১ম দিনঃ রুমা টু বগালেক ট্রেকিং
২য় দিন: বগালেক থেকে কেওক্রাডং ট্রেকিং
প্রথম রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগেই সবাইকে বলে দেওয়া হয়েছিল যারা সকালে কেওক্রাডং যেতে ইচ্ছুক তারা যেন সকাল সকাল ঘুমাতে যায় এবং অবশ্যই সকাল সকাল উঠে যেতে হবে। সকালে উঠে মুখহাত ধুয়ে জ্যাম লাগিয়ে অর্ধেক পাউরুটি সাবাড় করে দ্রুত ট্রেকিং এর পোশাক পরে নিয়ে সিয়াম রেস্ট হাউসের উঠানে এসে যাই, দলের যারা কেওক্রাডং যাবেন তারা একে একে সবাই সেখানে জড়ো হন।
এরপর শুরু হয় আমাদের কেওক্রাডং অভিমুখে যাত্রা। বগালেক পাড়া থেকে বেরিয়ে জুম ক্ষেতের মাঝ দিয়ে যাওয়ার সময় বুঝতে পারিনি আমাদের জন্য কত খাড়া রাস্তা অপেক্ষা করছে। একটু পরেই হঠাৎ আমার মোবাইল বেজে উঠে, বের করে দেখি খুব প্রিয় একজনের কল, “কাল থেকে তোমাকে অনেক মিস করছি”। বান্দারবানের এত ভিতরে এসে মোবাইলের নেটওয়ার্ক পেয়ে সত্যি চমকে গিয়েছিলাম। খাড়া উঠতে উঠতে অনেকের সাথেই একদিনের জমানো আলাপগুলো সেরে নিয়েছিলাম। দেশের বাইরে আমার বাবা-মাকেও জানিয়ে দিই যে আমি কেওক্রাডং যাচ্ছি।
কিছুদূর চলার পর আমরা বেশ ক’জন অন্যদের থেকে আলাদা হয়ে পড়ি। আমি, সৌম্য ভাই, সাঈদ ভাই, বাবু ভাই, আরিফ ভাই, মিজান ভাই এক সাথে উঠতে থাকি। চিংড়ি ঝর্ণা পার হওয়ার পর কিছুদূর আমাদের সাথে এক উপজাতি পরিবার যাত্রা সংগী হয়, চড়াই উঠতে উঠতে ভাবছিলাম কত সহজেইনা ঐ মহিলা পিঠে আমার চেয়ে পাঁচগুণ ওজন নিয়ে উঠে যাচ্ছেন। পথে একবার দু'পাহাড়ের মাঝে বাঁশের সাঁকো পেরুতে হয়, কি ভেবে যে পার হওয়ার সময় আমি ঐ সাঁকোর নিচে তাকিয়েছিলাম পরে আমার পা কাঁপতেই থাকে। অনেক নিচে পাথর দেখা যাচ্ছিল, পড়ে গেলে ঐ খাদ থেকে আমাকে কেউ তুলতেও পারবেনা, নিশ্চিত মৃত্যু!
