মগবাজার ওয়্যারলেস রেলগেটের একপাশে অনেক চায়ের দোকান। এখানকার কোন দোকানে বসে চা খেতে গিয়ে আমার চোখ পড়লো একটা সাদা রঙের বাড়িটির দিকে। সেখানে বড় করে সবুজের মাঝে সাদা অক্ষরে লেখা, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। নীচে লেখা ‘প্রধান কার্যালয়’। দেখেই দূর থেকে বাড়ির গায়ে থুতু ছিটাতে ইচ্ছা করছিলো। কিন্তু এতো দূর থেকে তো আর থুতু ছিটানো যায়। এগিয়ে গেলাম সাদা বাড়িটার দিকে।
ঘুরে ঘুরে দেখার সময় মনে হলো, জামায়াতের প্রধান কার্যালয়ের এই তিনতলা বাড়িটির চারপাশে কেমন যেন একটা অশুভ ছাপ লেগে আছে। এই ঘৃণা ভয়ের নয়, হতাশার নয়, জিদ আর খানিকটা কষ্টের প্রচন্ড এই ঘৃণাবোধ বমির মতো উগড়ে আসতে চা ভেতর থেকে। একাত্তরে পাকিস্তানীদের পা চাটা নরপিশাচদের আস্তানা দেখলে এমনটা মনে হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।
নিরাপত্তার খাতিরে(!) কার্যালয়ের চারপাশ ঘিরে আছে পেটমোটা ইটের দেয়াল। তার উপরে আবার তারকাঁটা বিছানো। যতটা বিশাল জায়গা দখল করে বাড়ির চারপাশে দেয়াল তোলা হয়েছে, বাড়িটি অবশ্য ততটা বিশাল নয়। কার্যালয়ের বেশিরভাগ ঘরের বাতি নেভানো। অন্ধকারের মাঝে অফিসের কাজ চলে কিভাবে! অবশ্য নরকের প্রাণীদের কাজের জন্য অবশ্য অন্ধকারই সুবিধাজনক।
বাহিরে থেকে বোঝা যাচ্ছিল বাড়ির দু-একটা রুমে উইন্ডো এসিও লাগানো আছে। তবে ভেতরে অবশ্য তেমন কারও উপস্থিতি টের পাওয়া যাচ্ছিল না। মাঝে মাঝে কয়েকটা আবছা ছায়ামূর্তি এক ঝলকের জন্য চোখে পড়ছিল।
ঘরের ভেতরে গোল্লাছূট খেললে যেমনটা হয় আরকি। বাড়ির বাইরে একপাশে দুটি সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো। ক্যামেরা আসল না নকল সেটা বোঝা মুশকিল। নকল ক্যামেরা হলেও অবশ্য জামাতীদের সমস্যা নেই। জেএমবি তো আর তাদের বাপের বাড়িতে বোমা হামলা করতে আসবে না!
দেশের অন্যান্য জায়গায় যেখানে বোমা হামলার হাত থেকে বাঁচতে সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে সেখানে বোমা হামলাকারী নিজেরাই সিসি ক্যামেরা লাগিয়ে বসে আছে। ভাবতেই খানিকটা হাসি পেয়ে গেল। আর কিছু না হোক নকল ক্যামেরা লাগিয়ে অন্তত নিজেদের ভাবমূর্তিটাকে তো উজ্জ্বল করা যাবে।
প্রধান কার্যালয়ের ছাদে এল্যুমিনিয়াম গ্লাসের জানালা চিলেকোঠা দেখা যাচ্ছিল। এর পাশেই রশিতে মেয়েলী কিছু কাপড়-চোপড় রোদে দেয়া হয়েছে। কার্যালয়ের ভেতরের টপফ্লোরে মেয়েলী ভেজা কাপড় কি করে এলো? নিজামী সাহেবের পক্ষে অবশ্য আজকাল আর কোন কিছুই অসম্ভব নয়।
রেলগেট থেকে খানিকটা সামনে গিয়ে হাতের বামপাশের চিপাগলিতে জামায়াতীদের প্রধান কার্যালয়ের মূল ফাটক। গলিতে ইসলামি বইপত্র, সিডি-ডিভিডি ছাড়াও কনফেকশনারী ও সস্তা পুড়ি-সিঙ্গার একটি হোটেল রয়েছে। এসব দোকানের মালিক-কর্মচারী কারও ভাবভঙ্গিই মোটেও সুবিধাজনক মনে হলো না।
পঁচা আপেলের গাছ যেখানে জন্মেছে তার আশেপাশে ভালো আপেল পাবার আশাও করা উচিত নয়।
কার্যালয়ের মূল ফাটকের ওপাশে কিছুই দেখা যায় না। গেটের দু’পাশে এখানেও সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো। তবে এখানকার ক্যামেরাগুলো স্থির। কোনো নড়াচড়া নেই। ক্যামেরার পাশে গেটে এক বুড়ো দারোয়ান দাঁড়িয়ে আছে। বুড়ো হলেও বেশ শক্তসামর্থ বোঝা যায়। এদিকে কার্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার মতো কোন অবস্থা নেই।
