ভ্যাম্পায়ারের পোষ্টমর্টেম
এজি মাহমুদ
ঈদের অনুষ্ঠানের একটা বিশাল অংশই দখল করে আছে নাটক-টেলিফিল্ম। কখন যে কোন নাটক দেখিয়ে দিচ্ছে হিসাব করা মুশকিল। তাই আর হিসেব করে দেখা হয় না। টিভির সামনে বসলে যেটা চোখে পড়ে সেটাই দেখতে থাকি। ইদানিং নাটকও কমন আইটেমের। গল্পে ভ্যারিয়েশন কম। তাই বোর লাগে। ঈদের চতুর্থ দিনের রাত্রে দেখি চ্যানেল ওয়ানে ‘ভ্যাম্পায়ার অ্যান্ড মি’ নামে একটা নাটক দেখাচ্ছে। খুব আগ্রহ নিয়ে দেখতে বসলাম। আমাদের দেশে প্রচলিত ধারায় ভ্যাম্পায়ার সেন্স নেই। অতিপ্রাকৃত কোন কিছুকে জ্বীন-ভূত-দৈত্য-ডাইনী পর্যন্তই আমাদের দেশের মানুষ ভেবে নেয়।
সুপার ন্যাচারাল এবং হরর সেন্স নিয়ে আমাদের দেশে কাজ কম হয়। মাঝখানে হুমায়ূন আহমেদের রচনা ও পরিচালনায় অতিপ্রাকৃত কিছু খন্ড নাটক প্রচারিত হয়েছিল। হুমায়ূন আহমেদের নাটক বা গল্পের থিম যথেষ্টই শক্তিশালী। সেখানে গ্যাপ খুঁেজ বের করা খুব শক্ত। একেতো তিনি না জেনে লেখেন না। এছাড়াও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রচুর পড়াশোনা আছে তার। তাই তার লেখা ও পরিচালিত অতিপ্রাকৃত খন্ড নাটকগুলো দর্শক আগ্রহ নিয়েই দেখেছে। এছাড়াও একুশে টিভিতে প্রচারিত মুহাম্মদ জাফর ইকবালের রচিত উপন্যাস প্রেত অবলম্বনে নির্মিত ধারাবাহিক নাটকটিও যথেষ্ট প্রশংসার দাবি রাখে।
আরো কিছু দিন পর দেখলাম আর টিভিতে এক-দুই পর্বের অতিপ্রাকৃত খন্ড নাটক ধারাবাহিকভাবে দেখাচ্ছে। দুই-তিন পর্ব দেখার পর মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। অতিপ্রাকৃত নাটক তো নয়, অতিমাত্রিক নির্মাণ কৌশল ও পরিচালনা প্রচারিত হতে লাগলো। যথাবিহিত সম্মানপূর্বক সেগুলো মোটেও দর্শকপ্রিয়তা পায়নি।
ভ্যাম্পায়ার,ওয়্যার উলফ্, জোম্বি-ফ্রাঙ্কেনস্টাইন, হাফ ব্রিড, ডেমন, মিউটেন্ট, আনডেড এই আইটেমগুলো হলিউডের মুভি ছাড়া আমরা খুব একটা দেখতে পাই না। তবে প্রতিবেশী দেশ ভারতের হিন্দি কিছু চ্যানেলে এরকম কিছু সিরিয়াল দেখা যায়। তবে সেগুলোর মানও খুব একটা প্রশংসনীয় নয়।
