এক একটা দিন পার হয়ে যায় শুধু শঙ্কা দুক্ষ হতাশা নিয়ে। জীবন কে যাপন আর করা হয়ে ওঠে না শেষ মেষ। আর কত? লিলিয়া হাতে তুলে নিল সেই বইটা আর হাসল একটু আপন মনে। চট করে একটু মুখে পানি দিয়ে, দুটুকরো জ্যাম টোস্ট আর এক কাপ কফির পরে লিলিয়া বেড়িয়ে পরল পথে। একটা নির্জন পার্কে গিয়ে সারাটা দিন আজ সে বই পড়েই কাটাবে। সব কিছু প্ল্যান মতই চলছে এ পর্যন্ত। নদীর পারের ছোট্ট নির্জন পার্কে বসে লিলিয়া বইয়ের রাজ্যে হারিয়ে গেল। বইটি কে মিথ বা প্রফেসি অথবা বৈজ্ঞ্যানিক কল্পকাহিনীর মাঝামাঝি বলাটা বোধ হয় ভুল হবে না। মানব সভ্যতার উত্থান এবং পতন, পতনের পরে আবার উত্থান এবং আবার নতুন করে পতন এর ঘূর্নীপাক অনেক বড় স্কেল এ কল্পনা করলে যেমনটি হওয়ার কথা ঠিক তেমন অনুভব করছিল লিলিয়া। চিন্তা করতে গিয়ে মাথা ঘুরপাক খাওয়ার দশা তার। মনের এবং ব্রেইনের জং ধরার সম্ভাবনা রাশ পায় এসব চিন্তার ঘুর্নিপাকে। লিলিয়া ভাবে, একারনেই বোধহয় মানুশ অন্ধভাবে ধর্মীও পুস্তক গুলোকে বিশ্বাস করে চলে। কারন তা সহজ এবং এত চিন্তার ঘূর্নীপাকে ঘোরারও প্রয়োজন পরে না।
কিন্তু সে তো আর সবাই পারে না। লিলিয়াও তেমনি না পারার দলে। অনেক প্রশ্ন, অনেক এডভেঞ্চার নিয়েই তো এই অস্তিত্বের, এই বেঁচে থাকার স্বার্থকতা। আর বাংলাদেশের মত একটি দেশের মেয়ে হলে তো অনেক কাঠখড় পোঁড়াতেই হয় সেই বেঁচে থাকাকে স্বার্থক করতে। ধন্যবাদ এই একবিংশ শতাব্দির বিজ্ঞান এবং টেকনলজিক্যাল এডভান্সমেন্ট যা জিওগ্রাফিক্যাল দুরত্বকে তুচ্ছ করে সারা পৃথিবীকে এত কাছে নয়ে এসেছে। বাংলাদেশের মেয়ে হয়েও পাশ্চাত্যের মেয়েদের মত স্বাধিনতা উপভোগ করা সম্ভব, নানা দেশ নানা সংস্কৃতির স্বাদ নেয়া সম্ভব। এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখা সম্ভব।
ঘাসের উপর আধশোয়া হয়ে বইয়ের মধ্যে মাথা গুঁজে ছিল লিলিয়া। আচমকা একটি ভরাট একটু বয়স্ক পরিচিত গলার আঁওয়াজ শুনে উঠে বসল লিলিয়া। পিটার, চিত্র শিল্পী। প্রায়ই সে নদীর ধারের এই পার্কটিতে বসে ঝকঝকে শহরটির নানা মুডের ছবি আঁকে। কখন রৌদ্রজ্জল, কখনওবা বৃষ্টিস্নাত, আবার কখন মনমরা ধুসর রঙের শহরটি।
"কেমন আছো সুন্দরী তরুনী? অনেক দিন কোন দেখা নেই যে? আমি তো প্রায় ভাবতে শুরু করেছিলাম যে আমার ভারতীয় সুন্দরীর আর বোধ হয় দেখা মিলবে না। ইংল্যান্ড তাকে নিশ্চয়ই বিরক্ত করে ফেলেছে তার ধুসর আবহাওয়া দিয়ে!", একনাগারে কথা বলে গেল পিটার।
লিলিয়ার মুখ হাসিতে উদ্ভাসিত হল। অনেক গল্প আছে পিটারের জীবনে, অনেক অভিজ্ঞতায় ভরা। শুনতে গেলে অনেক সময় অজানা শিহরণ জাগে। এডভেঞ্চারের উত্তেজনার সাথে ভয় এবং আনন্দের মশেল অনুভূতি।
"ওহ পিটার। বাংলাদেশী আমি, ভারতীয় নই। আর কতবার তোমাকে মনে করিয়ে দিতে হবে?" একটু রাগের ভান করে হেসে বলল লিলিয়া।
"এমন নয় যে আমি খুব একটা মাথা ঘামাই এটা নিয়ে। এই ছোট্ট পৃথিবীটাকে আমরা খন্ডে খন্ডে বিভক্ত করেছি, আর সেটা নিয়ে কতই না আবেগ আর রঙ চড়িয়ে গর্বিত হওয়ার খেলা খেলে আমরা পরম তৃপ্তি লাভ করি। কিন্তু পিটার, সে তো একই বাতাস আমরা ভাগাভাগি করে বেঁচে থাকি।" বলে চলল লিলিয়া। "আমরা কেউ আমাদের জন্মসূত্রে পাওয়া গায়ের রঙ নিয়ে গর্বিত, কেউ আবার জন্মস্থান, কেউবা আবার ধনী পরিবার নিয়ে যার পর নাই অতিব আপ্লুত। এগুল তো সবই দুর্ঘটনার ফল, আমরা কেউ ই আমাদের জন্মস্থান, গায়ের রঙ কিংবা বাবা মাকে পছন্দ মত বেঁছে নিতে পারি না, পারি কি?" একটু দম নিয়ে লিলিয়া একমুখ হাসি নিয়ে পিটারের গম্ভির মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, "কফি? এত ভারী এবং গুরুত্বপূর্ন আলোচনা কফি ছাড়া কি জমে!" পিটার অভিমানে ভংগী করে বলল, "এতক্ষনে?"
চলবে ---

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


