somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গাছ

২২ শে ডিসেম্বর, ২০১১ সকাল ১১:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :





রুমুর মন খারাপ। ওরা এতদিন ওদের দাদার বাড়িতে থাকতো। কিন্তু বাবার সাথে চাচাদের ঝগড়া হওয়ায় বাবা ঐ বাড়ি ছেড়ে দিয়েছেন। ওরা এখন একটা বাসায় ভাড়া এসেছে। তিনতলা বাড়ির তৃতীয় তলা। বাড়িটা ভালোই। একদিকে একটা খোলা মাঠ। একদিকে একটা চিকন রাস্তা। রাস্তার পরে ডাবগাছ ঘেরা একটা বিশাল পুকুর। আরেক দিকে একটা বেশ পুরনো বাড়ি। বাড়ির সামনে কয়েকটা পাইন গাছ। পাইন গাছগুলির সবচেয়ে উপরের অংশটা ওদের জানালা পর্যন্ত। গাছের পাতা জানালা দিয়ে ধরা যায়।
বাড়িটা মোটামোটি সুন্দর। কিন্তু রুমুর মন ভালো হচ্ছে না। বাড়ি সুন্দর হলে কি হবে বাড়িতে শুধু ওরা দু'জন। রুমু। আর রুমুর মা লিনা। অথচ দাদার বাড়িতে কত লোকজন। ওর কতগুলো ভাইবোন। রুমু ক্লাস থ্রি থেকে ফোরে উঠবে। বার্ষিক পরীক্ষার ছুটি প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। আর কয়েকদিন পর স্কুল খুলবে। কিন্তু এ বাড়িতে সাড়াদিন একা একা ওর ভালো লাগে না। ওর মা ওকে বিকেলে নিচের মাঠে খেলতে যেতে বলে। রুমু এদিকের কাউকে চেনেনা। তাই খেলতে যেতে ইচ্ছে করে না। সাড়াক্ষন বাড়ান্দায় বসে পুকুরের দিকে তাকিয়ে থাকে।
'কি করছিস মা?' লিনা এসে পাশে বসলো।
'কিছুনা। পুকুরটা দেখছি।'
'বিকেলে তোর সাইকেলটা নিয়ে বাইরে গিয়ে চালিয়ে আসিস।'
'আমার যেতে ইচ্ছে করে না।'
'আমি নিচে গিয়ে দাড়িয়ে থাকবো। তুই চালাবি।'
'তুমি নিচে গিয়ে দাড়ালে তোমার কষ্ট হবে। তোমার না বাবু হবে?'
লিনার বাবু হবে মাস খানেক পরে। হাটলে ভালো লাগে। কিন্তু বেশিক্ষন দাড়িয়ে থাকলে খারাপ লাগে। রুমু এত ছোট বয়সেই মা'র বেশ সেবাযত্ন করে।

বিকেলে রুমুর মা বাড়ান্দায় এসে নিচে তাকিয়ে রইলেন। রুমু ওর ট্রাই সাইকেল নিয়ে নিচের মাঠে গিয়ে চালাচ্ছে। লিনা-ই জোর করে পাঠিয়েছে। কয়েকটা ছেলেমেয়ের সাথে ওর পরিচয় হয়ে গেছে। একজন একজন করে ওরা এখন রুমুর সাইকেলটা চালাচ্ছে। রুমু বেশ খুশি। মেয়েকে খুশি দেখে মা-ও খুশি। বাড়িওয়ালনি আলাপ করতে এলেন রুমুর লীনার সাথে। আলাপ করতে করতে বিকেলটা তাড়াতাড়ি চলে গেলো।

