১ম সর্গ
সেটা ছিল রোদ পেঁচানো উত্তপ্ত এক গ্রীস্মদিন। জ্বলন্ত রাস্তায় একটা বুড়ো বাস চলছিল ধুঁকেধুঁকে। বাসযাত্রিরা ঠাসাঠাসি করে দাঁড়িয়ে ছিল। তাদের সবার গায়ে গরম জলের মতো জব্জবে ঘাম, যে ঘামের স্বাদ নোনতা, গন্ধ নোনতা। বাসের লেডিস সিটে বসে ছিল কয়েকজন শাড়ি পড়া এবং কয়েকজন সালোয়ার-কামিজ পড়া লেডিস। তারা কথা বলছিল না, কেবল সামনে তাকিয়ে ছিল চুপচাপ। বাসের উইন্ডস্ক্রীন দিয়ে তারা কালো রাস্তার গা চিড়ে বয়ে যাওয়া হলুদ সাদা দাগ দেখছিল।
বাসের মতো বাসের ড্রাইভারও ছিল বৃদ্ধ। তার তোবড়ানো গাল জুড়ে চিত্রলতার মতো লতিয়ে আছে নিস্প্রভ সাদা দাড়ি। ঝানু গোয়েন্দার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে চারপাশ দেখে এ্যাক্সিডেন্ট এড়িয়ে ধীরেসুস্থ্যে গাড়ি চালাচ্ছিল সে। বাসের যুবক যাত্রিরা সে কারণে বিরক্ত এবং বৃদ্ধরা নিশ্চিন্ত। মধ্যবয়সীদের অবশ্য কোন অনুভব ছিল না। তারা কেউ পরিবার, কেউ গন্তব্য, কেউ ভবিষ্যত, কেউবা বস্, গ্যাস, পানির বিল, চাকরী, প্রমোশন- এইসব ভাবছিল। এতগুলো লোক, অথচ কোন কোলাহল নেই। সবার মুখ বিকৃত হয়ে ছিল ক্লান্তিতে।
হঠাৎ করেই গুমোট স্তব্ধতা ভেঙ্গে খানখান হয়ে যায়। বাসের পেছন দিকে হৈচৈ। শক্ত সিটে বসে যারা ঝিমাচ্ছিল, তারা সোজা হয়ে বসলো। মহিলারা উৎসুক হলো ঘটনা জানার জন্য। তারা সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটির কাছে জানতে চাইলো ব্যাপারটা। লোকটি তার পেছনের যাত্রিকে জিজ্ঞেস করলো, সে শুধালো পরবর্তী যাত্রিটির কাছে। এইভাবে জানা গেল এক যুবক ছাত্র পরিচয় দিয়ে কন্ডাক্টরকে হাফ ভাড়া দিতে চেয়েছিল, যদিও যুবকের কাছে কোন পরিচয়পত্র ছিল না। এই নিয়েই তর্কাতর্কি। ঘটনা জানাজানি হবার পর আবার নেতিয়ে পড়লো কথামালা।
অল্প কিছু পরেই বাসের মাঝামাঝি থেকে ভেসে এলো কান্না ও চিৎকার ধ্বনি। এক ভদ্রলোকের পকেট কাটা গেছে। তিনি হাত-পা ছুঁড়ে বিলাপ শুরু করেছেন। পকেটমার তার এক মাসের পুরো বেতনটাই নিয়ে গেছে মানিব্যাগ শুদ্ধ। বাসের কেউ পকেটমারের শাস্তি দাবী করলো না, সহানুভূতি জানালো না। ভদ্রলোকের কান্না ধীরে ধীরে ফোঁপানীতে নেমে এলো। দু’হাতে মাথা চেপে তিনি নিরবে চোখের পানি ফেলতে লাগলেন- যার স্বাদ নোনা।
বাসের সামনের অংশ এতক্ষণ নিরব ছিল। নিরবতা ভাঙ্গলো নারীকন্ঠের গর্জনে। মহিলা একজন বাসযাত্রিকে ধমকাচ্ছেন, “এই যে, আপনি সরে দাঁড়ান তো! এভাবে গায়ের উপর পড়ছেন কেন?”
যাকে উদ্দেশ্য করে মহিলার এই রক্তচক্ষু, সে মিনমিন করে কী যেন ব’লে একটু সরে দাঁড়ায় শুধু। মহিলা তাতে সন্তুষ্ট নন, তিনি লোকটির চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুললেন। কটাক্ষে বললেন, নারীকে প্রত্যেক পুরুষই মনে করে লোভনীয় কেক বা পায়ের জুতো। লোকটি কেশে গলা পরিস্কার করে নিল। বললো, “ম্যাডাম, আমার মাথার সবগুলো চুল কালো, আর আপনার অর্ধেক চুল সাদা। শোনেন, বাসি কেক ছোঁয়ার ইচ্ছা আমার নাই, ব্যবহৃত জুতাও আমি পড়ি না।”
হেসে ফেললো কেউ, কেউ রাগলো, “এই জাতীয় কথা বলার মানে কি? সবকিছুর মধ্যে ভদ্রতা থাকা চাই!”
