প্রথম দেখেছিলাম আমার দাদীকে। গ্রাম থেকে যখন আসতেন, ওনাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হতো। ঠিক কী অসুখ ছিল আমার জানা নেই, তবে এটা জানতাম যে ওনাকে স্যাটিসফাই করতে ডাক্তারদেরও ঘাম ছুটে যেত। উনি প্রেস্ক্রিপশন পড়তে পারতেন না। তবে খুব যত্ন করে ট্যাবলেটের ফয়েলগুলো জমিয়ে রাখতেন।এমনভাবে অল্প ছিঁড়ে ওষুধ বের করতেন যাতে ফয়েলটা গোটাই থাকে; শেষ হয়ে গেলে হাতে চেপে চেপে উনি পুরো পাতাটাকে সমান করে তোষকের তলায় রেখে দিতেন কিছুদিন। এরপর পাতাটা একেবারে সমান হয়ে গেলে অন্যান্য ওষুধের ফয়েলের সাথে একটা রাবার ব্যান্ড দিয়ে বেঁধে রাখতেন। "আপনার কোনও অসুখ নেই," এই কথা বললে উনি বলে বেড়াতেন ডাক্তার ভাল না। আবার প্রেস্ক্রিপশনে একই ওষুধ রিপিট করলে বলতেন এই ডাক্তার তো আগের ডাক্তারের থেকে দেখে দেখে ওষুধ দিয়েছে। বেশিরভাগ সময় জেনেরিক একই রেখে ডাক্তাররা ওনাকে অন্য কোম্পানির একই ওষুধ প্রেস্ক্রাইব করতেন। ওনার সাংঘাতিক ওষুধ-প্রীতি ছিল। ওষুধ খেতেন খুব আগ্রহ করে, খুব ভাব-সাব মেরে। আমরা ছোট ছিলাম। হাঁ করে তাকিয়ে তাকিয়ে ওনার ওষুধ খাওয়া দেখতাম।
ঊনি ব্রেইন হেমারেজে মারা যান পরে...কিন্তু ওনার সম্বন্ধে হালকা পাতলা স্মৃতির মধ্যে ওনার ওষুধ নিয়ে বাড়াবাড়িটা খুব মনে পড়ে।
আমার শাশুড়ী। ট্যাবলেট পানি দিয়ে গিলতে পারেন না। ভাত খাওয়ার সময় একটা ছোট বাটি নিয়ে বসেন। তাতে রংবেরংয়ের নানা জাতের ওষুধ। একনলা ভাতের ভেতরে ট্যাবলেট ঢুকিয়ে উনি ভাবতে থাকেন "এটা তো ভাত, এর ভেতরে ওষুধ নেই!" এই কথা ভেবে ভেবে ভাত মনে করে উনি ভাতের সাথে ওষুধও খেয়ে ফেলেন। সত্যি, আমি বানিয়ে বলছিনা কিন্তু!! ওনার সাথে ডাক্তারের চেম্বারে গিয়েছি কয়েকবার। একই অবস্থা, "আপনার তেমন কোনও মেজর সমস্যা নেই" বললেই মুষড়ে পড়েন। আর যদি ডাক্তার নতুন কোনও ওষুধ দেন তবে সেই ওষুধের কী-কেন-সাইডএফেক্ট সবই উনি বুঝে নিতে চান ডাক্তারের কাছ থেকে। এটা অবশ্য ভাল অভ্যাস, তবে ডাক্তাররা অনেকসময় বিরক্ত হন। একবার ডাক্তার ওনার সাথে কথা না-বলে পুরোটা সময় আমার সাথে কথা বলেছিলেন এবং ওষুধের ডোজ ইত্যাদি সব আমাকেই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। সব বুঝে ঘরে ফেরার সময় দেখি ওনার সাংঘাতিক মন খারাপ। কারণ ওনার অনেক কিছু জানার ইচ্ছা ছিল সেটা জিজ্ঞাসা করার স্কোপ উনি পান-নি। ডাক্তার আমার সাথে কথা বলেছেন, ওনার সাথে বলেন নি। মজার ব্যাপার হলো তার পরেরদিন আরেক ডাক্তারের কাছে গিয়ে উনি-ই সব বললেন। ফের বের হয়ে আসার পর মন খারাপ, কারণ অনেক কথা উনি বলতে ভুলে গিয়েছিলেন যেসব ওনার এখন মনে পড়ছে।
আমি নিজে ছোটবেলায় চুরি করে হোমিওপ্যাথির ওষুধ খেতাম। ছেলেবেলায় আমার সারা গায়ে দানা টাইপ কী যেন হয়েছিল, কিছুতেই যায়না, তখন হোমিওপ্যাথির ওষুধ দেওয়া হলো। উফ, কী যে মজা! আমি লুকিয়ে লুকিয়ে কাগজের প্যাকেট খুলে সবটুকু খেয়ে শেষ করে ফেলতাম। (পরে অবশ্য এর কারণে আম্মুর কাছ থেকে অন্যকিছু খেয়েছি, যেটা মিষ্টি ওষুধ খাওয়ার সুখ ভুলিয়ে দিতো।)
এখন আমার মেয়েদের কে নিয়ে কী করি? যেই তাদের অসুখ বিসুখ হয়, নিজেরাই বলতে থাকে "আম্মু ওষুধ দাও, নাহয় অসুখ ভাল হবেনা!!" একটাকে ওষুধ দিলে অন্যটা কাঁদে, "আমিও খাবো!!" বড়মেয়ের ঠান্ডা লেগেছে, লুকিয়ে ওকে সিরাপ খাওয়াচ্ছি, হঠাৎ পেছন থেকে শুনি "ইয়্ইয়েএএএ!!!" কী ব্যাপার? না, ছোটটা আনন্দিত হয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে গিয়েছে, দুহাত উপরে ছুঁড়ে উল্লাস করছে; নেক্সট সে-ও ওষুধ খাবে।
ডাক্তারকে ফোন করলাম। ভাই আমাকে এমন একটা সিরাপ প্রেস্ক্রাইব করেন যেটা অসুস্থ না-হলেও খাওয়া যায়। উনি সব শুনে দিলেনও সেরকম একটা সিরাপ। এখন বাচ্চাদের একজনকে কোনও অসুখের কারণে কোনও সিরাপ খাওয়ালে বাকিটাকে সেই 'দুধভাত' ওষুধ-টাই খাওয়াই। কী আর করবো? ওষুধ-প্রীতি তো মনে হয় বংশ-পরম্পরায় ওদের মাঝেও চলে এসেছে!
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই মার্চ, ২০১০ সন্ধ্যা ৬:০৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


