শান্তা, কান্তা দু'জনেই তিনতলার ফ্ল্যাটের সামনে দাড়িয়ে আছে। দু'জনের হাতেই দু'টো প্লেট। প্লেটে মিষ্টি। উপরে আরেকটি প্লেট দিয়ে ঢাকা। তিনতলার ফ্ল্যাটের দরজায় ওরা বেশকিছুৰন ধরে ধাক্কা দিচ্ছে। বেল টিপছে। কিন্তু দরজা খুলছে না। শান্তা, কান্তাদের বাবা রফিক সুতার ব্যবসায়ী। আজ পহেলা বৈশাখ। ওদের বাবার সুতার গদিতে সকালে মিলাদ হয়েছে। মিলাদের মিষ্টি ওরা বিল্ডিংয়ের ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে দিচ্ছে। কিন্তু তিন তলার দরজা খুলছে না।
'চল্ আপু চলে যাই। ওনারা বোধহয় ঘুমাচ্ছে।' কানত্দা বলল।
'চল্ । '
ওরা যখন চলে যাবে সে মূহূর্তে দরজা খুলল। একজন খবুই সুন্দরী মহিলা দরজা খুললেন। ' আরে এই পুতলের মতো মেয়েরা কোত্থেকে এলো? কিগো মা তোমাদের নাম কি?'
শানত্দা ওর মাথার দু'ঝুঁটি দুলিয়ে বললো,'আন্টি আমরা চারতলার নতুন ভাড়াটিয়া। মা আপনাদের পহেলা বৈশাখের মিষ্টি পাঠিয়েছেন।'
' ও তাই। এসো, এসো। ভেতরে এসো।'
ওদেরকে ভেতরে ডেকে নিয়ে গেলেন তিন তলার আন্টি। মিষ্টি রেখে ওদের দু'জনকে দু'টো চকলেট দিলেন। এতৰন দাড়িয়ে থাকার বিরক্তি পুষিয়ে গেছে। আন্টিটা বেশ ভালো।
দু'জন মিষ্টি দিয়ে চলে এলো বাসায়। বাসায় ফিরতেই মা ওদের হাত-মুখ ধুয়ে খেতে বসালেন। তারপর পাঠালেন ঘুমুতে। বিকেলে বাবার সাথে মেলায় যাবে দু'জন। না ঘুমালে মেলায় যেতে দেবেন না বলে আগেই জানিয়ে দিয়েছেন ওদের মা।
মেয়েদের নিয়ে মেলায় ঘুরে নববর্ষের অনুষ্ঠান দেখে রাতে বাসায় ফিরলেন রফিক। ক্লানত্দ মেয়েরা বাসায় ফিরেই ঘুমিয়ে পড়লো। মেয়েদের মা সাড়াদিন রান্নাবান্না করে ক্লানত্দ ছিলো। টিভি দেখতে দেখতে সে-ও ঘুমিয়ে গেলো।
একা একা টিভি দেখছেন রফিক। হঠাৎ ছাঁদে ভারি কিছু একটা রাখার শব্দ হলো। রফিক ছাঁদে তাকালেন। এখন আর শব্দ নেই।
একটু পরে শুরম্ন হলো গটর গটর জাতীয় টানা শব্দ। কেউ মসলা বাঁটছে।
বিরম্নক্ত নিয়ে ছাঁদে তাকালেন রফিক। বাড়ির কেউ নিশ্চই মসলা বাঁটছে। হয়তো কারো বাসায় নববর্ষ উপলৰে মেহমান আসবে। ঘরে ঝামেলা না করে ছাঁদে গিয়ে ঝামেলা করছে। এটা নিশ্চই বাড়িওয়ালার বাসার লোকজনের কাজ। বাড়িওয়ালার পরিবার দোতলায় থাকে। এ বিল্ডিংয়ে তাদের বাসায় যৌথ পরিবার। লোকজন বেশি। বাসায় জায়গা কম। তাই মসলা বাঁটতে ছাঁদে গিয়েছে। অন্য কেউ এত রাতে ছাঁদে গিয়ে মসলা বাটার সাহস পাবে না।
বিরক্ত হলেও কিছু বলার নেই। কিছু বলতে গেলেই ঝগড়া বাঁধবে। রফিক বিরক্তি নিয়েই টিভি দেখতে লাগলো।
ছাঁদে বোধহয় অনেক মানুষ। মসলা বাঁটার শব্দের সাথে অনেকের হাঁটা চলার শব্দ।
রফিক ছবি দেখছেন। ছবিটা গুরুত্বপূর্ন জায়গায় চলে এসেছে। সেনাপতি রাজ্য দখল করে নিয়েছিলো। দু' রাজপুত্র জঙ্গলে গিয়ে বেঁচেছে। এখন তারা যুবক হয়েছে। পিতার রাজ্যের দখল নিতে সৈন্য সামন্ত নিয়ে রওনা হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ অভিযানের মাঝে শুরু হয়েছে মরু ঝড়। সৈন্যদল ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। দু'রাজপুত্র সৈন্যদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে।
দীর্ঘক্ষন পরে শব্দ থামলো।
রফিক হাফ ছেড়ে বাঁচলেন। বাকি ছবিটুকু মন:যোগ দিয়ে দেখা যাবে। ছাঁদের ছাঁদের শব্দে মন:যোগ দেয়া যাচ্ছিলো না।
ছবিতে এক রাজপুত্র কিছু সৈন্যকে খুঁজে পেয়েছে। সৈন্যরা পিপাসায় বালিতে কাঁতরাচ্ছে। তাদের জন্য পানি আনতে রাজপুত্র মরুদ্যোনে ছুটছে।
শব্দ আবার শুরু হলো। এবার অন্যরকম শব্দ। পা দাপড়াচ্ছে কেউ। ছাঁদে গরাগরি যাচ্ছে। গোঁ গোঁ শব্দও শোনা যাচ্ছে। একটুপর মনে হচ্ছে ছাঁদে ফুলের টবগুলি ছুড়ে এক পাশ থেকে অন্য পাশে ফেলছে।
কি হচ্ছে ছাঁদে? কোন অঘটন ঘটছে নাকি? বাড়িওয়ালার নাতিরা মারামারি লেগে গেলো নাকি?