মহিলাও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, এই সময় ড্রাইভার বাধ সাধলো, “চিল্লাচিল্লি বন করেন... কোনখানে যামু খেয়াল নাই?”
যাত্রিরা থামলো। আবার দীর্ঘক্ষণ পথচলা। পথের শেষ রেখায় বোধ হয় নিশ্চিন্ত গন্তব্য। গন্তব্যে অসম্ভব সুগন্ধি শান্তি, প্রিয়তোষ জীবন, সুখের হাওয়া, প্রলম্বিত বিশ্রাম!
চলতে চলতেই কেশে উঠে বাসটা থেমে গেল। জায়গাটা পূর্ণিমায় ভেসে থাকা একটা অলস বাজার। বাসের জন্য পানি চাই, তাই এই হঠাৎ ব্রেক- কৈফিয়ত দেয় ড্রাইভার। কন্ডাক্টর ছুটে পানি সংগ্রহে।
“এই বাস কই যাইবো গো?”
বাজারের কয়েকজন লোক গলা বারিয়ে যাত্রিদের জিজ্ঞেস করে।
“স্বর্গছেড়া”।
২য় সর্গ
লোকেরা চোখ নাচায়, কয়েকবার চোখ ছুঁড়ে দেয় দিগন্তে, “স্বর্গছেড়া নামটা তো নতুন শুনলাম! বিষয়টার বর্ণনা দেন না গো।”
এইবার একজন মহিলা কথা বলে। তার চশমার ফ্রেইমে খেলা করে অজস্র রামধনু রঙ বিচিত্র বেলুন। মোহনীয় সুরে সে ফিস্ফিস করে, “স্বর্গ চেনো না মিয়ারা? বেহেস্ত চেনো না? জান্নাতের কথা শুনো নাই?”
“শুনছি শুনছি”, লোকেরা বলাবলি করে, “সেইখানে আছে মনিমুক্তা খচিত সোনার তৈরী দরজা, সেই স্থানে দালানের ইট সোনা-রুপায় তৈরী, মাটি জাফরানের, কাঁকর হইলো ইয়াকুত পাথর; আবে রহমতের নদী বইয়া চলে সেখানে যার পানি দুধের চেয়ে সাদা, বরফের চেয়ে ঠান্ডা, মধুর চেয়ে মিষ্টি; স্বর্গের গাছগুলা সোনা আর রুপার, ফলগুলা নিকটবর্তী, বাতাস মোলায়েম, জান্নাতে ইচ্ছা করলেই সোনা রুপার পাত্রে আসে সুস্বাদু খাবার, আসে ফল-ফলাদি, আসে শীতল পানীয় ভর্তি পানপাত্র। আরো নাকি সেইখানে আছে নূর দিয়া তৈরী হুর, নব্য কুমারী, অতিশয় সুন্দরী, নম্র ও নরম। হুরবালিকার মৃদু হাসিতে চারদিক আলোকিত হয়, একবিন্দু থুথুতে মিঠা হইয়া যায় দরিয়ার পানি...”
“হ্যাঁ গো মিয়ারা, সেই স্বর্গের একখান টুকরা ভাগ্যক্রমে ছিড়া পড়ছে ওই দক্ষিণে... দক্ষিণে, মহা দক্ষিণে- সেই যায়গার নামই ‘স্বর্গছেড়া’, আমরা সেইখানে যাবো, সেই মহা শান্তির দেশে।”
“আমরাও সেইখানে যাইতে চাই!”
“না না, যায়গা নাই, সিট নাই... নাই নাই...”
“আমাদের পথের ঠিকানা বলো, মানচিত্র আইকা দাও... আমরা যাবো!”
“সেই পথ চেনে শুধু বৃদ্ধ ড্রাইভার।”
একটা ভীড় জড়িয়ে ধরলো ড্রাইভারের চারপাশ, “পথের ঠিকানা দেন জনাব, একবার সেইখানে নিয়া চলেন।”
“সেই পথ বড় দূরের, বড় কষ্টের সেই পথ!”
“আমরা যাবো। তবু যাবো!”
“তবে ভাইসব, সবুর করেন, খোদ রাজধানী থেইকা উনসত্তুরজন লোকে ভরেছে এই দুর্বল যান। এক ট্রিপ দিয়া আসি, পরবর্তি ট্রিপে যাবেন আপনারা। কেউ দরজায় ঝুলবেন না, ঝুললে বাস যাবে না... ভাইসব, সবুর করেন...”
