somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কত না বকুল পড়েছিলো ঝরে উদাসী স্মৃতি তীরে।

০৫ ই ডিসেম্বর, ২০১১ সন্ধ্যা ৬:৪৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দিলশাদ, বাবু, মিলা, মিতাআআআআআ-- দাদীর সুরেলা আওয়াজ কানে যেতেই কাঠের বারান্দায় গোল হয়ে বসা সব হুড়মুড় করে দৌড়ে রান্না ঘরে ছুটলো। আহ! রান্না ঘরটা কি উষ্ণ হয়ে আছে। তিন মুখি চুলার ধারে নিচু মোড়ায় দাদী বসে। চুলোর লালচে আগুনে উনার ফর্সা মুখটা লাল হয়ে আছে। চোখ তুলে তাকিয়েই বললেন, " ঝটপট বসে পড়। পিঠা ঠান্ডা হলে কি আর মজা পাবে। চুলার ধারে বিছানো পাটিতে হুড়োহুড়ি করে সবাই বসে গেলো। চাচাতো, ফুফাতো ভাই বোনেরা আগুনের কাছে বসবার জন্য কনুই দিয়ে ঠ্যালাঠেলি করছিলো। দাদী তা ঠিকই দেখতে পেলেন। স্মিত হেসে মৃদু কন্ঠে বললেন, " ওদের ভালো করে খাতির যত্ন কর, ওরা তো সব সময় আসেনা"। ভাই-বোনগুলো লজ্জা পেয়ে চুপ করে বসলো। শুধু দিলশাদদের জন্য দাদী আলমারী থেকে সুন্দর কারুকাজ করা প্লেট বের করেছেন ( এখানে ওরা বলে চিনির বর্তন) সেই প্লেটে ধোঁয়া ওঠা চিতই পিঠা আর হাঁসের গোস্ত বেড়ে দিলেন। চিতুই পিঠা ভেঙ্গে সোনালি রঙের ঝোল মাখিয়ে মুখে পুরে গরমের চোটে চোখে পানি এসে গেলো। মুখ হা করে পিঠা ঠান্ডা করার চেষ্টা করতেই বাবু হো হো করে হেঁসে উঠলো। দাদীও মুচকি হেসে বললেন, " রয়ে সয়ে খাও দীল, নাহলে জিভ পুড়ে যাবে। মুখে ছ্যাকা খেয়ে চোখে পানি এসেছিলো। বাবুর হাসিতে সেটা গড়িয়ে পড়লো। দাদী উঠে এসে আদর করে জড়িয়ে ধরে শাড়ীর আঁচল দিয়ে মুখ মুছিয়ে দিয়ে নিজেই পিঠে ভেঙ্গে গোস্ত আর ঝোল মাখিয়ে মুখে তুলে দিলেন। মুখ ভর্তী পিঠে নিয়ে দিল আদুরে স্বরে বল্লো, " দাদী আপনি ছই পিঠা কবে বানাবেন"? ছই পিঠা বানানোর সময় ভারী মজা হয়। ওরা সব্বাই মিলে কাঁই দিয়ে হাতী-ঘোড়া, হাড়ি, পাতিল বানায়। দাদী সেগুলো সিদ্ধ করে দেন। আর ওরা নিজেদের শিল্পকর্মে বিমোহিত হয়ে পরম আনন্দ নিয়ে সেগুলো পেটে পুরে। দাদীর শরীরে কি সুন্দর দারচিনি, এলাচের গন্ধ!!!