রুমুর বাবা বেশ রাত করে ফেরে। লিনা বাড়ান্দায় বসে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে। লিনার সাথে রুমু-ও বসে আছে বাবার জন্য। বসে থাকতে থাকতে রুমুর ঘুম পেয়ে গেলো। লিনা ওকে কোলে করে নিয়ে শুয়ে দিয়ে এলো বিছানায়। অনেক্ষন বসে থেকে লিনারও ঘুম ঘুম যাচ্ছে। ও বিছানায় গিয়ে আধশোয়া হলো। একটা বই নিলো হাতে। রুমুর বাবা আসতে আসতে বই পড়া যাক।
শোবার ঘর থেকে ড্রইং রুমের ভেতর দিয়ে রান্নাঘরটা অনেকখানি দেখা যায়। বই পড়তে পড়তে লিনার মনে হলো কেউ দ্রুত পাকের ঘরে ঢুকলো। লিনা বই নামিয়ে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইলো। কাউকে দেখা যাচ্ছে না। কোন নড়াচড়া নেই। রান্নাঘরের জানালার পাশের পাইন গাছটা বেশ ঝাকড়া। অনেক পাতা। জোছনায় পাইন গাছের ছায়া পড়েছে রান্না ঘরে। বাতাস নেই। গাছের ছায়াও নড়ছে না।
লীনা বই পড়তে লাগলো। কিছুক্ষন পর আবার মনে হলো কেউ রান্নাঘর থেকে বের হয়ে আবার দ্রুত ঢুকে গেলো রান্নাঘরে। একটা শব্দও হলো। মনে হলো কারো শরিরের ধাক্কা লেগেছে থালা-বাসন রাখার র্র্যাকে।
লিনা বই রেখে উঠে পড়লো। দরজার পেছন থেকে শাবলটা নিলো। আস্তে আস্তে গিয়ে ডাইনিং রুমের লাইট জ্বালালো। রান্না ঘরের লাইট জ্বালালো।
এসময় আবার শব্দ হলো। দরজায়। কেউ বোধহয় এসেছে।
'কে?'
'আমি, লীনা।' রুমুর বাবা অপুর কণ্ঠ। হাফ ছেড়ে বাঁচলো যেনো লিনা। দরজা খুলে দিলো।
'হাতে শাবল কেনো? ভয় পেয়েছো নাকি?'
'না, রান্নাঘরে একটা শব্দ শুনলাম। মনে হলো কেউ রান্নাঘরে আসা যাওয়া করছে। '
অপু রান্নাঘর ঘুরে এলো। ' গাছের ছায়া পড়েছে। বাতাসে গাছ নড়লে ছায়াও নড়েছে। তোমার মনে হয়েছে রান্নাঘরে কেউ আসা যাওয়া করেছে। '
'হতে পারে। কিন্তু তখন বাতাস ছিলো না। আর শব্দটা..'
'শীতের দিনের বাতাস। কিছুক্ষন থাকে। কিছুক্ষন নেই। শব্দটা হয়তো দূরে কোথাও হয়েছে। রাতে দূরের শব্দও কাছে মনে হয়।
'তাই হবে। নাও, খেতে বসো।'
'দেখি আত্মীয়-স্বজন কাউকে তোমার সাথে এনে রাখবো। '
'তুমি অযথা ভাইয়াদের সাথে ঝগড়া বাঁধালে..'
'আরে না..'
খেতে খেতে ওদের কথা চলতে লাগলো।

