আমার প্রিয় পোস্ট

. আমার নাইবা হলো পারে যাওয়া...

স্মৃতি ১৯৭১ (১)

১১ ই মার্চ, ২০১০ সন্ধ্যা ৬:৫৯

শেয়ারঃ
0 0 0

স্মৃতি ১৯৭১ (১)


১৯৬৯ এর গন অভ্যুথানের সময় আমরা ময়মনসিং ছিলাম। তারপর সে বছর না তার পরের বছর আব্বা বদলি হয়ে এলেন মৌ্লভীবাজারে তা মনে নেই। তখন মৌ্লভীবাজার বৃহত্তর সিলেট জেলায় ছিলো। মনু নদীর তীরে ছোট্ট ছিমছাম শহর।
আব্বা তদানিন্তন হাবিব ব্যাঙ্কের ম্যানেজার ছিলেন। এখানে আসার কিছু দিন পরই ব্যাঙ্কের একটি কোর্স করার জন্য আব্বাকে ৬ মাসের জন্য পশ্চিম পাকিস্তানে যেতে হয়। এখানে আম্মা আমাদের তিন ভাই বোনকে নিয়ে থেকে যান।

আমাদের পাড়ার নামটি ছিলো শান্তি পাড়া। আমাদের বাসার সামনেই ছিলো বড় একটি পুকুর। বাসার পিছনে ছিলো দুটো বাসা। একটি আমাদের বাড়িওয়ালা মিছিরউল্লাহ মোক্তারের, অপরটি বিক্ষ্যাত সাহিত্যিক সৈ্যদ মুজতবা আলীর। কয়েক বাসা পরেই ছিলো এক উকিলের বাসা। আমরা উনাকে দাদু ডাকতাম। উনার মেয়েরা আমার পিসিমনি, আর ছেলেরা কাকু। ওদের একটি ময়না পাখি ছিলো। খাঁচায় বসে সুন্দর শীষ দিতো, কেউ সামনে গেলেই বলত,"ভাস্কর, অথিত আইছে,বইতে দাও"। খুব মজা
লাগত আমার। উকিল বাবু আব্বাকে পুত্রবৎ স্নেহ করতেন। আব্বার অনুপস্থিতিতে দাদু, কাকারা, পিসিরা আমাদের খোঁজখবর করতেন। ব্যাঙ্ক থেকে আব্বার খবরাখবর পেতাম, হয়ত চিঠি পত্রও আসত। দেশের পরিস্থিতি কেমন হচ্ছে, বা কেমন চলছে তা সঠিকভাবে না বুঝলেও, এটূকু বুঝতে পারছিলাম চারিদিকে অশান্ত পরিবেশ বিরাজ করছে। মাঝে মাঝে স্কুল বন্ধ হচ্ছে, মিছিল মিটিং, টগবগ করে ফুটছে শহর। এর মাঝেই হঠাৎ করে আব্বা চলে এলেন। উনার মুখেই শুনলাম, ওখানে গুজব শোনা যাচ্ছিলো ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যাবে। আর ওখানকার সহকর্মিদের কথা বার্তা, ব্যবহার অনেক বদলে যাচ্ছিলো। আব্বা দেশে ফেরার জন্য ব্যাস্ত হয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু ওখানে নানা টালবাহানা করা হচ্ছিলো। শেষ পর্যন্ত আব্বা চাকুরি ছেড়ে দেয়ার হুমকি দেয়ায় কাজ হয়েছে। যে ফ্লাইটে আব্বা এলেন, সেটাই ছিলো পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আগত শেষ ফ্লাইট।

আব্বা, আম্মার কথায় বুঝতে পারছিলাম, দেশে, আমাদের জীবনে কিছু একটা ঘটতে চলছে। কিন্তু সেই কিছুটা যে কি তাই বুঝতে পারছিলাম না। এর মধ্যে ৭ই মার্চ এলো, চারিদিকে খুব উত্তেজনা, পাড়ায় পাড়ায় জটলা, সবার মুখেই একই প্রশ্ন, কি হবে?

