মৌলবাদ সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিতে আলোচনার শুরুতেই বলতে হয় যে, শব্দটি যতটা ধর্মীয় তার চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক তথা ধর্মের নামে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। যে কারণে এদেশের মুসলমানদের নতুন করে মৌলবাদ শব্দের সাথে পরিচিত হতে হচ্ছে, এ নিয়ে আলোচনা সমালোচনার ঝড় উঠেছে এবং সর্বোপরি মৌলবাদী দাবিদার তথাকথিত মৌলবাদ প্রতিষ্ঠায় শক্ত অপতৎপরতা শুরু করেছে।
মূলতঃ মৌলবাদ শব্দের অর্থ হলো- যে কোন ধর্ম বা মতবাদের মূলতত্ত্ব, মৌলিক বা মূল বিষয়সমূহ অথবা মৌলিক বা মূল মতবাদসমূহ। আর ব্যবহারিক অর্থে ধর্মান্ধ চরমপন্থী আমেরিকান খৃষ্টান প্রোটেষ্ট্যান্ট সম্প্রদায়ের বাইবেল সম্পর্কীয় মতবাদকে মৌলবাদ বলে এবং এ অর্থেই এটা ব্যাপকভাবে পরিচিত, আর এই ধর্মান্ধ চরমপন্থী আমেরিকান খৃষ্টান প্রোটেষ্ট্যান্ট সম্প্রদায়ই মৌলবাদী বলে পরিচিত। এরাই সর্বপ্রথম মৌলবাদী বলে পরিচিতি লাভ করে, যারা বাইবেলের প্রতিটি বিষয়ের যথার্থতায় এবং আক্ষরিক ব্যাখ্যায় যুক্তিহীনভাবে, যাচাই-বাচাই ব্যতিরেকে, অন্ধের ন্যায়, কুসংস্কারাচ্ছন্ন চরমপন্থীদের মতো বিশ্বাসী ছিল।
মৌলবাদ আমেরিকান খৃষ্টান প্রোটেষ্ট্যান্টদের একটি ব্যাপক আন্দোলনের নাম। মৌলবাদ আন্দোলন স্বাধীন চিন্তাবিদদের বিরুদ্ধে খৃষ্টধর্মের মূলতত্ত্বসমূহকে সংরক্ষণের জন্য হয়েছিল।
ঊনবিংশ শতকের শেষের দিকে অনেক স্বাধীন বা উদারমনা ধর্মীয় চিন্তাবিদগণ বাইবেলে সঠিকত্ব নিয়ে চ্যালেঞ্জ করে। তারা খৃষ্ট মতবাদ বা বিশ্বাসের প্রতি ঐতিহাসিক গবেষণালব্ধ তথ্য দিয়ে প্রশ্নবানে জর্জরিত করে। এই উদারমনাগণ চেয়েছিল, খৃষ্ট মতবাদ বা বিশ্বাসসমূহকে বিজ্ঞানের নতুন আবিষ্কারের সাথে সমন্বয় করতে, বিশেষ করে জীববিদ্যা ও ভূ-তত্ত্বের ক্ষেত্রে। অনেক খৃষ্টানরাই মনে করতো যে, উদারমনাদের এসব কাজ খৃষ্টানদের খাঁটিত্ব বজায় রাখার এমনকি খৃষ্ট মতবাদ বেঁচে থাকার জন্য বিশেষ রকমের হুমকীস্বরূপ।
১৯১২ সালের দিকে কিছু বেনামী লেখক ১২টি ছোট ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভলিউমে “The Fundamentals” নামে বই বের করে এবং এই বইয়ের নামকরণ থেকেই এই আন্দোলন Fundamentalist Movement বা “মৌলবাদী আন্দোলন” নামে আখ্যায়িত হয়।
লেখকগণ তাদের বইসমূহে এই ব্যাখ্যা দিতে চেষ্টা করেন যে, তারাই যা মনে করছেন, তাই মূল খৃষ্টানতত্ত্ব; যা কোনরূপ প্রশ্ন ব্যতিরেকেই গ্রহণ করতে হবে। এই মতবাদের মধ্যে মূল ছিল ৫টি। যথা-
১. বাইবেলের চূড়ান্তরূপে সঠিকত্ব,
২. যীশুর মায়ের কুমারী অবস্থায় তাঁর জন্মগ্রহণ,
৩. যীশুর দেবত্ব,
৪. পৃথিবীর পাপাচারের জন্য যীশুর জীবন উৎসর্গকরণ,
৫. শারীরিকভাবে যীশুর পুনরায় আবির্ভাব।