আজ বেশ মেঘলা মেঘলা। অন্যদিন লীনা উঠে অন্যদের ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলে। আজ রুমু আগে উঠে স্কুলের জামা কাপড় পড়ে বাবাকে ডেকে তুললো। অপু-ই প্রতিদিন সকালে ওকে স্কুলে দিয়ে যায়। আবার ছুটি হলে নিয়ে আসে। লীনা তরিঘড়ি করে দু'জনের নাস্তা বানিয়ে দিলো।
রুমুকে নিয়ে অপু চলে গেলো স্কুলে। স্কুল ছুটি বারোটায়। লীনা নাস্তা খায়নি। কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না। ঘুম ঘুম পাচ্ছে। বিছানায় শুয়ে বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে গেলো লীনা।
বিছানায় শুয়ে বই পড়ছে লীনা। হঠাৎ মনে হলো কে যেনো রান্নাঘরে ঢুকলো। লিনা তাকিয়ে রইলো রান্নাঘরের দিকে। ঐদিন-ও এমন হয়েছিলো। বারবার নিশ্চই ওর ভুল হতে পারেনা। লিনা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো রান্নাঘরের দিকে।
খাটের পাশেই শাবলটা রাখা হয়েছে। কোন ওলট পালট দেখলেই লীনা শাবল নিয়ে দৌড়ে যাবে। রান্নাঘরে শব্দ হলো। কেউ রান্নাঘর থেকে বের হচ্ছে। তার শরিরে থালা-বাসনের র্যাক লেগে শব্দ হয়েছে। এক সেকেন্ড পরেই তাকে দেখা গেলো। কোন মানুষ না। গাছ। একটা লম্বা গুড়ি। গুড়ি থেকে হাতের মতো অনেকগুলি ডাল বের হয়ে রয়েছে। ঘন পাতার কারনে ডালগুলি দেখা যাচ্ছে না। রান্নাঘর থেকে বের হয়ে গাছটা থমকে দাড়ালো। গাছটার কোন চোখ নেই। গাছের চোখ থাকে না। কিন্তু তারপরেও মনে হলো গাছটা লীনার দিকে তাকিয়ে আছে। আঁধো অন্ধকার, আঁধো আলোয় গাছটিকে ভয়ংকর দেখাচ্ছে। গাছটি এবার ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে লীনার দিকে।
শাবলটা নিয়ে দ্রম্নত বিছানা থেকে নামলো লীনা। অসুস্থ শরির নিয়ে ও কি পারবে এই গাছটার সাথে? অপু কোথায়? ও কি এসেছে? ও আসতে দেরী করছে কেন? লীনা শাবলটা এক হাতে শক্ত করে ধরে জোরে চিৎকার দিলো 'অপু, অপু।'
ঘুম ভেঙ্গে গেলো লীনার। কিছুৰন লাগলো স্বপ্নের ঘোর থেকে বের হতে। স্বপ্নে নয় ঘটনাগুলি যেন সত্যিই ঘটছিলো। রান্নাঘরের দিকে তাকিয়ে দেখলো কিছু দেখা যাচ্ছে না। দুপুরের রোদ ডাইনিং রম্নমে। ঘামে শরির ভিজে গেছে। লীনা শাড়ির আঁচল দিয়ে ঘাম মুছলো। বিছানা থেকে নেমে আসত্দে আসত্দে গেলো রান্নাঘরের দিকে।
রান্নাঘরে কেউ নেই। শীতের হাল্কা হাল্কা বাতাস এসে লাগলো শরিরে। জানালার পাশের পাইন গাছটা অল্প অল্প দুলছে। লীনা জানালায় ঠেস দিয়ে দাঁড়ালো। পুরনো একতলা বাড়িটা দেখা যাচ্ছে। বাড়িটা বেশ বড়। কিন্তু সে তুলনায় লোকজন খুব একটা দেখা যায় না। বিশাল বাড়িট বাড়িটা বেশিরভাগ থাকে নির্জন। আজ দু'টি বাচ্চাকে দেখা গেছে। তারা বাড়ির সামনে উঠানে খেলছে। মাটি গর্ত করে বাড়ি, পুকুর বানাচ্ছে। লীনা ওদের খেলা দেখতে লাগলো।
দরজায় ধাক্কা পড়ছে। 'লীনা, লীনা।'
লীনা দরজা খুলে দিলো। রম্নমুকে স্কুল থেকে নিয়ে এসেছে অপু।
রম্নমুর জামা বদলে দিলো লীনা।
'লীনা আমি যাই।'
'খেয়ে যাবে না?'
'না কাজ আছে। বাইরে খাবো।'
'কথা ছিলো।'
'কি কথা?'
'আমার সাথে কাকে যেন এনে রাখবে বলেছিলে।'
'হ্যা। একজন কাউকে এনে রাখবো। কেন আজকেও ভয় পেয়েছো?'
'না, ভয় পাইনি। একটা স্বপ্ন দেখেছি।'
'কি স্বপ্ন?'
'দেখি একটা গাছ পাকের ঘরে ঢুকলো। গাছটা বেশ লম্বা। ঘরের ছাঁদ ছুয়ে যায়। পাকের ঘর থেকে বের হয়ে গাছটা আমাকে ধরতে আসছে।'
অপু কিছুৰন চুপ করে রইলো।
'দেখি কাকে এনে রাখা যায়। কাল পরশুর মধ্যেই কাউকে এনে তোমার সাথে রাখবো। তবে তোমার ভয় পাওয়ার বিষয়টা ডাক্তারকেও জানানো দরকার।
'হু।'
'আমার কাজ আছে। কাল বিকেলে চলো ডাক্তারের কাছে।'
'আচ্ছা।'