এরপর কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে নিয়ে একটানা উঠে আমরা দার্জিলিং পাড়ায় এসে পৌঁছি, ব্যাগ থেকে মজাদার চিনি-টোস্ট বের করে অন্যদের সাথে থাকা খেজুর, আচার আর দার্জিলিং পাড়ার দাদার দোকানের কফি খেয়ে চাঙ্গা হয়ে উঠি। এরপর আবারো খাড়া পাহাড় বেয়ে উঠা, পথ যেন আর শেষ হতেই চায়না। পাহাড়ের গায়ে মেঘেদের লুকোচুরি দেখতে দেখতে আর ছবি তুলতে তুলতে কখন যেন আশে পাশের পাহাড়গুলোকে ছাড়িয়েঅনেক উঁচুতে উঠে গেছি। সামনে কেওক্রাডং এর চুড়া দেখতে পেলেও সিঁড়ি আর আসেইনা, সৌম্য ভাই উপজাতি এক দাদার কাছে জানতে চায় সিঁড়ি আর কত দূর, উত্তরে জানতে পারি আরও কিছুটা দূর আছে। একসময় কাঙ্খিত সিঁড়ি দেখতে পাই, দু'দফা বিশ্রাম নিয়ে অবশেষে চুড়ায় গিয়ে পৌঁছি। সে এক অসাধারণ অনুভূতি, আনন্দ। চারপাশে উঁচুনিচু পাহাড়ের চুড়া দিগন্তে মিশেছে আর চুড়াগুলোতে জড়িয়ে আছে সাদা, ধুঁসর মেঘ। একপাশে বৃষ্টি হচ্ছে তো অন্যপাশে ঝলমলে রোদ, আর আমি সবকিছুর উপরে উঠে প্রকৃতির অসীম সৌন্দর্য উপভোগ করছি। নিজেকে তখন সত্যিকার সৌভাগ্যবান মনে হচ্ছিল আর স্রষ্টাকে ধন্যবাদ দিচ্ছিলাম এমন একটি মুহুর্ত উপভোগ করার মত শারীরিক-মানসিক শক্তি দেওয়ার জন্য। সারা পথে সমানে ক্যামেরার সাটার টিপে গেছি, যেন কোনটা রেখে কোনটা তুলি অবস্থা। সৌম্য ভাই বারবার সাবধান করে দিচ্ছিলেন এত ছবি তুলে ক্যামেরার চার্জ শেষ করে ফেললে শেষে চুড়ায় উঠে ছবি তুলতে পারবোনা। পরে চুড়ায় উঠেও ছবি তুলেছি অনেক যদিও ততক্ষণে আমার ক্যামেরার চার্জ শেষ দাগে এসে ঠেকেছিল।
কেওক্রাডং এর চুড়ায় আমাদের টিমের সাথে থাকা জিপিএস এ উচ্চতা দেখাচ্ছিল। সবাই মিলে ফটোসেশন আর হালকা নাস্তা-পানি খেয়ে আমরা অগ্রগামী দল হিসেবে আমরা মূল দল থে দলছূট কয়েকজন বগালেক অভিমূখে নামতে শুরু করি। উঠার সময় একরকমের কষ্ট হচ্ছিল, হাঁফিয়ে উঠছিলাম খুব। নামতে গিয়ে পায়ের গোড়ালি আর কোমরে অত্যধিক চাপ পড়ছিল, তবুও জয় করার আনন্দে আমরা তর তর করে নামতে থাকি। আবারো মাঝপথে দার্জিলিং পাড়ায় বিরতি নিই সাথে চমৎকার কফির স্বাদ। আরো নেমে আসার পর চিংড়ি ঝর্ণা পেরিয়ে একসময় বগা লেক দেখতে পাই। বগালেকপাড়া ঢোকার মুখে দেখি পূরবী আপু দাড়িয়ে আছেন, সামনে আসতেই আমাদের অভ্যর্থনা জানান। ও, বলে রাখি- আমাদের দলের যারা বগালেক থেকে কেওক্রাডং ট্রেকিং এ যাননি পূরবী আপু তাদের একজন। বগালেকপাড়ায় সিয়াম রেস্ট হাউজে অল্প বিশ্রাম নিয়ে বগার ঠান্ডা জলে ঝাপিয়ে পড়ি। দুপুরের খাওয়া শেষ করে কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে উঠে দেখি সবাই লেকের পাড়ে আড্ডায় মগ্ন, আমিও তাদের সাথে মিশে যাই। একসময় চা আসে, অনেকে দু'কাপ করে চমৎকার স্বাদের সে চা পান করেন। সন্ধ্যা নামলে তারাদের আলোতে আমাদের আড্ডা চলতে থাকে। একসময় রাতের খাবারের ডাক পড়ে, চমৎকার চিকেন খিচুড়ি খেয়ে ব্যাগপ্যাক গুছিয়ে ঘুমাতে যাই, ভোরে উঠে যে আবারো পথে চলতে হবে। এবার ঘরের ছেলে ঘরে ফেরার পালা.......

















অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