দু’জন ধনী ভ্রাতা; Lyman এবং Milton-এর খরচে এসব বই চারদিকে ছড়ানো হয়। এই মৌলবাদ মতবাদটি উৎপত্তির পর থেকে পর্যায়ক্রমে প্রচার-প্রসার লাভ করতে থাকে। এমন কি ১৯৩০ সালের দিকেও এই খৃস্ট মৌলবাদ টিকে ছিল। ১৯৪১ সালে The Aggressive Fundamentalist American Council of Christian Churches গঠিত হয়। পরবর্তী বছর অধিকতর মধ্যপন্থীদের নিয়ে Association of Evangelicals গঠিত হয়। এরাও প্রোটেস্ট্যান্টদের একটি সম্প্রদায়। এই সম্প্রদায়ের মৌলবাদীদের রক্ষণশীল ইভানজেলিক্যাল বলা হয়। নব্য মৌলবাদীদের একটি নতুন জাগরণ হয়েছিল ১৯৫০ সালের দিকে। এদের প্রচারের ফলে তা অন্যান্য দেশেও বিস্তার লাভ করে।
কাজেই মুসলমানদেরকে মৌলবাদী বলা বা মুসলমানগণ নিজেদেরকে মৌলবাদী বলে দাবী করা কখনো কোন মতেই শরীয়তসম্মত হবে না। কারণ যারা বাইবেলের প্রতিটি বিষয়ের যথার্থতায় এবং আক্ষরিক ব্যাখ্যায় যুক্তিহীনভাবে, যাচাই-বাচাই ব্যতিরেকে, অন্ধের ন্যায়, কুসংস্কারাচ্ছন্ন চরমপন্থা অবলম্বন করেছিল তারাই মৌলবাদী। তাদেরই শেয়ার বা চিহ্ন বা আলামত মৌলবাদ।
আর যারা বলে থাকে, মূল বা মৌলিক বিষয়ের সাথে যাদের সম্পর্ক রয়েছে, তারা সকলেই মৌলবাদী। তাহলে বলতে হয়, ইহুদী-নাছারা, হিন্দু-বৌদ্ধ, মজুসী, মুশরিক, জৈন ইত্যাদি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের কিছু লোক রয়েছে, যারা তাদের ধর্মের মূল বা মৌলিক বিষয়ের সাথে সম্পর্ক রাখে, তাহলে তারাও মৌলবাদী। অর্থাৎ তাহলে ইহুদী মৌলবাদী, খৃষ্টান মৌলবাদী, হিন্দু মৌলবাদী, বৌদ্ধ মৌলবাদী, মজুসী মৌলবাদী, মুশরিক মৌলবাদী, জৈন মৌলবাদী ইত্যাদি মৌলবাদীদের মতো মুসলমানরাও এক প্রকার মৌলবাদী।
এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, নাছারা শব্দটি সাধারণতঃ দু’অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। (১) আভিধানিক, (২) ব্যবহারিক। আভিধানিক অর্থে নাছারা শব্দের অর্থ হলো- সাহায্যকারী অর্থাৎ যারা সাহায্য করে আর ব্যবহারিক বা প্রচলিত অর্থে নাছারা হচ্ছে ঐ সম্প্রদায়ের নাম যারা সারা বিশ্বে খৃষ্টান নামে পরিচিত। যাদেরকে ঈসায়ীও বলা হয়।
অনূরূপ, শিয়া শব্দটি দু’অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। (১) আভিধানিক, (২) ব্যবহারিক। আভিধানিক অর্থে শিয়া শব্দের অর্থ হলো- ফিরক্বা, গোত্র, দল, অনুসারী, সাহায্যকারী ইত্যাদি আর ব্যবহারিক বা প্রচলিত অর্থে শিয়া হচ্ছে ঐ সম্প্রদায়ের নাম যারা ইমামিয়া বা রাফেজী ফিরক্বা নামে পরিচিত। যারা হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর অনুসরণকারী বলে দাবী করে।
অনূরূপ আরো একটি শব্দ হচ্ছে হিন্দু। এ শব্দটিও সাধারণতঃ দু’অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে- (১) আভিধানিক, (২) ব্যবহারিক। আভিধানিক অর্থে হিন্দু শব্দের অর্থ হলো- চোর, ডাকাত, ছিনতাইকারী, গোলাম, মাশুক, পছন্দনীয়, প্রিয় ইত্যাদি আর ব্যবহারিক বা প্রচলিত অর্থে হিন্দু হচ্ছে ঐ সম্প্রদায়ের নাম যারা সারাবিশ্বে মুর্তিপূজক হিসেবে পরিচিত।
