লীনা মাত্র পাশ করে বের হলো নামকরা বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। রেজাল্ট আহামরি কিছু নয়। ইউনিভার্সিটিতে গুজব ছড়াতো অনেকেই; যে কিছু কিছু শিক্ষকের সাথে কিংবা মাঝে মাঝে কোনও কোনও টি-এর সাথে অনভিপ্রেত ভঙ্গিমায় দেখা গেছে লীনাকে। পড়ায় অমনযোগী সুন্দরীকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছে অনেক সিনিয়র ভাইজান, যদি এই সুযোগে "ভাই"প্রত্যয়টা বাদ পড়ে যায়! কী আর হবে, পথে পথে পড়ে থেকেছে কিছু খানখান হৃদ্য়। এমনই এক অবস্থায় যখন চারপাশে দিওয়ানা-মাস্তানার চাপে দেনা-পাওনার হিসেব গন্ডগোল করে লীনা সমূহ বিপদের সম্মুখীন; তাকে উদ্ধারের জন্য এগিয়ে এল ক্লাসের গুডি গুডি ছেলে পূলক। এমনিতে পূলককে পাত্তা দেওয়ার মত মেয়ে লীনা ছিলনা। কিন্তু ভালবাসা-ছলনার খেলায় প্যাঁচ লেগে যাওয়ায় খানিকটা অসহায় হয়েই সে পূলকের শরণ নিতে বাধ্য হলো। গ্র্যাজুয়েশনের আগে বিয়েও করে ফেললো পারিবারিক ভাবে। তবে হ্যাঁ, বিয়ের আগে পূলক তার বধুর কাছ থেকে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিলো, এই সম্পর্কই লীনার শেষ সম্পর্ক হবে কোনও পুরুষের সাথে।
চাকরির ইনকামে হবেনা; ব্যাচমেট বৌএর চেয়ে এগিয়ে থাকার প্রত্যয়ে ব্যবসা শুরু করলো পূলক।
মাল-মশলা মিশিয়ে লীনা সি.ভি লিখেছে ভালই। বাবার ব্যবসা, শাশুড়ীর অ্যাড-ফার্ম, স্বামীর ব্যবসা, সবকিছুতেই তার "এক্সপেরিয়েন্স" ঝকঝক করছে সেখানে। হেন এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটি নেই যে সে করেনি। গড়পরতা রেজাল্টকে ছাপিয়ে "নিজেকে" উজ্জ্বল করে তোলার আপ্রাণ চেষ্টার ছাপ পড়েছে একপাতার কাগজে। রেফারেন্সে প্রভাবশালী কয়েকজনের নাম আর সেই সাথে নিজের বেশ ঝকঝকে একখানা ফটো। খেয়াল করলে তার সি.ভি.র ফাঁকিবাজি হয়তো ধরে ফেলা যাবে। খুব প্রোব করলে হয়তো ইন্টারভিউতেই তার গুণাগুণের সত্যতা যাচাই হতে পারে। কিন্তু কোনও এক অজ্ঞাত (নাকি জ্ঞাত?) কারণে তার কিছুই হলোনা। লীনার ইন্টার্ণশিপ হলো নামকরা এক প্রাইভেট ফার্মে। মাসুদ লীনার বস্, সুপুরুষ, ভদ্র, বিবাহিত, সন্তানের জনক।
এরপরে তিনমাসে ঘটনা অনেকদূর। বিস্তারিত লিখতে গেলে আমার মতো গাঁইয়ার কলম চলেনা। পূলক জানতেও পারলোনা, কল্পনাও করতে পারলোনা মাসুদ-লীনা এরমধ্যেই বস্-ইন্টার্নীর সম্পর্ককে অতিক্রম করে কোন্ পর্যায়ে চলে গিয়েছে। মাসুদের চোখে লীনা ছাড়া কিছুই পড়েনা ইদানিং। ভুলে গিয়েছে সে ঘর-সংসার-সন্তান-সমাজ। লীনাকে ছাড়া একদন্ডও কল্পনা করতে পারেনা। বারে বারে আক্ষেপ কেন আরো আগে ওর সাথে পরিচয় হলোনা, কীভাবে লীনাকে সে সারাজীবনের জন্য দখল করতে পারে!
