উৎসর্গঃ কাজী মামুন
(যার মাধ্যমে আমি নিজে নিজেকে চিনেছি, নিজেকে নিজে আবিষ্কার করেছি এবং করে চলেছি)
ভাল কবিতা কি বা কোনগুলো? প্রত্যেকের মনেই এর উত্তর আছে। একটু ভাবলেই বোঝা যায় যে, প্রত্যেকের মনে একটা শক্তি থাকে যার সাহায্যে আমরা ভাল কবিতাকে বিচার করে থাকি। অর্থাৎ সেই শক্তিবলেই আমরা কোন কবিতাকে ভাল বলে ঘোষনা দিয়ে থাকি। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি এই যে, ভাল কবিতা সম্পর্কে আমাদের সুনির্দিষ্ট ধারনা না থাকলেও আমরা এ ঘোষনা দিয়ে থাকি। আসলে এটাকে আমরা “রুচি” বলে অভিহিত করতে পারি। ভাল কবিতা কোনগুলো তার উপর স্বচ্ছ ধারনা না রেখেই শুধু সেই রুচির উপর নির্ভর করেই আমরা ভাল কবিতা নির্বাচন করে থাকি। এবং সেই রুচিকে আমরা সবসময় কথ্য ভাষাতেই বলে থাকি কিন্তু তা কখনো লেখ্য ভাষাতে ব্যক্ত করি না।
ভাল কবিতা নির্বাচন করতে রুচিবোধ যে গুরুত্বপূর্ণ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই রুচিবোধ মানুষের মধ্যে প্রাকৃতিকভাবেই সৃষ্টি হয়। কিন্তু এ রুচিবোধ ভাল কবিতা মাপার মাপকাঠি হতে পারে না। একেকজনের রুচি একেকরকম ফলে একজনের কাছে যে কবিতা ভাল বলে স্বীকৃ্ত তা অন্যের কাছে ভাল নাও হতে পারে। আর এখানেই গন্ডগলটা বাঁধে। নিজের রুচিই উৎকৃষ্ট- এটিকে প্রমাণ করাই আমাদের মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাড়ায়। কিন্তু তা কি করা উচিত? আবু সয়ীদ আইয়ুব বলেছেন, “রুচির নির্দেশ মেনে চলতে গিয়ে সমালোচনার ইতিহাস স্বৈরাচারের তালিকায় পরিণত হয়েছে।“ তিনি উদাহরন টানতে গিয়ে বলেছেন, “কাউলির প্রতিপত্তি তার সময়ে মিল্টনের চেয়ে অধিক ছিল এবং মিল্টন স্বয়ং তাকে শেক্সপিয়ার ও স্পেনসরের তুল্য জ্ঞান করতেন। অর্ধ শতাব্দী পরে পোপ্ অবজ্ঞাভরে প্রশ্ন করেছেন, কাউলি আজ পড়ে কে?”
এ রচনার প্রথম বাক্য বা প্রশ্নটিতে আবার ফিরে যেতে হচ্ছে। ভাল কবিতা কি বা কোনগুলো? সেগুলো চেনার উপায় কি? হ্যাঁ, এখানে প্রশ্নটির পিছনে একটু লেজুড় লাগিয়ে দিলাম। প্রশ্নের উওরে বলা যায় যে, কবিতা নিয়ে সমালোচনা করলে এর সমাধান হতে পারে। অর্থাৎ কবিতা নিয়ে পড়াশোনা করলে একটি পথ বেড়িয়ে আসতে বাধ্য। এবং ভাল কবিতা নিরূপণ করা সহজ হয়ে যাবে। অত্যন্ত আনন্দের সাথে জানাচ্ছি যে, বাংলা সাহিত্যে সমালোচনা সাহিত্য এতই সুবিশাল যে, প্রশ্নটির উত্তর আমরা সহজেই জানতে পারি। কিন্তু এখানেও সমস্যা থেকে যাই। আগেই বলেছি যে, সাহিত্য সমালোচনা এতই সুবিশাল যে, তা পড়ে শেষ করা সময় সাপেক্ষ। তাছাড়া বিভিন্ন সমালোচকের যুক্তির মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত সিন্ধান্তে পৌঁছানো অনেকের জন্যে সম্ভব নাও হতে পারে। তাহলে এর সহজ উপায় কি? বা কত সহজে আমরা এ প্রশ্নের উত্তরটি জেনে নিতে পারি? এবং তা কিভাবে? আবু সয়ীদ আইয়ুব তার আধুনিক কবিতা সংকলনে বইয়ের ভূমিকায় খুব সহজে এর উত্তর দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “কোন একটি ভাষায় নির্দিষ্ট কালের মধ্যে কিংবা বিশিষ্ট শ্রেণীর ভিতরে কোন কোন কবিতা ভাল, কাব্যসংকলন গ্রন্থকে এই প্রশ্নের উওর মনে করা যেতে পারে। অর্থাৎ কাব্যসংকলন কাব্য সমালোচনারই অন্তর্ভূক্ত।“
