যেদিন ভেসে গেছে চোখের জলে..
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যক্তিগত জীবন, বা তাঁর সুখ-দুঃখ নিয়ে অনেকেই অনেক কিছু লিখেছেন। যারা কবির খুব কাছের মানুষ ছিলেন, তারা উপলব্ধি করেই লিখেছেন। শারীরিক মানসিক যে দুঃখগুলো
অত্যন্ত ব্যক্তিগত সে সম্মন্ধে কবি চিরদিন নীরব থেকেছেন। তাঁর মুখে পারিবারিক জীবনের কথা কমই শোনা গিয়েছে। মংপুতে মৈত্রেয়ী দেবীর বাড়িতে কবি শেষবার যখন গিয়েছিলেন, তখন উনার শরীর বিশেষভালো ছিল না। মৃত্যুর এক বছর আগে থেকেই উনি নানা কারণে ভুগছিলেন। তখন কবি ক্ষণে ক্ষণে স্মৃতিচারণ করতেন। কবির অসুস্থতায় মৈত্রেয়ী উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলে উনি কপট রাগ দেখাতেন। বলতেন,“ডাক্তার আমার কি করবে? আমি কি ডাক্তারের ওষুধ খাই? তা ছাড়া এ আমার হার্টের কষ্ট। আমি জানি এইটেই আমার দরজা,- প্রত্যেকেরই একটা না একটা দরজা থাকে, আমার মৃত্যুবাণ এইখানে আছে।হঠাৎ একদিন স্তব্ধ হয়ে যাবে, সে মন্দ নয়”।
কবি সম্পর্কে শরৎচন্দ্র নাকি বলেছিলেন উনি মৃত্যু কে ভয় করেন বড় বেশী, সে জন্যই সর্বদা লেখেন, ভয় করিনে, ভয় করিনে।
কবি বলেন, “ এ কথা সত্য নয়, একেবারেই সত্য নয়। জীবন সম্মন্ধে আমার আর স্পৃহা নেই। শুধু একটি কথা মনে হয়। এই যে
বিশ্বভারতী এত পরিশ্রমে গড়ে তুলেছি, আমার অবর্তমানে এর মূল্য কিছুই থাকবেনা?”
নিজের সন্তানের দীক্ষা দিতে গিয়ে ব্রম্মাচর্যাশ্রম প্রতিষ্ঠা হয়, এবং নিজের জাতির মঙ্গল সাধনের প্রয়াস বিশ্বের কল্যাণে গিয়ে পৌঁছায়। শান্তিনিকেতন গড়ে তোলবার পথে দেশের মানুষের কাছ থেকে পেয়েছেন প্রচুর বাঁধা। যা তাঁকে গভীর কষ্ট দিয়েছিল। সে সময়ে যে কাজে সহানুভূতি পাওয়া উচিত ছিল তার পরিবর্তে পেয়েছিলেন অপমান আর নিন্দা। সেই জন্য এই বিষয়ে শেষদিন পর্যন্ত দেশের লোকের সম্মন্ধে তাঁর গভীর অভিমান ছিল। বলতেন,--“আমি যা ভাল বুঝেছি প্রাণপণে তা দিতে চেয়েছি, এর চেয়ে আর অপরাধ কি করেছি বল? কিন্তু তোমরা তো নেবেনা, ফিরিয়ে দেবে, শুধু ফিরিয়ে দেবে তা নয়, গাল দিয়ে ফিরিয়ে দেবে। আমার কাজ সম্মন্ধে সমালোচনায় নিন্দায় রসনা মুখর হয়ে আছে, কিন্তু সাহায্য করতে কেউ কড়ে আঙ্গুল নাড়লনা।
বিশ্বভারতীর পিছনে যে কী পরিশ্রম আছে, কী দুঃখের দিনগুলো গেছে, তাতো কেউ জানে না, চারিদিকে ঋণের বোঝা, ছোটবৌ্য়ের গহনা পর্যন্ত নিতে হয়েছে। ঘর থেকে খাইয়ে পরিয়ে ছেলে যোগাড় করেছি। কেউ ছেলে তো দেবেই না, গাড়ি ভাড়া করে অন্যকে বারণ করে আসবে।এই রকম সাহায্যই স্বদেশবাসীর কাছ থেকে পেয়েছি। আর তখন চলেছে একটির পর একটি মৃত্যু শোক, সে দুঃখের ইতিহাস সম্পুর্ন লুপ্ত হয়ে গেছে। লোকে জানে উনি শৌখিন বড়লোক। সম্পুর্ন নিঃসম্বল হয়েছিলুম, আমার সংসারে কিছুমাত্র বাবুয়ানা ছিলনা। ছোটবৌকেও অনেক ভার সইতে হয়েছিল।মৃত্যু সম্মন্ধে এই একটি মাত্র বাঁধা আমার, সে আমার বিশ্বভারতী, আর কিছু নয়।”