২৬ মার্চের সকালে শুনতে পেলাম কত রকম কথা, শেখ মুজিবকে মেরে ফেলেছে, আর নানা রকম কথা, এর মধ্যে কারফিউ ঘোষণা করা হয়েছে, রাতের বেলা ব্ল্যাক আউট। হেরিক্যানের চিমনিতেও লাগানো হলো চারকোনা করে কাটা কাগজ।
আব্বা অফিস থেকে এসে নানা খবর জানাতেন, আর ছিলো ছোট্ট রেডিওতে বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা, আকাশবানীর খবর শোনা। আমাদের বাড়িওয়ালা মিছিলউল্লাহ মোক্তার শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান হলেন। তার বাড়িতে পাকসেনাদের আনাগোনা শুরু হল। শহরের মানুষগুলো রাতারাতি কোথায় যেন হারিয়ে গেলো। এক সকালে দাদুর বাড়ির দরজাতেও দেখলাম তালা ঝুলছে। আব্বা আমাদের সদর দরজায় তালা লাগালেন, বাসার পিছন দিক দিয়ে আমাদের চলাচল শুরু হোল।
আব্বার কঠোর নির্দেশ, বাসার বাইরে পা দিবে না। ভাইয়া শান্তশিষ্ঠ লক্ষ্মী ছেলে, আব্বার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করলেও আমার পক্ষে এই নির্দেশ মানা সম্ভব ছিলো না। অব্যাবহারে পুকুরটা যতই পানার জঙ্গল হোক, তাতে ডুব না দিলে কি আমার চলবে? আর এই নিঃঝুম পাড়াতে একটু ঘুরাঘুরি তো করতেই হবে। একদিন গিয়ে দাদুদের বাসায় ঢূকলাম। যদিও গা ছমছম করছিলো, তারপর ও আমার কৌতুহলি মন থামছিলো না।
দরজা হাট করে খোলা। ঘরে কোন আসবাব পত্র নেই, সারা বাড়ি লণ্ডভণ্ড,কাগজের ছড়াছড়ি। ঠাকুর ঘরে উঁকি দিলাম, শুন্য ঘর। ছোট্ট পিতলের দোলনায় দুলত ছোট্ট পিতলের রাধা কৃষ্ণের মুর্তি, ঘুমানোর জন্য ছোট্ট পিতলের খাট, ছোট ছোট থালা বাটি, যেগুলো আমার মনে লোভ জাগাত, কিছুই নেই। ফিরে আসার সময় কাগজের স্তুপের নিচে শক্ত কিসে যেন পা পড়ল, হাতে নিয়ে দেখি শঙ্খ। এই দুধসাদা শঙ্খটি কত সন্ধ্যায় শুক্লা পিসিকে গাল ফুলিয়ে বাজাতে দেখেছি। বাসায় ফিরে আম্মাকে দেখালাম, আম্মা বললেন, তুলে রেখে দাও, ওরা এলে ফিরিয়ে দেবে। আম্মার মুখ থেকে আব্বা শুনেই ধা করে আমার গালে এক থাপ্পর বসালেন।
আব্বা ধমকে বললেন,"কেন তুমি বাইরে গেলে, কেন অন্যের জিনিস হাতে নিলে?"
কি করে বুঝাই, পিসিমনিদের শঙ্খ পড়ে ছিলো অনাদরে, কেউ যদি নিয়ে যেত?

 

সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই মার্চ, ২০১১ সন্ধ্যা ৭:৪৫ | বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...

 

১. ১১ ই মার্চ, ২০১০ সন্ধ্যা ৭:০৮
ভাঙ্গন বলেছেন: দিদি, ১৯৭১ সালের জমাট বাঁধা রক্তিম স্মৃতিগুলো আমাদের সামনে তুলে ধরার যে প্রয়াস আপনি নিয়েছেন, সেজন্য আপনাকে সাধুবাদ জানাই। আপনার যারা স্বাধীনতা যুদ্ধ দেখেছেন তাঁরা কতটা সৌভাগ্যবান ছিলেন বলতে গা কেঁপে উঠে। আমরা শুধু গল্প শুনে আর কল্পনায় আঁকা ছবি দিয়ে ৭১ কে বুঝতে চেষ্টা করি। আপনার লিখে যাওয়া স্মৃতিমালা যদি আমাদের একটুও ইতিহাসমুখি করে, সেটাও কম নয় দিদি।
.............
অনেক ভাল লাগলো স্মৃতির এই গল্প পড়ে। এভাবে চলুক দিদি।
১১ ই মার্চ, ২০১০ সন্ধ্যা ৭:৩৯

লেখক বলেছেন: ভাঙ্গন, ৩টি পর্ব লিখেছি, তোমার মত সবার আগ্রহ দেখে
আমার লেখার আগ্রহ বেড়ে গিয়েছে।
আজকাল স্মৃতি বড় বেশী বিশ্বাষ-ঘাতকতা করছে, পুরোপুরি
বিস্মৃত হওয়ার আগেই তাই সেগুলো তোমাদের সামনে তুলে ধরার
চেষ্টা করছি। অনেক ভালোবাসা ভাইটি আমার।

২. ১১ ই মার্চ, ২০১০ সন্ধ্যা ৭:২০
রুবেল শাহ বলেছেন:
বুবু লেখা গুলি পড়ছি.......