নতুন বাড়িটায় আসার পরে আপনার এ সমস্যা শুরম্ন? ডাক্তার শারমিন সুলতানা জিজ্ঞেস করলেন।
'এ বাসায় আসার পর থেকেই সমস্যা শুরম্ন। এর আগে সমস্যাটা ছিলো না।'
'ও'। এমনিতে এ সময়ে মেয়েরা মানষিকভাবে বিপর্যসত্দ থাকে। তাদের মৃত্যুচিনত্দা পেয়ে বসে। অনেকে ভয় পায়। অনেকে অস্বাভিক আচরন করে। আপনি যা দেখেছেন এটি আপনার মনের কল্পনা। কিন্তু আপনার স্বপ্নে গাছ কেন আসছে? বাড়ির পাশে কি কোন গাছ আছে, যেটি দেখলে আপনার ভয় ভয় করে?'
'শুধু স্বপ্নে না। আমি জেগে থেকেও দেখছি..'
'আসলে আমাদের বাড়ির পাশে বেশ কয়েকটা পাইন গাছ আছে।' অপু জানাতে লাগলো ডাক্তারকে। 'একটা গাছের উপরের অংশটা একদম আমাদের রান্নাঘর ঘেষে। গাছের ছায়া আমাদের ঘরের ভেতর ঢোকে। দিনে সূর্যের আলোয় বা রাতে চাঁদের আলোয় গাছের ছাঁয়া ঘরে পড়ে। ও বেশিরভাগ সময় একা একা বাসায় থাকে। এজন্য ভয় পায়। '
' এমনিতে কিন্তু পাইন গাছগুলিকে আমার ভয় লাগে না। কিন্তু একটি গাছ আমার আমাকে ধরতে আসে। আমি স্বপ্নেও দেখি বাসত্দবেও..'
'ও । বাসায় অন্য কাউকে এনে রাখার ব্যবস্থা করেন।' ডাক্তার পরামর্শ দিলেন। 'নয়তো ওনাকে ওনার মা'র বাড়িতে রেখে আসতে পারেন। এ কয়েকটা দিন সেখানে থেকে আসুক। ভালো সেবাযত্ন পাবে।'
'ওর মা'র বাড়ি গ্রামে। সেখানে ডাক্তার ক্লিনিক পাওয়া কঠিন। তবে চেষ্টা করছি একজন আত্মীয়কে এনে রাখতে।'
'ঠিক আছে। আমি ওষুধ দিয়ে দিচ্ছি। তবে ওনাকে একা রাখা ঠিকনা। দেখেন কাউকে সাথে এনে রাখতে পারেন কিনা।'