শান্তিনিকেতনে ব্রম্মচর্যাশ্রম শুরু হবার অল্প পরেই কবি-পত্নি মারা গেলেন। মারা গেলেন মেজ মেয়ে দীর্ঘ দিন রোগে ভুগে। তাঁদের রোগশয্যায় শুশ্রুষা ও অন্যান্য ব্যবস্থা কি ভাবে করেছেন, মুমুর্ষ কন্যার শেষ ইচ্ছে পুরনে আলমোড়া থেকে কাঠগুদাম পর্যন্ত ছয় মাইল পাহাড়ি পথ তাঁকে ডাণ্ডিতে বহন করে হেঁটে নেমেছেন- সে সব কাহিনী নানা জায়গায়
নানা জনে লিখেছেন। কোন কবির কাছে, বিশেষ করে এমন প্রতিভাসম্পন্ন কবির কাছে, কোন দেশ ও পরিবার এমন আনুগত্য কোনদিন পায়নি। জগবিখ্যাত কবিদের জীবনের সঙ্গে তুলনা করলে তাই আমরা আশ্চর্য হয়ে যাই।প্রতিদিনের প্রতিটি তুচ্ছ কর্মকে আনন্দে বহন করেও তিনি দৈনন্দিন তুচ্ছতার উর্ধে গিয়েছেন। এ কথা তাঁর ব্যক্তিগত জীবন এবং কাব্যজীবন উভয় দিকেই মানায়। ক্ষুদ্রের ভিতর দিয়ে যে বৃহৎকে জানা, সীমার ভিতরে যে অসীমের অনুভব, বিশেষের ভিতরে যে বিশ্বরূপ দর্শন, তা আমরা রবীন্দ্রজীবনে ও কাব্যে সমান ভাবেই দেখতে পাই।
ছেলেবেলার কথা বলতেন- “ চিরদিন মনে মনে আমি উদাসী,- ছোটবেলা কেন, শিশুকাল থেকেই। যখন দুপুরবেলা একা একা ছাঁদে বসে থাকতুম, রোদ ঝাঁ ঝাঁ করে উঠত, পথ দিয়ে ফেরিওয়ালা হেঁকে যেত তাদের উচ্চ সুর, আর মাঝে মাঝে উড়ে যাওয়া চিলের ডাক আমার মনকে উধাও করে নিয়ে যেত,- নির্জন দুপুরে সেই চিলের ডাক যেন সুদুরের ডাক। একা একা তেতলার ঘরে ঘুরে ঘুরে বেড়াতুম...... সেই যে তেতলার ছাঁদে নতুন বৌঠানের হাতের রান্না, মনে হত একেবারে অমৃত। নতুন বৌঠান সবসময় আমায় খোঁচাতেন, সেটা যে স্নেহ তা তো বুঝতুম না তখন, লজ্জা পেতুম, দুঃখ হত। মনে হত কি করে এমন হব যে আর কোনো দোষ তিনি খুঁজে পাবেন না। সবাই খেতে বসেছি, হঠাৎ তিনি বলতেন,-‘ দেখ দেখ রবি কি রকম করে খায়, ঠিক উনার মত করে’। কি লজ্জা পেতুম তখন। অথচ সেটা
কমপ্লিমেন্ট, ওনার মত করে খাওয়া খুবই বড় কমপ্লিমেন্ট!’রবি সবচেয়ে কালো, দেখতে একেবারেই ভালো নয়, গলা যেন কী রকম, ও কোনদিন গাইতে পারবে না, ওর চেয়ে ওমুক ঢের ভালো গায়,- অথচ এ সবই ছলনা, মনে মনে বলতেন তার উলটো। বৌঠান কখনো স্বীকার করতেন না যে আমি লিখতে পারি, বা কোন কালে পারব। বিহারীলাল ছিল তাঁর আদর্শ। শুধু একটি মাত্র গুণ আমার স্বীকার করতেন যে আমি ভালো সুপুরি কাঁটতে পারি।