হ্যাঁ, এরকম একটি বইয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্যেই এই রচনার অবতারনা। আর সেই বইটি হচ্ছে, হুমায়ুন আজাদ সম্পাদিত “আধুনিক বাংলা কবিতা”। এ সংকলনটি আমাদের যেমন ভাল কবিতার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় ঠিক তেমনি আধুনিক বাংলা কবিতা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করা যায়। তবে এখানেও অনেকে আপত্তি তুলতে পারেন। কারন আধুনিক কবিতার সৃষ্টিলগ্নে, যেমন অনেকেই আছেন যারে আধুনিক কবির লেখাকে বেয়াড়া মনের বেয়াদবি মনে করতেন, তাদের সংখ্যা যে এ যুগে এসে কমেছে তা কে দাবী করতে পারে? এখানে আধুনিক কবিতা সম্পর্কে খুব ছোট করে ধারনা দেওয়া যেতে পারে। আধুনিক বাংলা কবিতার সংজ্ঞা নিরুপণ করতে গেলে বলতে হয় আধুনিক বাঙলা কাব্য মিশ্র সংস্কৃতির উপাসক।।
আবু সয়ীদ আইয়ুব তাঁর আধুনিক কবিতা সংকলনে বলেছেন, “কালের দিক থেকে মহাযুদ্ধ পরবর্তী এবং ভাবের দিক থেকে রবীন্দ্র-প্রভাবমুক্ত, অন্তত মুক্তি প্রয়াসী, কাব্যকেই আমরা আধুনিক কাব্য বলে গণ্য করেছি।“
তাই তিনটি লক্ষণের কথা বলা যায়-
১। কালের দিক থেকে আধুনিক বাঙলা কবিতা প্রথম মহাযুদ্ধ পরবর্তী।
২। ভাবের দিক থেকে রবীন্দ্র-প্রভাব থেকে মুক্তি লাভের প্রয়াসী।
৩। সৃষ্টির দিক থেকে তা নবতম সুরের সাধক।
তবে এ লক্ষণগুলোর মধ্যেই আমাদের আধুনিক বাঙলা কবিতা সীমাবদ্ধ নয়।
ভাবের দিক দিয়ে আধুনিক কবিতার সাধারণ লক্ষণগুলো হচ্ছেঃ
১। নগরকেন্দ্রিক যান্ত্রিক সভ্যতার অভিঘাত।
২।বর্তমান জীবনে ক্লান্তি ও নৈরাশ্যবোধ।
৩।আত্নবিরোধ ও অনিকেত মনোভাব।
৪।বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য হতে সচেতন গ্রহণ।
৫।ফ্রয়েডীয় মনোবিজ্ঞানের প্রভাব। অবচেতন মনের ক্রিয়াকে প্রশ্রয় দেওয়ার ফলে চিন্তাধারার অসম্বদ্ধতা।
৬। ফ্রেজার প্রমুখ নৃতাত্ত্বিক, ও প্লাঙ্ক, বোর, আইনস্টাইন প্রভৃতি আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানীর প্রভাব।
৭।মার্ক্সীয় দর্শনের, বিশেষত সাম্যবাদী চিন্তাধারার, প্রভাবে নতুন সমাজ সৃষ্টির আশা।
৮।মননধর্মিতা- অনেক সময় জ্ঞানের বিপুল ভারে দুরূহতার সৃষ্টি।
৯।বিবিধ প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধ (যেমন প্রেম, সুন্দর, কল্যাণ, ধর্ম) সংশয় এবং তৎসঞ্জাত অনিশ্চয়তার উদ্বেগ।
১০।দেহজ কামনা, বাসনা ও তৎপ্রসূত অনুভূতিকে স্বীকার করা এবং প্রেমের শরীরী রূপকে প্রত্যক্ষ করা।
১১।ভগবান এবং প্রথাগত নীতিধর্মে অবিশ্বাস।
১২।রবীন্দ্র- ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে সচেতন বিদ্রোহ ও নতুন সৃষ্টির পথসন্ধান।
বলা বাহুল্য, সব লক্ষণ কোন একটি বিশেষ কবির মধ্যে প্রকাশ পায়নি।
আধুনিক বাঙলা কবিতার লক্ষণ আলোচনায় আঙ্গিকের বৈশিষ্ট্যও সমমর্যাদা দাবি করে। এগুলো হচ্ছেঃ
১। বাকরীতি ও কাব্যরীতির মিশ্রণ।
২। অতীত ঐতিহ্যের সাথে নতুন অনুভূতির সমন্বয় সাধন।
