somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দুঃখ দিনের গান-১

২৭ শে জুলাই, ২০০৯ দুপুর ১২:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


----আমি বুঝতে পারছি , আমার পেছনে ফেউ লেগেছে। কিন্তু জায়গাটা একদম অচেনা। সামনে দিগন্ত বিস্তৃত সাগর ছাড়া আর কিছু দেখতে পাচ্ছি না। বড় বড় ঢেউ ওঠা নামা করছে।
আকাশের চাঁদ দেখে নিশ্চিত হয়ে বলা যায়, আজ পূর্ণিমা। সেই আলোতেই হঠাৎ ছায়াটা দেখে ফেলেছি। হাতে কি যেন একটা নিয়ে দ্রুত এগিয়ে আসছে আমার দিকে। লোকটা অনেক ক্ষণ ধরেই আমাকে ফলো করছে।
ফেউটাকে খসানোর অনেক চেষ্টা করে, ব্যার্থ হয়ে প্রাণপ্রণ দৌড়ানো শুরু করলাম। জোৎস্নার আলোয় ধু ধু করছে চারিদিক। লুকোবার জায়গা পাচ্ছি না। সমুদ্রের শো শো গর্জন শোনা যাচ্ছে। পেছনে অচেনা শত্রু। সমুদ্রের কিনারায় প্রায় পৌঁছে গেছি, পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়লে হয়তো বিপদটা কিছুটা এড়ানো যাবে। পানিতে ঝঁপিয়ে পড়তে যাবার ঠিক আগ মুহূর্তেই গর্জে উঠলো শত্রুর হাতের অস্ত্রটা। পর পর দুবার। এত কাছে থেকে টার্গেট মিস হবার কোন কারণ নেই। সরাসরি পানিতে পড়বার আগে বুঝতে পারলাম, প্রচন্ড ঝাঁকি খেয়ে উঠলো শরীরটা। পানিতে পড়তে পড়তে আমি দেখলাম, আমার বুক থেকে গড়িয়ে পড়া তাজা রক্ত মিশে যাচ্ছে পানিতে।

জাহিদ, এই কি হয়েছে তোমার? কে যেন ঝাঁকুনি দিচ্ছে আমাকে। চোখ খুলতেই, ঘরের তীব্র আলোটা চোখ ধাঁধিয়ে দিল আমার। প্রথমে চিনতেই পারছিলাম না সামনে বসা মেয়েটাকে।
অবয়বটা স্পষ্ট হতেই বুঝলাম যূথি। এত শো শো শব্দ কিসের?
- ও এই কথা, বৃষ্টিসহ বাতাস হচ্ছে বাইরে। যে হারে বিদ্যুত চমকাচ্ছিল, আমি তো ভেবেছি আসতেই পারবো না। কড় কড় করে বাজ পড়লো কোথায় যেন।
- এই অবেলায় এভাবে ঘুমাচ্ছিলে কেন? কেমন ছটফট করছিলে। নিশ্চই কোন দুঃস্বপ্ন দেখেছ। বলতে বলতে যুথি দৌড়ে গিয়ে বিছানা বরাবর জানালাটা আটকে দেয়।
দেখেছ, তুমি তো ভিজেই গেছ প্রায়।
- এই জন্যই কি পানির অনুভূতি টের পাচ্ছিলাম? উঠে বসি। চোখের কোণাতেও কেমন ভেজা স্বাদ টের পাই।
যুথির অলক্ষে চোখ মুছি। কি জন্য জানি না। দুঃস্বপ্ন দেখে বোধ হয়।
নাকি যুথিকে বিদায় দিতে আমার কষ্ট হচ্ছে? গত এক সপ্তাহ ধরে যুথি আর আমি এক সঙ্গে থাকছি না।
আমার সাথে নাকি আর কোন কিছুই মিলছে না। যুথি নাকি বড্ড ক্লান্ত। এ সম্পর্কটাকে আর বয়ে বেড়াতে পারছে না।
বেশ ছিল, আমাদের "যৌথ জীবনের" সংসার। লিভিং টুগেদার এর বাংলা কি হয়-- "যৌথ জীবন?"
এক সাথে ছিলাম, অনেকটা সময়। টানা দুবছর। একই ছাদের তলায়। আজ দুবছর পর ওর মনে হচ্ছে এভাবে থাকার কোন মানে হয় না। কেন এমন মনে হচ্ছে, এ প্রশ্ন করা শোভন নয়। যৌথ জীবনে এসব নিয়ম নেই।