চোখ মেলে বুঝতে পারছি্লোনা সে কোথায় আছে? হাঁসকুড়ি থেকে এখানে এলো কি করে? স্বপ্ন দেখছিলো। কত বছর, কত যুগ দিল হাঁসকুড়িতে যায়নি। বছর সাত/ আট আগে দেশে গেলেও সুনামগঞ্জ বা হাঁসকুড়ি যাওয়া হয়নি। দাদী নেই। হাঁসকুড়ি যাওয়ার প্রশ্ন উঠেনা। কিন্তু দাদার বাড়িতেই যেতে পারলো কই? আজো দিলশাদ প্রায়ই স্বপ্নে সেই শৈশবের, কৈশরের সেই আনন্দময় দিনগুলিতে ফিরে যায়। ভেজা চোখের কোল মুছে বিছানা ছেড়ে উঠে দাড়ায়। দরজা খুলতেই হিমেল বাতাস কামড় দিয়ে ধরলো। আস্তে আস্তে বাগানে গিয়ে দাড়ালো। আম্মার হাতের সেই সাজানো বাগান আর আগের মত নেই। কিছুই কি আর আগের মত আছে? সে নিজে? হাসনাহেনা, বকুল, কামিনী গাছগুলো এই শীতে ন্যাড়া পত্র-শূন্য হয়ে আছে। আম্মার এক বান্ধবীর দেয়া শিউলি গাছটা বছর তিনেক আগে হঠাৎ মরে গেলো। এখানকার নার্সারীতে খুঁজেও আর শিউলির চারা পাওয়া যায়নি। আম্মার হাতের লাগানো সাতকরার গাছটি এবারই প্রথম ফল দিয়েছে। কি সুন্দর ছোট ছোট জাম্বুরার মতো সাতকরা ঝুলে আছে। সেদিন ছোট খালা সাতকরা দিয়ে মাছ, গোস্ত রান্না করে অনেককে খাইয়েছেন। জীবনের প্রথম এ জিনিস খেয়ে মেহমানেরা যেমন বিস্মিত, তেমনি আনন্দিত। "হ্যাপি বার্থ ডে আপু"। নিমার গলা শুনে ফিরে তাকায় দিল। এই ঠান্ডায় বাগানে ক্যানো? ঠান্ডা থেকে বেঁচে থাকো। মনে নেই দু'বছর আগে কেমন ভুগলে? স্বস্নেহে ওর কপালে চুমু দিয়ে আস্তে করে বলে, " দেখেছ, আম্মার সাতকরা গাছটি কেমন সুন্দর ভাবে ফল দিয়েছে"? হুম, কিন্তু তুমি এখন ঘরে যাও তো! আমি আসি। হাত তুলে বিদায় জানিয়ে ছটফট করে বেরিয়ে যায় নিমা। ছোট বোনটি আমার! দীর্ঘশ্বাষ চাঁপার চেষ্টা করে দিল। সংসার করার কোনই আগ্রহ নেই। বলে, " এই তো বেশ আছি"। কে জানে, সংসার করলে হয়তো সেও মিলা, মিতার মত সুখী ও স্বার্থক হতো। নাকি আমার জীবন দেখে তার সংসারের প্রতি অনিহা জন্মেছে? সবার ছোট, মা, বাবার কোল-পোছা বোন আমার ভালো থাকুক।

ইস! নিমা দুপুরে ফিরবে কিনা জিজ্ঞাসা করা হলোনা। মনে মনে জিভে কামড় দেয় দিল। ধ্যাত! কি যে হচ্ছে দিনকে দিন! কিচ্ছু যদি মনে থাকে। দুপুরে ফিরলে ওকে নিয়ে বাইরে খেয়ে আসতো। নিজের উপর রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে ঘরে এসে ঠিক করলো আজ সে কিছুই রান্না করবেনা। সকালের বরাদ্দ মধু দিয়ে লেবু পানি আর গোটা পাঁচেক ভেজানো আমন্ড চিবিয়ে ল্যাপটপটা কোলে নিয়ে বসলো। শুধু মেইলটা চেক করবে। আর কিছু নয়। আজ গোসলের সময় মাথায় সেম্পু করবে। আর এই বয়সেও চুল তাকে খুব ভোগায়। রোজ রোজ ভেজাতে পারেনা। চুল না শুখালেই তো মাথা ব্যাথায় কষ্ট পেতে হয়।
অনেক গুলো গ্রিটিংস কার্ডের মাঝে অমিতের কার্ড পেয়ে মনটা ভরে গেলো। আলতো করে ল্যাপটপের স্ক্রিনের উপর হাত দিয়ে যেন অমিতকে ছোঁ্যার চেষ্টা করলো। জানবাচ্চাটা আমার!!!! কত দিন ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করেনি। দিলশাদের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। এ পানি কি অমিতের জন্য? নাকি রিয়াজের জন্য? নিজের মনকেই প্রশ্ন করে " সেকি আশা করেছিলো রিয়াজের মেইল পাবে?" কেন সে এখনও এমন করে ভাবে? কেন সে রিয়াজকে মন থেকে এতোটুকু সরাতে পারেনা?
ল্যাপটপ বন্ধ করতে যাবে, এমন সময় নতুন আসা মেইলটি চোখে পড়তেই দিলশাদের মুখটি আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। " কঙ্কাবতীর মেসেজ! এই মেয়েটি যাদু জানে! কি করে দিলশাদের মনের কথাগুলো বুঝে ফেলে কে জানে! দ্রুত হাতে মেসেজটি ওপেন করলো।

