ছিপছিপে লম্বা লোকটা টকটকে র্ফসা রঙ, মুখ ভর্তি দাড়ি দেখলেই বুঝা যায় বাঙালি নয় কিন্তু পুরোদস্তুর বাঙালি পোষাক, চালচলন এবং কথা বলায় । একখানা হারমনিয়াম গামছায় বেঁধে গলায় ঝুলিয়েছে। পায়ে দুই ফিতার অতি সাধারণ স্যান্ডেল, ফতুয়া, লুঙি গায়ে, টরন্টো শহরের ঝাঁঝাঁ দুপুরে, পহেলা জুলাইর ক্যানাডা ডের আনন্দময় দিনে অনায়াসে বাঙালি সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছে। লোকটা কিন্তু বাংলাদেশী নয়, র্জামান।
কথা বলছে বাংলায়। মাঝে মাঝে হারমনিয়াম বাজিয়ে গাইছে গান। আমার একটা নদী আছে জানল না তো কেউ.... পাখি উড়িয়া উড়িয়া...আরো অনেক গান... লালন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের।
হারমনিয়ামটায় অনেক যত্নে বাংলা বর্ণ খুদাই করা । গ্রাম বাংলায় কুড়িয়ে পাওয়া একটি সুন্দর প্রবচন লেখা, এখন ভুলে গেছি সেটা, যার গুঢ় অর্থ মানুষকে ভালোবাসার কথাই বলে।
গানের ফাঁকে ফাঁকে দূরে একখানা রিকসা দাঁড় করানো আছে তার উপর গিয়ে বসছে। রিকসাটিও রঙচঙে ফুল পাতার নকশায় বাংলাদেশের ছবি তুলে ধরে এই সুদূরে। বেশ একটা ভীড় তাকে ঘিরে বাংলাদেশী এবং বিদেশীদেরও।
র্মাকোস কাজের সূত্রে বাংলাদেশে ছিল বছর দুই। কাজের প্রয়োজনে বাংলা ভাষা শিখতে হয়েছে ওকে তখন। কিন্তু দুবছর পরে, ও বাংলাদেশ থেকে চলে এলেও বুকে ধারণ করে আছে, শুধু ভাষা নয় সে দেশের আচার আচরণ, রীতি নীতি। বাংলাদেশ ওর সাথে বিরাজ করে। প্রতিদিন অর্ন্তজালে পড়ে বাংলা পত্রিকা, জানে ঐদেশের খবর। একদিন ওর বাড়িতে গিয়ে দেখলাম বাংলাদেশ। শিতল পাটি, মোড়া, শাড়ি, বাংলাদেশী পুতুল, পাখা আরো গ্রামবাংলার নানান জিনিস দিয়ে সাজানো ঘর। আর রিকসা খানাও নিয়ে এসেছে জাহাজে চড়িয়ে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বাংলা গান করা ছাড়াও, রিকসার ভেতরে বসে পেছনের জানলা দিয়ে বাংলা পাপেট শো করে বেড়ায় । ওকে কেউ বলে দেয়নি, জোর করেনি, আপন মনের মাধুরী দিয়ে নিজের মনের ভালোলাগায় ভালোবাসে সে বাংলা ভাষা আর বাংলাদেশ।
প্রকৃতি, পরিবেশ জাতি গোষ্ঠীর কারণে বিভিন্ন দেশে জন্ম গ্রহণ করা মানুষ জন্ম সুত্রে পাওয়া নানান ভাষায় কথা বলে। প্রতিটি জাতি স্বাচ্ছন্দ্য তার নিজের ভাষায় কথা বলায়। প্রতিটি মানুষের মুখের বুলিতে প্রস্ফূটিত হয় পরিবার, শিক্ষা, দিক্ষা আর ব্যক্তি সাতন্ত্র ।
