বাচ্চারা প্রতিদিন নানা ধরনের ঝামেলার কাজ করে থাকে। ওরা এতো এ্যনার্জি পায় কোথায় বুঝিনা! বাপ্রে বাপ, সেই সকালে ঘুম থেকে উঠে খেলা আর খেলা। দুপুরে ঘুমের কথা বললে শোনেইনা। রাতেও যেন ঘুমাবার নাম নেই। সত্যিই ওদের সাংঘাতিক এ্যনার্জি। বাচ্চারা সারাটাদিন দুষ্টমী করবে সেটাই যেন স্বাভাবিক। ওরা জিনিষপত্র ছুঁড়ে মারবে, ভাংবে, অগোছালো করবে, ফেলে দেবে এগুলিই যেন ওদের কাজ। দেখুন এই কাজগুলি আমরা ওদের হয়তো শেখাইনা তারপরও ওরা এগুলিই করে আপন মনে। তারমানে এগুলি আমাদের মেনে নিতে হবে যে শিশুরা এই ধরনের বিরক্তকর কাজগুলি করবেই। এখন আমাদের কাজ হবে, ওদেরকে লাইনে আনা, তাই না? আমরা গার্ডিয়ান/গার্জিয়ানরা যদি হাল ছেড়ে দেই ওদেরকে লাইনে আনতে তাহলেতো হবেনা, কি বলেন? ওদের দুষ্টুমী আচরনগুলি যেন কন্ট্রোলে আনতে পারে সেই শিক্ষাইতো দিতে হবে, তাই না?
এই বিষয়ে আমিও অনেক ভেবেছি। আমার জমজ বাচ্চাদুটিও যে বিরক্ত করেনি তা কিন্তু নয়। ওদের বিরক্তিতেও চিৎকার চেঁচামেচি করতে হয়েছে, সত্যি। আমি ভাবতাম এমন কোন ভালো উপায় আছে নাকি যার মাধ্যমে তাড়াতাড়ি ওদেরকে সাইজ করা যাবে। এখন যে বুদ্ধীটির কথা বলবো সেটা আমার আবিষ্কার নয়। কোন এক ব্লগে পেয়েছিলাম বুদ্ধিটি। প্রথম প্রথম ভেবেছিলাম বুদ্ধিটি খাটালে হয়তো আপাতত পজেটিভ কিছু পেলেও ভবিষ্যতের জন্য এটা নেগেটিভ প্রভাব ফেলবে। কিন্তু না, তা হয়নি এখন পর্যন্ত। বরং আজ পর্যন্ত ভালো কাজ দিচ্ছে যদিও আমি নিজেই সব সময় বিষয়টি পালন করে আসতে পারছিনা বা করছিওনা। তবে কাজে দিচ্ছে।
বুদ্ধিটি হলো, শিশুদের ভালো কাজের জন্য ওরা কিছু কামাই করবে। ঠিক তাই, ইনকাম করবে। না ভাই, টাকা পয়সা ইনকাম করবেনা। ইনকাম করবে কিছু টিকেট বা কুপন যাই বলেন। সেই টিকেট বা কুপন তারা জমাবে। এবং একটা পর্যায়ে সেই টিকেট দিয়ে তাদের মনের ইচ্ছা পূরন করবে। খুব সহজেই বুঝিয়ে দিলাম, বুঝলেন তো?
আমি কিভাবে বিষয়টি বাস্তবায়ন করি?
যেমন ধরুন ওরা সকালের নাস্তা খেতে প্রচুর সময় নিচ্ছে বা মারাত্নক ধিরে ধিরে খাচ্ছে। অমনি ঘোষণা দিয়ে দেই যে যদি আর ১০-১৫ মিনিটে সুন্দর করে (গাপুস-গুপুস করে নয়) খেয়ে ফেলে তবে সে টিকেট পাবে। আবার ধরুন ঘরে খেলনা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখেছে। অনেকক্ষন খেলা করেছে। এবার ওকে দিয়েই খেলনাগুলি গুছিয়ে রাখতে টিকেট দেবার ঘোষনা দেই। তেমনি যদি নিজের দাঁত নিজেই ব্রাস করে তাহলেও টিকেট দেই। এভাবে বিভিন্ন ভালো ভালো কাজের জন্য বা ওরা যদি ওদের কাজ নিজে নিজে সুন্দর করে করে তবে আমি ওদের টিকেট দেই।
টিকেট কিভাবে কাজে লাগাবে?
