড়া বয়সে ডিভোর্স দিছে তার জন্য যদি তোমার প্রেষ্টিজে লাগে তাইলে তুমি আমারে ভাল বাইসো না। আমার আপত্তি নাই। তার পরও একই কথা বার বার ভাল্লাগে না।
-সরি সরি সরি, ভুল হইছে। এই কানে ধরছি, মাফ কইরা দেও সোনা। তোমারে ছাড়া আমি বাচুম ক্যামনে?
-ইটস ওকে, চল বের হই।
মিথুনের বাবা ডাঃ আশরাফুজ্জামান আর মা কাজী আরিফা জামানের মধ্যে বিচ্ছেদ হয়েছে দু’বছর আগে। তখন মিথুন অনার্স শেষ করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজ বিজ্ঞানে প্রথম বিভাগে দ্বিতীয় হয়েছে। সেই উপলক্ষে তিতলি তিতলির বাবা মাকে দাওয়াত করা হয়েছিল মিথুনদের বনানীস্থ বাসায়। আর সেই দাওয়াত বা পূণর্মিলনিই আশরাফ আর আরিফার ছাড়াছাড়ির প্রধান কারণ। তিতলি যখন তার বাবা মাকে নিয়ে মিথুনদের বাসায় পৌঁছালো তখন মিথুন বেশ মেজাজ খারাপ করে ওদের জন্য অপেক্ষা করছিল। পরিচয় পর্বে এসে দেখা গেল দুই পরিবারই আগে থেকে পরিচিত। কিন্তু সেটা নতুন প্রজুের একে বারেই অজানা। প্রফেসর নাজমুদ্দৌলাহ্ আর ডাঃ কাজী আশরাফুজ্জামানের স্ত্রী কাজী আরিফা জামান একে অপরের সহপাঠি ছিল এক সময়। এবং একই জায়গায় বাসাও ছিল এক সময়।
-আপনার কথা তো অনেক অনেক শুনেছি মিথুনের মায়ের কাছে। তা আপনিই যে আবার মিথুনের বান্ধবীর বাবা তা কে জানতো।
বললেন উৎফুল্ল ডাঃ আশরাফ।
-আমিই কি জানতাম?
হেসে উত্তর দিলেন প্রফেসর ড. নাজমুদ্দৌলাহ্।
-তা কোথায় আছেন? মানে কি করা হয়?
-ঢাকা কলেজে, ইংরেজী পড়াই। থাকি ধানমন্ডিতে।
-বাহ্ বেশ তো।
-আপনি তো ডাক্তার, কোথায় আছেন এখন?
-আমি আছি সলিমুল্লায়। আর নিজের একটা ক্লিনিক আছে উত্তরায়।
-তা হলে ভালই আছেন মনে হচ্ছে।
-আপাতত আছি কয়দিন থাকি বলা যায় না ভাই।
বিভিন্ন ধরনের আলাপচারিতায় জমে উঠল পার্টি। ফাঁকে এক সময় আরিফা আর নাজমুল দুজনে দুজনার সাথে কথাও বলেছে।
রাত দশটার দিকে পার্টি শেষ হলো। বিদায়ী করমর্দনের সময় আশরাফ নাজমুলকে হঠাৎই বলল
-আপনারও তো দেখছি আমার ছেলের মতো ঘন ঘন চেখে টিপ দেয়ার মুদ্রা দোষ আছে।
নাজমুল কোন কথা বলল না।
আশরাফ নিজে থেকেই নাজমুলকে বলল
-একদিন আসেন আমার চেম্বারে।
-আসব আসব
-কবে আসবেন বলেন
-কথা দিলাম একদিন বিনা নোটিসে চলে আসব।
এরপর একে অপরের মোবাই নম্বর বিনিময়ের পর বিদায় নিল।

