somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

এ দিন ভোলা যায়না।

২৬ শে মার্চ, ২০১১ দুপুর ১:১৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

২৫শে মার্চের কালো রাত্রির আধারে ঢাকায় ঘটে যাওয়া ঘটনাবলী ঢাকার বাইরের মানুষ জানতে পেরেছে ২৬/২৭ কি আরও পর। ২৫শে মার্চ রাত ১২টার পর হতে সিলেট শহরবাসী গোলাগুলির শব্দ পেলেও আসল ঘটনা বা কারন জানতে পারেনি। সিলেটে হঠাৎ করেই ২৬শে মার্চ সকাল থেকে যে কারফিউ দেয়া হয়েছিল কেউ তা জানত না। তাই ২৬শে মার্চ সকাল বেলায় প্রথম যারা পাকসেনার গুলির শিকার হয়েছিলেন, তাদের মধ্যে, ছাত্র শিক্ষক, সাধারন মানুষ ছিলেন। সিলেট এইডেড হাই স্কুলের শিক্ষক জগলুল স্যার এবং সিলেট সরকারি বয়েজ হাই স্কুলের মেট্রিক পরিক্ষার্থী হাসান, এরা দুজন গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। আহতদের সিলেট সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো। সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডাক্তার সামসুদ্দিন আহমেদ ও উনার সহকর্মিরা আহতদের চিকিৎসা করেন। গুলিতে জগলু স্যারের ডানহাতের চারটি আঙ্গুল উড়ে গিয়েছিলো। হাসানের বাম পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়। কারফিউ শিথিল হতেই হাসপাতালে মানুষে ভিড় লেগে যায়। হাসানকে পাঁচ ব্যাগ রক্ত দেয়া হয়। আত্মিয় স্বজন নয়, আহতদের রক্ত দেয়ার জন্য সবাই উদ্গ্রিব ছিলো। তৎকালিন সিলেটের এমপি দেওয়ান ফরিদ গাজি ও রাজনৈতিক নেতা ছাড়াও অসংখ্য সাধারন মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আহতদের দেখতে গিয়েছিলেন।

হাসপাতালের ঠিক সামনেই সরকারি মহিলা কলেজ। পাক-আর্মি সেই কলেজে ক্যাম্প করেছিলো। ডাঃ শামসুদ্দীন আহমেদ এর স্ত্রী ঐ মহিলা কলেজের অধ্যক্ষা ছিলেন। বৃদ্ধা মা, ও ছোট সন্তানদের গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দিলেও স্ত্রী “বেগম হোসনে আরা আহমেদ কিছুতেই স্বামীকে ছেড়ে যেতে রাজি হন নি। তাঁদের বড় ছেলে “জিয়াউদ্দীন আহমেদ” তখন মুক্তিযুদ্ধের উদ্দেশ্যে ঘরছাড়া। স্ত্রী, আত্মিয়-স্বজন সবার অনুরোধ অনুযোগ উপেক্ষা করে ডাঃ শামসুদ্দীন আহমেদ প্রানের ঝুঁকি নিয়ে হাসপাতালে রয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলো, তরুন ডাঃ জিয়া, ডাঃ শ্যামল কান্তি লাল, এ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার কোরবান আলী, ও কয়েকজন পুরুষ নার্স। হাসপাতালের সামনে পাক আর্মি ঘাটি করার পরপরই ডাঃ শামসুদ্দীন মহিলা নার্সদের কাজ থেকে অব্যাহতি দিয়ে তাদের নিরাপদে সরে পড়তে বলেন। পাঁচ/ছয় দিন পর দুপুর বেলা ডাক্তার সামসুদ্দিন হাসপাতালে এসে রুগিদের বললেন, “তোমরা সবাই হাসপাতালের পিছন দিক দিয়ে বেরিয়ে যাও, যে কোন সময় আর্মি এখানে আসতে পারে”। জগলু স্যার হাসান কে কাধে করে হাসপাতালের পিছনের কাঁচা ড্রেনের মাঝে অবস্থান নিলেন। যারা হেটে যেতে সক্ষম, তারা গলি ঘুপচি দিয়ে ছুটতে লাগলো। হাসান কে ফেলে স্যার যেতেও পারছেন না, কাধে বয়ে তো আর ছোটা যাবে না। তাই সন্ধ্যার অন্ধকারের অপেক্ষায় থাকলেন। বিকেলের আগেই হাসপাতালে গুলির শব্দ শোনা গেলো। সন্ধ্যার অপেক্ষা বাদ দিয়ে হাসানকে টেনে হিচঁড়ে দাড়িয়া পাড়ার ভিতর দিয়ে গেলেন।গলির ভিতর অনেক বাড়ির সামনে উৎসুক মানুষের মুখ দেখতে পেয়ে অনুরোধ জানালেন, কাছেই জিন্দাবাজার এলাকায় হাসানের ফুফাতো ভাইএর বাসায় খবর দেয়ার জন্য। কিছুক্ষনের ভিতরে হাসানের ভাই এসে দু’জনকেই উনার বাসায় নিয়ে গেলেন। হাসপাতালের মানুষ গুলোর কপালে কি ঘটেছে তা আর সেই মুহুর্তে জানা সম্ভব হলো না।