রফিক আর বসে থাকতে পারলো না। ছাঁদে মনে হয় বড়রা কেউ নেই। কোন অঘটন ঘটে যেতে পারে। দেখা দরকার।
দরজার চাবিটা নিলেন। দরজা লক করে সিড়ি ভেঙ্গে উঠতে লাগলেন। পা দাপড়ানোর শব্দ আরো স্পষ্ট হচ্ছে। গোঁ গোঁ শব্দটাও। কেউ বোধ হয় চিৎকার দিতে চাচ্ছে। কিন্তু পারছে না। কেউ কি কারো গলা টিপে ধরলো? আর কয়েকটা সিড়ি পার হলেই ছাঁদ। ছাঁদের গেটও খোলা।
রফিক ছাঁদে পা দিতেই সব শব্দ থেমে গেলো।
চাঁদের আলোয় পুরো ছাঁদ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। ছাঁদভতর্ী ফুলের টবগুলি দাড়িয়ে আছে। কেনোটা উল্টে পাল্টে নেই। টব ছোঁড়ার কোন চিহ্ন নেই। মসলা বাঁটার পাটা-পুতা নেই।
ছাঁদের কোথাও কেউ নেই।
গা ছমছম করা ভয়ংকর শব্দহীনতা ঘিরে ধরলো রফিককে।
রফিক আর ছাঁদে দাড়াতে পারলো না। নামতে থাকলো নিচে। দরজার সামনে আসতেই আবার শব্দ শুরু হলো। কান্নার শব্দ। অসংখ্য নারী পুরুষ বিলাপ করে কাঁদছে। রফিকের পুরো শরিরের লোম দাড়িয়ে গেলো। কোন রকমে বাসায় ঢুকলো রফিক। তারপর একটা চিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারালো।
সকালে মাথায় ঠান্ডা কিছুর অনুভূতিতে ঘুম ভাঙ্গলো। একটুপর বুঝতে পারলেন মাথায় পানি ঢালা হচ্ছে। বিছানায় শান্তা-কান্তা উদ্বিগ্ন হয়ে বসে আছে।
'বাবার জ্ঞান ফিরেছে মা। ' রফিকের স্ত্রী সামনে আসলেন। 'বসতে পারবে?'
'পারবো।'
মাথা মুছে দিলো রফিকের স্ত্রী। রাতে রফিক চিৎকার করে অচেতন হয়ে গিয়েছিলো। এরপর আর পুরোপুরি চেতনা ফেরেনি। ওর চিৎকারে পাশের ফ্ল্যাটের লোকজন উঠে আসে। মধ্যরাতের পর প্রচন্ড জ্বর আসে। বিরবির করে সারারাত কি যেন বলেছে। শুধু বোঝা গেছে,'আমি আমি আমি...'