"দিল-দরিয়া, দিল-বাহার, দিল-ই-রুবা, দিলশাদ বানু"
শুভ জন্মদিন-
কি করা হচ্ছে শুনি? নিশ্চয় গালে হাত দিয়ে অতিতের চোরাগলিতে অন্ধের মত ঘুরপাক খাচ্ছো? উহু! ওসব আজ চলবেনা। চোখ মোছো। এখুনি উঠে গোসলে যাও। গোসল করে ভালো করে চুল মুছে শুখিয়ে নিবে কিন্তু! সাদা শাড়ী, নাহ! থাক! ঝামেলায় কাজ নেই। সাদা সালোয়ার কামিজ পড়ো। আজ চুল খোঁপায় জড়াবেনা। তাই ঐ গানও আজ বাঁজবেনা- " আলগা করো গো খোঁপার বাঁ্ধন, দিল ওহি মেরা ফাস গায়ি", , , , বেনীও নয়- " সই ভালো করে বিনোদ বেনী বাঁধিয়া দে" এ গানও বাদ। তোমার ঐ দিঘল কালো কেশ ছেড়ে রেখো। তবে একগুচ্ছ নার্গিস ফুল গুঁজে দিও তাতে। নিমা বা সাজদার সাথে বেরিয়ে পরো বাইরে। দুপুরে তোমার প্রিয় থাই ফুড খেয়ে ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে এসো। সুরমা নদীর স্রোতের মাঝে তোমার নামে ভাসিয়ে দিবো এক রাশ শিউলি। চোখ বন্ধ করে তোমার মনের ঘাট থেকে তা তুলে নিও। কেমন? অনেক অনেক অনেক ভালো থেকো।
এক পৃথিবী, এক সমুদ্র, এক আকাশ ভালোবাসা তোমার জন্য।
"তোমার কঙ্কাবতী"
ল্যাপটপ বন্ধ করে প্রিয় শিল্পী অজয় চক্রবর্তীর সিডিটি ছেড়ে দিলো দিলশাদ। ভরাট, দরাজ কন্ঠ সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়লো। " কত না বকুল পড়েছিলো ঝরে উদাসী স্মৃতি তীরে"।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই ডিসেম্বর, ২০১১ সন্ধ্যা ৬:৪৫
৩৬টি মন্তব্য ৩৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলা সাহিত্যে জায়গা পাচ্ছেন ওসমান হাদী

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:১৭


সংবাদপত্র যা বলছে
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ জুন ২০২৬ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই পরিমার্জন-সংক্রান্ত কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ক্রাউড ফান্ডিং-এর সুযোগ তৈরি করে সরকারী লাভজনক প্রজেক্টে জনগণের বিনিয়োগ নিন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১২ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:৩১

বাংলাদেশের বর্তমান সরকার বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তিত, তা বুঝা যাচ্ছে। নাহলে, খোদ প্রধানমন্ত্রী দেশে বিনিয়োগ নিয়ে আসতে জনগণকে অনুরোধ করতেন না। আমার মন হয়, দেশের মানুষের কাছেই অনেক সম্পদ আছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিএনপির আবালীপনা।

লিখেছেন তানভির জুমার, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮

বিএনপি ৫০ হাজার নাচের শিক্ষক নিয়োগ দিতে যাচ্ছে। যার পেছনে ১০ বছরে ব্যায় হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা। যা দিয়ে ফুল প্যাকেজ ৩০ টি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

×