পাশ করার পরপর চাকরির খোঁজ। একটা চাকরি পেলেই হলো। স্বপ্নের অর্গানিযেশন, কিংবা স্বপ্নের ক্যারিয়ার স্ট্রীম অথবা পছন্দ মত বেতনের যে-কোনও একটা চাকরি। পেলেই হলো।
আমি যেবার পাশ করলাম, খুব স্বপ্ন ছিল হিউম্যান রিসোর্সে ক্যারিয়ার করবো। সে আমলে বিবিএ স্টুডেন্টদের হিউম্যান রিসোর্সে মেজর করার অপশন ছিলনা। চাকরি খুঁজি, অ্যাড দেখে অ্যাপ্লাই করি। কিন্তু ডাক পেলেও চাকরিটা আর হয়না। সে আমলে অভিজ্ঞতা ছাড়া এইচ-আর এ লোক নিতনা। কেবলমাত্র ইন্টার্নশিপ অভিজ্ঞতা সম্বল করে দুইমাস টিউশনির খরচে চলছিলাম। আমার ব্যাচমেটরা সবাই ততদিনে সকার। কেবলমাত্র আমি গোঁ-ধরে বেকার।
আমার পরিবারের জন্য এটা কলংকস্বরূপ হয়ে দাঁড়াচ্ছে দেখে শেষে ঢুকে গেলাম অ্যাডফার্মে। বেইলি রোডের নর্তন কলোনির এশিয়াটিক। কাজ শুরু করলাম। প্রথমে কেমন খাপছাড়া মনে হলেও কাজের পরিবেশটা সাংঘাতিক পছন্দ হয়ে গেল। আমি নিজে প্রচন্ড ইনফর্মাল মানুষ, অ্যাডফার্মের মানুষগুলোও ইনফর্মাল। মিশে গেলাম কাজে। ঘরে ফেরার কোনও টাইম টেবিল ছিলনা। একদিন বাসায় ফিরলাম রাত এগারোটায়। বিশেষ ক্যাম্পেইনের কাজে দেরী হয়ে গেল।
পরিবারের মুরুব্বিদের (পরিবারের বাইরে হবু মুরুব্বিও একজন ছিলেন সেসময়ে) রক্তচক্ষুর সামনে শুরু করলাম আবার চাকরি খোঁজা, পেয়ে গেলাম ছোটমোট একটা। আমার ব্যাচমেটরা কেউ তখন পঁচিশের নীচে বেতন পায়না। প্রতিমাসে আমার অ্যাকাউন্টে জমা পড়তো সর্বসাকূল্যে আটহাজার। বাপের হোটেলে ছিলাম, গায়ে লাগেনি তেমন।
যাহোক, আমার নিজের কাহিনী বলার উদ্দেশ্যে আজকে বসিনি। আসলে আমাদের দেশে মানুষ চাকরি খোঁজে কিসের ভিত্তিতে, সেটা নিয়েই লিখতে বসেছি।
চাকরি খোঁজার মানুষ বেশি চাকরিদাতার চেয়ে। খুব কম মানুষ-ই ব্যবসার দিকে যায়। যেজন্য আমাদের অর্থনীতি খুব বেশি চাকরি-নির্ভর। দেশে প্রতিবছর যে-হারে ছাত্ররা পাশ করে বের হয়, সে-হারে চাকরি প্রাপ্তিসাধ্য নয়। কাজেই প্রচুর মেইক্-শিফ্ট দেখা যায় চাকরির বাজারে। অনেক ভাল রেজাল্ট করে ইউনিভার্সিটির ভাল কোনও বিষয়ে পড়ে এসে দেখা গেল চাকরির বাজারে সে সাবজেক্টের দাম নেই। তখন পড়ার বিষয়ের গুল্লি মেরে আমরা লেগে পড়ি যে-কোনও সাবজেক্টের যে-কোনও জায়গায় মোটামুটি বেতনের একটা চাকরি নিতে। আমি এম্বিএ পড়ার সময় একজন সরকারী ডাক্তারকে ক্লাসে দেখেছি, যিনি অল্পবেতনে পোষাতে না-পেরে ডাক্তারি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এই স্বপ্নভঙ্গের কিন্তু এখানেই ইতি নয়। চাকরিতে ঢুকে গেলাম। বাসার সবাই খুশি। মাস-গেলে মা-য়ের হাতে বেতন দিলাম। মিষ্টি খাওয়ালাম। এভাবে কয়েকমাস গেল। আস্তে আস্তে টের পেলাম কাজটা আসলে আমার পছন্দ হচ্ছেনা। ধামাচাপা দেওয়া পুরোনো স্বপ্নগুলো আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। বন্ধুদের আড্ডায় গিয়ে সে স্বপ্নভঙ্গের বেদনা রীতিমত আফসোসে পরিণত হলো। সবাই যার যার কাজ নিয়ে খুব খুশী। কিন্তু যে কাজ আমি করছি সেটা আমার স্বপ্নের ধারেকাছেও আসেনা।