লীনার চাকরি দরকার। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীর ইন্টার্নশিপ নয়, পাকাপোক্ত চাকরি। মাসুদকে চাপ দিতে লাগলো হরদম। তিনমাস পর কী হবে? বেকার হয়ে যাবে সে?? মাসুদ লীনাকে বোঝায় প্রয়োজনে সে তার স্ত্রীকে ডিভোর্স দিয়ে লীনাকে বিয়ে করবে। তাহলে লীনার অগাধ টাকা হবে, চাকরি না-করলেও চলবে।
নাঃ এভাবে হবেনা তাহলে। তিনমাস দেখতে দেখতে পার হয়ে গেল। মাসুদ পাগলপ্রায়, পূলকও কিছুটা আঁচ করতে পেরেছে। কিন্তু লীনা বুঝে গিয়েছে তার চাকরি হচ্ছেনা। বিভিন্ন পারিবারিক সমস্যার কথা এবং হঠাৎ করে নতুন করে পতিপ্রেম জাগ্রত হওয়ার অজুহাতে সে মাসুদ কে একপ্রকার "না" করে দিল।
এরপরে যা হলো তা লিখতে গেলে অন্য কাহিনি। আমি খালি তুলে ধরতে চাইছি একটা "অ্যালার্মিং" ট্রেন্ডকে। যা আগে দেখিনি, কখনও শুনিনি, কিন্তু সেটাই এখন অতিমাত্রায় স্বাভাবিক হয়ে আসছে। একি অবক্ষয়, নাকি উন্নয়ন? লীনা-মাসুদের মত বাস্তব-চরিত্ররা হেঁটে বেড়াচ্ছে আমাদের চারপাশে আর আমরাও তাদের নিছক বাস্তবতা বলে মেনে নিচ্ছি বা এড়িয়ে চলতে বাধ্য হচ্ছি।
কত ব্যাচেলর আজকাল বিয়ে করার জন্য পাত্রী খুঁজে বেড়ায়। বিয়ে মানে কি শুধু একজোড়া নারী-পুরুষের একসাথে থাকা? এই সম্পর্কের মাঝে কোনও সামাজিক/পারিবারিক দায়বদ্ধতা নেই?
মা-চাচীদের সবসময় পরিবার, আত্মীয়, শাশুড়ী নিয়ে ব্যস্ত থাকতে দেখেছি। মনেই পড়েনা তাঁদের কখনও তাঁদের স্বামীদের পাশাপাশি পাব্লিকলি বসতে বা গল্প করতে দেখেছি। অথচ সারাটাজীবন স্বপ্ন দেখেছি ওনাদের মত সংসার হবে, ওনাদের জুড়িগুলো সাংঘাতিক ফাটাফাটিরকম রোমান্টিক ছিল। দেখা-কথা হতো সামান্য, কিন্তু একজনের জন্য আরেকজনের না-খেয়ে বসে থাকা; আবার ঘরে কেউ না-খেয়ে বসে আছে বলে অন্য কোথাও না-খেয়ে দ্রূত ঘরে ফেরার তাড়া...গোসলের পানি, সাবান, তোয়ালে এগিয়ে দেওয়া কিংবা বিদেশ যাওয়ার কালে চোখের পানিতে ব্যাগ গুছিয়ে দেওয়া...দেশে ফেরার পরে স্ত্রীর জন্যে কেনা শাড়ী-গয়নাগুলো কেউ না-দেখে মত করে আড়ালে উপহার দেওয়া, আরও কত কী!!!
এসব কি কম রোম্যান্টিক? আমি নারী-স্বাধীনতার পক্ষে, নারী-নির্যাতনের বিপক্ষে। কিন্তু ভালবাসাবাসির এই আধুনিকায়নের ঘোর বিরোধী আমি।
কত্ত্ব কিছু শুনি, দেখি, পড়ি! নতুন নতুন সব কথা, নতুন কনসেপ্টের ভীড়ে মনে হয় এতটাকাল যেটাকে বাস্তব জেনে বড় হয়েছি, সেটাই আজকাল অবাস্তব হয়ে গেছে!
সব সমস্যা নিয়ে তো আর ব্লগ লেখা চলেনা। আবার আমার কাছে যেটা সমস্যা অন্যের কাছে তার মানে প্রগতি কিংবা নতুনত্ব। তবে আমি তাদের কাছে কী? পিছিয়ে পড়তে পড়তে হোঁচট খাওয়া মান্ধাতার আমলের একজন?
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই অক্টোবর, ২০০৯ বিকাল ৩:৫৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


