দিলশাদ, বাবু, মিলা, মিতাআআআআআ-- দাদীর সুরেলা আওয়াজ কানে যেতেই কাঠের বারান্দায় গোল হয়ে বসা সব হুড়মুড় করে দৌড়ে রান্না ঘরে ছুটলো। আহ! রান্না ঘরটা কি উষ্ণ হয়ে আছে। তিন মুখি চুলার ধারে নিচু মোড়ায় দাদী বসে। চুলোর লালচে আগুনে উনার ফর্সা মুখটা লাল হয়ে আছে। চোখ তুলে তাকিয়েই বললেন, " ঝটপট বসে পড়। পিঠা ঠান্ডা হলে কি আর মজা পাবে। চুলার ধারে বিছানো পাটিতে হুড়োহুড়ি করে সবাই বসে গেলো। চাচাতো, ফুফাতো ভাই বোনেরা আগুনের কাছে বসবার জন্য কনুই দিয়ে ঠ্যালাঠেলি করছিলো। দাদী তা ঠিকই দেখতে পেলেন। স্মিত হেসে মৃদু কন্ঠে বললেন, " ওদের ভালো করে খাতির যত্ন কর, ওরা তো সব সময় আসেনা"। ভাই-বোনগুলো লজ্জা পেয়ে চুপ করে বসলো। শুধু দিলশাদদের জন্য দাদী আলমারী থেকে সুন্দর কারুকাজ করা প্লেট বের করেছেন ( এখানে ওরা বলে চিনির বর্তন) সেই প্লেটে ধোঁয়া ওঠা চিতই পিঠা আর হাঁসের গোস্ত বেড়ে দিলেন। চিতুই পিঠা ভেঙ্গে সোনালি রঙের ঝোল মাখিয়ে মুখে পুরে গরমের চোটে চোখে পানি এসে গেলো। মুখ হা করে পিঠা ঠান্ডা করার চেষ্টা করতেই বাবু হো হো করে হেঁসে উঠলো। দাদীও মুচকি হেসে বললেন, " রয়ে সয়ে খাও দীল, নাহলে জিভ পুড়ে যাবে। মুখে ছ্যাকা খেয়ে চোখে পানি এসেছিলো। বাবুর হাসিতে সেটা গড়িয়ে পড়লো। দাদী উঠে এসে আদর করে জড়িয়ে ধরে শাড়ীর আঁচল দিয়ে মুখ মুছিয়ে দিয়ে নিজেই পিঠে ভেঙ্গে গোস্ত আর ঝোল মাখিয়ে মুখে তুলে দিলেন। মুখ ভর্তী পিঠে নিয়ে দিল আদুরে স্বরে বল্লো, " দাদী আপনি ছই পিঠা কবে বানাবেন"? ছই পিঠা বানানোর সময় ভারী মজা হয়। ওরা সব্বাই মিলে কাঁই দিয়ে হাতী-ঘোড়া, হাড়ি, পাতিল বানায়। দাদী সেগুলো সিদ্ধ করে দেন। আর ওরা নিজেদের শিল্পকর্মে বিমোহিত হয়ে পরম আনন্দ নিয়ে সেগুলো পেটে পুরে। দাদীর শরীরে কি সুন্দর দারচিনি, এলাচের গন্ধ!!!
চোখ মেলে বুঝতে পারছি্লোনা সে কোথায় আছে? হাঁসকুড়ি থেকে এখানে এলো কি করে? স্বপ্ন দেখছিলো। কত বছর, কত যুগ দিল হাঁসকুড়িতে যায়নি। বছর সাত/ আট আগে দেশে গেলেও সুনামগঞ্জ বা হাঁসকুড়ি যাওয়া হয়নি। দাদী নেই। হাঁসকুড়ি যাওয়ার প্রশ্ন উঠেনা। কিন্তু দাদার বাড়িতেই যেতে পারলো কই? আজো দিলশাদ প্রায়ই স্বপ্নে সেই শৈশবের, কৈশরের সেই আনন্দময় দিনগুলিতে ফিরে যায়। ভেজা চোখের কোল মুছে বিছানা ছেড়ে উঠে দাড়ায়। দরজা খুলতেই হিমেল বাতাস কামড় দিয়ে ধরলো। আস্তে আস্তে বাগানে গিয়ে দাড়ালো। আম্মার হাতের সেই সাজানো বাগান আর আগের মত নেই। কিছুই কি আর আগের মত আছে? সে নিজে? হাসনাহেনা, বকুল, কামিনী গাছগুলো এই শীতে ন্যাড়া পত্র-শূন্য হয়ে আছে। আম্মার এক বান্ধবীর দেয়া শিউলি গাছটা বছর তিনেক আগে হঠাৎ মরে গেলো। এখানকার নার্সারীতে খুঁজেও আর শিউলির চারা পাওয়া যায়নি। আম্মার হাতের লাগানো সাতকরার গাছটি এবারই প্রথম ফল দিয়েছে। কি সুন্দর ছোট ছোট জাম্বুরার মতো সাতকরা ঝুলে আছে। সেদিন ছোট খালা সাতকরা দিয়ে মাছ, গোস্ত রান্না করে অনেককে খাইয়েছেন। জীবনের প্রথম এ জিনিস খেয়ে মেহমানেরা যেমন বিস্মিত, তেমনি আনন্দিত। "হ্যাপি বার্থ ডে আপু"। নিমার গলা শুনে ফিরে তাকায় দিল। এই ঠান্ডায় বাগানে ক্যানো? ঠান্ডা থেকে বেঁচে থাকো। মনে নেই দু'বছর আগে কেমন ভুগলে? স্বস্নেহে ওর কপালে চুমু দিয়ে আস্তে করে বলে, " দেখেছ, আম্মার সাতকরা গাছটি কেমন সুন্দর ভাবে ফল দিয়েছে"? হুম, কিন্তু তুমি এখন ঘরে যাও তো! আমি আসি। হাত তুলে বিদায় জানিয়ে ছটফট করে বেরিয়ে যায় নিমা। ছোট বোনটি আমার! দীর্ঘশ্বাষ চাঁপার চেষ্টা করে দিল। সংসার করার কোনই আগ্রহ নেই। বলে, " এই তো বেশ আছি"। কে জানে, সংসার করলে হয়তো সেও মিলা, মিতার মত সুখী ও স্বার্থক হতো। নাকি আমার জীবন দেখে তার সংসারের প্রতি অনিহা জন্মেছে? সবার ছোট, মা, বাবার কোল-পোছা বোন আমার ভালো থাকুক।