এইখানেই সমস্যাটা হয়। চাকরি পাওয়ার আনন্দটা যখন উচ্চাকাংখার সাথে মেলেনা। দিন দিন চাকরিক্ষেত্রে আপনি হতাশা পুষতে থাকবেন। দেখবেন আপনার পাশের টেবিলের ছেলেটা যে কাজ করছে সে কাজটাই আপনাকে বারবার টানছে। নিজের ডেস্কের কাজ অবহেলিত হচ্ছে। এভাবে আপনার কাজের মূল্যায়নেও আপনি পিছিয়ে যাচ্ছেন। যারা কাজ এন্জয় করছে তারা কিন্তু অনেক বেশি প্রডাক্টিভ, তারমধ্যে এখন যূগটা হলো কম্পিটিশনের। একটু থেকে একটু পিছিয়ে পড়লে অনেক বেশি ক্ষতি হয়ে যায়!!
আমার চেনা একজন মেধাবী ছেলে পাশ করার পর গোঁ ধরে বসলো সে তার পছন্দের অর্গানিযেশনে কাজ করবে। অন্য কোথাও চাকরির জন্য সে চেষ্টাই করবেনা। সে চাকরির জন্যে আবেদন করলো। এবং চাকরি পেলোও। তবে অর্গানিযেশনটা ছাড়া আসলে চাকরির কোনোও কিছুই তার মনমতো হলোনা। পছন্দের কোম্পানিতে চাকরি পেয়েও সে কিন্তু সেখানে ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে পারলোনা। একসময় সে হতাশা থেকে চাকরি ছেড়ে দিল। ততদিনে অনেক দেরী হয়ে গেছে। সমসাময়িকরা যখন দেড়-দুই বছরে একটা করে প্রমোশন পেয়েছে, ততদিনে সে আবার বেকার। আবার নতুন করে তাকে শুরু করতে হয়েছে অন্য কোথাও। বলাই বাহুল্য, ক্যারিয়ারের সেই গ্যাপ তাকে শুরুতে একটা বড় ধাক্কা দিয়েছিল যার কারণে সেও হয়ে গেল মেইক্-শিফ্ট।
শুরুটা অনেক ইম্পর্ট্যান্ট। সবাই ভুল করে, এই একটা জায়গায়। প্রথমদিন থেকেই স--ব পেতে চায়। ভাল বেতন, ভাল অর্গানিযেশন, মনমতো চাকরি, মনমতো পরিবেশ, সব-স-ও-ব!!
আরে চাকরিজীবন তো আর 'একদিনের' নয়!! আমি যদি মানুষটা চুপচাপ গোছের হয়ে থাকি তবে কি আমার সেইল্সের চাকরি পোষায়? মাঝে মাঝে ইন্টার্ভিউতে অনেকে মরিয়া হয়ে সবকিছুতেই "হ্যাঁ-হ্যাঁ" বলে থাকে।
-ঢাকার বাইরে যেতে আপত্তি? -"না"।
-এই জবটা কিন্তু নো-গ্রোথ পজিশন, আপনি দ্যাখেন চিন্তা করে!-"আমার কোনোই আপত্তি নেই! আমার সারাজীবোনের স্বপ্ন অমুক কোম্পানিতে চাকরি করবো!"
ব্যস্, হয়ে গেল চাকরি। তারপরে একমাস, দু'মাস---আস্তে আস্তে শুরু হলো হতাশা।
---(চলবে)---
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে জুলাই, ২০১০ দুপুর ২:৫০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

