বার্ষিক পরীক্ষা শেষ। স্কুল বন্ধ। শুভ ক্লাস টু'র পরীক্ষা দিয়েছে। থ্রিতে উঠবে। ছুটি পেয়ে জ্যাঠাদের বাসায় বেড়াতে এসেছে। জ্যাঠাদের বাসায় বেড়াতে আসার আগে ও ঠিকমতো বুঝতোইনা জ্যাঠা কাকে বলে। চাচাদের মধ্যে যারা বাবার বড় তারাই হচ্ছে জ্যাঠা। আর যারা বাবার ছোট তারাই হচ্ছে চাচা। ওর বাবার বড় একজনই। তাই ওর জ্যাঠাও একজন।
ওর জ্যাঠাদের বাড়িটা খুব সুন্দর। বেশ বড় বাড়ি। দু'দিকে দেয়াল আছে। দু'দিকে নেই। একদিকে একটা পুকুর। পুকুরের ওপারেও বাড়িঘর নেই। অনেক দূর পর্যনত্দ ধনিচার জঙ্গল।
যেদিকে পুকুর নেই সেদিকে শরিষা ৰেত। শরিষা ৰেতের ভেতর দিয়ে একটা রাসত্দা চলে গেছে। অনেক দূর। ধানৰেতের মাঝামাঝি একটা তেতুল গাছ। রাতে সেখানে ভূত থাকে। ভরদুপুরে দিনেও থাকে। ভরদুপুরে একা সেদিকে তাকাতে নেই।
জ্যাঠাদের বাড়িটা আমগাছে ভতর্ী। পেয়ারা গাছ মাত্র তিনটা। তিনটা গাছের পেয়ারাই ভেতরে লাল হয়।
ওর জ্যাঠাতো বোন তিনজন। রিনা, মিনা, রিতা। ভাই দু'জন। রাসেল, সোহাগ। সবাই গেছো বাঁদর। অনায়াসে গাছে উঠে যায়। ডালে চড়ে চড়ে অন্যগাছে যেতে পারে। ভাইগুলি বয়সে শুভ'র ছোট। কিন্তু ওরাও গাছে চড়তে কম যায় না।
শুভ কোন রকমে চেষ্টা করে একটা আম গাছে উঠেছে। আর নামতে পারছে না। নামার ইচ্ছেও নেই। ও একটা গাছে বসেই কাটিয়ে দিলো।
কিছুৰন পর রানী আপা এলেন ওদের ডাকতে। রানী আপা ওদের আত্মীয়। বয়সে কয়েক বছরের বড়। মানে ছোটদের মধ্যে একটু বড়। 'ওই তরা গাঙ্গে গোসুল করতে যাবিনি?'
গাছ থেকে তিন বোন লাফিয়ে ঝাপিয়ে নামলো। নদীতে গোসল করতে যাবে। তিনবোন মিলে গাছ থেকে নামালো শুভকেও। ওকেও নিয়ে যাবে। রানী আপার ডাক শুনেই এলেন জ্যাঠি। 'রানী শুভ কিন্তু সাতার জানে না। ওরে নিলে সাবধানে রাখবি। ঠাইয়ের মইধ্যে গোসুল করবি।'
'খালা এতো চিনত্দা কইরো নাগো। ওয় আমার লগে থাকবো।'
ঊাড়ি থেকে বের হলেই ইট বিছানো রাসত্দা। রাসত্দার পরেই মাটি ঢালু হয়ে নেমে গেছে নিচে। এরপর নদী।
'ওই আজকা এদিক দিয়া নামতাম নারে। আজকা মসজিদের সামনে দিয়া নামমু। এদিকে ঠাই অইতো না। সাঁতরাইতে অইবো। ওদিক দিয়া অনেক দূর পর্যনত্দ ঠাই।'
ইট বিছানো রাসত্দার পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ওরা অনেক দূর গেলো। রাসত্দার বাদিকে একটা পুরনো মসজিদ। ডানদিকে অনেক দূর পর্যনত্দ নদীর তীর। তীর ধরে ওরা দৌড়ে নদীতে নেমে গেলো। নদীতে নেমেই ঝাপাঝাপি। গ্রামের বহু মানুষ ছেলেপুলে নিয়ে গোসল করতে নেমেছে। শীতের দিন। তাই প্রথমে পানিতে নামতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু নামলে আর উঠতে ইচ্ছে করে না। উপরের চাইতে পানি কিছুটা গরম। উপরে উত্তুরে বাতাসে শীত লেগে যায়।
