বাংলাদেশ ছাপিয়ে শোকের ছায়া ছড়িয়ে পরেছে টরন্টো শহরের বাংলাদেশীদের মাঝে। কারণ মিশুক এখানে বড় জীবন্ত গত একদশক এই শহরের আলো বাতাসে মিশে আছে মিশুক। মাঝে মাঝেই কাজের প্রয়োজনে চলে গিয়েছে কিন্তু ফিরে এসেছে বারবার। এবার চলে গেছে স্থায়ী ভাবে দেশের কাজে। ফিরাটা খুব তাড়াতাড়ি হবে না সময়ের ব্যবধান খুব বেশী নয় তাই অভাবটা তেমন গায়ে লাগেনি এখনো। পুরানো পরিচয়, নতুন বন্ধু, খানিক দেখা সবার মনে অসম্ভব দাগ কেটে আছে মিশুক। তারেকেরও অনেক কাছের মানুষ, প্রিয় মানুষ এখানে তবে মিশুক খুব বেশী জীবন্ত যেহেতু এই শহরে এই পথে এই মানুষগুলোর খুব কাছাকাছি থাকা একটা মানুষ সে। নিঃশ্বাসের শব্দ, হাসির দমক, কথা বলার ধরন, চলন ফেরন চোখের উপর নাচছে।
সড়ক র্দূঘটনায় মিশুক মুনির, তারেক মাসুদ সহ পাঁচজনের মর্মান্তিক খবরটা একজন দুজন থেকে ছড়াতে ছড়াতে সবার মাঝে ছড়িয়ে পরে। শোকের কালো নদী দীর্ঘ হতে থাকে । মানুষগুলোর চোখ ঝাপসা, বুকের ভিতর গুমরানো যন্ত্রনা। হতে পারে না এ হতে পারে না অবিশ্বাস বিশ্বাস হয়ে উঠতে চায়। কাম্য নয় তবু অবশ্যম্ভাবি মৃত্যু জগদ্দল পাথর হয়ে বসে । উত্তর মেরুর শীতলতা ছড়ায় গ্রীষ্মের প্রহরে।
খুব দ্রুত সিদ্ধান্তে জমায়েত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় পরদিনই। এমনই ইচ্ছা জাগছিল সবার মনে একসাথে হতে পারলে হয়তোবা কষ্ট ভাগাভাগি করা যাবে। আপন তাগিতে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে অনেক লোক সমবেত হন। স্মৃতির্জজরিত প্রতিটি মানুষ আবেগ প্রবণ, চোখের পাতা ভেজা। শোক নয় স্বজন হারানোর ব্যথায় প্রতিবাদ তুলেন। উজ্জ্বল দুই নক্ষত্রের এভাবে ঝরে যাওয়া কেউ মেনে নিতে পারছে না, কেউ না।
আমি গত তিনদিন ধরে লেখার চেষ্টা করছি। ওদের কার্যক্ষেত্রের দীর্ঘ বর্ণনা অনেকের লেখায় উঠে আসবে কিন্তু আমি লিখতে চেয়ে ছিলাম একজন বাবা, স্বামী আর প্রেমিকের কথা। কিন্তু গত তিনদিনে মোটে আধা পাতা লিখা হয়েছে। বারবার তিনটি মুখ মিলে মিশে একাকার হয়ে ভাবনার ক্যানভাস মিলিয়ে যাচ্ছে।
আজ গভীর রাতে গতকাল অনুষ্ঠানে, সাইফুল্লা ওয়াদুদ হেলালের করা মিশুকের সাক্ষাতকারের উত্তরগুলো আমার মগজে বড় বেশী জটলা পাকাচ্ছে, আমাকে ঘুমাতে দিচ্ছে না কিছুতেই।
মিশুক বলছিল,
”আমাদেরই দোষ। আমরা বড় বেশী উদার মাফ করে দেই । আমরা কারো দোষ দেখি না। সব কিছু বড় সরলতায় গ্রহণ করি। মানুষ ধর্ম করছে একটু বেশী ওয়াজ নসিহত হচ্ছে এতে দোষের কিছু নাই।”