বাসায় এসে অপু আত্মীয়দের অনেককেই ফোন দিলো। কিন্তু থাকার মতো সময় কারো নেই। শেষে লীনা-ই সমস্যার সমাধান করলো। লীনা-র মা এসে থাকবেন। আজ রোববার। আগামী রোববার তিনি গ্রাম থেকে চলে আসবেন।
ডাক্তারের ওষুধে কাজ হয়েছে। কয়েকদিন ধরে একা থাকলেও লীনা রান্নাঘরে কাউকে ঢুকতে দেখছে না। দুঃস্বপ্নও নেই। লীনা প্রশানত্দি নিয়ে ঘুমাচ্ছে। অপুও কয়েকদিন ধরে তাড়াতাড়ি চলে আসছে। দিনেও চেষ্টা করছে বাসা থেকে দুপুরের খাবার খেয়ে যেতে।
বাড়িওয়ালী প্রায়ই লীনাদের ফ্ল্যাটে আসেন। তার সাথে আসেন নিচের তলার এক ভাড়াটিয়া। এ দু'জনের মধ্যে খুবই ভাব। কিন্তু দু'জনই লীনাকে বিরক্তিকর সব প্রশ্ন করেন। অপু কত টাকা আয় করে। সব টাকা লীনার হাতে দেয় কিনা। কি নিয়ে অপু'র ভাইদের সাথে অপুর ঝগড়া লাগলো -এসব। লীনা হাসিমুখে এড়িয়ে যায়। প্রশ্ন ভালো না লাগলেও এদের উপস্থিতি ভালো লাগে। একা একা থাকলে ওর মনটা হঠাৎ করেই খারাপ হয়ে যায়। লীনা ওর ভয় পাওয়ার বিষয়টি এদের বলেনি। বললে হয়তো এ নিয়ে আবার নানারকম প্রশ্ন করবে।
শনিবার। কাল লীনার মা আসবেন সকালে।
মেশিনে করা চালের গুড়ি ফ্রীজে রাখা ছিলো। রাতে অসুস্থ শরির নিয়েই লীনা মা'র জন্য পিঠা বানালো। ওর মা তেলের পিঠা ভালোবাসেন। মাকে বেশ সাহায্য করলো রম্নমু।
অপু আজ আসতে দেরী করছে। লীনা বাড়ান্দার চেয়ারে বসে অপুর জন্য অপেৰা করতে থাকলো। রম্নমুও কিছুৰন বসেছিলো। একটু পরেই ওর ঘুম পেয়ে গেছে। ওকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে এসেছে। শরির আজ বেশ ক্লানত্দ। ঘুম এসে যাচ্ছে। কিন্তু অপুর জন্য বসে আছে। অপু গরম তরকারি ছাড়া খেতে পারে না। লীনা ঘুমিয়ে গেলে তরকারি গরম করার ঝামেলায় না গিয়ে অপু না খেয়েই ঘুমাতে যায়। তাই লীনা বসে আছে। ওকে খাবার দিয়ে তারপর ঘুমাতে যাবে। ডাক্তারের ওষুধটা আজ খায়নি। খেলে ইচ্ছে থাকলেও জেগে থাকতে পারবেনা। ঘুম এসে যাবে।
লীনা ঘুমিয়ে গেলে অবশ্য অপুর এ ফ্ল্যাটে ঢুকতে কোন সমস্যা হবে না। দরজা খোলার জন্য লীনার বসে থাকার দরকার নেই। দরজার ছিটকিনি খুলে শুধু লক করে ঘুমিয়ে যেতে পারে। অপুর কাছে চাবি আছে। অপু ওর চাবি দিয়ে দরজা খুলে ঢুকতে পারবে।
বাড়ান্দার সাথে লাগোয়া লীনাদের শোবার কৰ। বেডরম্নমের দরজা বরাবর বসেছিলো লীনা। ঝট করে মাথা ঘুরিয়ে পেছনে তাকালো। মনে হলো কেউ ওর দিকে পেছন থেকে তাকিয়ে আছে।
কেউ নেই।
আবার রাসত্দার দিকে তাকিয়ে অপুর জন্য অপেৰা করতে লাগলো। হঠাৎ মনে হলো কেউ যেনো ওদের বেডরম্নম থেকে হেটে চলে গেলো। ঘাড় ঘুরিয়ে বেডরম্নমে দেখলো। রম্নমু কি টয়লেটে গেলো?
লীনা উঠে শোবার ঘরে গেলো। রম্নমু আরামে ঘুমুচ্ছে। হাতে শাবলটা নিয়ে লীনা লাইট জ্বালিয়ে সব ঘর ঘুরে এলো।
না কেউ নেই।
মনের ভুল। ওষুধটা না খাওয়ার কারনে ভয়ের বিষয়টা চলে এসেছে। লীনা ভয় কাটানোর ওষুধটা খেলো। অপুর জন্য অপেৰা করার দরকার নেই। ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়বে।
ঘুমানোর আগে বই পড়াটা লীনার অভ্যাস। বিছানায় শুয়ে হাতে একটা বই তুলে নিলো। দু'এক পৃষ্ঠা পড়তেই রান্নাঘরের দিক থেকে কারো স্পষ্ট পায়ের শব্দ পেলো। বই রেখে হাতে শাবল নিলো লীনা। ডাইনিং রম্নমের ভেতর দিয়ে রান্নাঘরের দিকে তাকিয়ে রইলো।
রান্নাঘর থেকে দ্রম্নত কেউ ডাইনিং রম্নমের দিকে বের হয়ে এলো। লীনা জানে এটা ওর মনের ভুল। এখন রান্নাঘর দেখতে গেলে আর কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। নিজের ভয় ভাঙ্গাতেই লীনা শাবল হাতে কয়েক পা এগিয়ে ডাইনিং রম্নমে চোখ রাখলো।
ওইদিক থেকেও কেউ একজন এগিয়ে এলো। লীনা তাকিয়ে দেখলো শোবার ঘর আর ডাইনিং রম্নমের মাঝের দরজার সামনে একটি পাইন গাছ দাড়িয়ে আছে। তার ডালপালাগুলি হাতের মতো নড়ছে। চোখ না থাকলেও গাছটির তাকিয়ে থাকা লীনা বুঝতে পারছে। ভয়ংকর তার চেয়ে থাকা।
'মাগো..' বলে চিৎকার দিলো লীনা। দৌড়ে গিয়ে বিছানায় উঠে রম্নমুকে জড়িয়ে ধরলো। গাছটি এগিয়ে আসছে তার দিকে। রম্নমুও জেগে উঠে চিৎকার করছে। লীনা শাবলটি ছুড়ে মারলো গাছটির দিকে। শাবলের আঘাতে গাছটির একটি ডাল ভেঙ্গে পড়লো। গাছের ভেঙ্গে যাওয়া ডালের জায়গা থেকে পিচকারির মতো রক্ত ছুটলো। গাছটির এগিয়ে আসা বন্ধ হলো না।
কৰের ছাঁদ ছুয়ে যাওয়া গাছটি এগিয়ে এসে লীনার গাঁ ঘেষে দাড়ালো। গাছের একেবারে উপরের অংশ ঝুঁকে এলো চিৎকার করতে থাকা লীনার দিকে। কয়েকটা ডাল একসঙ্গে গলাটিপে ধরলো লীনার।


