somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ফুটবলবোদ্ধা

১০ ই জুলাই, ২০১০ দুপুর ১:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমাদের মহাল্লার তোতা ভাই দাবি করেন- সে হাল আমলের মেসি-কাকা-রোনালদো-দ্রগবা নয় পেলে-ম্যারাডোনার চেয়ে বেশী ফুটবল বুঝেন। আমাদের চেয়ে বয়সে বড় তার উপর সকাল-বিকাল চা-নাস্তার লোভে আমরা এক বাক্যে স্বীকার করি, তার-ই উচিৎ ছিল ফিফা’র প্রধান হওয়ার।
তিনি ফুটবলের কোন দলের সমর্থক সে-টা রহস্যময় বিষয়। ফুটবল ওয়ার্ল্ড কাপের সময় হট ফেবারিট সব দেশের পতাকা উড়ে তাদের বাড়ীর ছাদে। ফুটবল সম্পর্কে তার ব্যাখা-বিশ্লেষণ-ভবিষ্যৎ মন্তব্য শুনে মনে হয় ফুটবল খেলা চীনে নয় চালু হয়েছে আমাদের রাজশাহীতে আর তার প্রচারক মিং সম্রাটরা নয় আমাদের তোতা ভাই।
আমাদের ছোট্ট রাজশাহীতে খেলা নিয়ে তেমন বাজি ধরার প্রচলন ছিলো না। কিন্তু বলিউডের জান্নাত ছবির ব্যাপক সাড়া ফেললে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়াম লীগ (আই.পি.এল) টু থেকে বাজি ধরা শুরু হয়। আই.পি.এল-থ্রি থেকে তা ব্যাপক আকার ধারণ করে। ক্রিকেটের চেয়ে ফুটবল আরো অনিশ্চিত খেলা- ইঞ্জুরী টাইমেও খেলার প্রকৃতি বদলে যেতে পারে। ফুটবল ওয়ার্ল্ড কাপেও চলে বাজি ধরার ধারা।
ফুটবল ওয়ার্র্ল্ড কাপ শুরু হলে তোতা ভাইয়ের ফুটবল অত্যাচার বাড়ে। বড় স্ক্রিনে খেলা দেখতে গেলে এদিকে ভুঁভুঁজেলার শব্দ অন্য দিকে তোতা ভাইয়ের ফুটবল বিশ্লেষণের বর্ষণ। তখন আমাদের মনে হতো তিনি মিং সম্রাট আর আমরা তার হাতে পরাজিত সেনাপতি। তিনি আমাদের কাটা মন্ডুকে ফুটবল বনিয়ে খেলছেন।
হঠাৎ একদিন কি প্রসঙ্গে আমরা তাকে বলি: ‘ তোতা ভাই, আপনি ফুটবল সম্পর্কে এত জানেন , আগেই বলে দেন কোন দল জিতবে! তাহলে আপনি কেন বাজী ধরেন না। ফুটবল সম্পর্কে অজ্ঞরা বাজি ধরে টাকা কামাচ্ছে। আর আপনি বসে আছেন!’
আমাদের কথায় তোতা ভাইয়ের আতেঁ লাগে। তিনি বাজি ধরা শুরু করেন। তাতে তিনি জিততেন কি না জানি না, তবে ফুটবল ওয়ার্র্ল্ড কাপের গ্রুপ পর্ব শেষ হতে-হতে শুনি বিদেশ থেকে তার দুলাভাইয়ের পাঠানো আই-পড খোয়া গেছে। রাউন্ড অব সিক্সটিন শেষ হবার পরে দেখি তার হাতে সাধারণ মোবাইল ফোন! তার সাধের ব্লাকবেরী হ্যান্ডসেট কি হলো? সে-টা বলে তার ৫ তলার ঘরের জানালা দিয়ে চোর চুরি করে নিয়ে গেছে! কোয়াটার ফাইনাল শুরু হতেই তিনি আমাদের কিছু না বলে হুট করে তাদের গ্রামের বাড়ী চলে গেলেন। আমরা হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। যাক এখন আমরা আরাম করে বড় স্ক্রিনে খেলা দেখতে পারবো।
ফুটবল ওয়ার্ল্ড কাপ শেষ হবার পরে শুরু হয় স্থানীয় সব লোকাল ফুটবল কাপ। ফুটবল ওয়ার্ল্ড কাপের ৬৪টা খেলা দেখে আমরা উৎসাহী হয়ে পড়লাম আমরাও পারবো ভালো ফুটবল খেলে কোন লোকাল কাপ জিততে। কিন্তু সমস্যা জার্সি, বুট, ফুটবল আর এন্ট্রি ফি’র টাকা কোথায় থেকে আসবে। তোতা ভাই গ্রাম থেকে ফিরে আমাদের এড়িয়ে চলছিলেন। আমরা তাকে ধরি একটা ফুটবল টিম করার জন্য। তিনি এক কথায় রাজি হয়ে যান। সে-ই দিন সন্ধ্যায় আমাদের জার্সি, বুট আর বল কিনা হয়ে যায়। টিমের নাম ঠিক হয় ‘রিয়াল রাজশাহী ইউনাইটেড’। তিনি-ই আমাদের কোচ-ম্যানেজার-ফ্র্যাঞ্চাইজার-স্পন্সর। গোল্ড কাপ টুর্নামেন্টে এন্ট্রি ফি জমা দিয়ে প্রতিদিন মাঠে প্রাক্টিসে গেলেও প্রাক্টিস বলটায় একটাও লাথি পড়ে না। আমরা বসে-বসে বাদাম চিবায় আর তোতা ভাই তার ফুটবল খেলার গল্প শোনান।