“ কিন্তু বছরের পর বছর যাওয়ার পর আমরা দেখেছি ধর্মের আভরণে ওরা বেশ শক্ত একটা ভিত্তি তৈরী করে ফেলেছে। ”
আমার আরো কিছু ঘটনা মনে পড়ছে, হুমায়ুন আজাদকে নৃশংস ভাবে আক্রমন করা হয়েছিল মেরে ফেলার জন্য সত্য কথা বলার জন্য। সাহসী কথা বলার জন্য। কিছুদিনের জন্য সুস্থ হয়ে উঠলেও তার কন্ঠ বজ্র হয়ে বেজে উঠার সুযোগ পায়নি মৃত্যুই শেষ পরিণতী হয়েছে।
দু হাজার এক সনের এগারই সেপ্টেম্বর শান্ত সকালে নিরিহ প্লেন উড়ে আসছিল প্রতিদিনের মতন। কেউ কিছু ভাবেনি কিন্তু প্লেনটা দালানের মাঝে ঢুকে পড়ার পরও কেউ ভাবেনি ইচ্ছাকৃত কেউ কিছু করেছে। কয়েক মিনিটের মাঝে দ্বিতীয় প্লেনটি আরেকটি অট্টালিকা ভেদ করে চলে যাবার পরও মানুষ ভাবছিল কী হচ্ছে, একটার পর একটা এমন প্লেন এ্যাকসিডেন্ট হচ্ছে আজ সকালে। তিন নাম্বার প্লেন পেন্টাগনে পরার পর মানুষ ভাবতে শুরু করল ”আমেরিকা ইজ আন্ডার এ্যাটাক”।
প্রথমবার, মানুষ সহজ ভাবেই নিতে চায়। দ্বিতীয়বারেও খারাপ ভাবতে চায় না। কিন্তু এরপর সর্তকতা আপনা আপনি চলে আসে।
মাস্টারমাইন্ড চিন্তাবিদরা আনেক অগ্রসর চিন্তা করে। সহজ মানুষ যার ধারে কাছেও ভাবে না সাধারন জীবন যাপনেই ব্যাস্ত থাকে। কারো চোখে কিছু অস্বাভাবিক মনে হয় না সহজে ধরা পরে না ওদের কাজ। ওরা আরো সহজ স্বাভাবিক ব্যবহার নিয়ে মিশে থাকে মানুষের মনে আর আস্ট্রেপৃষ্টে বাঁধতে থাকে চারপাশ থেকে মাকড়সা যেমন নিরীহ জাল ছড়িয়ে ঘর বেঁধে বসে থাকে কিন্তু উড়ে আসা পতঙ্গরা আটকা পড়ে যায়। তেমনি সাধারণ মানুষ যার কিছুই বুঝে উঠে না । আটঘাট পুরো বাধা হয়ে গেলে সরলতার উপর প্রচন্ড আঘাতে স¦রূপ দেখায়।
দুই হাজার একের ঘটনার বহু আগে বাংলাদেশে তিরাশি সনের ফেব্রুয়ারীতে এমনি এক আপাত দৃষ্টিতে নিরিহ ঘটনা ঘটানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। ছাত্রদের মিছিলের উপর ট্রাক উঠে এসেছিল। র্নিমমভাবে পিষ্ট হয়ে মারা গিয়েছিল সেলিম. দেলোয়ার আহত হয়েছিল আরো অনেকে। দূর্ঘটনা বলেই চালানোর চেষ্টা করেছিল কিন্তু তুখোর ছাত্ররা সাথে সাথেই প্রতিবাদে মুখর হয়েছিল। দূর্ঘটনা নয় হত্যা করা হয়েছে।