হাসপাতালের কেবিনে আধশোয়া হয়ে বসে আছে লীনা। হাতে এক কাপ চা। পাশে বসে আছে রম্নুমু, রম্নমুর বাবা, রম্নমুর নানি। রম্নমুর ভাই হয়েছে। ছোট্ট বাবুটা ওর নানির কোলে।
ঐদিনের ঘটনা ডাক্তার শারমিনকে বলছিলো অপু।
'আমি রিঙ্া থেকে নামতেই শুনলাম লীনার চিৎকার। দৌড়ে সিড়ি দিয়ে ফ্ল্যাটে উঠতে উঠতে রম্নমুরও চিৎকার শুনলাম। ফ্ল্যাটে উঠে দরজার লক খুলতে খুলতে চিৎকার বন্ধ হয়ে গেলো। দরজা খুলে দেখলাম দু'জনেই অচেতন হয়ে আছে। বাড়িওয়ালী, অন্য ফ্ল্যাটের লোকজনও ওদের চিৎকার শুনে চলে এসেছে। এম্বুলেন্সে করে দু'জনকে নিয়ে এলাম হাসপাতালে। সকালে লীনার জ্ঞান ফিরলো। আগের রাতের ঘটনা বললো। ওকে নাকি একটা গাছ গলাটিপে ধরেছিলো। ও ভেবেছে ও মরে গেছে। জ্ঞান ফিরলে বুঝতে পেরেছে ও বেঁচে আছে। রম্নমুও গাছটা দেখেছে। তাই রম্নমু-ও ভয়ে অচেতন হয়ে গেছে।'
ডাক্তার শারমিন রম্নমুর সাথেও কথা বললেন। রম্নমু বললো ও কোন গাছ বা কাউকে বাসায় দেখেনি। মা'র চিৎকার শুনে ও ভয় পেয়েছে। ভয় পেয়ে চিৎকার দিয়ে অচেতন হয়ে গেছে।
'গাছ আপনার গলাটিপে ধরেছিলো না? যদি সত্যি-ই কেউ আপনাকে গলাটিপে ধরতো তাহলে আপনার গলায় কোন চিহ্ন থাকতো না? আর কোন গাছ গলাটিপে ধরলে তো চিহ্ন আরো বেশি থাকতো। গাছের ডালপালার খোঁচা থাকতো গলায়।'
ডাক্তারের কথায় লীনা মিটিমিটি হাসছে। ওর মধ্যে ভয়ের কোন চিহ্ন নেই। হাসতে হাসতে বললো,'কিন্তু তখন আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিলো। গলাটিপে না ধরলে এমন কেন হবে? এরপরই তো আমি জ্ঞান হারাই। দমবন্ধভাব আর অচেতন হওয়াটাতো বাসত্দব?'
'ভয় থেকেও মানুষের দমবন্ধভাব তৈরী হয়। ভয় থেকে অচেতন হয়ে যাওয়ার ঘটনা তো অহরহ ঘটে। ধরলাম কোন গাছ আপনার গলাটিপে ঠিকই ধরেছিলো। আপনার শাবলের আঘাতে গাছটার একটা ডাল কেটে যায়। সেখান থেকে রক্ত বের হয়। সত্যি-ই যদি এ ঘটনা ঘটে থাকে তাহলে আপনার ঘরে রক্তের চিহ্ন, গাছের ভাঙ্গা ডাল অনত্দত পাতা পড়ে থাকার কথা। অপু সাহেব আপনাদের শোবার ঘরে কি এমন কিছু ছিলো?'
বিষয়টা অপুর মাথায়ই ছিলো না। এরকম কোন ঘটনা ঘটে থাকলে ঐ ঘরে নিশ্চই চিহ্ন থাকবে। তখন তাড়াহুড়ায় বিষয়টি খেয়াল করেনি অপু। বাসায় গিয়ে এ বিষয়টা খেয়াল করে দেখতে হবে।
অপুর নতুন বাবু হওয়ার খবর পেয়ে ওর ভাইয়েরা চলে আসলো। চলে আসলো পরিবারের বাকি সবাই। হাসপাতালের কেবিনে নতুন বাবুকে দেখে অপুর ভাইদের রাগ,অভিমান ভেঙ্গে গেলো। ঠিক হলো হাসপাতাল থেকে অপুরা ভাড়া বাসায় আর ফেরৎ যাবেনা। যাবে ওর বাবার বাড়ি। আর কালই সব মালপত্র ঐ বাড়ি থেকে অপুর বাবার বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হবে।