আরো উল্লেখ্য, মুসলমান সুন্নী সম্প্রদায়ের কাউকেও যদি কেউ শিয়া বলে সম্বোধন করে তাহলে কোন সুন্নী মুসলমান ব্যক্তি সেটা পছন্দ করবে না। অনূরূপ যদি কোন মুসলমানকে তার কোন আমলের কারণে হিন্দু বলে সম্বোধন করে তাহলে সেটা কোন মুসলমানই পছন্দ করবে না। অনূরূপ নাছারা শব্দটি কুরআন শরীফে থাকার পরও কোন মুসলমান নাছারা সম্বোধন গ্রহণ করতে নারাজ। এতে সে ব্যবহারিক বা প্রচলিত খৃষ্টান অর্থই গ্রহণ করে চটে যায়। কারণ নাছারারা ইসলামের দৃষ্টিতে বাতিল ধর্মাবলম্বী, চির জাহান্নামী ও কাট্টা কাফিরের অন্তর্ভূক্ত। আর শিয়া শব্দটি দল বা সম্প্রদায় অর্থে কুরআন শরীফের প্রায় ১০ স্থানে উল্লেখ থাকার পরও এই শব্দটি আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের কেউই ব্যবহার করেন না। কেননা শিয়া শব্দটির আভিধানিক অর্থ দল বা সম্প্রদায় হলেও এ অর্থে শব্দটি প্রচলিত নয়। বরং শিয়া শব্দটির প্রচলিত বা ব্যবহারিক অর্থ হলো ইমামিয়া বা রাফেজী ফিরক্বা, যারা আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের ফতওয়া মুতাবিক মুসলমানের অন্তর্ভূক্ত নয়। আর হিন্দু শব্দের একটি অর্থ মাশুক বা প্রিয় হলেও অর্থাৎ এই অর্থ ইসলামে গ্রহণীয় বা পছন্দনীয় হলেও কোন মুসলমানকে হিন্দু বললে প্রচলিত মুর্তিপূজক অর্থই সে গ্রহণ করে, হিন্দু হিসেবে স্বীকৃত হতে পছন্দ করবে না।
উপরোক্ত আলোচনার দ্বারা সহজেই প্রমাণিত হয় যে, নাছারা শব্দের অর্থ সাহায্যকারী হওয়ার পরও ইসলামী নাছারা শব্দ যেমন মুসলমানদের কাছে পছন্দনীয় নয়। শিয়া শব্দের অর্থ দল বা সম্প্রদায় হওয়ার পরও তার সাথে ইসলামী শব্দ যুক্ত করে ইসলামী শিয়া যেমন আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের কাছে পছন্দনীয় নয়। হিন্দু শব্দের একটি অর্থ মাশুক বা প্রিয় হওয়ার পরও তার সাথে ইসলামী শব্দ যুক্ত করে ইসলামী হিন্দু যেমন পছন্দনীয় নয়। তেমনি মৌলবাদ শব্দের অর্থ মূল হতে আগত মতবাদ হওয়ার পরও তার সাথে ইসলামী শব্দের যোগ সাধনে ইসলামী মৌলবাদ ধারণা বা শব্দ ইসলামে পছন্দনীয় নয়। মূলতঃ কোন শব্দ পেলেই তা বিনা তাহ্ক্বীক্বে (বিচার-বিশ্লেষণ ব্যতিরেকে) কোন মুসলমানের নামের সাথে সংযুক্ত করা যাবে না। যা আল্লাহ পাক কুরআন শরীফে বলেন,
“তোমরা পরস্পরকে দোষারোপ করোনা এবং পরস্পরকে অশোভনীয় লক্বব (ঊপাধি) দ্বারা সম্বোধন করোনা। (কেননা) ঈমান আনার পর অশ্লীল নাম দ্বারা ডাকা গুনাহ ও এটা হতে যারা তওবা করলো না তারা জালিমের অন্তর্ভুক্ত।” (সূরা হুজরাত ১১)
উপরোক্ত আয়াত শরীফে আল্লাহ পাক আমাদের নিজেদেরকে দোষারোপ করতে এবং একে অপরকে অশ্লীল, বিশ্রী, অশোভনীয়, খারাপ ও শরীয়তবিরোধী লক্বব বা উপাধী দ্বারা সম্বোধন করতে নিষেধ করেছেন। আর আল্লাহ পাক এও বলেছেন যে, ঈমান গ্রহণের পর কাউকে কুফরী, ফাসিকী লক্বব বা উপাধী দ্বারা সম্বোধন করা গুনাহ এবং নিকৃষ্টতম কাজ। কারণ কাউকে যদি অশালীন, অশোভনীয়, অযৌক্তিক, মানহানীকর লক্বব বা উপাধী দ্বারা সম্বোধন করা হয়, তবে স্বভাবতঃই সে মনে কষ্ট পেয়ে থাকে। আর হাদীস শরীফে বলা হয়েছে,
