somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সুধাসদনে দেড়ঘন্টা

০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১০ রাত ১২:৪৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


অনেকক্ষণ ধরে হাটতে হাটতে খুব টায়ার্ড হয়ে গেছি এমন একটা ভঙ্গিতে হেটে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাড়ি সুধাসদনের সামনের লেকের পাশে গিয়ে বসে পড়লাম।

সরাসরি সুধাসদনের সামনে যাবার কোন উপায় নেই। চারপাশে এসএসএফ, পিজিআর, ডিজেএফআই আর আমর্ড পুলিশ ব্যাটেলিয়ানের কড়া নিরাপত্তা প্রহরা। যেখানে বসে আছি তার সামনেই কয়েকগজ দূরে এক মধ্যবয়স্ক ব্যারিকেড। কোন গাড়ি এসে গেটের সামনে দাঁড়ালেই দড়ি দিয়ে তাকে টেনেটুনে বারবার উঠানো-নামানো হচ্ছে। যদিও একটা মাইক্রোবাসের ধাক্কা উনি সামলে উঠতে পারবেন কি-না সন্দেহ!

ব্যারিকেডের ভেতরের দিকে দু’পাশে ছাউনীর নিচে একে-৪৭ রাইফেল হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দুইজন পিজিআর(প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট)। দু’জনের মাথা সিসিটিভি ক্যামেরার মতো একটু পর পর এপাশ থেকে ওপাশে বাতাস করে যাচ্ছে।

আমি এখানে বসার সাথে সাথেই এদের একজন আমার দিকে তাকিয়ে ওয়্যারলেস তুলে কোথায় কি যেন বলে দিল।
বলার ভঙ্গিতে মনে হল, সে নিশ্চিতভাবেই সন্দেহজনক তালিকায় ফেলে দিয়েছে। বেশিক্ষণ এখানে বসে থাকাটা মনে হয় সম্ভব হবে না। তাছাড়া প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের নিরাপত্তার বিষয়টি কিছুটা স্পর্শকাতর। আমি তবুও একটা নিরীহ ভঙ্গিমায় কারও জন্য অপেক্ষা করছি- টাইপ ভাব নিয়ে বসে থেকে ঝটপট চোখ বুলালাম চারপাশে।

ব্যারিকেডের ভেতরের একপাশে পাশাপাশি দুটো বিল্ডিং। একটা লাল ইটের আর অন্যটা সাদা। খানিকটা সামনে গিয়ে হাতের ডানে আরেকটি বাড়ি রয়েছে। কিন্তু ওই বাড়িটি এখান থেকে দেখা যাচ্ছিল না। ওই বাড়ির গেটের সামনে, না বাস, না ট্রাক ধরণের একটি পুরানো গাড়ি রাখা আছে। এরকম একটা বাতিল গাড়ি এখানে কি করছে!

এই তিন বাড়ির মধ্যে প্রধানমন্ত্রী কোন বাড়িতে থাকেন বোঝার উপায় নেই। পরে আশপাশ থেকে খবর নিয়ে জানা গেল, উনি সাদা বাড়িতে থাকেন। আর তার স্বামী ওয়াজেদ আলী মিয়া’র এক বন্ধুর পরিবারের সদস্যরা থাকেন পাশের লাল বাড়িটিতে।

যাই হোক, এই বাড়িগুলোর নিরাপত্তা ব্যারিকেডের বাইরের একপাশে একটা বড়সর চারকোনা কাউন্টার বক্স। বক্সের পাশেই গায়ে রোদ লাগিয়ে প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে দু’জন মধ্যবয়স্ক ডিজেএফআই আরামদায়ক ভঙ্গিতে বেশ উচ্চস্বরেই গল্পগুজব চালিয়ে যাচ্ছিলেন। আশেপাশের পরিস্থিতির দিকে তাদের খুব একটা নজর আছে বলে মনে হচ্ছিল না।

এবার আমার নজরটাকে একটু পেছনে ঘুরাতেই দেখি, লেকের পানিতে দুইজন হুইল ফেলে বসে আছে। আমি ওদিকে তাকাতেই তারা আমার দিকে এমনভাবে ফিরে তাকালো যে, মাছ ধরার সময় তাদের দিকে তাকানো মস্তবড় অপরাধ!

তাড়াতাড়ি সামনে মুখ ঘুরাতেই দেখি কোথেকে এক টিনএজার মেয়ে এসে আমার বামপাশে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলতে শুরু করেছে। এতক্ষণ যারা আমাকে দেখেও দেখেনি টাইপ ভান করছিল তারাও এবার এদিকে ফিরে তাকালো। দুই ডিজেএফআইও তাদের গল্প থামিয়ে এদিকেই তাকিয়ে আছে। ঘটনা তদন্তে এক পুলিশ কাছে আসতেই মেয়েটা ফোন রেখে পুলিশকে জিজ্ঞাসা করে বসলো, ‘আচ্ছা এই লেক দিয়ে কি ওই পাড়ে যাওয়া যায়?’
‘সাঁতার দিয়া পারলে অবশ্যই যাওয়া যায়’ পুলিশের সরেশ উত্তর। মেয়েটা আর কিছু না বলে গটগট করে হেটে চলে গেল। পুলিশ এবার আমার দিকে তাকালো, ‘আপনি ওনার সাথেরজন না?’ আমি মাথা নাড়তেই সে আবার বললো, ‘এখানে তো বসা যাবে না। অন্যকোথাও গিয়ে বসেন।’