একটু পরে জ্বর পুরোপুরি কমে গেলো। পাশের ফ্ল্যাটের মৃদুলা ভাবি রাতেও অনেক্ষন ছিলেন। সকালেও তিনি এলেন। রাতে কি হয়েছিলো জিজ্ঞেস করলেন তিনি।
'প্রথামে ছাঁদে মসলা বাঁটার শব্দ শুনলাম। কিছুক্ষন পর শুনি কারো পা দাপড়ানোর শব্দ...' রাতের ঘটনার পুরো বর্ননা দিলো রফিক।
'ভাই আপনারা এ বিল্ডিংয়ে নতুন এসেছেন তো তাই ঘটনাটা জানেননা। এ বিল্ডিংয়ের সবাই এটা জানে। এমনকি এ পাড়ারও বেশিরভাগ লোকজন জানে।'
'কি ঘটনা আপা? কি ঘটনা?' রফিক আর ওর স্ত্রী একসাথে জিজ্ঞেস করলো। শান্তা-কান্তার প্রশ্নবোধক দৃষ্টিও তার দিকে।
বেশ কয়েক বছর আগের ঘটনা। বাড়িওয়ালার এক ছেলে ছিলো বাবু নামে। ছেলেটা এইচ এস সি পরীক্ষা দিয়েছিলো। পারিবারিক কোন একটা কারনে ওর বাবা একদিন ওকে খুব মারধর করলো। সেদিন ছিলো পহেলা বৈশাখ। বাবু বন্ধুদের সাথে নববর্ষের অনুষ্ঠানে যাবে। নববর্ষ উপলক্ষে ওর বাবা-ই ওকে গরদের পাজামা পাঞ্জাবী কিনে দিয়েছিলো। ছেলেটাও খুশি হয়ে সকাল থেকে এগুলি পড়েছিলো। কিন্তু বাবার মারধরের কারনে ওর খুব মন খারাপ হয়। সাড়াদিন আর বাইরে না গিয়ে ঘরে বসে থাকে।
নববর্ষ উপলক্ষে ঐদিন ওদের বাসায় বেশ খাবার দাবারের আয়োজন হয়। বাবুর মা কোন অনুষ্ঠানে মেশিনে ভাঙ্গানো মশলা ব্যবহার করেন না। বাটা মশলা ব্যবহার করে রান্না করেন। বাবু ছিলো তার ছেলেমেয়েদের মধ্যে ছোট। ওর বড় ভাইবোনরা বেশিরভাগ অন্য জায়গায় থাকে। নববর্ষ উপলক্ষে ঐদিন সবাই এলো বাসায়।
রাতে সবাই যখন নববর্ষের খাওয়া, টিভিতে অনুষ্ঠান দেখায় ব্যস্ত , তখন বাবার দেয়া গরদের সাদা পায়জামা পাঞ্জাবী পড়ে বাবু চলে গেলো ছাঁদে। বিষ খেলো। ছাঁদে বিষ খেয়ে ওর পা দাপরানোর শব্দে আপনারা যে ফ্ল্যাটে আছেন এ ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়ারা প্রথমে ওর বিষ খাওয়ার বিষয়টি টের পায়। ওরা দৌড়ে ছাঁদে গিয়ে প্রথমে বাবুকে খুঁজে পাচ্ছিলো না। ছাঁদে প্রায় আড়াইশ ফুলের টব ছিলো। বাবু প্রতিদিন এ ফুলের টবগুলিতে পানি দিতো। বাবুকে বের করে আনতে ওরা টব ছুড়ে ছুড়ে এদিক ওদিক ফেলে। সবাই মিলে যখন বাবুকে নিচে নামাচ্ছিলো তখন বাবু কি যেন বলতে চাচ্ছিলো বারবার। কিন্তু ওর কথা গলায় আটকে যাচ্ছিলো। গলা থেকে শুধু গোঁ গোঁ জাতীয় শব্দ বের হচ্ছিলো। চোখ দিয়ে পানি ঝড়ছিলো। মৃত্যুর আগে মানুষ বাঁচতে চায়। বোধহয় বাঁচতে চাওয়ার শেষ আঁকুতিটি-ই ও বলতে চেয়েছিলো। পারেনি।
এরপর থেকে এ বিল্ডিংয়ের ছাঁদে প্রায়ই মশলা বাটার শব্দ শোনা যায়। শোনা যায় টব ছুঁড়ে ফেলার, কারো গোঁ গোঁ করার শব্দ। তবে বাবু কারো কোন ক্ষতি করেনা। আর ওকে কেউ দেখতে পায়না। শুধু ওর বন্ধুরা দেখতে পায়। '
'বন্ধুরা কি দেখতে পায়?' রফিকের স্ত্রী জিজ্ঞেস করলো।
'ওর বন্ধুরা সবাই এ মহল্লার বিভিন্ন বাড়ির বাসিন্দা। ওইসব বাড়ির ছাঁদে ওর বন্ধুরা ওকে হাঁটাহাঁটি করতে দেখে। সাদা গরদের পায়জামা পাঞ্জাবী পড়ে বাবু হাঁটছে। ফুলের টবে পানি দিচ্ছে। বন্ধুদের দেখলে এগিয়ে আসে। ভেজা চোখে সামনে এসে দাড়ায়। তারপর কি যেন বলার চেষ্টা করে। পারেনা। #
শরীফ উদ্দিন সবুজ
২৭-১২-২০১১
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ২০১১ সকাল ১১:৩৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


