ভৌতিক গল্প// কুপি
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
'ভাই আপনার ছেলের জন্য মাষ্টার দরকার বলেছিলেন তাই এই ছেলেটাকে নিয়ে এলাম।' হাজীপুর প্রাইমারি স্কুলের শিৰক নিজাম উদ্দিন বললেন। সাথে করে আনা ছেলেটি সুদর্শন। লম্বা। ফর্সা। মাথায় ঝাকড়া চুল। সাদা পায়জামা পাঞ্জাবী পড়া।
হাজী নিয়ামত উলস্নাহ গ্রামের ধনী লোক। তার পাঁচ ছেলে। বড় চার ছেলেই বিদেশে থাকে। ছোট ছেলে রঞ্জন ক্লাস ফাইভে পড়ে। রঞ্জনের জন্যই একজন জায়গীর শিৰক খুঁজছেন তিনি।
'এই মাষ্টার দিয়া অইতনা নিজাম ভাই। মাদ্রাসায় পড়া মাষ্টার। এক নাম্বার অইলো জঙ্গী-মঙ্গীর লগে আছে কিনা কে জানে। আর দুই নাম্বার অইলো মাদ্রাসায় পড়া পোলাপান অংক বিজ্ঞান ঠিকমতো পারেনা।'
'ভাই এই ছেলে ভাঙ্গুরা আলিয়া মাদ্রাসায় পড়ে। এই মাদ্রসায় কিন্তু অন্যরকম। জঙ্গী-মঙ্গীর জায়গা নেই। আর ও কয়েকটা দিন আমার ছেলে মেয়েকে পড়িয়েছে। অংক বিজ্ঞান ভালোই পারে।'
'ঠিক আছে নিজাম ভাই, আপনি যখন বলছেন রাখলাম।'
ছেলেটার নাম জাহাঙ্গীর। জাহাঙ্গীর হাজী নিয়ামত উলস্নাহর ছেলের জন্য লজিং মাষ্টার নিযুক্ত হলো। তিনবেলা খাবার। থাকার জায়গা। মাসে পাঁচশত টাকা হাত খরচ।
অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই জাহাঙ্গীরের উপর আস্থা তৈরী হলো হাজী নিয়ামত উলস্নাহর। যারা অংক বিজ্ঞান ঠিকমতো পড়তে পারেনা হাজী নিয়ামত উলস্নাহ তাদের বলেন 'লোথা'। যেসব শিৰক অংক বিজ্ঞান পড়াতে পারেনা তাদের লোথা মাষ্টার। তার বড় চার ছেলেই লোথা। কোনরকমে কলেজ পাশ করে মালয়শিয়ায় থাকে। তবে তার ছোট ছেলে অংক বিজ্ঞানে ভালো। লোথা না। এবারের শিৰক জাহাঙ্গীরও লোথা না। সে অংক বিজ্ঞান ভালোই পারে।
এ বাড়িতে জাহাঙ্গীরের নামের সাথে মাষ্টার জুড়ে গেলো। নাম হলো জাহাঙ্গীর মাষ্টার। শুরম্নতে জাহাঙ্গীর মাষ্টারের থাকার জায়গা দেয়া হয়েছিলো বাড়ির বাইরের অংশের একটি ঘরে। বাইরের ঘরের টিনের চাল অনেক জায়গায় ফুঁটো। বৃষ্টির দিন এসে গেছে। তাই জাহাঙ্গীরকে রঞ্জনের সাথে থাকতে দেয়া হলো।
আজ বিকেল থেকেই বৃষ্টি পড়ছে। কখনও একটু বেশি। কখনও কম। মাগরেবের নামাজের পর জাহাঙ্গীর পড়াতে বসলো রঞ্জনকে। প্রতিদিনের রম্নটিন কাজ। রাত নয়টা পর্যনত্দ চললো পড়াশোনা। প্রথমে বিজ্ঞানের একটা প্রশ্ন পড়ানো হলো। এরপর রঞ্জন প্রশ্নটা মুখস্থ করা শুরম্ন করলো। ঘন্টাখানেক লাগলো প্রশ্নটা মুখস্থ করতে। এরপর শুরম্ন হলো লেখা। একে একে দশবার লেখা হলো। লিখতে লিখতে রাত নয়টা বেজে গেলো।
মমতা ফুঁপু রাতের খাবার নিয়ে এলেন। সপ্তাহে টানা পাঁচদিন এ বাড়িতে সব্জি ভর্তা ডাল দিয়ে খেতে হয়। দু'দিন মাছ মাংস। রঞ্জন সপ্তাহের পাঁচদিন কম খায়। দু'দিন বেশি খায়। সব্জি দেখলে ওর ভাত চলেনা।
মমতা ফুঁপু মশারি টানিয়ে দিয়ে গেছেন। আগে ভাত খেয়ে কিছুৰনের মধ্যেই রঞ্জন ঘুমিয়ে পড়তো। কিন্তু এখন পারেনা। নতুন স্যার আসার পর ওর ঘুমাতে দেরী হয়। স্যার ঘুমানোর আগে বিছনায় শুয়ে কিছুৰন বই পড়েন। ততৰন লাইটটা জ্বালানো থাকে।
আজ খাওয়ার সময়ই বিদ্যুৎ চলে গেছে। তাই আজ তাড়াতাড়ি-ই ঘুমানো যাবে।
কিন্তু তা আর হলো না। জাহাঙ্গীর স্যার মশারির ভেতরে ঢুকেই মুখের কাছে একটা বই খুলে ধরলেন। মাথার পেছনে টেবিলে একটা কেরোসিনের কুপি জ্বলছে। কুপির আলোতেই জাহাঙ্গীর স্যার পড়ছেন।
অন্যদিন দশ-পনের মিনিট পড়ার পর লাইট বন্ধ করে দেন। কিন্তু আজ আধঘন্টা হয়ে যাচ্ছে কুপি বন্ধ করার লৰন নেই। রঞ্জন আবার অন্ধকার ছাড়া ঘুমাতে পারেনা। অন্ধাকারে ঘুমাতে ঘুমাতে ওর বদভ্যাস হয়ে গেছে।
'স্যার কুপিটা কি বন্ধ কইরা দিমু?'