‘রবি কি চমৎকার সুপুরি কাঁটে’- ওটা অবশ্য কাজ আদায়ের ফন্দি। আমি নতুন বৌঠানের ইচ্ছে মত সুপুরি কাঁটায় যথেষ্ট উন্নতি করতে পারলুম না। ইস্কুল থেকে থেকে ফিরে যদি দেখতুম তিনি বাড়ি নেই, ভারী দুঃখ হত। তিনি বলতেন, ‘বাহ! তোমার জন্য কী আমি আত্মীয়তা লৌ্কিকতা ছেড়ে দেব নাকি’? নতুন বৌঠান আরবি ঘোড়ায় চড়ে চিৎপুরের রাস্তা দিয়ে বেড়াতে যেতেন দাদার সঙ্গে। সে কী অসমসাহসিকতা!! একেতো ঐ প্রকাণ্ড ঘোড়া, তার চাইতেও অনেক প্রকাণ্ড ব্যাপার,- সে যুগের বৌ ঘোড়ায় চড়ে বেড়াতে চলেছে। তিনি কিন্তু গ্রাহ্য করতেন না, এটা কম কাণ্ড নয়, তাঁর মধ্যে অনন্যসাধারণতা ছিল।
বৌঠানের পাখীর শখ ছিল, চীন দেশের এক শ্যামা জোগাড় করেছিলেন,- একটা লোক ছাতু, ফড়িং খাইয়ে যেত। খাঁচায় বন্দি পাখী আমার ভালো লাগতো না,- তিনি আমার সে সব কথা উড়িয়ে দিতেন,- “ আর পাকামি করতে হবে না”।
তারপর তো তেতলার ছাদের পর্ব শেষ হয়ে গেলো............।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনে সেই কয়েকদিনের স্মৃতি খুব বেশী উজ্জ্বল ছিল। কত দেশে কত মানুষের সঙ্গে জীবনে তিনি পরিচিত হয়েছেন, কত বিচিত্র সুখ দুঃখের সংঘাতে তাঁর সুদীর্ঘ জীবন অসংখ্য অভিজ্ঞতায় অনুভুতিতে পরিপুর্ণ হয়েছিল, কিন্তু তবু সেই তার ছেলেবেলার জীবন শেষ বয়সেও প্রকাণ্ড জায়গা জুড়ে ছিল তাঁর মনে। তাঁর জ্যেতিদাদা, ও বৌঠানের
স্নেহচ্ছায়ায় তেঁতলার ছাদের দিনগুলি যেন তাঁর জীবনের একটা প্রধানতম কেন্দ্র। এ প্রসঙ্গে ১৩৪৫ সালের শ্রাবণ মাসে প্রবাসীতে প্রকাশিত লেডি অবলা বসুকে লিখিত একটি চিঠির কয়েকটি লাইন......
“ আপনাকে আর একটি কাজ করতে হবে, আমাকে সম্মান এবং শ্রদ্ধা প্রভৃতি করা একেবারেই ছেড়ে দেবেন। যদি স্নেহ করেন তো বাঁচি। তাহলে অল্প বয়সের স্মৃতিটাও মাঝে মাঝে মনে পড়ে। আমার এক বৌঠাকরুন ছিলেন, আমি ছেলে বেলায় তাঁর স্নেহের ভিখারী ছিলেম,- তাঁকে হারানোর পর থেকে আমার দ্রুত পদবিক্ষেপে বয়স বেড়ে উঠেছে, এবং আমি শ্রদ্ধা ও সম্মান লাভ করে হয়রান হয়েছি”।
নিজের দাম্পত্য জীবন সম্পর্কে এ ভাবেই বলেছেন- “আধুনিকভাবে আমাদের বিবাহ হয়নি, তাতে কিছুই আসে যায়নি।
আমাদের মাঝে একটা গভীর শ্রদ্ধার সম্পর্ক ছিল। তিনি তো চেয়েছিলেন আমার শান্তিনিকেতনের কাজে সঙ্গিনী হবার।
বিশেষ করে শেষের দিকে তাঁর একান্ত আগ্রহ হয়েছিল আমার কাজ করবার। কিন্তু সে তো হলোনা। অল্প পরেই তাঁর সেই
ভয়ানক অসুখ হল... তিনি যখন চলে গেলেন, তখন আমার এক মুহূর্ত অবসর ছিল না। সদ্য শুরু হওয়া শান্তিনিকেতন,