পানিতে নেমে শুভ'র মনেই হচ্ছে না ও সাঁতার জানেনা। তবে রানী আপা ওকে ঠিক চোখে চোখে রাখছেন। সামনে একটা ঘাট। নদীর গভীর পর্যনত্দ নেমে গেছে ঘাটের সিড়ি। রানী আপা শুভকে কড়া করে বলে দিয়েছেন সিড়ির কাছে যাবি না। ডুব সাঁতারের চেষ্টা করবি না।
শুভ প্রথম দিকে রানী আপার কথা মেনেই চলছিলো। একটু পরে ওর বয়েসি কতগুলি ছেলেমেয়ে নেমে ডুব সাঁতার শুরম্ন করলো। শুভকেও ওরা সাথে নিলো। শুভ ডুব দিয়ে সাঁতড়ে বেশিদূর যেতে পারে না। ডুব দিয়ে মাটি ধরে ধরে এগোয়। দারম্নন লাগছিলো খেলাটা।
হঠাৎ মনে হলো মাথা কোন কিছুর সাথে ধাক্কা খেলো। ঘাটটার সাথে নাকি? যাক অসুবিধা নেই। বেশি বোধহয় লাগেনি। মাথা ব্যাথা করছে না। শুভ পানির নিচেই সামনের দিকে তাকালো। পানির নিচে কতগুলি ছেলেকে দেখা যাচ্ছে। একটা ছেলে পানির নিচে ঋষিদের মতো বসে মিটিমিটি হাসছে। আরে এতো ওর জ্যাঠাতো ভাই সোহাগ। সাথের ছেলেগুলি ওকে ঘিরে খেলছে। ওরা কারা? একটা ছেলের গালে বেশ বড় একটা তিল। আরেকটা ছেলের মাথার চুল জট পাঁকানো। শরিরে একটা পৈতা। ওরা আসত্দে অসত্দ ঝাপসা হয়ে আসছে। শুভ চাইছে ওদের দিকে তাকিয়ে থাকতে। ওদের ডাক দিতে। কিন্তু পারছে না। শরির কেমন নিসত্দেজ হয়ে আসছে।
'তরা ছেড়ারে থুইয়া কই গেছিলি? ওয় দুখ্খু পাইলো কেমনে...'
রানী আপাসহ শুভ'র জ্যাঠাতো ভাইবোনদের তুমুল বকাঝকা করছেন জ্যাঠি। ও চোখ খুলে দেখলো বাড়িতে লোকজনে ভতর্ী। নদীতে ডুব সাঁতার দিয়ে ঘাটের সাথে মাথা ঠুকে গিয়েছিলো শুভ'র। মাথা ঠুকে অজ্ঞান হয়ে গেছে। মাথা কেটেছে সামান্য। তবে মাথা ফুলে ফুটবলের মতো হয়ে গেছে। রানী আপা ওকে উদ্ধার করে বাসায় এনেছে। নইলে হয়তো নদীতে ডুবে মারাই যেতো।
জ্যাঠা বসেছিলেন একটু দূরে। শুভকে চোখ খুলতে দেখে এগিয়ে এলেন। এবার বকাঝকা শুরম্ন হলো ওকে। 'তরে রানী না করে নাই ডুইব্বা সাতরাইতে? ডুব দিছস তো দিছস আবার গেছস সিড়ির সামনে? এখলা এখলা কেলেস্নইগা ডুব দিলি?'
'আমি তো একা না। যখন ডুব দিলাম তখন দেখলাম সোহাগ পানির নিচে বসে মিটিমিটি হাসছে। আর ওর চারিদিকে কয়েকটা ছেলে খেলছে। আমি দেখলে ওদের চিনবো। একটা ছেলের মাথায় চুল জট পাকানো। আরেকটা ছেলের গালে বড় তিল। একটা ছেলে...'
শুভ'র কথা শুনে সবাই কেমন চুপ হয়ে গেলো। নিরবতা ভাঙ্গলো এক মহিলার কান্না। তিনি এসে জড়িয়ে ধরলেন শুভকে। 'বাবা যেই ছেলেটার মাথায় জটা ওর শইলে কি পৈতা আছে? এইযে শইলেস্ন ঝুলইন্না সাদা মোটা সুতা?'
