আমার বিয়ের পরে ঘন ঘন শুনতাম ওনাদের কাছে, আমি খ্যাৎ!! আমার লম্বা-চুল খ্যাৎ, যা কিনা বিয়ের পর আমার সাহেবের বড়বোনের পরিচিত পার্লারে নিয়ে বেশ ঘটা করে একদিন অনন্য স্টাইলে কাটিয়ে আনা হলো! আমার ফুলহাতা জামা খ্যাৎ, শশুরবাড়িতে ঢোকার পর পরা শুরু করলাম হাফস্লীভ জামা। সূতির জামা ল্যাবেন্ডিস, তাই চট্টগ্রামের ড্রেসিডেল থেকে অথবা মিমির আঁচল থেকে থ্রী-পিস কেনা হতো আমার জন্য। আমি সাজিনা, তাই সাজতে পারিওনা, এটা একটা বিশাআআল সমস্যা হয়ে দাঁড়ালো ওনাদের কাছে। নতূন বৌ সাজবেনা, এ কেমন কথা!! আমি দাওয়াত-টাওয়াতে যখন যেতাম, কর্তার বড়বোনের সাজেশন-মত সাজতে হতো, নিদেনপক্ষে সাহেবকে দেখিয়ে নিতে হতো সাজগুজ ঠিকমতো হয়েছে কিনা। আমার মত করে সাজতে গেলে যদি সেটা খ্যাৎ হয়ে যায়!!
এভাবে মোটামুটি সর্বজনস্বীকৃত একজন খ্যাৎ-এর উপাধি পেয়ে গেলাম আমি শশুরকূলে।
আমার সাম্প্রতিক আরেক গাঁইয়া দূর্বলতা গত ঈদে আমার শাশুরী-আম্মাজান আবিষ্কার করলেন, আমি চপার-বোর্ড ব্যবহার করিনা। আমি বটি ছাড়া কুটাবাছা করতে পারিনা। আমার ঘরে দুইবাচ্চা সামলে রান্নাঘরের কাজ করা দূর্দান্ত কঠিন, কারণ আমি বটি ব্যবহার করি। ছোট টা আমার পিছে পিছে ঘুরে সারাক্ষণ, সুতরাং আমি চুলার ধারে গেলে সে-ও চূলায় হাত দিয়ে বসে। তাই গত কয়েকবারের চট্টগ্রাম ট্রিপে আমার শাশুড়ীআম্মা অনেক বার করে আমাকে চপারের উপকারিতা বোঝালেন। ঢাকায় কোথায় কিনতে পাওয়া যায় তা-ও কার কাছ থেকে জেনে আমাকে জানালেন। উনি বিদেশ বসবাসকালীন কিভাবে দা-বটিবিহীন দূর্ঘটনামুক্ত সংসারে এতগুলা বাচ্চা নিয়ে রান্নাবান্না করেছেন তার কাহিনীও বহুবার শুনলাম। শুনলাম উনি এভাবে মুরগী কুটা থেকে শাকপাতা কুটা সবই করেছেন।
ঠিক হ্যায়, আমার গাঁইয়া স্টাইল দূর করতে হবে। এবার ঢাকায় এসে ঠিক করলাম কিছুতেই আর বটি নয়। জান গেলেও নয়। অভ্যেসবশতঃ হাত বারবার বটির দিকেই চলে যায়, কিন্তু না, কিছুতেই হার মানবোনা। মুরগী কাটলাম যেদিন, খুব কষ্ট হলো। আমার কয়েক মিনিটের বটির কাজ টা এই মডার্ণ স্টাইলে করতে গিয়ে ঘন্টার উপরে লাগলো। তবুও ছাড়লাম না। আমাকে আমার শশুরবাড়ীর মত স্মার্ট-মডার্ণ হতেই হবে!!
ঠিক দুপুরবেলা, ভুতে মারে ঢ্যালা...আজ দুপুরে কী যে হয়ে গেলো! বাচ্চাদুইটাই ঘুম। পিঁয়াজ কুটতে গিয়ে মনমতো মিহিকুচি হচ্ছেনা। মনে হলো যেন প্রয়োজনের তুলনায় বেশী সময় যাচ্ছে। বটিটা যেন আমার দিকে তাকিয়ে ব্যঙ্গ করছে আর বলছে "ওরে, তোর রান্নায় হাতেখড়ি যার কাছে, তাকে ফেলে তুই পারবি রান্নাঘরে থাকতে? মনে নেই সেই রোকেয়া হল পর্যন্ত তুই এই আমাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিলি? এখন এত সময় নষ্ট করে, ঘাম ঝরিয়ে তুই কোন পাকা রাধুঁনীর সুখ পেতে চাইছিস?" হঠাৎ খেয়াল হলো আরে বাচ্চারা তো ঘুম, আমি তো পারিই বটি ব্যবহার করতে। কী ক্ষতি হবে?
যেই ভাবা সেই কাজ। ওরে আমার সুখ দেখে কে? কয়েক সেকেন্ডে আমার পিঁয়াজগুলো ফাঁই-ফাঁই করে মিহি-মিহি-মিহি কুচি-কুচি হয়ে গেল!! ওয়াও, তবে সব্জীগুলো কুটে ফেলি? ওহ, সে কী তুমুল স্পীড, আর এত ফাটাফাটি সব্জী-কুটা কে কবে দেখেছে? তৃপ্তিতে আমার মনটা ভরে গেলো।
ওরে আমি হীরে ফেলে কাঁচ বুকে তুলে নিয়েছিলাম রে! বটি তুই আমাকে ক্ষমা করিসরে বোন। তোকে ছাড়া আমার রান্নাঘর অচল!! গুল্লী মারি আমার মডার্ণ প্র্যাক্টিসের। আমি গাঁইয়া, আমার বটি গাঁইয়া, আমার রান্না গাঁইয়া! সো হোয়াট? যে এরপরেও আমার রান্না খাবে সে-ও হবে গাঁইয়া, তবু আমার বটি-বান্ধবীকে আমি ছাড়বো না গো!!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