টুর্নামেন্টে আমাদের খেলা পড়লো মেসে থাকা ক’টা ছেলেদের টিমের সাথে। আমরা ভাবলাম গ্রাম থেকে আসা ছেলেগুলো ফুটবলের কি বুঝে। আমরা ওদের উড়িয়ে দিবো, কিন্তু ওরাই আমাদের আক্রমানাত্যক ৪-৩-৩ ছককে কোথায় উড়িয়ে দিয়ে ০-০-১০ খেলতে লাগলো। গোটা মাঠ ফাঁকা রেখে বল শুধু আমাদের ডি-বক্সে থেকে গেলো। ২০ মিনিটের মধ্যে-ই আমরা কাহিল হয়ে গেলাম, কেও আঘাত পেলো, কেও ভয়ে আঘাতের বাহানা করে খেলতে চাইলো না। শেষে একাদশ পূর্ণ করার জন্য তোতা ভাই মাঠে নামলেন। মধ্য বিরতিতে খোলার ফলাফল ১টা আত্মঘাতি গোল সহ আমরা ১৩টা গোল খেয়েছি আর তোতা ভাই পা মচকালেন ফ্রি-কিক্ করতে গিয়ে।
আমাদের ‘রিয়াল রাজশাহী ইউনাইটেড’ ক্রাস করলেও তোতা ভাইয়ের অতিরিক্ত আত্নবিশ্বাস ক্রাস করে না। ফুটবল নিয়ে বই লেখা শুরু করবেন বলেন, কিন্তু বইটা পেলে না ম্যারাডোনাকে উৎসর্গ করবেন তা ঠিক করতে না পারায় তা আর লেখা হয় না।
আমাদের মহল্লার পূর্ব আর পশ্চিম পাড়ার বৈরীতা কমানোর জন্য স্থানীয় কাউন্সিলার এক প্রিতি ফুটবল ম্যাচ আয়োজন করেন। তোতা ভাই এই ম্যাচে তার ফুটবলজ্ঞান জাহির করতে গেলে কাউন্সিলার সাহেব তাকে অনেক বড় ফুটবলবোদ্ধা মনে করে ঐ ম্যাচের রেফারির দায়িত্ব দেন।
শুক্রবার বিকাল ৫টা থেকে খেলা শুরু হয়। কিন্তু ঘড়ি ধরে টানা ২ মিনিট অর্থাৎ ১২০ সেকেন্টও খেলা হয় না। কিছুক্ষণ পরপর রেফারি তোতা ভাইয়ের বাঁসি। এলাকা বসীর সামনে নিজের ফুটবলজ্ঞান প্রচার করার সুযোগ ১ ইঞ্চি ছাড়লে না। প্রিতি ফুটবল ম্যাচটা প্রক্টিস সেসান বনিয়ে রেফারি থেকে কোচ হয়ে গেলেন। ২২ জন খেলোয়াড় সহ দর্শকদের তিনি বল পাস, ড্রিবলিং, ফ্রি-কিক শেখাতে লাগলেন। যারা প্রতিবাদ করতে গেলো তাদের হলুদ কার্ড দেখালেন। পূর্ব পাড়ার এক খোলোয়ারকে ২ বার হলুদ কার্ড দেখালে লাল কার্ড হয়ে যায় ফলে ঐ খেলোয়াড়কে মাঠ ছাড়তে হয়। এতে প্রতিবাদে পূর্ব পাড়ার দর্শক মাঠে নেমে পড়লে পশ্চিম পাড়ার দর্শকরাও মাঠে নেমে পড়ে। দুই পক্ষের মধ্যে তর্ক থেকে মারামরি শুরু হয়ে যায়। মধ্য পাড়া লোকজন দুই পক্ষকে থামতে গেলে ত্রিমুখি সংঘর্ষ শুরু হয়ে যায়। সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে কাউন্সিলার সাহের নিজেই বেদম মার খেলেন। RAB-এর গাড়ী আসছে শুনে সংঘর্ষটা বড় আকার ধারণ করার আগেই সবাই সরে যায়। তোতা ভাই কিছুদিনের জন্য গা ঢাকা দেন। তার সফল ব্যবসায়ী পিতা পরিস্থিতি সামলে নেন। তোতা ভাইয়ে ফুটবলের উপর তিনি কঠোর নিষেধাক্কা জারী করেন। তিনি ঘোষণা দেন তোতা ভাই ফুটবলের ‘ফু’ উচ্চারণ করলেই বাড়ী থেকে বের করে দিবেন। কিছু দিনের মধ্যে তাকে ঢাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
তারপর অনেক দিন ধরে তোতা ভাইয়ের কোন খবর নাই হঠাৎ একদিন টিভি’র চ্যানেল বদলাতে-বদলাতে এক চ্যানেলের স্পোর্টস টক সো তে চোখ আটকে যায় দেখি বাফুফে’র কর্মকর্তা তোতা ভাই সাম্প্রতিক ফিফা’র ফুটবল সম্মেলনের যোগদানের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করছেন তার স্বভাবসুলভ ফুটবলজ্ঞান বর্ষণ ধাঁচে।
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

=একান্ত নিজস্ব জিনিসগুলো পর হয়ে যাচ্ছে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৫



যে চোখ দিয়ে দেখেছি ধরার আলো, সে চোখও দিচ্ছে ফাঁকি,
যে চোখের আলোয় দেখেছি পুকুর নদী, শুকনো উঠোন;
বৃষ্টি ভেজা দিন, দেখেছি ময়না শালিক, ঘুঘু ডাকা দুপুর
সে চোখ পর হয়ে যাচ্ছে অল্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×