শুভ পৈতা চেনে। 'হ্যা, পৈতা ছিলো।'
'অই ছেলেটা কেমন আছে? আমার অনিল কেমন আছে?'
শুভ প্রশ্ন বুঝলো না। পানির নিচে আর বাচ্চারা কেমন থাকবে? ভালই আছে। গোসল করছে। কিছুৰন পর গোসল সেড়ে বাসায় চলে আসবে। শরির মুছে ভাত খাবে। যেমন সোহাগ গোসল করতে নেমেছিলো। এতৰনে নিশ্চই সোহাগও ভাত খেয়ে ফেলেছে।
শুভ'র সামনে এসে দাড়ালো সোহাগ। সব সময় হাসি হাসি সোহাগ ভয়ে চুপসে গেছে। জ্যাঠা-ই ওকে জিজ্ঞেস করলেন, 'ওই তুই ঘাটলার নিচে বইয়া আছিলি?'
শুভর দিকে তাকিয়ে বললো সোহাগ, 'ভাইরে আমি আজকা নদীত নামি নাই। রানী আপায় আমারে সবতের জামা কাপড় দেহনের লেইগা পারে বহাইয়া রাখছিলো। আমারে কইছিলো সবতের গোসুলের পর আমারে গোসুল করাইয়া দিবো। ভাইরে তুই কারে দেখছস ভাই? কারে দেখছস?'
শুভ'র মাথা কেমন খালি খালি লাগছে। সোহাগ নদীতে নামেনি। তাহলে ও কাকে দেখেছে? কাকে দেখেছে? ও আর জেগে থাকতে পারছে না। ওর ঘুম পেয়ে যাচ্ছে।
অনিলের মা'র কান্না থামছে না। উনি কেঁদেই চলেছেন। অচেতন হতে হতে শুভ অনিলের মা'র কান্না শুনতে পেলো।
শুভ যাদের পানির নিচে দেখেছে সোহাগ ছাড়া সবাই মারা গেছে। প্রতিবছরই নদীর ঘাটের পাশে এক দুইজন বাচ্চা মারা যায়। তবে মরে যাওয়া বাচ্চাদের অনেকেই সেখানে খেলতে দেখে। পানির নিচে , ঘাটলার পাশে তারা খেলে। মাথায় জটাওয়ালা ছেলেটির নাম অনিল । গ্রামের ধোপার ছেলে। গতবছর বর্ষার সময় নদীতে গোসল করতে গিয়ে ও মারা গেছে। গালে বড় তিল যে ছেলেটার ওর নাম বিপস্নব। মারা গেছে আরো কয়েক বছর আগে। এবার হয়তো শুভ'র পালা ছিলো। রানী আপার জন্য ও বেঁচে গেছে।
শুভ'র দাদি বললেন, 'আমি খোয়াজ খিজির (আ
খবর পেয়ে চলে আসলো শুভ'র বাবা মা। শুভকে নিয়ে গেলো।
বার্ষিক পরীৰ্যার পরের ছুটিটার বেশিরভাগ এবার শহরেই কাঁটলো।
দেখতে দেখতে বর্ষা চলে এলো। শুভ'র বর্ষা ভালো লাগে। বৃষ্টি হলে স্কুল থেকে ফেরার সময় রিকশা পাওয়া যায় না। রিকশা দিয়ে আসলেও বৃষ্টিতে কমবেশি ভিজতে হয়। ওর মা অনেক চিনত্দায় থাকেন ওর বৃষ্টিতে ভেজা নিয়ে। কিন্তু ওর বৃষ্টিতে ভিজতে দারম্নন লাগে।
গত কয়েকদিন ধরে ঝুম বৃষ্টি হলো। আজ বৃষ্টি নেই। কিন্তু আকাশের মেঘ কাঁটেনি। বিকেলে ছোট চাচা এলেন বাড়িতে।
শুভ'র জ্যাঠাতো ভাই সোহাগ মারা গেছে। নদীতে ডুবে।
শুভরা সবাই গেলো ওর জ্যাঠাদের বাড়ি। নদী থেকে সোহাগের লাশ তোলা হয়েছে। লাশটি পাওয়া গেছে নদীর ঘাটের পাশে। পানির নিচে বসা অবস্থায় লাশ। মুখে মিটিমিটি হাসি। যেন ও মারা যায়নি। খেলছে। #
শরীফ উদ্দিন সবুজ
১২-১২-২০১১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