বুড়ো দাড়োয়ান বেশ সন্দেহজনক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে অনেক্ষণ ধরেই। কোথায় দাঁড়ানো যায় ভেবে ভেবে শেষ পর্যন্ত গিয়ে থামলাম পুড়ি-সিঙ্গারার দোকানের সামনে। একটা বাসি পুড়ি তুলে নিয়ে মুখে দিতেই মনে হলো রামুর রাবার বাগানের কোন রাবারের টুকরো চিবুচ্ছি।
ঘুরেফিরে দড়িয়েছি এমন এক জায়গায়, যেখানে সিসি ক্যামেরার চোখ বড়বড় করে এদিকেই তাকিয়ে আছে। দেয়ালের ওপর দিয়েও কিচ্ছু দেখার উপায় নেই। বুড়ো দাড়োয়ান ছাড়া আর কাউকেই দেখা যাচ্ছিল না। একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান কার্যালয়ের আশেপাশে নেতা-কর্মীদের কোন ভীড় নেই-বিষয়টি একেবারেই বেখাপ্পা মনে হলো।
দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর গেটের ভেতর থেকে দুইজন লোক বের হয়ে এলো। একজনের নাকের নীচে সরু গোঁফ। আরেকজনের গালে দাড়ি, গোঁফ নেই। দু’জনের পড়নেই পায়জামা-পাঞ্জাবী।
গালে দাড়ি’র হাতে মোবাইল। আর সরু গোঁফ সেই মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে হুমড়ি খেয়ে তাকিয়ে আছে। চোখে মুখে বিরাট উত্তেজনার ছাপ। গালে দাড়ি মোবাইলটা সরিয়ে নিতে চাচ্ছিল। কিন্তু সরু গোঁফ কিছুতেই তা হতে দিবে না।
গালে দাড়িঃ রাখ! রাখ! বন্ধ কর, পরে গিয়া দেহিস।
সরু গোঁফঃ ধূর ব্যাটা! এমুন জিনিস আগে দেখছি কোনদিন! দ্যাখ কি মাল!
গালে দাড়িঃ আরেকটা মেমোরি কার্ড নিয়া আসা দরকার ছিলো।
সরু গোঁফঃ ভিতরে এমন কালেকশন! সব নিয়া যাইতে হইবো।
ওরা চলে যাবার একটু পরে; সাদা কোর্ট-প্যান্ট, মুখে চাপ দাড়ি আর চোখে মোটা গ্লাসের কালো চশমা চোখে এক লোক হেটে আসতে দেখা গেল। লোকটার হাতে একটা কালো ব্রিফকেস। মোটমুটি মেকআপ ছাড়াই বাংলা ছবির স্মাগলার পার্টের অভিনয়ে চালিয়ে দেয়া যাবে।
স্মাগলার সাহেব হাটি হাটি পা পা করে সোজা এসে ঢুকে পরলেন জামাতের অফিসে। তাকে দেখেই বুড়ো দাড়োয়ান খটাশ করে সালাম দিয়ে বসলো। বোধহয় উনি কোন উচ্চপর্যায়ের জামায়াতী অফিসার(!) হবেন। কিন্তু তাহলে তো এরকম কোর্ট-টাই পরে থাকার কথা নয়। বিষয়টা ঠিক বোঝা গেল না।
জামায়াতী ইসলামীর অফিসে যাবো বলে বেশ কয়েকদিন শেভ করা হয়নি। চাপদাড়ি নিয়ে চামে বাড়ির আশেপাশে অনেক্ষণ ধরেই ঘুরঘুর করছিলাম।
ঘন্টা দেড়েক পর শার্ট-প্যান্ট পরা কুকুর চেহারার এক লোক বাড়ির ভেতর থেকে বেড়িয়ে এসে ঘেউ ঘেউ করে বললো, ‘অই মিয়া অফিসের আশপাশে এতো ঘুরঘুর করতাছেন ক্যান?
আমি না শোনার ভান করে এড়িয়ে যাচ্ছিলাম। কুকুর একা খুব একটা সুবিধা করতে না পেরে একটু পর শূকর চেহারার আরো দুইজনকে নিয়ে ফিরে এলো।
শূকর চেহারার একজন নানাভাবে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলো, ‘কোথেকে এসেছি’, ‘কেন এসেছি’, ‘কার কাছে এসেছি।’ ভুং ভাং কি সব জবাব দিচ্ছিলাম।
এসময় পাশ থেকে আরেক শূকর আমার গায়ে একটা ধাক্কা দিয়ে বললো, ‘আমাগো লগে কি মজা লও?- বলেই ডান হাত তুলে গলা বরাবর সামনে পেছনে দু’বার ছোঁড়া চালাবার ভঙ্গি করলো।
তার এই ভঙ্গিতে কোন জড়তা নেই। যেন অনেকদিন থেকেই এই কাজে সে অভ্যস্ত! তার চোখের দৃষ্টিই বলে দিচ্ছিল, সত্যিকারের ছোঁড়া হাতে নিয়ে সেটা কারো গলায় চালিয়ে দিতেও বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ কখনো তার মনে কাজ করবে না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