দুবছর পর, আমরা সেদিন আমরা পরষ্পর পরষ্পরকে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম। আমরা কেউ কাউকে বিন্দু মাত্র আঁচ করতে দেইনি, কি হতে পারে?
আমি বেইলী রোডে দিয়েছিলাম কেকের ওর্ডার। কিনেছিলাম একটা পছন্দের জামদানী। এক গোছা ফুল।
তারপর তারাভরা এক সন্ধ্যায় চা খেতে খেতে, যুথিকে বলেছিলাম-- তুমি আমাকে বিয়ে করবে যুথি? আমি তোমাকে সারাজীবন আমার কাছে রাখতে চাই।
কেউ অনেকক্ষণ কোন কথা বলতে পারিনি।
-যুথিই নীরবতা ভাঙ্গে। তা এখন আর হয়না জাহিদ।
-কেন হয় না যুথি?
যুথি আমাকে ওর খবর টা দিল। ও ওর অফিস থেকে একটা ট্রেনিং এর জন্য দুবছরের জন্য আমেরিকা যাবার সুযোগ পেয়েছে।সাথে আরও বল্লো ও আর এই সম্পর্কটা টানতে চায় না।
আমরা দুজনেই বিশেষ সারপ্রাইজড হয়েছিলাম।
আমি নির্বাক হয়ে কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
- তুমি কি একটা দিনের জন্যও বনিকে ভুলতে পেরেছ? একটা মুহূর্তের জন্য? তুমিইতো বিয়ের ব্যাপারে ঘোর বিরোধী ছিলে। আজ আমার ক্যারিয়ারে একটা নতুন পালক যোগ হচ্ছে, আর তুমি বলছ বিয়ে করে সংসারী হতে।
-- এরকমটা ঠিক তোমাকে মানায় না।


-আজ কত তারিখ যুথি? স্মৃতির যাবর কাটা রেখে আমি প্রশ্ন করি।
-যুথি তার পরিচিত ঘরে, অভ্যস্থ হাতে নিজের জিনিসগুলো গোছাতে গোছাতে বলে, বাংলা না ইংরেজীটা জানতে চাও?
-বাংলাটাই বলো।

- ১৬ শ্রাবণ।
- আমার বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। ও আচ্ছা। তুমি কখন ফিরে যাবে?
- কেন?
- আমার কেমন ভয় ভয় করছে। আমি যুথির কাঁচ ভাঙ্গা হাসি শুনতে পাই।
- অন্ধকারকে ভয় তোমার?
- আমি যুথিকে দুর্বল করার চেষ্টা করি, বৈদ্যুতিক আলোর নীচে আমি জীবনানন্দকে টানি
গভীর অন্ধকারের ঘুম থেকে নদীর চ্ছল চ্ছল শব্দে জেগে উঠলাম আবার ;
তাকিয়ে দেখলাম পান্ডুর চাঁদ বৈতরণীর থেকে তার অর্ধেক ছায়া
গুটিয়ে নিয়েছে যেন
কীর্তিনাশার দিকে ।

ধানসিড়ি নদীর কিনারে আমি শুয়েছিলাম--পউষের রাতে--
কোনদিন আর জাগবো না জেনে
কোনদিন জাগবো না আমি --কোনোদিন জাগবো না আর--

যুথি আমাকে হেলাল হাফিজ উপহার দেয়

কষ্ট নেবে কষ্ট
হরেক রকম কষ্ট আছে
কষ্ট নেবে কষ্ট !