আমার একটাই দাবী থাকবে এই লেখা গুলো মলাট বন্ধি করার.....

শুভ কামনা সব সময় ........
১১ ই মার্চ, ২০১০ সন্ধ্যা ৭:৪১

লেখক বলেছেন: রুবেল, নাছোড়বান্দা তোমার পাল্লায় পড়লে কি না লিখে পারা যায়?
তোমার দাবী সাদরে গ্রহন করলাম। তোমাদের এত ভালবাসা আমায়
ঋনী করে ফেলছে। ভালো থেকো ভাই।

৩. ১১ ই মার্চ, ২০১০ রাত ৮:০৮
রুবেল শাহ বলেছেন:
বইটা হাতে ধারিয়ে দিলেই তোমার ঋণ শোধ....
তার পর আমরা নাহয় ঋণী হয়ে থাকবো.....:)
৪. ১১ ই মার্চ, ২০১০ রাত ৮:১৭
সুলতানা শিরীন সাজি বলেছেন:
আপু তোমার বাড়ি আসিনি ম্যালাদিন........
এসে এসে ঘুরে গিয়েছি এর আগে........

যা লিখতে শুরু করেছো.........সেই ইতিহাস শুনতে প্রতিদিন পারি।
অপেক্ষায় থাকলাম এই লেখার ধারাবাহিকতার।
অনেক ভালো থেকো তুমি।
সবসময় পাশে আছি।

অনেক অনেক ভালোবাসা।
১১ ই মার্চ, ২০১০ রাত ৯:৫১

লেখক বলেছেন: সাজিমনি, অনেক ঝামেলায় মন বিক্ষিপ্ত ছিলো, তাই কিছুই লেখা হয়নি।
ব্লগেও আসা হয়নি ঠিক মত। হঠাৎ করেই মনে হলো স্মৃতি এলোমেলো হবার
আগেই আমার কিছু কর্তব্য আছে, সেটা শেষ করে যাই। হয়তো গুছিয়ে, তারিখ
মোতাবেক লিখতে পারবো না, তবুও স্মৃতি থেকে তুলে ধরার চেষ্টা করে যাবো।

অনেক করে ভালো থেকো গো সোনামনি।

৫. ১১ ই মার্চ, ২০১০ রাত ১০:০২
ভাঙ্গন বলেছেন: দিদি, আপনার এই পোস্টটা সিরিজ শেষ হলে আমি এক সাথে প্রিয়তে নেবার ইচ্ছা পোষন করি।
শেষ করতে হবে কিন্তু!
৬. ১১ ই মার্চ, ২০১০ রাত ১০:২৮
চিকনকালা বলেছেন: আপনার ৭১ এর স্মৃতি নিয়ে লেখা খুব ভাল লেগেছে। আরো লিখবেন। পড়ার ইচ্ছা থাকল।

আমার এক চাচা ছিলে. তিনি ঢাকায় ছিলেন পুরো ৭১ সাল। তাঁর কাছে বিভৎস সব কাহিনী শুনেছি। তিনি অনেক কিছু দেখেছিলেন, জানতেন। অনেক বলেছি তাঁকে লিখতে।লেখেন নাই। দূঃখের বিষয় তিনি বেঁচে নাই।
১১ ই মার্চ, ২০১০ রাত ১১:২৬

লেখক বলেছেন: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি, তাদের উচিত
এই প্রজন্মএর কাছে সেই সব দিনের কথা তুলে ধরা।
আপনাদের জন্যই আমার এই পিঁছু ফিরে দেখা।

৭. ১১ ই মার্চ, ২০১০ রাত ১১:৫৫
মোঃমোজাম হক বলেছেন: এই প্রথম আপনার লেখা পড়লাম।সাবলীল ভাষায় লেখা।ভাল লাগছে,চালিয়ে যান।
১২ ই মার্চ, ২০১০ রাত ১২:২৯