“মুসলমানকে কষ্ট দেয়া কুফরী।”
অন্যত্র বলা হয়েছে,
“মুসলমান সেই, যার হাত ও জবান হতে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে।” (বুখারী শরীফ)
আরো বলা হয়েছে,
“মু’মিন সেই, যার কাছ থেকে মানুষ তাদের রক্ত ও মাল-সম্পদের ব্যাপারে নিরাপদ থাকে।”
সর্বোপরি এ প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক কুরআন শরীফে বলেন,
“যারা কোন মু’মিন পুরুষ ও মু’মিন নারীদের বিনা অপরাধে কষ্ট দেয়, তারা মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপের বোঝা বহন করে।” (সূরা আহ্যাব ৫৮)
অর্থাৎ আল্লাহ পাক মুসলমানদেরকে পরস্পর পরস্পরকে অশ্লীল-বিশ্রী, অশোভনীয়, খারাপ ও শরীয়ত বিরোধী লক্বব বা উপাধী দ্বারা সম্বোধন করতে নিষেধ করেছেন। এমনকি যে শব্দের একাধিক অর্থ রয়েছে যেমন- ভাল ও মন্দ অর্থাৎ ভাল ও মন্দ উভয় অর্থেই ব্যবহৃত হয়, এমন শব্দ দিয়েও সম্বোধন করতে নিষেধ করেছেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক কুরআন শরীফে বলেন,
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা রঈনা বলোনা উনজুরনা বলো এবং শ্রবণ কর (বা শুনতে থাক) আর কাফিরদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।” (সূরা বাক্বারা ১০৪)
এ আয়াত শরীফের শানে নুযুলে বলা হয়েছে, ইহুদীরা রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কষ্ট দেবার জন্য রঈনা শব্দ ব্যবহার করত যার একাধিক অর্থ। একটি অর্থ হল “আমাদের দিকে লক্ষ্য করুন” যা ভাল অর্থে ব্যবহার হয় আর খারাপ অর্থ হল “হে মূর্খ, হে মেষ শাবক” এবং হিব্রু ভাষায় একটি বদ দুয়া। ইহুদীরা রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রঈনা বলে সম্বোধন করত। যাতে প্রকৃতপক্ষে তাদের উদ্দেশ্য ছিল খারাপ অর্থের প্রতি ইঙ্গিত করা। আর সাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ রঈনা শব্দের ভাল অর্থের প্রতি ইঙ্গিত করে রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করলে ইহুদীরা খারাপ অর্থ চিন্তা করে হাসাহাসি করত। এতে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কষ্ট পেতেন তবুও কিছু বলতেন না। কেননা আল্লাহু পাক-এর রসূল, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওহী ছাড়া কোন কথা বলতেন না। যেমন কুরআন শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “তিনি (হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওহী ব্যতীত নিজের থেকে মনগড়া কোন কথা বলেন না।” (সূরা নজম ৩-৪)
এর ফলশ্রুতিতে আল্লাহু পাক কুরআন শরীফের আয়াত শরীফ নাযিল করে রঈনা শব্দের বদলে উনজুরনা শব্দ ব্যবহার করতে বললেন। কারণ রঈনা শব্দ ভাল-খারাপ উভয় অর্থে ব্যবহার হলেও উনজুরনা শব্দ শুধুমাত্র ভাল অর্থে ব্যবহৃত হতো। তাই যে সকল শব্দ ভাল-খারাপ উভয় অর্থে ব্যবহৃত হয়, সে সকল শব্দের পরিবর্তে, উপরোক্ত আয়াত শরীফ মুতাবিক ওটার সমার্থক অর্থবোধক শব্দ ব্যবহার করতে হবে, যা শুধুমাত্র ভাল অর্থেই ব্যবহৃত হয়।