সেই রাতে শোয়ার পরে এপাশ ওপাশ করছিল আরিফা। আশরাফ পাশ ফিরতে ফিরতে বলল
-কি ব্যাপার ঘুমাচ্ছ না কেন?
-শরীর টা তেমন ভাল লাগছে না। তুমি ঘুমাও।
-আমার চেয়ে তোমার ঘুমের বেশী দরকার। ঘুমাও
আরিফার ঘুম আসছিল না কিছুতেই। অনেক বছর পরে আজ দেখা হলো নাজমুলের সাথে। কম করে হলেও বিশ বছর। মিথুনের চেহারা একদম নাজমুলের মতই হয়েছে। মিথুনের জন্মের পরে ওকে মাত্র একবারই দেখেছিলো নাজমুল। তখন মিথুনের বয়স মাত্র দেড় বছর। কোলে নিয়ে নাজমুল বলেছিলো
-কিরে আরিফা তোর ছেলে তো দেখি আমার মতো ঘন-ঘন চোখে টিপ দেয়।
কোন কথা বলেনি আরিফা। তখন তিতলির বয়স মাত্র ২৭ দিন।
নাজমুল তখন সিলেটে একটা সরকারী কলেজে ইংরেজী পড়াচ্ছে। স্ত্রী আর একমাত্র মেয়েকে নিয়ে তখন সিলেটেই থাকে। বাবা অসুস্থ বলে বাড়ীতে এসেছে।

আটাশির পরে আশরাফ স্ত্রী সন্তান সহ দেশের বাইরে চলে যায় উচ্চতর ডিগ্রী নেয়ার জন্য। যাওয়ার আগে আরিফাই অনেক চেষ্টা করেছিলো যোগাযোগ করতে। কোন লাভ হয়নি। আরিফা যখন দেশে ফিরলো তখন নাজমুল তার স্ত্রী আর সন্তান নিয়ে সিলেট নেই তখন তারা লন্ডন। ওখানে একটা ইউনির্ভাসিটিতে পিএইচডি করছে। এর পর আর কারো সাথে কারো কোন প্রকার যোগাযোগ হয়নি। নতুন করে এই যোগাযোগটা না হওয়াটাই বোধ হয় ভাল ছিলো। আরিফা আবার নতুন করে চমকে উঠলো। কি হতে চলেছে এসব?
নষ্ট কোন পচা কিছু কি বেরিয়ে আসবে নাতো? তাহলে তো শুধু দুর্গন্ধই ছড়াবে না সংক্রামিত ও হবে বটে। মিথুন আর তিতলির কথাবার্তা চালচলন দেখে মনে হয় একে অন্য কে গভির ভাবে ভালবাসে। মরার আগ পর্যন্ত একে অপরকে না ছেড়ে যাওয়ার প্রতিশ্র“তি দিয়েছে নিশ্চই। কিন্তু এ কি করে সম্ভব? পৃথিবী উল্টে গেলেও তো তা সম্ভব না। এতে আল্লার আরশ থেকে সরাসরি গজব নাজিল হবে। এ হতে দেয়া যায় না কোন মতেই। মিথুন কে সব সময় বাসা থেকে বলা হয়েছে তোমার যাকে খুশি তাকেই তুমি পছন্দ করতে পারো এবং বিয়েও করতে পারো। এ ব্যাপারে বাবা বা মায়ের কারো কোন আপত্তি থাকবে না তা তুমি নিশ্চিৎ থাকতে পরো। কিন্তু এটা কি হলো? কি হবে এখন? মিথুনের বর্তমান বয়স পঁচিশ। আজ পর্যন্ত কেউ কোন রকম প্রশ্ন বা সন্দেহ করেনি। কিন্তু এখন? এখন কি করবে আরিফা? প্রচন্ড প্রস্রাব পেল আরিফার সাথে পানির পিপাসা। ধীরে ধীরে বিছানা ছাড়ল। ফ্রীজ খুলে পানির বোতল বের করে অর্ধেকটাই শেষ করলো। টয়লেট থেকে বের হয়ে আর বিছানায় না গিয়ে চলে গেলো সোজা বারান্দায়। চেয়ারে পিঠ ঠেকিয়ে আরএকটি সকাল পর্যন্ত নির্ঘুম বসে থাকল; আর আশরাফ খাটে শুয়ে।

আযানের বেশ কিছুপর মিথুনের রুমের ভেজানো দরজা ঠেলে ভিতরে উঁকি দিলো আরিফা। বাবার মতোই বেশ গোছানো হয়েছে। সবসময়ই বেশ পরিপাটি থাকে। ওর বয়সী অন্য কোন ছেলের রুমে ঢোকা তো দুরের কথা দরজা থেকেই পালিয়ে আসতে ইচ্ছা করে। আরিফা কিছু না বলে দরজা থেকে ফিরে গেলো। সকালের আলো ফুটতে শুরু করেছে। অনেক দিন এরকম সকালের আলো দেখা হয়না।