জনগন গলাকাটা মাছের মতো একটা ঝাঁকুনি দিয়ে স্থির হয়ে যায়। তাদের চোখ মৃত মাছের মতো ঠান্ডা ও ঘোলাটে রূপ ধারণ করে। বাজারটা ডুবে যায় অমাবস্যায়। বাস আবার চলতে শুরু করে। আস্তে ধীরে ড্রাইভার স্টিয়ারিং ঘুরায়। বাসের জানালা ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায় দিনের আলো ও রাতের আঁধার।
ক্রমেই বাসযাত্রিরা আক্রান্ত হয় একঘেঁয়েমিতে। একটু একটু করে জন্ম নেয় অসন্তোষ যার শুরুটা হয় এইভাবে; এক লোক, চেহারা দেখে বুঝা যায় নিতান্ত নিম্ন আয়ের, লুঙ্গিটা উরু পর্যন্ত তুলে ঘ্যাশ ঘ্যাশ শব্দে চুলকিয়ে চামড়ার উপর ঝাল মিটাচ্ছিল। ব্যাপারটা ভালো লাগলো না আরেকজনের, যিনি সাজ পোষাক ও আভিজাত্যে উচ্চশ্রেণীর- নাকটাক কুঁচকে বললো, “ওই ব্যাটা লুঙ্গি নামা! শরম লেহাজ নাই? অসভ্য বদমাইশ কোথাকার!”
লোকটা লুঙ্গি নামালো ঠিকই কিন্তু সেই সাথে ঘার বেঁকিয়ে জানতে চাইলো, কোন সাহসে তাকে অসভ্য বদমাইশ বলা হয়েছে। এক কথা, দু’কথায় ব্যাপারটা গড়িয়ে চললো, শেষে স্থির হলো বৃদ্ধ ড্রাইভারের উপর, “আর কতদূর নিয়া যাবে? কোথায় স্বর্গছেড়া?”
বৃদ্ধের মুখে শিশিরের মতো বিন্দু বিন্দু ঘাম, “শান্ত হন ভাইসাবেরা, শুনেন শান্ত হয়ে, সম্ভবত আমরা পথ হারাইছি।”
মুহুর্তে সমস্ত বাসজুড়ে নামলো বনভূমির নিঃস্তব্ধতা। একটা ভয়ার্ত কন্ঠ চিৎকার করলো, “কী! কী বললা?”
“আমরা পথ হারাইছি”, বৃদ্ধ পুনরায় বলে।
একটা সবুজ বৃক্ষ শুকায়, বার বার পাতা ঝরে। কিছুক্ষণের মধ্যেই একদল হতাশ মানুষ ফুঁসে উঠে হিংস্রতায়। ড্রাইভারের কপাল ফেটে দরদর করে রক্ত পড়ে। হাত পা ভারসাম্য হারায়। একজন মহিলা যাত্রি তীক্ষ্ণ কন্ঠে চেঁচায়, “ওরে মারামারি করিস না! বুড়াকে মারলে ফিরবো কেমনে? এইখানে যে আটকা পড়বি সবাই... ওরে ছাড় ছাড়রে বাপধনেরা, রক্তারক্তির ফল ভালো না!”
ধীরে ধীরে মানুষগুলো সম্বিত ফিরে পায়। মহিলারা এগিয়ে আসে বৃদ্ধ ড্রাইভারের শুশ্রুষা করতে। কিন্তু অচিরেই টের পায় বৃদ্ধ দৃষ্টি এড়িয়ে চলে গেছে নাগালহীণ উর্ধ্বে। চারপাশে তখন নোনা বাতাসের দাপাদাপি, সুর করে মেয়েরা বিলাপ করে, বৃদ্ধরা মাথা চাপড়ায়।
“এই দেশে চির সন্ধ্যা”, কন্ডাক্টরদের একজন জানায়। যুবকেরা স্বান্তনা দেয়। এইভাবে কাটে অনেক সময়, যদিও কতটা সময় তা ঠিক বুঝা যায় না। নোনা ঘাম, নোনা চোখের পানি করে তোলে আরও ভারী, আরো লবনাক্ত। ঝড় বৃষ্টিকে সাথে নিয়ে নোনা বাতাস ডানা ঝাপটায়। কিয়ৎক্ষণ পর শূণ্য বাসটি পড়ে থাকে একলা। সব মানুষেরা ছোটে আশ্রয়ের খোঁজে, ফিরে যায় নিজ নিজ সীমানায়।
তারপর দিন যায়। সেই বাজারের লোকরা অপেক্ষায় থেকে থেকে হয়ে যায় সারি সারি পাথর এবং একদা এক ফাল্গুন মাসের বিশ তারিখে রাজধানী শহরের প্রান্তে এসে দাঁড়ায় একটি বৃদ্ধ বাস। দুইজন কন্ডাক্টর যাত্রিদের কানে কানে শোনায় ‘স্বর্গছেড়া’র কাহিনী। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাসটার পেট ভরে উঠবে। লোকজন দাঁড়াবে ঠাসাঠাসি করে। বেলা দ্বিপ্রহরে একজন সফেদ সাদা বৃদ্ধ ড্রাইভার ধীরে ধীরে বাস ছাড়বে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