হাতে টাকা পয়সা নেই, কাঁধে বিশাল ঋণের বোঝা, অজস্র কাজ। তখন নিজের সুখ দুঃখকে কেন্দ্র করে মনকে আবদ্ধ করবার অবসর ছিলনা। মেজ মেয়ে মৃত্যু শয্যায় আলমোড়ায়। তাকে ফেলেও বার বার আসতে হতো শান্তিনিকেতনের কাজে, আসা-যাওয়া ছুটোছুটি............ তবে সবচেয়ে কষ্ট হতো, যে এমন কেউ ছিলোনা যাকে সব বলা যায়। সংসারে কথার পুঞ্জ অনবরত জমে উঠতে থাকে, ঠিক পরামর্শ নেবার জন্য নয়, শুধু বলা, বলারই জন্য। যখন জীবনের এই যুদ্ধ চলছে কাজের বোঝা জমে উঠেছে, মেয়ে মৃত্যুর পথে অগ্রসর হচ্ছে, তখন সেইটেই সবচেয়ে কষ্ট হতো যে, এমন কেউ নেই যাকে সব বলা যায়। নতুন বৌ’এর অভাব তখন ভীষন ভাবে অনুভব করেছি।
কবি নিজেই স্বীকার করেছেন, ভিতরের একটি জায়গায় তিনি নির্মম- তা না হলে যে জায়গায় তিনি এসেছিলেন, সেখানে আসা সম্ভব হতো না। কোন বন্ধনই শিকল হয়ে তাঁকে বাধেঁনি কোনদিন। চিরদিন তিনি সংসারের শত সহস্র কাজের ভিতর
রয়েছেন, কিন্তু উনার মন, নৌকা যেমন তীরের বন্ধনের মধ্যে পথ করে নিয়ে ভেসে যায়, তেমনি ভেসে গিয়েছে। ঘাটের বন্ধন কবির জন্য নয়। যদি তাই হতো, যদি সংসারের অসংখ্য ছোট বড় বন্ধনের হাতে নিজেকে জড়িয়ে নিতেন, তা হলে সব নষ্ট হয়ে যেত। তাই একদিন কবি লিখেছিলেন,- “ আমি চঞ্চল হে আমি সুদুরের পিয়াসী”............
মৈত্রেয়ী দেবীকে কবি বলেছিলেন,- “ যাকে তোমরা ভালোবাসা বল, সে রকম করে আমি কাউকে কোনো দিন ভালোবাসিনি।
আমি বৃহতসংসারে বাস করেছি, প্রিয় জনের অন্ত ছিলনা। বন্ধু বান্ধব, সংসার, স্ত্রী-সন্তান কোন কিছুই আমি কোন দিনই তেমন করে আঁকড়ে ধরিনি। আমার জীবনে যতবার মৃত্যু এসেছে, যখন দেখেছি কোন আশাই নেই, তখন আমি প্রানপনে সমস্ত শক্তি একত্র করে মনে করেছি, ‘তোমাকে আমি ছেড়ে দিলাম, যাও তুমি তোমার নির্দিষ্ট পথে’। নিজের সন্তান কেও আঁকড়ে রাখতে চাইনি। যেতে যখন হবেই তখন যেন আমার আসক্তি, আমার বেদনা, তাকে মর্তের সঙ্গে বেঁধে না রাখে। তাকে বন্ধন ছিন্ন করবার জন্য যেন কষ্ট পেতে না হয়, যেন সুগম হয় তার পথ,- যেখানে ত্যাগেই মঙ্গল, সেখানে নিরাসক্ত হয়ে ত্যাগ করাই উচিত। ঘটনাপ্রবাহ আমার হাতে নেই, কিন্তু আমি তো আমার হাতে আছি। যত অপ্রিয়ই হোক, যত বেদনাদায়কই হোক, যা নিশ্চিত ঘটবে তার সঙ্গে যুদ্ধ করে ক্ষত হওয়া কিছু নয়। সেখানে নম্র হয়ে মেনে নিতে হয়, তাতেই কল্যাণ।
আমার মৃত্যুর সময় যদি উপস্থিত থাকো, তাহলে কান্নাকাটি করে আকুল হয়ে পিছনে ডেকোনা। একান্ত মনে ত্যাগ কোরো আমাকে,- মনে হয় মুমুর্ষের প্রতি সেই সবচেয়ে বড় কর্তব্য।”
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা এপ্রিল, ২০১০ রাত ১১:২৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