সকালে নাস্তার টেবিলে মা ছেলের দেখা হলো।
-মিথুন তোর সাথে কিছু কথা আছে আমার।
-কি কথা বলো।
-না এখন না পরে বলব।
-না না এখনই বলো মা পরে হয়তো সময় হবে না।
-তিতলি কে কি ভালো বাসিস?
-হ্যাঁ, তোমাকে একদিন বলেছিলাম, মনে হয় তোমার খেয়াল নেই।
-খেয়াল নেই তা না, তবে এই মেয়ে কিনা সেটা জানার জন্যই।
-মা তোমার কি হয়েছে বলো তো? তুমি বলো কি অন্য কিছু বলবে নাকি
-তুই কি ওকেই বিয়ে করবি?
-অফ কোর্স, কেন তোমার কি কোন আপত্তি আছে নাকি?
-আপত্তি তো কিছুটা আছেই, না থাকলে এতো কথা বলব কেন?
-কি আপত্তি বলতো!
-সেটা বলা যাবে না, তবে ওকে তুই বিয়ে করতে পারবি না।
মিথুন কোন কথা না বলে সুবোধ বালকের মতো নাস্তা সেরে বেরিয়ে গেল।

একটা রিভলভিং চেয়ার বসে মিথুন দোল খাচ্ছে আর খাচ্ছে সিগারেট। তিতলি দুই হাতে দুইটা মগ নিয়ে ঢুকতে ঢুকতে বলল
-আন্টির কথা শুনে তুমি কি বললে?
-আমি কিছুই বলি নাই।
ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল মিথুন।
-তা তোমার চিন্তা ভাবনা কি?
-আমার চিন্তা? আমার চিন্তা কি তুমি জান না?
-জানি, জানব না কেন?
-তাইলে? তোমার ভয়ের কিছু নাই। একটা গান শোনাও।
-ওম্মা কথা শুনছ?