লেখক বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ।

৮. ১৩ ই মার্চ, ২০১০ রাত ১:৫৯
কালপুরুষ বলেছেন: ভাল লাগলো তোমার স্মৃতিকথা। আমারো একটু একটু অনেক কথা মনে পড়ছে সেই সময়ের, যুদ্ধের দিনগুলোর কথা। প্রায় ৯ মাস গ্রামের বাড়ীতে থাকার নানা ঘটনা।
১৩ ই মার্চ, ২০১০ বিকাল ৫:০৬

লেখক বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ দাদা। যা মনে পড়ছে লিখে ফেলুন দাদা।
এই প্রজন্ম কে জানাতে হবে তো...
আপনার লিখনীতে সেই ইতিহাস অনেক জীবন্ত হয়ে উঠবে।

৯. ১৩ ই মার্চ, ২০১০ সকাল ১০:১৩
ইমন জুবায়ের বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ। ৭১ নিয়ে লেখার সময় কাজে লাগবে। প্রিয়তে নিলাম।
১৩ ই মার্চ, ২০১০ বিকাল ৫:০৭

লেখক বলেছেন: কেমন আছো ইমন? অনেক শুভকামনা।

১০. ২৬ শে মার্চ, ২০১০ বিকাল ৪:২৪
দীপান্বিতা বলেছেন: কেমন আছেন!......খুব ভাল লাগলো...পরের পর্বগুলোও পড়ছি... :)
২৬ শে মার্চ, ২০১০ সন্ধ্যা ৭:৩৫

লেখক বলেছেন: ভালো আছি দীপা। তুমি ভালো তো?

অনেক শুভেচ্ছা।

১১. ০৯ ই এপ্রিল, ২০১০ রাত ১১:৩২
দুরন্ত স্বপ্নচারী বলেছেন:
কি আনমনে এসেছিলাম, ভক্ত হয়ে ফিরে গেলাম।

দিদি, অসাধারণ। নিশ্চয়ই বাকীগুলোও পড়বো।
১০ ই এপ্রিল, ২০১০ রাত ১২:০৮

লেখক বলেছেন: তোমাদের জন্যই তো এই স্মৃতিচারন। যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখোনি।
আমার বালিকা চোখ, আর মন দিয়ে দেখা, অনুভবের কথাগুলো তোমাদের সাথে শেয়ার করলাম।

১২. ১৮ ই এপ্রিল, ২০১০ রাত ৮:৪১
মাহমুদহাসান বলেছেন: ছাপ্পান্নো হাজার বর্গমাইল

আমার দেশ, আমাদের দেশ, ছাপ্পান্নো হাজার বর্গমাইলের দেশ।
আমরা কি এই বাঙলাদেশ চেয়েছিলাম?

ভালো লাগল, বাকি পোস্ট দুটোও পড়ব। বালিকার চোখে দেখা সেই দুঃসহ দিনরাত্রির কথা জানতে ভালো লাগবে ভীষণ।


বি দ্রঃ ছাপ্পান্নো হাজার বর্গমাইল এবং আমরা কি এই বাঙলাদেশ চেয়েছিলাম কথা দুটি মূলত প্রিয় লেখক ড. হুমায়ুন আজাদ এর দুটি বইয়ের নাম। পড়েছেন কি?
১৮ ই এপ্রিল, ২০১০ রাত ৯:১৬

লেখক বলেছেন: আমার এই লেখাটি পড়ায় খুব খুশী হলাম। ছাপ্পান্নো হাজার বর্গমাইল বইটি আমার সংগ্রহে আছে। অন্যটা পড়া হয়নি।

অনেক অনেক ধন্যবাদ তোমায়।

 

মোট সময় লেগেছে ০.৯৬৮৪ সেকেন্ড

 

সামহোয়‍্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...
© সামহোয়্যার ইন...নেট লিমিটেড | ব্যবহারের শর্তাবলী | গোপনীয়তার নীতি
আমি কেবলই স্বপন করেছি বপন বাতাসে---
তাই আকাশকুসুম করিনু চয়ন হতাশে।
ছায়ার মতন মিলায় ধরণী,
কূল নাহি পায় আশার তরণী,
মানস প্রতিমা ভাসিয়া বেরায়...
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ

    কোন বিভাগ নেই