পরদিন অপু আর অপুর বড় এক ভাই লোকজন নিয়ে মালপত্র আনতে গেলো। অপু শোবার ঘর ভালো করে খুঁজলো। কোন রক্তের দাগ নেই। কোন গাছের ডাল-পাতা নেই। একটাও নেই। ডাইনিং রম্নমের জানালা খোলা ছিলো। ডাইনিং রম্নমে পাইন গাছের কয়েকটা শুকনো পাতা পড়ে আছে। পড়তেই পারে। খোলা জানালা দিয়ে বাতাসে আসতে পারে। জানালার পাশেই পাইন গাছ। লীনা যে একা থাকতে থাকতে ভুল দেখেছে তাতে কোন সন্দেহ নেই।
তিন ভ্যনগাড়ি ভরে মালপত্র উঠলো। অপু নিচে দাড়িয়ে মালপত্র ওঠানো দেখছে। ওদের পাশের পুরনো একতলা বাড়িটার সামনে একটা বিশাল গেইট। অন্য সময় বন্ধই থাকে। আজ বিশাল গেইটটা পুরো খোলা। অপু হাটতে হাটতে গেটটার সামনে গেলো। গেটের ঠিক পাশের পাইন গাছটা সবচেয়ে ছোট। এটি কাটা হচ্ছে। পায়জামা পাঞ্জাবী পড়া একজন বয়স্ক ব্যাক্তি দাড়িয়ে দাড়িয়ে গাছকাটা দেখছেন। লোকটা বোধহয় এ বাড়ির মালিক। অপুকে গেটের সামনে দাড়াতে দেখে লোকটা এগিয়ে এলো।
'কি মাস দুয়েক আগে না দেখলাম আপনারা আসলেন। এখনই চলে যাচ্ছেন?'
'হ্যা। আমার ভাইয়েরা আমাকে ভাড়া থাকতে দিচ্ছেনা। গাছটা কেটে ফেলছেন?'
'হ্যা, কেটে ফেলছি।'
'এটাতো সবার ছোট, বড়গুলি থেকে একটা কাটতেন।'
'না, সবগুলিই কেটে ফেলবো।'
'কেন?'
'আমার মেয়ের বাচ্চা হবে। ও গাছের ছায়া দেখে ভয় পায়। গাছগুলি নাকি রাতে উঠানে হাটাহাটি করে। মাঝে মাঝে বাড়ির ভেতরে ঢুকে যায়। ওর দিকে তাকিয়ে থাকে...।'#

১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ক্লাস ফাকি দিয়ে তারা আড্ডা মারছে। এই দিকে পিতা মাতা হয়তো মনে করবে যে আমার মেয়ে ক্লাস করতে গিয়েছে।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:২৫



ক্লাস ফাকি দিয়ে তারা আড্ডা মারছে। এই দিকে পিতা মাতা হয়তো মনে করবে যে আমার মেয়ে ক্লাস করতে গিয়েছে। এই স্থানটি খুবই নিরিবিলি। দেশের আইন-শৃঙ্খলার অবস্থা খুবই খারাপ। এমন ফাকা... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলা সাহিত্যে জায়গা পাচ্ছেন ওসমান হাদী

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:১৭


সংবাদপত্র যা বলছে
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ জুন ২০২৬ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই পরিমার্জন-সংক্রান্ত কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

×