মাস খানেক পরের কথা। দুপুরের খাবারের পর এক অবসরে আশরাফ ফোন করল নাজমুলকে।
-কি খবর কেমন আছেন?
-এই তো ভাল, আপনি?
-খারাপ না। আচ্ছা আপনি কি খুব ব্যাস্ত আজ?
-উমমম না, কেন বলুন তো?
-ব্যাস্ত না হলে চলে আসুন আমার এখানে দু’কাপ গরম কফি খেতে খেতে নরম গল্প করি।
-আচ্ছা আমি ১০ মিনিট পরে আপনাকে ফোন করে জানাচ্ছি কেমন?
-ওকে ঠিক আছে। রাখলাম।
ঘন্টা খানেক পরেই নাজমুলের গাড়ী এসে ব্রেক কষল আশরাফের অফিসের সামনে।
অনেক গল্প আলাপের পরে শরীর পরীক্ষার পালা। অনেক সময় নিয়ে অনেক যতেœ পরীক্ষা করে আশরাফ বলল
-আপনি তো বেশ ভালো আছেন এই বয়সেও বেশ ভালো।
বেল টিপতেই বেয়রা গোছের কেউ একজন ঢুকলো।
-এক জন নার্স পাঠাও, আর বল দুটি টেস্টটিউব পাঠাতে, এক জনের ইউরিন, স্টুল আর ব্লাড নিতে হবে।
নাজমুল হা হা করে উঠল
-এতো সব কি জন্য?
-আরে ভাই সামান্য একটু রক্ত নেব। ভয়ের কিছু নেই।
-আমি ভয়ের কথা বলছিনা। কিন্তু কি জন্য দরকার। আপনার আবার ফাও ঝামেলা।
-আরে না কি যে বলেন।
নার্স এসে নাজমুলের বক্ত, ইউরিন স্টুল সব নিয়ে গেলো।
এর পর দুজন মিলে লাঞ্চ করে বেশ কিছু সময় পরে নাজমুল বিদায় নিল।
আর আশরাফ নাজমুলের কিছু স্যাম্পল ঢুকালো নিজের ব্রীফকেসে। যেখানে মিথুনের ও স্যাম্পল রয়েছে। এগুলো নিয়ে আগামী কাল সে বিমানে উঠবে, চলে যাবে ব্যাংককের বামরুন গ্রাদ হাসপাতালে। নিজে দাড়িয়ে থেকে করাবে ডিএনএ টেস্ট, যা সলিমুল্লায় বা ঢাকা মেডিকেলেও সম্ভব। কিন্তু সে তা চায় না। দেখা যাক কোথাকার পানি কোথায় গড়ায়।
মিথুন আর আরিফার মধ্যে বেশ যুদ্ধ চলছে তিতলি কে নিয়ে। যুদ্ধের এক পর্যায়ে মিথুন তার সর্ব শেষ অস্ত্রটা ব্যাবহার করলো। আর তা হচ্ছে
-মা একটা কথা শোন, অনেক চিন্তা করেছি, শেষ পর্যন্ত আমার মনে হয়েছে তোমার চেয়ে তিতলিকেই আমার বেঁচে থাকতে হলে বেশী দরকার। তুমি যদি আমাকে ওর জন্য ত্যাজ্য করে দাও তাতেও আমার কোন আপত্তি নেই। আর কিছু বলার আছে?
কথাটা শোনার পরে আরিফার মনে হলো এর চেয়ে ব্যথার আর কিছু মনে হয় এদুনিয়ায় নেই। আরিফাকে কোন কথা বলার সুজোগ না দিয়ে হন হন করে বেরিয়ে গেল মিথুন।
নিজের ছেলেকে হারানোর মতো আর কোন অস্ত্র কি আর আরিফার কাছে নেই?
আছে, খুব মারাত্বক অস্ত্রই আছে আরিফার কাছে। কিন্তু আজ থেকে দুই যুগ আগেই সেই অস্ত্র নিজেই বিদ্ধ হয়ে আছে। অল্প কিছু সময়ের মধ্যেই আরিফা জ্ঞান হারালো।
এক সপ্তাহ পরে আশরাফ দেশে ফিরলো। রিপোর্ট পজেটিভ, অর্থাৎ মিথুন আশরাফের নয় নাজমুলে সন্তান। ব্যাংককে যখন রিপোর্ট হাতে পেয়েছিলো তখনই সে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছিলো যে দেশে ফিরে প্রথম কাজ হবে আরিফাকে ডিভোর্স দেয়া। এবং এ সিদ্ধান্তে সে অটল। বাড়ী ফিরে নাজমুল যথা সম্ভর স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলো। খাওয়া দাওয়া চলাফেরা সবই। এমন কি রাতের ব্যাপারটাও।
দুদিন পরের কথা। আশরাফ ও আরিফা যথারীতি নির্ঘুম শুয়ে পাশাপাশি। কথা বলা শুরু করলো, বিভিন্ন কথা। এক সময় আশরাফ বলল
-আতিক কি ফোন টোন করে তোমাকে?
-হুম, বিকেলেও করেছিলো তোমার কাথা জানতে চাইলো।
-ওর প্রমোশনের খবর কি?
-আগামী বোর্ডেই মেজর হবে।
-ওতো আরো দুই বছর আগেই মেজর হতে পারতো। কুয়েত মিশনটার কারনে ই তো পিছিয়ে গেলো।
-হ্যা, তবে ওর বউ তো ওর আগে মেজর হয়ে বসে আছে।
-আরে ধুর মেডিকেল কোরের কথা আলাদা। চিন্তা কর সেদিনের আতিক আজ সেনা কর্ম কর্তা। আচ্ছা ওর একবার এ্যাপেন্টিসাইটিস হয়েছিলো না?
-হুম, কেন তোমার মনে নেই?
-মনে থাকবে আবার? ওর সংবাদ পেয়েই তো আমি বাড়ীতে গেলাম। মনে পড়ে তখনকার যোগাযোগের কি বাজে অবস্থা ছিলো? আর এখন?
-হুম।
-তখন তো তোমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। আচ্ছা সেদিন নাজমুল তো তোমাদের অনেক উপকার করেছিলো তাই না?
-হুম।
-খুব পরোপোকারী লোক। এইতো সেদিনও আমাকে কতো বড় একটা উপকার করলো!
-কি সেটা?
-আছে পরে বলব। আচ্ছা আতিকের যেদিন অপারেশন হয়েছিলো সেদিন তো তোমরাই দুজন ই ওর পাশে ছিলে তাই না?
আরিফার হার্টবিট ক্রমশ বাড়তে শুরু করলো। কোন ক্রমে ঢোক গিলে বলল
-হ্যা, আর তো কেউ ছিল না তখন।
-নাজমুল সেই রাতে অনেক সাহায্য করেছিলো।
-হুম।
আরিফা প্রানপণ চেষ্টা করেছিলো নিজেকে সামলে রাখতে। কিন্তু পারছে না। মনে হচ্ছে আজরাইল এখন তার সামনেই হাজির, যেকোন সময় জান কবজ করে ফেলতে পারে।
-ও তো সেই রাতেই তোমাকে মা আর আপাতো দৃষ্টিতে আমাকে বাবা করেছিলো। তাই না?
-তুমি কি বলছ এসব?
-চুপ কর হারামজাদি একে বারে গলা টিপে মেরে ফেলব। ভাবিস আমি ঘাস খাই না? মিথুন যে একটা জারজ, তার বীজ যে তোর পিরিতের সখা নাজমুল দিয়েছিলো তার যথেষ্ঠ প্রমান আমার কাছে আছে। এখন যা বলি চুপচাপ শুনে যা। তিন দিন সময় দিলাম, তিন দিনের মধ্যে তোরা মা ছেলে আমার বড়ী ছেড়ে বেড়িয়ে যাবি।
-তুমি কি বলছ এসব?
-কি বলছি বুঝতে পারছেন না আপনি? যে মাগি শুধু মা ডাক শোনার জন্য অন্য পুরুষের সাথে শোয় তাকে শুধু আমি কেন দুনিয়ার কোন স্বামিই গ্রহন করবে না।
দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পর একটা ডিফেন্স নেয়ার চেষ্টা করলো আরিফা।
-এখন এসব কথা বলছ কেন? আমার মা হওয়াটা তো সব সময়ই আমার চেয়ে তোমাদেরই বেশী দরকার ছিলো। ছিলো না? তোমার মা তোমাকে আরেকটা বিয়ে পর্যন্ত দিতে চেয়েছিলো। অথচ তোমার চৌদ্দগুষ্ঠি সহ আমার বাপের টাকায় ভাত খেতো। আমার বাপের টাকা না হলে আজ ডাক্তার হতে পারতে না, হতে বটতলার কেরানী বুঝেছ? এখন বড় বড় কথা। আমাকে যে কতো জ্বালিয়েছ আমার মনে নেই?
-চুপ কর। বেশী গলা চড়াবি না।
-আমি চুপ করবো? তুই চুপকর। আর একটা কথাও বলবি না। আমাকে এই বাড়ী থেকে বেড়িয়ে যেতে বলছিস কোন সাহসে শুনি? এটা কি তোর বাপের বাড়ী নাকি? এটা আমার বাপের বাড়ী। আমার বাবা আমাকে কিনে দিয়েছে। কাল সকালে তুই নিজেই বেড়িয়ে যাবি। আমাকে যেন আর একবার বলতে না হয়। আমি তোকে এক্ষুনি ডিভোর্স দিলাম। কাল নোটিস পেয়ে যাবি। আমার সাথে ফাজলামি করিস না? এবার বুঝবি মজা।