ভিডিওতে যতদূর দেখলাম রাস্তা ফাঁকাছিল দুপাশ থেকেই মনে হলো। আমি ভেবেছিলাম আগের মতই বাংলাদেশের রাস্তায় মাঝ দিয়ে গাড়ি চলে,সামনে গাড়ি এলে পাশে সরে জায়গা দেয়া হয় কিন্তু মনে হলো আসা যাওয়ার রাস্তা দাগ দিয়ে ভাগ করা আছে। আজ ঘাতক ড্রাইভারের কথা শুনে নিশ্চত হলাম। রাস্তা মাঝ বরাবর ভাগ করা আছে সাদা দাগদিয়ে। তাহলে ধাক্কা দেয়ার জন্যই অন্যপাশে সরে আসা হয়েছে।
তারেক মাসুদ যে ভাবে মুক্তিযুদ্ধ, মাদ্রাসা, লোকাচার, ইতিহাস নিয়ে ঘাটাঘাটি করছে লোকটা কারো কাছে ডেঞ্জারাস হতেও পারে। তোমার আমার কাছে না হয় সোনার ছেলে। আরেক জন জুটেছে মুক্ত চিন্তার মানুষ। ক্যানাডা ছিল ভালো, চুপচাপ বিদেশে থাকো। এখানে কেন ফিরে আসা বাপু।
স্বাধীন দেশে আপন মনের মাধুরী মিশায়ে দেশের কথা বলতে ওরা হয়তো সাচ্ছন্ধ বোধ করছিল কিন্তু পাশেই কিছ ুমানুষের হয়তো দম বন্ধ হয়ে আসছিল ওদের কার্যক্রমে। আস্তে আস্তে গতি রোধ করার চিন্তাটা হয়তো ছিল কিন্তু এক ঢিলে দুই পাখি মেরে ফেলার আনন্দটা হয়তো শোকে মূহ্যমান মানুষের আড়ালে উজ্জাপিত হয়েছে মহা ধুমধামে, কে জানে? নিরব সড়কে র্নিধারিত গাড়িটি ধাক্কা দিতে অসুবিধা কোথায় যদি আগে থেকে পরিকল্পনা থাকে।
নিরিহ র্দূঘটনায় দুজন উজ্জ্বল নক্ষত্রের জীবন অবসান হয়েছে এর পিছনে আসল ঘটনা চাঁপা দেয়া খুব সহজ। মেধাবীদের মেরে ফেলার প্রক্রিয়া সেতো বাংলাদেশ হওয়ার প্রক্কাল থেকেই চলে আসছে চৌদ্দই ডিসেম্বর উনিশ একাত্তর থেকে নানান অভিসিন্ধিতে হামলা বুদ্ধিজীবির উপরই তো হচ্ছে।
ক’দিন আগেই এক বন্ধুর সাথে এই কথাই আলোচনা করছিলাম। র্দূঘটনায় শুধু উজ্জ্বল মেধাবী মানুষ গুলো কেন চলে যায়? যারা প্রতিষ্ঠিত অপরাধী তারাতো বহাল তবীয়তেই আছে কখনো কোন র্দূঘটনা ঘটনার সামান্যতম আঁচড় তাদের গায়ে লাগেনা কেন? সহজ উত্তর মনে হয় একটাই সাধারন মানুষ তাদের জীবনযাত্রা নিয়েই ব্যস্ত কোন জটিলতার সূতা বুনেনা কারো বিরুদ্ধে।
নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থার দাবী সরকারের কাছে থাকবে কিন্তু এই হৈ চৈর আড়ালে আসল পরিকল্পনাকারী মাস্টার মাইন্ডরা যেন লুকিয়ে না থাকতে পারে ।
হয়তোবা বেশী ভাবা বেশী বলা হয়ে গেলো কিন্তু আবারো মিশুকের কথাটা প্রতিধ্বনীত হয় মগজের কোষে কোষে আমাদেরই দোষ। বড় বেশী উদার আমরা তবে এখন মনে হয় ভাবার সময় আসলেই হয়েছে। এভাবে আমরা আর একটি মেধাকেও হারাতে চাইনা বাংলাদেশের। মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী কিন্তু কখনো কাম্য নয় আর এমন মৃত্যু কখনো না।
।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