লাল কষ্ট নীল কষ্ট কাঁচা হলুদ রঙের কষ্ট
পাথর চাপা সবুজ ঘাসের সাদা কষ্ট,
আলোর মাঝে কালোর কষ্ট
'মালটি-কালার' কষ্ট আছে
কষ্ট নেবে কষ্ট ।

আমরা দুজনেই খুব ভালো আবৃত্তি করি। আমাদের দুজনের অনেক মিল, চিন্তা চেতনায়।
তারপরও আমরা পরস্পরকে ধরে রাখতে পারছি না।
যুথি আমাকে অভ্যস্থ হাতে এক কাপ চা এগিয়ে দেয়। প্রিয় নারীর মত বলে,
- তুমি বড্ড কষ্টবিলাসী জাহিদ। এখন চা টা শেষ কর। তারপর হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও। বৃষ্টি থামলে কোথাও ঘুরে এসো।
আমি চা শেষ করেই চলে যাব। যা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ছিল আমার সব গুছিয়ে নিয়েছি। আরও কিছু টুকটাক রইল। হয়তো আরও দু একদিন তোমার এখানে আসতে হতে পারে।
সব নেওয়া হলে তোমাকে চাবি টা ফেরত দেব।
-- যুথির কথা খুব একটা কানে যায় না। আমার মাথায় ঘুরতে থাকে-- আজ ১৬ ই শ্রাবণ
----- মস্তিষ্কের দেয়োলে দেয়ালে প্রকম্পতি হতে থাকে আজ ১৬ ই শ্রাবণ।
-- যুথি বলে, আসি।

--আমি আবৃত্তি করি,
এবার আমি তোমার ভবিষ্যত বলে দিতে পারি ।
- বলো ।
- খুব সুখী হবে জীবনে ।
শ্বেত পাথরে পা ।
সোনার পালঙ্কে গা ।
এগুতে সাতমহল
পিছোতে সাতমহল ।
ঝর্ণার জলে স্নান
ফোয়ারার জলে কুলকুচি ।
তুমি বলবে, সাজবো ।
বাগানে মালিণীরা গাঁথবে মালা
ঘরে দাসিরা বাটবে চন্দন ।
তুমি বলবে, ঘুমবো ।
অমনি গাছে গাছে পাখোয়াজ তানপুরা,
অমনি জোৎস্নার ভিতরে এক লক্ষ নর্তকী ।

-- যুথি কি আমার কবিতা শুনতে পায়? কিন্তু আমি ওর ফিরে যাবার পদশব্দ শুনি।

চলবে।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে জুলাই, ২০০৯ দুপুর ১২:৪৩
২১টি মন্তব্য ১৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রাসূলের (সা.) অনুসারি হবেন শুধুমাত্র সাহাবা (রা.), অন্যরা এবং ওলামা ওলামার অনুসারি হবেন

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:৪০




সূরাঃ ৩৫ ফাতির, ২৮ নং আয়াতের অনুবাদ-
২৮। এভাবে রং বেরং- এর মানুষ, জন্তু ও আন’আম রয়েছে। নিশ্চয়ই আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে (ওলামা) আলেমরাই তাঁকে ভয় করে।নিশ্চয়্ই আল্লাহ পরাক্রমশালী ক্ষমাশীল।

সূরা:... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নবীজির শেখানো এক অনন্য আমল

লিখেছেন নতুন নকিব, ১১ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৯:০৩

দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নবীজির শেখানো এক অনন্য আমল

ছবি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

মানুষের জীবন মূলত অসংখ্য ছোট-বড় সিদ্ধান্তের সমষ্টি। প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি মোড়ে আমাদের কোনো না কোনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×