মানুষমাত্রই ভালোবাসে কথা বলতে। নিজের ভাব বিনিময় করতে অপরের সাথে। ভাষাই এই ভাব বিনিময়ের প্রধান মাধ্যম। প্রতিটি জাতির নিজের মাতৃভাষা অনেক আপন তার কাছে। সে ভাষাকে রুদ্ধ করে দিতে চাইলে, প্রতিবাদে রক্ত ঢেলে দিয়েছিল রাজপথে বরকত, জব্বার, রফিক, সালাম ১৯৫২ এর একুশে ফেব্রুয়ারী। তাদের সে প্রতিবাদ, ত্যাগের ফলে আজ আমরা পেয়েছি নিজেস্ব ভাষা।
বাংলা ভাষা আজ শুধু বাংলাদেশের ভৌগলিক সীমায় আবদ্ধ নয়, ছড়িয়ে পড়েছে সারা পৃথিবী জুড়ে। বিভিন্ন দেশে বাঙালি পাড়া গড়ে উঠেছে আর সেখানে দোকান পাটে বাংলা লেখা সাইনর্বোড। বিদেশির কাছে নিজের দেশকে প্রচার করার চেষ্টায় সাধারণ মানুষ নিজস্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লাল সবুজের মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করেন বাংলা দেশের পতাকা । খুব ভালোলাগা দেয় এই বিষয়টি । আজ অন্য ভাষার পাশাপাশি যখন দেখি বাংলায় লেখা ‘স্বাগতম’ , ‘ধন্যবাদ’ এমন শব্দ গুলো তখন অনেক ভালোলাগায় ভরে উঠে মন।
টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগ আছে। যেখানে বিদেশিরা বাংলা শিখে। একজন বাংলাদেশীর একক প্রচেষ্টায় এই বিভাগটি গড়ে উঠেছে প্রায় দশ বছর। যোসেফ ও’কর্নেল একজন শিক্ষক যিনি শান্তি নিকেতনে বাংলা শিখে এসেছেন। জাপানের নারিতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাইজু আজুমা এমনি আরেক ভদ্রলোক রবীন্দ্রনাথের উপর পড়ালেখা করেছেন শান্তিনিকেতনে। নিজেকে ভাবেন পুরোদস্তুর বাঙালী । রবীন্দ্রনাথের রচনাসমুহ জাপানি ভাষায় অনুবাদ করেছেন। যোসেফ ও কর্নেল ও কাইজু আজুমার কেনেডিয়ান এবং জাপানি স্ত্রী রাও ভালো বাংলা বলেন। কাইজু আজুমার স্ত্রী কলকাতা থেকে জাপান ফেরার পথে আমার বাড়িতে থাকলেন ঢাকায়। বাংলায় প্রাণ খুলে কথা হলো তার সাথে । ১৯৮৮ সনের দিকে জাতীয় কবিতা উৎসবের অনুষ্ঠানে জাপান থেকে আসা কবি শাড়ি পরে, বাংলায় কবিতা পড়ে আর রবীন্দ্র সঙ্গীত গেয়ে হৃদয় জয় করেছিলেন বাংলাদেশীদের। ক’ বছর আগে টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়ে গেলো রবীন্দ্র উৎসব। অনেকের সাথে আমিও কবিতা পড়তে গেলাম। দেখা পরিচয় হলো দেশ বিদেশ থেকে আসা অনেক বাংলাভাষায় আগ্রহী বিদেশি মানুষের সাথে। যারা পড়ালেখা করে শিখছেন আমাদের প্রাণের ভাষা বাংলা। আর আজকাল মাল্টিকালচারাল বিয়ে করে বিদেশী অনেকেই পুরোদমে বাঙ্গালি হয়ে উঠছেন। নিজের দেশের মানুষ নয় শুধু বিদেশীরাও যখন আমার ভাষায় কথা বলে অনেক অনেক বেশী ভালোলাগে, ভাষার এই বিস্তৃতি দেশে বিদেশে দেখে গর্বে বুক ভরে উঠে ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