যাই হোক ‘ভ্যাম্পায়ার অ্যান্ড মি’ নাটকের ক্যামেরার কাজ আমাদের দেশের মানে মোটামুটি হলেও নাটকের গল্প খুব একটা গ্রহণযোগ্য নয়। নাটকে দেখা যায় একটি দৈনিকের একজন ক্রাইম রিপোর্টার কিছু রহস্যজনক হত্যাকান্ড এবং হাসপাতাল থেকে মাত্রাতিরিক্ত ব্লাড ব্যাগ বিক্রির তদন্ত করতে গিয়ে এক বাড়িতে যায়। সেখানে থাকা ভ্যাম্পায়াররা তাকে তাদের পরিচয় বলে দেয়। রিপোর্টার এসব কথা পত্রিকায় লিখে দেবে বললে ভ্যাম্পায়াররা তার রক্ত খেয়ে নিবে বলে তাকে ভয় দেখায়। রিপোর্টটার খুব ভয় পেয়ে গেলে ভ্যাম্পায়াররা তাকে বলে, তুমি বাঁচতে চাইলে তোমার বদলে আরেকজন মানুষ নিয়ে এসো। রিপোর্টার তখন আরেকজন মানুষ ধরে নিয়ে আসে। কিন্তু যখন ভ্যাম্পয়াররা মানুষটিকে পেয়ে রিপোর্টারকে ছেড়ে দেয় তখন রিপোর্টার আত্মগ্লানিতে পড়ে। সে আবার ফিরে গিয়ে যখন সেই মানুষটিকে বাঁচাতে যায়। গিয়ে দেখে সেই মানুষটিও ভ্যাম্পায়ার। তারপর সব ভ্যাম্পায়ার মিলে রিপোর্টারের রক্ত খেয়ে নেয়।
গল্পের অসামঞ্জস্য খুবই কষ্টদায়ক।
অসামঞ্জস্য ১ঃ ভ্যাম্পায়ারদের বাড়িতে রিপোর্টার প্রথমবার সহজে ঢুকতেই পারেনি। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গেটে বসে থেকেছে। পরের সিকোয়েন্সগুলোতে যখন-তখন রিপোর্টারকে বাড়ির ভেতরে আসতে যেতে দেখা গেছে।
অসামঞ্জস্য ২ঃ ভ্যাম্পয়ারদের বাড়িতে একটি মেয়ের এক পায়ে দড়ি বেঁধে খোলা একটি রুমে রেখে দেয়া হয়েছে কিন্তু তার হাত বাধা নয়। মেয়েটি ভ্যাম্পয়ারদের জন্য বসে বসে কাঁদছে। হাসতে হাসতে একটা ভ্যাম্প এসে মেয়েটির রক্ত খেয়ে নিল।
অসামঞ্জস্য ৩ঃ ভ্যাম্পায়ারদের অযথা মাত্রারিক্ত হাসাহাসি। রিপোর্টার একটা কথা বললে হাসে। রক্ত খেতে যাবার আগে পরে হাসি। দেখে মনে হচ্ছিল হাসির নাটক। যে নাটক দেখে দর্শক নয়, নাটকের পাত্রপাত্রীরাই হাসাহাসি করছে।
অসামঞ্জস্য ৪ঃ ভ্যাম্পায়ারদের খবর ক্রাইম রিপোর্টার জানতে পারার পরেও সে কোন অ্যাকশান নেয়নি। সে পত্রিকায় রিপোর্ট লিখতে পারতো। কিংবা অন্য কোনভাবে তাদের ধ্বংস করে দেবার চেষ্টা করে দিতে পারতো। কিন্তু তাকে সিঁিড়র উপর বসে থেকে রাত পার করতে দেখা গেছে।
তবে অতিপ্রাকৃত বিষয়গুলো যে নাটকের গল্পে উঠে আসছে, এটা আশাব্যাঞ্জক। কিছুদিন আগে ডাকিনী বিদ্যা অর্থাৎ ডাইনির গল্প নিয়ে একটি বাংলা ছবির পোষ্টার দেখেছিলাম। সিনেমার নামটা মনে নেই তবে পোষ্টারে অনেকগুলো ভয়াবহ মেয়ের মুখ আর পোষ্টারের নিচে সম্ভবত ‘আমরা মেয়ে নই, ডাইনি’-এই টাইপের হুমকি দেয়া ছিল। সেই ছবিটির কি খবর আমার জানা নেই। আরো ভালো গল্প নিয়ে নির্মিত হরর মুভি কিংবা নাটক যে গতানুগতিক ধারায় ভিন্নমাত্রা এনে দেবে তাতে সন্দেহ নেই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