আমি চুপচাপ উঠে দাঁড়িয়ে একটু সামনে চলে এলাম। চেয়ারে বসে থাকা ডিজেএফআইদের সামনে ওয়াসার একটা ভ্রাম্যমান পানির গাড়ি। এর ডান পাশে পুলিশদের রঙচঙে পোশাক আর অস্থায়ী ক্যাম্প দেখে মনে হতে পারে, একদল জিপসী তাবু ফেলে লেকের পাড়ে ঘোরাঘুরি শুরু করছে। ক্যাম্পের ভেতরে তিন চারটা করে কাঠের চৌকি ফেলে রাখা আছে। কিন্তু একটাতেও কোন তোষক কিংবা বালিশের চিহ্নমাত্র নেই। এলোমেলো কিছু পুরানো পেপার এদিক-ওদিক ছড়িয়ে আছে। এখানে ঘুমানোর কোন অবস্থা না থাকলেও বসে থেকে ঝিমানোর জন্য একবোরে মন্দ নয়।

ক্যাম্পগুলোর পাশেই আছে দুটি চায়ের দোকান। একটা দোকানে আবার শীতের পিঠাও বিক্রি হচ্ছে। এই দুই দোকানের আশেপাশে কাস্টোমারের কোন অভাব নেই। এর মধ্যে একজনকে দেখি, প্রকাশ্যে নাকের লোম ছিঁড়তে ছিঁড়তে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে। আমিও তার পাশে বসে নির্বিকার ভঙ্গিতে চা খেতে শুরু করলাম।

চা খাওয়া প্রায় শেষ এই সময় এক সাদা গাড়ি এসে থামলো রাস্তার ওপাশে। গাড়ি থেকে প্রায় লাফ দিয়ে নেমে এক তরুণ। কানে ফোন ধরে কার সাথে কথা বলছিল বোঝা না গেলেও দোকানের কাছাকাছি আসতেই তার মুখে একটা রিকোয়েস্ট শুনতে পেলাম, ‘আপনে মালডা দিয়া দেন বস, কাম শেষ হইলেই আবার ফেরত দিয়া দিমু।’ অনুরোধ সন্দেহজনক!

এই সময় ওপাশ থেকে শুনতে পেলাম, ‘কারও বেতন ক্লিয়ার হইবো না।’ আমি কাপ রেখে ঘটনা কি জানার জন্য আবার সুধাসদনের সামনে চলে এলাম।

এসে দেখি, সাদা পাঞ্জাবী পরা এক বয়স্ক চাচামিয়া বেশ উত্তেজিত ভঙ্গিতে হাত-পা ছোঁড়াছুড়ি করছেন। উনার একহাতে একটা পাটখড়ির সাদা লাঠি আরেক হাতে ঝুনঝুনি। উনি পুলিশ সদস্যদের কাউকে বেতন দিতে চাইছেন না। আমর্ড ব্যাটেলিয়ানের সদস্যরা ঘিরে ধরে বিভিন্নভাবে চাচাকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন যে, বেতন দেবার দরকার নেই। কিন্তু তারপরেও চাচা একটা কথাই বলতে লাগলেন, ‘না না বেতন কাউকেই দেয়া যাবে না।’ পুলিশ সদস্যরাতো মহা ঝামেলায় পরে গেলেন। চাচাকে এখান থেকে কিছুতেই সরানো যাচ্ছে না।

হঠাৎ চাচা তার হাতের পাটখড়ি তুলে বলতে শুরু করলেন, ‘বেতন কেন দিবো! শেখ সাহেবরে মারছে। তোদের বলছি, ভালো কইরা পাহারা দে। আর কাউরে য্যান মারতে না পারে। কিন্তু তোরা সবকয়টা ফাঁকিবাজ!’

এসময় সুধাসদনের ভেতর থেকে এক তরুণীকে হেটে আসতে দেখে আমি উদাস উদাস ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইলাম তার দিকে। তার হাতে দেশের নামকরা এক প্রাইভেট মেডিক্যালের ডেন্টাল বিভাগের কাগজপত্র ঠাসা সুদৃশ্য ফাইল। সুধাসদনের বাসিন্দাদের দাঁতে পোকাও ধরে নাকি! বিষয়টা জানা ছিল না।
৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

=একান্ত নিজস্ব জিনিসগুলো পর হয়ে যাচ্ছে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৫



যে চোখ দিয়ে দেখেছি ধরার আলো, সে চোখও দিচ্ছে ফাঁকি,
যে চোখের আলোয় দেখেছি পুকুর নদী, শুকনো উঠোন;
বৃষ্টি ভেজা দিন, দেখেছি ময়না শালিক, ঘুঘু ডাকা দুপুর
সে চোখ পর হয়ে যাচ্ছে অল্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×