কাজেই উপরোক্ত আয়াত শরীফ ও হাদীস শরীফ অনুযায়ী-
(১) খৃষ্টান প্রোটেষ্ট্যান্টদের সাথে তাশাব্বুহ্ বা মিল হওয়ায়,
(২) কাফির সম্প্রদায়ের সাথে তাশাব্বুহ্ বা মিল হওয়ায়,
(৩) ভাল অর্থের চেয়ে মন্দ অর্থেই বেশী পরিচিতি হওয়ায়,
(৪) অশালীন ও অশোভনীয় লক্বব হওয়ায়,
(৫) মুসলমানদের দোষী সাব্যস্ত করায়,
(৬) মুসলমানদের মনে কষ্ট দেয়ায়,
(৭) মুসলমানদের ক্ষেত্রে এটি একটি অপবাদ হওয়ায় এবং আরো নানাবিধ কারণে শরীয়তের দৃষ্টিতে মুসলমানদের মৌলবাদী বলা জায়িয নেই।
অতএব, শরীয়তের দৃষ্টিতে কোন মুসলমানের পক্ষে মৌলবাদী নাম ধারণ করে ফখর বা গর্ব করা বা গর্ববোধ করা জায়িয নেই। তবে যদি কোন বিধর্মী বা নাস্তিকরা মুসলমানদেরকে মৌলবাদী বলে সম্বোধন করে, তাহলে সেটাও শরীয়তের দৃষ্টিতে গালী হিসেবে গণ্য হবে।
উল্লেখ্য, শরীয়তের দৃষ্টিতে কোন মুসলমানকে মৌলবাদী বলাই যেখানে নাজায়িয, সেখানে কি করে বলা যায় যে, মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও মৌলবাদে বিশ্বাসী না হলে কাফির, মুরতাদ, মুশরিক হবে কিংবা তারা অবৈধ সন্তান হবে?
অথচ চরমোনাই (চামড়া ছাড়া)-র পীর মাওলানা ফজলুল করীম ২২শে আগষ্ট ১৯৯৮ ঈসায়ীতে মানিক মিয়া এভিনিউতে বলেছে-
“যারা মৌলবাদে বিশ্বাসী নয় তারা কাফির, মুরতাদ ও মুশরিক।” (২৩শে আগষ্ট ১৯৯৮ ঈসায়ী, দৈনিক বাংলবাজার)
এই চামড়া ছাড়া পীর আরো বলেছে-
“যারা মৌলবাদী নয় তারা অবৈধ সন্তান।” (২৮শে অক্টোবর ১৯৯৯ ঈসায়ী, দৈনিক ভোরের কাগজ)
মূলতঃ একথা বলা সম্পূর্ণ কুফরী হয়েছে। যে বা যারা এ ফতওয়া দিয়েছে, তাদের উপরই সে ফতওয়া বর্তাবে। কারণ ইসলামী আক্বায়েদে এমন কোন শর্ত-শরায়েত উল্লেখ করা হয়নি যে, মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও মৌলবাদে বিশ্বাসী না হলে কাফির, মুরতাদ, মুশরিক হয়ে যাবে। প্রকৃতপক্ষে যারা মৌলবাদী দাবী করে বা মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও মৌলবাদে বিশ্বাসী হওয়ার শর্ত আরোপ করে, তারা নতুন দল, মত, পথ গঠনে ব্যস্ত। যেমন- মির্জা গোলাম আহ্মদ কাদিয়ানী মুসলমানদেরকে মুসলমান নামে পরিচিত না করে কাদিয়ানী নামে পরিচিত করেছে। তদ্রুপ মৌলবাদীরাও মুসলমানদেরকে মুসলমান নামে পরিচিত না করে মৌলবাদী নামে পরিচিত করার কাজে ব্যস্ত। যা কুরআন-সুন্নাহর খিলাফ। আল্লাহ পাক-এর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
“সে আমাদের দলভূক্ত নয় যে বানানো মতবাদের দিকে আহ্বান করে।”