পরদিনও কেউ ঘর হতে বের হতে পারলো না। টানা তিনদিন কারফিউ ছিলো। তিনদিন পর হাসপাতালে মানুষজন ছুটে গেলো। দেখা গেলো হাসপাতালে রক্তের নদীর মাঝে পড়ে আছে ডাক্তার সামসুদ্দিন আহমেদ, ডাঃ জিয়া, ডাঃ শ্যামল কান্তি লাল, ড্রাইভার কোরবান আলী, পুরুষ নার্স মাহমুদুর রহমান সহ আরও অনেক অসহায় রুগীর মৃতদেহ। ডা; শামসুদ্দীন আহমদের চাচা এসে উনার লাশ সনাক্ত করেন। দেরী করার কোন উপায় নেই। চোখের সামনে জল্লাদের খাড়ার মতো ঝুলে আছে আর্মির ক্যাম্প। তাই সেই সব শহীদদের হাসপাতালের ভিতরের উঠানেই কবর দেয়া হলো।আজ সেই হাসপাতালের নামকরন করা হয়েছে শহীদ ডাক্তার সামসুদ্দিন হাসপাতাল। হাসপাতালের পাশেই হয়েছে কেন্দ্রিয় শহীদ মিনার। সেখানে সব শহীদের নাম লেখা রয়েছে। ওষুধপত্র নেই, শুধু চুন হলুদ, আর পুরনো শাড়ী কাপড় দিয়ে গজ করে ক্ষত স্থানের চিকিৎসা চলেছিলো হাসানের। নিজের বাড়িঘরেও থাকতে পারতো না। কারন পাড়ার মধ্যেই তৈরী হয়েছিলো শান্তিকমিটির সদস্য। উকিল গোলাম জিলানী। স্বাধীনতার পরেও যার কোন শাস্তি হয়নি। কিছু মুক্তিযোদ্ধা নামধারী মানুষের বদান্যতায় তিনি পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। পরবর্তীতে তো সাধারন ক্ষমা ঘোষনা করায় গোলাম জিলানীর মতো সব রাজাকারেরাই দুধে ধোয়া তুলশি পাতা হয়ে যান। তারাই প্রভুত সম্পদ অর্জন করেন, তাদের সন্তানেরা সমাজের মান্যগন্য মাথা হয়। আর মুক্তিযুদ্ধের শহীদের স্ত্রী বৃদ্ধ বয়সে রাস্তায় কলম ফেরি করে বিক্রি করেন, মুক্তিযোদ্ধার সন্তানেরা নিরাশ্রয়, অনাহারে মরে যায়। আর হাসানের মতো কিশোরেরা স্বপ্ন ভঙ্গের কষ্ট বুকে নিয়ে কিশোর থেকে যুবা, যুবা থেকে পৌঢ়ত্ত্বের পথে খুঁড়িয়ে চলে। মামা মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরে এলে ভাগ্নের অভিমান ভাঙ্গাতে পারেন না। তার প্রশ্ন, “ কেনো এমন হলো? আমারও তো তোমার সাথে যুদ্ধে যাওয়ার কথা ছিলো”। পায়ের নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ক্ষত শুখিয়ে গেছে। কিন্তু বুকের ক্ষত আজো দগদগে ঘায়ের মত যন্ত্রনা দেয়। আর সেই কষ্টের সাথে সাথে মনে করিয়ে দেয় ২৬শে মার্চের ঘটনা। একাত্তুর আমাদের জীবনের সাথেই জড়িয়ে আছে। একে ভোলা কি যায়? না, ভোলা সম্ভব? যুদ্ধে যেতে পারেনি বলে হাসানের খুব দুঃখ। আমি বলি “ একনদী রক্ত পেরিয়ে যে স্বাধীনতা এসেছে, সেই নদীতে তো তোমার রক্তও মিশে আছে, তবে এই দুঃখ কেনো”?
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা এপ্রিল, ২০১১ রাত ৯:১২
৫৮টি মন্তব্য ৫৬টি উত্তর পূর্বের ৫০টি মন্তব্য দেখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিলিয়নিয়ার রবিন খুদা ও আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ০৯ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৩০

বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় কী?

কর্মসংস্থান? না।

বিনিয়োগ? না।

ডলার সংকট? না।

গার্মেন্টস খাতে ছাঁটাই? না।

ব্যাংকিং খাতের আস্থা সংকট? না।

সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো— কোনো অনুষ্ঠানে জুলাই চেতনা কত মিলিলিটার ঢুকেছে, কে কতবার উচ্চারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×