ওরা টিকেট হাতে পেয়েই খুব খুশী থাকে। অনেক প্রশ্ন করে টিকেট দিয়ে কি করতে পারবে সে সব বিষয়ে জানতে। আমিও ঘোষণা দেই যেমন, ৪টি টিকেট জমাতে পারলে আইসক্রিম খেতে দেবো। ৬টি টিকেট জমাতে পারলে মজার মুভিটি দেখতে দেবো। ৫টি টিকেট জমাতে পারলে কম্পিউটার গেম খেলতে দেবো একটু বেশীক্ষন ধরে। ইত্যাদি। আশা করি বুঝতে পেরেছেন। আমার বাচ্চারাই ডিসিশন নেয় যে, ওরা ওদের টিকেট দিয়ে কি করবে। যদি আইসক্রিম খেতে চায়, তবে এনে দেই এবং ওদের কাছ থেকে ৪টি করে টিকেট ফেরত নিয়ে নেই।
টিকেট বানাবো কি দিয়ে?
আমি টিকেট বানিয়েছি ইউজ না করা বাতিল বিজনেজ কার্ড দিয়ে। আমাদের অনেকেরই এমন ১-২ বক্স বিজনেস কার্ড পড়ে থাকে। সেগুলির অপরদিকটা সাদা থাকে। সেদিকে সাইন পেন দিয়ে মজার একটা ছবি এঁকে দেবেন। আর সেটাকে টিকেট হিসাবে দিয়ে দেবেন, ব্যাস। দেখবেন বেশ যত্ন করে রাখবে টিকেটগুলি। তবে যদি আপনার সময় আর সামর্থ থাকে তবে নিজেই কুপনের মতো করে কিছু একটা ডিজাইন করে প্রিন্টারে প্রিন্ট করে বানাতে পারেন কিছু একটা (আমিও একটু ট্রাই করেছিলাম)
টিকেটের প্রয়োগ:
আমি সব সময় ওদের মনের ইচ্ছাগুলি টিকেটের বিনিময়ে করাই না। বরং ওরা হয়তো টিকেট দিয়ে আইসক্রিম খেতে চাইলো, আইসক্রিম আনলাম, ওরা খেলো, টিকেট দিতে চাইলো আমাকে আর আমিও ঘোষনা দিলাম যে টিকেট লাগবে না, ওরাও আরো আনন্দে মেতে উঠলো এইভেবে যে টিকেটগুলি দিয়ে মনের অন্য ইচ্ছাগুলি পুরন করতে পারবে।
তবে টিকেট বিনিময় একমত্র উপায় নয় শিশুকে ভালো কাজে উৎসাহ দেবার জন্য। শিশুর সাথে আচরনগত যে বিষয়গুলি অবশ্যই পালন করবেন সেগুলি এমন:
(ক) শিশুর যে কোন ভালো কাজের প্রসংশা করবেন বেশ ভালো মতোই। সাথে আরো বাড়তি কথা বলবেন। যেমন: "বাহ্ তুমিতো বেশ সুন্দর করে তোমার পোষাকগুলি গুছিয়েছো! জানো আমি যখন ছোট ছিলাম তোমার মতো করে এমন সুন্দর করে গোছাতে পারতাম না।" যদি এভাবে কথাগুলি বলতে পারেন তবে দেখবেন আপনার সন্তান বেশ উৎসাহ পাবে।
(খ) সন্তানের বিভিন্ন ভুল কাজে নিরুৎসাহিত করবেন না। শিশুরা বিভিন্ন কাজে ভুল করবেই। সেই ভুল ধরিয়ে শুধরিয়ে দেয়াই আমাদের কাজ, এটা মাথায় রাখবেন। কেন আপনার সন্তানকে একটা কথা চৌদ্দবার বলতে হচ্ছে, এই ধরনের চিন্তা মাথায় রাখবেন না। বারবার বলতে হবে এটাই স্বাভাবিক। একটা ভুল করলেই যদি ধমক দেন, চিৎকার দেন, থাপ্পর দেন তবে কিন্তু সে মনোযোগ দিয়ে আপনার কথা শুনবেনা। বরং বাড়তি ভয়ে থাকবে এবং আরো ভুল করতেই থাকবে। বরং যখন প্রথমবার ভুল করবে তখনি কাছে বসিয়ে পুরো বিষয়টি বুঝিয়ে দিন। বোঝাতে গিয়ে আপনার ছোট বেলার ঘটনা বলুন। বা আপনার বন্ধুর জীবনে ঘটে যাওয়া ভুল ঘটনাটি বলুন। সাথে আরো কিছুক্ষন যদি ঘটনাটি নিয়ে বাচ্চার সাথে কথা বলেন তবে দেখবেন সে ভুল কাজটা সহজে আর রিপিট করবে না। কারন প্রথমবারেই আপনি যথেষ্ট সময় নিয়ে তার মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছেন বিষয়টি।
আপনার সন্তানকে নিয়ে কোন প্রশ্ন থাকলে এখানে ক্লীক্ করে প্রশ্ন করতে পারেন। আর শিশু লালন-পালনের উপর আরো বিভিন্ন বিষয়ে জানতে এই লিষ্টটি দেখুন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