ইতিহাসে রয়েছে মির্জা গোলাম আহ্মদ কাদিয়ানী, তার জীবিতবস্থায় সে যখন ধারণা করলো যে, তার দল প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে, তখন সে ঘোষণা দিল- আদমশুমারী বা লোক গণনার সময় যে ব্যক্তি মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও কাদিয়ানী মতে বিশ্বাসী না হবে ও নামের শেষে কাদিয়ানী শব্দ ব্যবহার না করবে, সে কাফির। সে আরো ঘোষণা করলো- যারা কাদিয়ানী মত বিশ্বাস করবে ও কাদিয়ানী শব্দ নামের শেষে ব্যবহার করবে, তাদের জন্য ঐ সমস্ত ব্যক্তিদের সাথে বিয়ে-শাদী, আত্মীয়তা, খাওয়া-দাওয়া, উঠা-বসা ইত্যাদি সম্পর্ক রাখা সম্পূর্ণ নাজায়িয ও হারাম যারা মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও কাদিয়ানী মতে বিশ্বাসী নয় ও নামের শেষে কাদিয়ানী শব্দ ব্যবহার করবে না। তদ্রুপ মৌলবাদীরাও যখন ধারণা করলো যে, তাদের দল প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে, তখন তারাও কাদিয়ানী অনূরূপ ঘোষণা দিল যে, কোন ব্যক্তি যারা মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও মৌলবাদীরা দাবী না করলে বা মৌলবাদে বিশ্বাসী না হলে কাফির, মুশরিক ও মুরতাদ-এর অন্তর্ভূক্ত হবে। আর কাদিয়ানীর মত বাকী ঘোষণাটুকুও হয়তঃ অচিরেই দিবে। অথচ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উম্মতগণকে আল্লাহ পাক কুরআন শরীফে হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম-এর ভাষায় “মুসলমান” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন,
“তিনি তোমাদের নাম রাখলেন- মুসলমান।” (সূরা হজ্ব ৭৮)
আল্লাহ পাক আরো ইরশাদ করেন,
“তোমরা মৃত্যুবরণ করিওনা মুসলমান না হয়ে।” (সূরা আল ইমরান ১০২)
আল্লাহ পাক আরো উল্লেখ করেন,
“তোমরা পেরেশান হয়োনা এবং তোমরা চিন্তিতও হয়োনা। তোমরাই কামিয়াবী হাছিল করবে যদি মু’মিন হও।” (সূরা আল ইমরান ১৩৯)
আল্লাহ পাক আরো বলেন,
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা ঈমান আন।” (সূরা নিসা ১৩৬)
আল্লাহ পাক আরো বলেন,
“নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্য থেকে আল্লাহ পাক-এর নিকট ঐ ব্যক্তি সবচেয়ে বেশী সম্মানিত যে বেশী মুত্তাকী বা তাক্বওয়া অবলম্বনকারী।” (সূরা হুজরাত ১৩)
আল্লাহ পাক আরো বলেন,
“সাবধান! নিশ্চয়ই আল্লাহ পাক-এর ওলীগণের কোন ভয় নেই এবং তারা চিন্তিত হবেন না।” (সূরা ইউনূছ ৬২)
উপরোক্ত আয়াত শরীফসমূহে স্বয়ং আল্লাহ পাক হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উম্মতগণকে মুসলমান নাম দিয়েছেন আর মুসলমান না হয়ে ইন্তেকাল করতে নিষেধ করেছেন। আরো উল্লেখ করা হয়েছে- হে ঈমানদারগণ! তোমরা খালিছ ঈমান আন, অর্থাৎ ইলমুল ইয়াক্বীন, আইনুল ইয়াক্বীন এবং হক্কুল ইয়াক্বীন হাছিল করে প্রকৃত মু’মিন হয়ে যাও, তাহলেই তোমরা কামিয়াবী হাছিল করতে পারবে এবং তোমাদের কোন চিন্তা-পেরেশানীও থাকবেনা। আরো উল্লেখ করেছেন যে, তোমারা সতর্ক বা সাবধান হও, যারা প্রকৃত তাক্বওয়া অর্জন করে মুত্তাকী হয়েছে বা আল্লাহ পাক-এর খাছ ওলী হয়েছে, নিশ্চয়ই তাদের কোন চিন্তা-পেরেশানী নেই। কারণ তারাই আল্লাহ পাক-এর কাছে সবচেয়ে বেশী সম্মানিত। অতএব, মুসলমানগণকে মুসলমান না বলে মৌলবাদী বলা শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ নাজায়িয, হারাম ও কাট্টা কুফরী।
