somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আবার ‘ডিজিটাল টাইম’?

২১ শে মার্চ, ২০১০ সকাল ৮:৩৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



খবরের কাগজের ভেতরের পৃষ্ঠায় এক কোনায় একটা খবর ছাপা হয়েছে এবং সেটা দেখে আমি আঁতকে উঠেছি। সেখানে লেখা হয়েছে, মার্চ মাসের ৩১ তারিখ ঘড়ির কাঁটার পরিবর্তন করা হবে (এটাকে কি এগিয়ে আনা বলা হবে, না পিছিয়ে দেওয়া বলা হবে—আমি সেটা বুঝতে পারি না বলে পরিবর্তন কথাটা ব্যবহার করছি)। কাজেই এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা যেন বিষয়টা লক্ষ রেখে পরীক্ষা দিতে যায়। কারণ ঘড়ির কাঁটার পরিবর্তনের কারণে সময়সূচিরও পরিবর্তন হয়ে যাবে।
আমাকে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে খবরটির দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়েছে। নিজের চোখে দেখেও আমার বিশ্বাস হতে চায় না যে এই দেশে এ রকম গুরুতর একটা বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গায় একজন মানুষও নেই, যিনি পুরো ব্যাপারটা একবার ভেবে দেখবেন।
ঘড়ির কাঁটা পরিবর্তন বা বিদেশিদের ভাষায় ‘ডে লাইট সেভিংস’ আসলে বড়লোক দেশের এক ধরনের বিলাসিতা—গ্রীষ্মে দীর্ঘ একটা দিনে বিকেলে দিনের আলোয় তারা বেশি সময় ফুর্তি-ফার্তা করে, সে জন্য ঘড়ির কাঁটা ঘুরিয়ে দেয়। শীতকালে সেটাকে আবার পরিবর্তন করতে হয়—বছরে দুবার এই কর্তন-কুর্দন তাদের দেশে মানিয়ে যায়, কিন্তু আমাদের এই দেশে? গত বছর সেটা পরীক্ষা করা হয়েছিল এবং এ দেশে সেটা শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছিল। লঞ্চঘাটে যদি কাউকে জিজ্ঞেস করা হতো, কয়টায় লঞ্চ ছাড়বে—অর্ধেক মানুষ বলেছে নয়টায়; অন্য অর্ধেক মানুষ বলেছে ১০টায়। দুজনেই সঠিক, কারণ বাংলাদেশের মানুষ সরকারের অবিবেচকের মতো নেওয়া একটা সিদ্ধান্তের কারণে দুটি সময় চালু রেখেছে। একটাকে তারা ধরেছে সঠিক সময়, অন্যটিকে তামাশা করে নাম দিয়েছে ডিজিটাল সময়। এই সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ তৈরি করার আন্তরিক প্রচেষ্টার মধ্যে সময় নিয়ে এই তুঘলকি কাণ্ডটি হচ্ছে এক ধরনের টিটকারি—সরকারের বড় বড় মানুষের মধ্যে এটা বোঝার মতো কেউ নেই, সেটা ভেবে আমি এক ধরনের আতঙ্ক অনুভব করি।
ঘড়ির সময় কিন্তু কোনো মন্ত্রী বা কোনো আমলার ব্যক্তিগত ইচ্ছা-অনিচ্ছার ব্যাপার নয়। এ ব্যাপারে সারা পৃথিবীর সব মানুষ একটা নিয়ম মেনে চলে। সেটা হচ্ছে, সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের ভেতরকার সময়ের ঠিক মাঝখানে ঘড়ির কাঁটার বারোটা হিসাবে ধরা হয়। এই মুহূর্তে আমাদের দেশে যে ঘড়ির কাঁটা রয়েছে, সেটা এই নিয়মটি মেনে চলছে। সরকার এটাকে পাল্টে দেওয়ার যে কুপরিকল্পনা করছে, সেটা করা হলে হঠাত্ করে এই অবস্থাটা পাল্টে যাবে। অন্য অনেকের থেকে আমার দুঃখ অনেক বেশি, কারণ ৯০ ডিগ্রি দ্রাঘিমা রেখাটি ঠিক বাংলাদেশের মাঝখান দিয়ে গিয়েছে, আমি কিছুতেই এটা ভুলতে পারি না। কাজেই আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে আমাদের যে ঘড়িটা চলছে, তার মধ্যে এক ধরনের সৌন্দর্য আছে, সেটাও আমি ভুলতে পারি না। দুঃখ হচ্ছে, যাঁরা কলমের এক খোঁচায় ঘড়ির কাঁটা সামনে-পিছে নিয়ে যান, তাঁদের কাছে আমার এই সৌন্দর্যবোধের কোনো মূল্য নেই।
আমি সরকারের কাছে করজোড়ে আবেদন করছি, আমাদের মতো দেশে ঘড়ির কাঁটা পরিবর্তনের এই নিষ্ঠুর খেলা খেলবেন না। বিদ্যুতের সাশ্রয় হয় বলে যে যুক্তি দিয়ে এটা শুরু হয়েছিল, সেটা নেহাতই খোঁড়া যুক্তি। আমি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছি, ঘড়ির কাঁটা পরিবর্তন করে এমন কোনো বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয়নি। সরকার ইচ্ছা করলেই ঘড়ির কাঁটা পরিবর্তন না করে শুধু দোকানপাট, অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজের সময়সূচির পরিবর্তন করে অনেক বেশি দক্ষতার সঙ্গে বিদ্যুতের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। সেটা হবে অনেক বেশি বুদ্ধিমানের কাজ।
এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হতে যাচ্ছে। আমাদের কাতর অনুনয় না শুনে সরকার যদি সত্যি সত্যি ঘড়ির কাঁটা পরিবর্তন করে দেয়, তাহলে এ দেশের লাখ লাখ ছেলেমেয়ে এক ধরনের বিড়ম্বনার মধ্যে পড়বে। আসল সময় কোনটা, কেউই সেটা জানবে না। সময়ের আগে যাবে, না পরে যাবে—সেটা নিয়ে এক বিশাল দুর্ভাবনায় সবাই দিশেহারা হয়ে যাবে। এ দেশে ঘড়ির কাঁটা পরিবর্তন করাটাই এক ধরনের অবিবেচকের সিদ্ধান্ত, আর এইচএসসি পরীক্ষার আগে আগে সেটা করার সিদ্ধান্ত হচ্ছে অমানবিক সিদ্ধান্ত (পৃথিবীর বিলাসী দেশগুলো সেটা করবে আরও দুই মাস পরে)।
সত্যি সত্যি যদি ঘড়ির কাঁটা পরিবর্তন হয়ে যায়, তাহলে আমি এ দেশের এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের কাছে ক্ষমা চেয়ে বলব, আমি দুঃখিত, তাদের এই বিড়ম্বনাটুকু সহ্য করতে হচ্ছে। শুধু মনে করিয়ে দেব যে আমি কিন্তু তাদের এই বিড়ম্বনা থেকে রক্ষা করার জন্য আমার পক্ষে যেটুকু সম্ভব, সেটুকু চেষ্টা করেছিলাম। -------------------মুহম্মদ জাফর ইকবাল


Click This Link
১২টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×