ইস! নিমা দুপুরে ফিরবে কিনা জিজ্ঞাসা করা হলোনা। মনে মনে জিভে কামড় দেয় দিল। ধ্যাত! কি যে হচ্ছে দিনকে দিন! কিচ্ছু যদি মনে থাকে। দুপুরে ফিরলে ওকে নিয়ে বাইরে খেয়ে আসতো। নিজের উপর রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে ঘরে এসে ঠিক করলো আজ সে কিছুই রান্না করবেনা। সকালের বরাদ্দ মধু দিয়ে লেবু পানি আর গোটা পাঁচেক ভেজানো আমন্ড চিবিয়ে ল্যাপটপটা কোলে নিয়ে বসলো। শুধু মেইলটা চেক করবে। আর কিছু নয়। আজ গোসলের সময় মাথায় সেম্পু করবে। আর এই বয়সেও চুল তাকে খুব ভোগায়। রোজ রোজ ভেজাতে পারেনা। চুল না শুখালেই তো মাথা ব্যাথায় কষ্ট পেতে হয়।
অনেক গুলো গ্রিটিংস কার্ডের মাঝে অমিতের কার্ড পেয়ে মনটা ভরে গেলো। আলতো করে ল্যাপটপের স্ক্রিনের উপর হাত দিয়ে যেন অমিতকে ছোঁ্যার চেষ্টা করলো। জানবাচ্চাটা আমার!!!! কত দিন ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করেনি। দিলশাদের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। এ পানি কি অমিতের জন্য? নাকি রিয়াজের জন্য? নিজের মনকেই প্রশ্ন করে " সেকি আশা করেছিলো রিয়াজের মেইল পাবে?" কেন সে এখনও এমন করে ভাবে? কেন সে রিয়াজকে মন থেকে এতোটুকু সরাতে পারেনা?
ল্যাপটপ বন্ধ করতে যাবে, এমন সময় নতুন আসা মেইলটি চোখে পড়তেই দিলশাদের মুখটি আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। " কঙ্কাবতীর মেসেজ! এই মেয়েটি যাদু জানে! কি করে দিলশাদের মনের কথাগুলো বুঝে ফেলে কে জানে! দ্রুত হাতে মেসেজটি ওপেন করলো।
"দিল-দরিয়া, দিল-বাহার, দিল-ই-রুবা, দিলশাদ বানু"
শুভ জন্মদিন-
কি করা হচ্ছে শুনি? নিশ্চয় গালে হাত দিয়ে অতিতের চোরাগলিতে অন্ধের মত ঘুরপাক খাচ্ছো? উহু! ওসব আজ চলবেনা। চোখ মোছো। এখুনি উঠে গোসলে যাও। গোসল করে ভালো করে চুল মুছে শুখিয়ে নিবে কিন্তু! সাদা শাড়ী, নাহ! থাক! ঝামেলায় কাজ নেই। সাদা সালোয়ার কামিজ পড়ো। আজ চুল খোঁপায় জড়াবেনা। তাই ঐ গানও আজ বাঁজবেনা- " আলগা করো গো খোঁপার বাঁ্ধন, দিল ওহি মেরা ফাস গায়ি", , , , বেনীও নয়- " সই ভালো করে বিনোদ বেনী বাঁধিয়া দে" এ গানও বাদ। তোমার ঐ দিঘল কালো কেশ ছেড়ে রেখো। তবে একগুচ্ছ নার্গিস ফুল গুঁজে দিও তাতে। নিমা বা সাজদার সাথে বেরিয়ে পরো বাইরে। দুপুরে তোমার প্রিয় থাই ফুড খেয়ে ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে এসো। সুরমা নদীর স্রোতের মাঝে তোমার নামে ভাসিয়ে দিবো এক রাশ শিউলি। চোখ বন্ধ করে তোমার মনের ঘাট থেকে তা তুলে নিও। কেমন? অনেক অনেক অনেক ভালো থেকো।
এক পৃথিবী, এক সমুদ্র, এক আকাশ ভালোবাসা তোমার জন্য।
"তোমার কঙ্কাবতী"
ল্যাপটপ বন্ধ করে প্রিয় শিল্পী অজয় চক্রবর্তীর সিডিটি ছেড়ে দিলো দিলশাদ। ভরাট, দরাজ কন্ঠ সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়লো। " কত না বকুল পড়েছিলো ঝরে উদাসী স্মৃতি তীরে"।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই ডিসেম্বর, ২০১১ সন্ধ্যা ৬:৪৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