হলোও তাই। পরের দিনই দুজনার, চৌত্রিস বছরের সংসার ভেঙে গেলো। আশরাফ তার নিজের ফ্লাটে উঠলো। মিথুন আর আরিফা নিজেদের বাড়ীতেই রয়ে গেল।
আরিফা মিথুন আর তিতলির ব্যাপারে প্রতিদিনই কিছুনা কিছু বলছেই। মিথুন কিছুতেই মায়ের কথায় কান দেয়না।
এভাবে বছর খানে থাকার পর একদিন সত্যি সত্যিই মিথুন আর তিতলির ভিসা হয়ে গেলো। তবে ওরা বিয়েটা বাংলাদেশে বসেই করেছিলো।
বিয়েটা যেমন কারো বাবা মাই জানেনি তেমনি কবে যে ওরা বিমানে চেপেছিলো তাও বোধ হয় কেউ জানতে পারেনি।

৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অনুকুলে নয় শেখ হাসিনা (আপা) প্রতিকুল পরিস্থিতিতেই বেশি অকুতোভয়।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৪




একদিকে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন তিনি দেশে ফিরছেন, আরেকদিকে তিনি প্রায় নিশ্চিন্ন করে দেয়া আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠন করে ফেলেছেন! এবং সেই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের অগণতান্ত্রিক, ভয়ঙ্কর এবং অবৈধ রাজনৈতিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিএনপির আবালীপনা।

লিখেছেন তানভির জুমার, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮

বিএনপি ৫০ হাজার নাচের শিক্ষক নিয়োগ দিতে যাচ্ছে। যার পেছনে ১০ বছরে ব্যায় হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা। যা দিয়ে ফুল প্যাকেজ ৩০ টি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান... ...বাকিটুকু পড়ুন

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

লিখেছেন নতুন নকিব, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২৪

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×