ছেলেবেলার খেলার সাথিরা আজ কে কথায় আছে, কেমন আছে জানিনা। তাদের সবার নাম আজ আর মনে নেই। কিন্তু তাদের সবাইকে আমার মনে আছে। বেশীরভাগ নামই ভুলে গিয়েছি। কোন কোন নাম কি করে যেনো স্মৃতির জালে আটকে আছে। বয়স যখন ৪/৫ তখন ঢাকায় ইন্দিরা রোডে ছিলাম। পাশের বাসার রেখার সাথে ছিলো চরম বন্ধুত্ব। আমাদের বাড়িটি আব্বা তখন সদ্য তৈরী করেছেন। তখনও গেট বসানো হয়নি। গেটের জন্য নির্ধারিত জায়গায় একটি বাঁশ রাখা ছিলো। হাত দিয়ে বাঁশ সরিয়ে আসা-যাওয়া করা হতো। সেই বাঁশ ধরে বানরের মতো ঝুলা ছিলো আমার আর রেখার প্রিয় খেলা।
ময়মনসিং এ পন্ডিতপাড়ায় থাকি। পৃথিবীর সব চাইতে সুন্দর আর ভালো স্কুল ছিলো আমার। টিচার্স ট্রেনিং কলেজের অন্তর্ভুক্ত এক্সপেরিমেন্টাল হাই স্কুল। ক্লাস টুতে পড়ি। হাতের কাজ নামক একটা ক্লাশ হতো। কোনদিন বাগানের কাজ, কোনদিন মাটির কাজ করতে হতো। মাটির কাজ যেদিন করতাম সেদিন বাসা থেকে এঁটেল মাটি আটার মতো মেখে নিয়ে যেতাম। মাটি দিয়ে বানাতাম, মাছ, পাখী, নৌকা, ফলমুল। আমার বন্ধু চাঁদ, চাঁদের মতো ফুটফুটে দেখতে। সেই চাঁদের মতো সুন্দর ছেলে কুটকুট করে মাটি খেতো।
মনে আছে, লস্কর চাচার মেয়ে বিলু, নীলু, দিলুর কথা, ছবি, ভবি, শংকরী আর উমার কথা। আরো অনেকের কথা মনে আছে, যাদের সাথে কলার ভেলায় চড়ে পুকুরে সাঁতার শিখতাম, দুর্গাবাড়ীর বাগানে শাখ-আলু আর ফুল তুলতাম। পাশের বাসার দুভাই, আনিস আর একজনের নাম মনে নেই, কিন্তু তাকে তো মনে আছে। ভোরবেলা একসাথে সার্কিট হাউজের মাঠে খরগোস দেখতে যেতাম। সাদা সাদা খরগোসগুলি ঝোপের আড়ালে লুকোচুরি খেলতো।
মৌ্লভীবাজারের বন্ধুরা তাদের কথাও মনে আছে। ভাদ্রের ছুটির দুপুরে পুকুর থেকে তাল তুলে আনতাম আমি আর কৃষ্ণা। বর্ষায় ছিপ দিয়ে মাছ ধরতাম অলি, মাসুম, শওকত বুড়ো, আরো কত বন্ধুর সাথে। মনু নদীর জলে পা ভিজাতাম, লাকি, শেলী, হেলেন, ঝর্নাদের সাথে। ফুলগুটি, কড়ি খেলতাম ভাইয়া, রানু, মেরীর সাথে। মুক্তিযুদ্ধের সময় নোয়ারাই গ্রামের সালেহা, আম্বিয়া, হাওয়ারুন, তোমাদের কথাও মনে আছে। ঝর্নার সাথে তাদের বাসায় যেতাম। সেই উচুনিচু পাহাড়ি পথ ধরে গল্প করতে করতে হেটে যাওয়া, কখনো পাল্লা দিয়ে ছুটে যাওয়া। নরয়েজিয়ান মিশনে থাকতো তারা। কত সময় যে সেখানে কাটিয়েছি।ঝর্নার সাথে পরে যোগাযোগ হলেও এখন আবার হারিয়ে গেছে। দু'কন্যার মা হেলেনের সাথেও পরে দেখা হয়েছিলো। কিন্তু যখন ওকে খুঁজে বের করেছিলাম তখন তার সিলেট থেকে যাবার সময় হয়ে গিয়েছিলো। ঢাকায় বাসাবোতে মায়ের বাসার পাশেই বাড়ি করেছিলো শুনেছিলাম। আমি বন্ধুদের যেমন করে খুঁজে বেড়াই ওরা কি আমায় খোঁজে? এ প্রশ্ন আমার সন্তানদের। আমি উত্তর দেই, সেটা তো তাদের ব্যাপার। আমার মন আমার বন্ধুদের খবর জানতে ব্যাকুল, এটা তো আমার ব্যাপার। অন্যে আমাকে কি চোখে দেখে তা নিয়ে তো আমি মাথা ঘামাই না। ভালোবাসার প্রতিদান আশা করিনা। আমি আমার মতই ভালোবেসে যাই। মনে আছে কুষ্টিয়ার ডোরা, ডুরিনের কথা। কতদিন, কত সময় আমরা এক সাথে কাটিয়েছি, খেলেছি, রেল লাইন ধরে অনেক দূর হেটে গিয়েছি। কুলফি মালাই, হজমি, চালতার আচার ভাগাভাগি করে খেয়েছি। তোমাদের কাউকেই আমি ভুলিনি। নাম মনে না থাকলে কি হয়েছে। তোমরা সবাই আমার মনের মনিকোঠায় সযতনে রক্ষিত আছো।আমার স্মৃতিময় সোনালি শৈশবের সাথে মিশে আছো। তোমাদের কি ভোলা যায়???
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা আগস্ট, ২০১১ দুপুর ১২:৫৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