'ও রঞ্জন এখনও ঘুমাও নাই। না কুপি বন্ধ করন লাগতো না। আমি-ই করমু নে।'
রঞ্জন চুপ মেরে গেলো। এপাশ ওপাশ করতে লাগলো। কিন্তু ঘুম আসে না।
একটু পরে রঞ্জন দেখলো জাহাঙ্গীর স্যার বইয়ের পৃষ্ঠার কোনা ভাজ করছেন। এখন বোধহয় ঘুমিয়ে পড়বেন। রঞ্জন তাকিয়ে রইলো।
না। কোনা ভাজ করেও আবার পৃষ্ঠা ওল্টালেন। ভাজ করা কোনা ঠিক করলেন। আবার পড়া শুরম্ন করলেন। বইয়ে মগ্ন হয়ে পড়েছেন।
পরের পৃষ্ঠায় গিয়ে আবার কোনা ভাজ করলেন। এবার বোধহয় বই বন্ধ করবেন। কিন্তু স্যার বইয়ের দিকে তাকিয়েই মশারি থেকে হাত বের করলেন।
মনে মনে হাসলো রঞ্জন। মশারি থেকে হাত বের করে স্যার কুপিটার নাগাল পাওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু এ চেষ্টা করে লাভ নেই। তাকে মশারি থেকে বের হতেই হবে। কারন কুপি অনেক দূরে। তার হাত থেকে আরে রঞ্জন তাকিয়ে রইলো া প্রায় এক হাত দূরে। এতদূর তার হাত যাবেনা।
রঞ্জন তাকিয়ে রইলো স্যার কখন বিরক্ত হয়ে বিছানা ছেড়ে উঠেন দেখতে। নাকি শেষমেশ কুপিটা ফেলে দিয়ে মশারিতে আগুন টাগুন লাগিয়ে দেন।
রঞ্জন যা দেখলো তাতে ওর গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেলো। স্যার মনোযোগ দিয়ে বই পড়ছেন-ই। তার বের করে দেয়া হাতটা লম্বা হতে শুরম্ন করলো। হাতের লোমগুলি যেন লোম না চিকন চিকন কাটা। ঠিক কুপির উপরে গিয়ে হাতটা থামলো। কুপির আগুনের উপর থাকলেও হাতটা একটুও পুড়ছে না। একটা লোম-ও পুড়ছে না। হাত কুপির উপর আলতোভাবে রেখে তিনি কুপি নিভিয়ে দিলেন।
রঞ্জন আর থাকতে পারলো না। 'মা...' বলে প্রচন্ড জোড়ে এক চিৎকার দিলো। অন্য বিছানায় লাফ দিয়ে উঠে বসেছে জাহাঙ্গীর স্যার। অন্ধকারে তার শরির দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু তার চোখ দু'টো অন্ধকারেও রাগে জ্বলজ্বল করছে। রঞ্জনকে যেনো এৰুনি খেয়ে ফেলবে।
গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির মধ্যে ভ্যানগাড়িতে করে রঞ্জনকে নেয়া হলো উপজেলা স্বাস্থকেন্দ্রে। সেখান থেকে ব্রক্ষ্মনবাড়িয়া সদর হাসপাতালে। ডাক্তারি চিকিৎসার পাশাপাশি চললো মসজিদের ইমাম ডেকে ঝাড়ফুঁক। বেশ কয়েকদিন পর সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরলো রঞ্জন।
ঐদিন রাত থেকেই জাহাঙ্গীর স্যারকে আর খুঁজে পাওয়া গেলো না কোথাও। #
শরীফ উদ্দিন সবুজ
২৯-১২-২০১১
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
ক্লাস ফাকি দিয়ে তারা আড্ডা মারছে। এই দিকে পিতা মাতা হয়তো মনে করবে যে আমার মেয়ে ক্লাস করতে গিয়েছে।

ক্লাস ফাকি দিয়ে তারা আড্ডা মারছে। এই দিকে পিতা মাতা হয়তো মনে করবে যে আমার মেয়ে ক্লাস করতে গিয়েছে। এই স্থানটি খুবই নিরিবিলি। দেশের আইন-শৃঙ্খলার অবস্থা খুবই খারাপ। এমন ফাকা... ...বাকিটুকু পড়ুন
দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল
আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন
বাংলা সাহিত্যে জায়গা পাচ্ছেন ওসমান হাদী

সংবাদপত্র যা বলছে
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ জুন ২০২৬ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই পরিমার্জন-সংক্রান্ত কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ... ...বাকিটুকু পড়ুন
Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ
![]()
প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।