উল্লেখ্য হাদীস শরীফে বলা হয়েছে, “যদি কেউ অন্য কাউকে কাফির বলে, তবে সে শব্দটি প্রথমে আসমানে উঠতে চায়, কিন্তু তখন আসমানের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়। এরপর তা জমিনে নিপতিত হবার চেষ্টা করে, তখন জমিনের দরজাও বন্ধ করে দেয়া হয়। অতঃপর তা যাকে বলা হয়েছে তার উপর পড়ে যদি সে উপযুক্ত হয়। নতুবা যে বলেছে তার উপর গিয়েই পড়ে এবং কাফির অবস্থায়ই তার মৃত্যু হয়।”
আরো উল্লেখ্য যে, ইসলামী উছূলের কোথাও উল্লেখ করা হয়নি যে, মৌলবাদে বিশ্বাসী না হলে মুসলমান ও হালাল সন্তান হওয়া সত্ত্বেও অবৈধ সন্তানে পরিণত হয়ে যাবে। প্রকৃতপক্ষে সমগ্র মুসলমানদেরকে মুসলমান ও হালাল সন্তান হওয়া সত্ত্বেও মৌলবাদে বিশ্বাসী না হলে অবৈধ সন্তান বলে তাদের প্রতি ও তাদের চরিত্র সম্পর্কে মিথ্যা তোহ্মত দেয়া হয়েছে।
শরীয়তের দৃষ্টিতে কোন ব্যক্তি যদি কাউকে জেনাকার ও জেনাকারিনী বলে উল্লেখ করে, তখন তার দায়িত্ব হয়ে যায় ৪ জন সাক্ষী পেশ করা। যদি সাক্ষী পেশ করতে পারে, তাহলে যাকে জেনাকার ও জেনাকারিনী বলে সাব্যস্ত করা হয়েছে তার শাস্তি হলো- যদি অবিবাহিত ও অবিবাহিতা হয়, তাহলে তার শাস্তি হবে ১০০ দোররা। আর বিবাহিত ও বিবাহিতা হয়, তাহলে তার শাস্তি হলো ছংগেছার বা মৃত্যুদন্ড। আর যদি কোন ব্যক্তি কাউকে জেনাকার ও জেনাকারিনী বলে সাব্যস্ত করার পর ৪ জন সাক্ষী পেশ করতে না পারে, তাহলে যে জেনার তোহ্মত দিয়েছে, তার শাস্তি হলো ৮০ দোররা এবং তার সাক্ষী আর কস্মিনকালেও গ্রহণযোগ্য হবে না, কারণ সে চরম ফাসিকের অন্তর্ভূক্ত।
উল্লেখ্য, যে বা যারা বলে মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও মৌলবাদে বিশ্বাসী বা মৌলবাদী দাবী না করলে অবৈধ সন্তান, তাহলে তাদের দায়িত্ব হলো অবৈধ সন্তান প্রমাণ করতে হলে ৪ জন সাক্ষী পেশ করা। আর যদি ৪ জন সাক্ষী পেশ করতে না পারে, তাহলে নিম্নোক্ত আয়াত শরীফের হুকুম তাদের উপর বর্তাবে। আল্লাহ পাক বলেন,
“যারা স্বাধীনা মহিলাগণের প্রতি অপবাদ দেয়। অতঃপর ৪ জন পুরুষ সাক্ষী পেশ করতে পারে না তাহলে তাদেরকে ৮০ দোররা মারবে এবং তাদের সাক্ষী কস্মিনকালেও গ্রহণযোগ্য হবে না। কারণ তারা চরম ফাসিকের অন্তর্ভূক্ত।” (সূরা নূর ৪)
(দলীলঃ তাফসীরে আহ্কামুল কুরআন, কুরতুবী, রুহুল মায়ানী, খাযিন, বাগবী, বুখারী, ফত্হুল বারী, উমাদতুল ক্বারী, এরশাদুস্ সারী, তাইসীরুল ক্বারী, মিশকাত, মিরকাত, লুময়াত, আশয়াতুল লুময়াত, শরহুত্ ত্বীবী, তা’লীকুছ ছবীহ, মুযাহিরে হক্ব, ফিক্বহুল আকবর, তাক্মীলুল ঈমান, আক্বায়েদে নসফী, শরহে আক্বায়েদে নসফী, Encyclopeadia Britanica, Encyclopeadia Americana, World Book ইত্যাদি)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