৩। প্রচলিত কবিপ্রসিদ্ধ উপমা ও বর্ননার বিরলতম ব্যভার।
৪। প্রাচীন উপমা বা শব্দের অভিনব অর্থে প্রয়োগ এবং তৎসহযোগে নতুন চিত্রকল্প সৃষ্টি।
৫। শব্দ গঠনে মিতব্যয়িতা ও অর্থঘনত্ব সৃষ্টির চেষ্টা।
৬। নামবাচক বিশেষ্য বহুপদময় বিশেষণ, অব্যয় এবং ক্রিয়ার পূর্ণরূপের ব্যাবহার।
৭। চলতি ক্রিয়াপদের সাথে সংস্কৃতবহুল বিশেষ্য বা বিশেষণের সংযোগ।
৮। প্রচলিত পয়ার, সনেট অ মাত্রাপ্রধান ছন্দের রূপান্তর এবং মধ্যমিলের সৃষ্টি।
৯। গদ্যছন্দের ব্যবহার।
১০। ব্যঙ্গ, বিতর্ক, অদ্ভুত, বীভৎস রসের বহুল ব্যবহার।
১১। শব্দালংকার অপেক্ষা অর্থালংকারের বহুল ব্যবহার।
১২। বিষয়বৈচিত্র।
বইটির ভূমিকায় হুমায়ুন আজাদ বলেছেন, “মাত্র সাড়ে ছ-দশকে আধুনিক কবিতার যে উৎপাদন ঘটে, রবীন্দ্রনাথকে মনে রেখেও বলছি উৎকর্ষে ও পরিমানে তার তুলনা দূর্লভ।“
হুমায়ুন আজাদ বইটি উৎসর্গ করেছেন পাঁচ মহৎ আধুনিকের নামে- জীবনানন্দ দাশ, অমিয় চক্রবর্তী, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে। ভূমিকায় এই পাঁচ মহৎ আধুনিকের উদ্দেশ্যে বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন, “আধুনিক বাংলা কবিতার সাথে জড়িত একটি বিস্ময় হচ্ছে একই দশকে পাঁচজন মহৎ কবিত্র আবির্ভাব, আগে যা কখনো ঘটেনি; বাংলা কবিতাকে একজন মহৎ কবির জন্যে অপেক্ষা করতে হয়েছে শতাব্দীর পর শতাব্দী, তাই এক দশকে পাঁচ প্রধান কবির আবির্ভাব যারপরনাই বিস্ময়কর।“
আধুনিক বাংলা কবিতার গুরুত্ব বুঝাতে গিয়ে তিনি বলেছেন, আধুনিক কবিতা পূর্বে বাংলা কবিতা মর্মত অপ্রাপ্তবয়স্কদের কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতায়ই প্রথম বাংলা কবিতা যা প্রাপ্তবয়স্কদের কবিতা।“
বইটি শুরু হয়েছে জীবনানন্দ দাশের কবিতা দিয়ে। বইটিতে জীবনানন্দের বাইশটি কবিতা আছে। আমিয় চক্রবর্তীর উনিশটি, সুধীন্দ্রনাথ দত্তের বিশটি, বুদ্ধদেব বসুর উনিশটি এবং বিষ্ণুদের বিশটি। এছাড়াও কবিতা রয়েছে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, প্রমেন্দ্র মিত্র, অজিত দত্ত, সঞ্চয় ভট্টাচার্য, অরুন মিত্র, অশোকবিজয় রাহা, দিনেস দাস, সমর সেন, আহসান হাবীব, মণীন্ড রায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, অরুণকুমার সরকার, নরেশ গুহ, নীরেন্ধ্রনাথ চক্রবর্তী, আবদুল গনি হাজারী, সুকান্ত ভট্টাচার্য(৭টি), শামসুর রহমান(১৩টি), শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়, হাসাম হাফিজুর রহমান, শঙ্খ ঘোষ, পুর্ণেন্দু পুত্রী, আলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, শক্তি চট্টোপাধ্যায়(৭টি), সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সাধনা মুখোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার, অমিতাভ দাশগুপ্ত, সৈয়দ শামসুল হক(৬টি), শহীদ কাদরী(৭টি), সিকদার আমিনুল হক, রফিক আজাদ(৭টি), মোহাম্মদ রফিক, মহাদেব সাহা(৪টি), নির্মলেন্দু গুণ(৬টি), হুমায়ুন আজাদ(৬টি), আবুল হাসান(৬টি), ফরহাদ মজাহার, হুমায়ুন কবির। বইটির একেবারে শেষে প্রত্যেকটি কবির সংক্ষিপ্ত কবি পরিচিত রয়েছে।
কবিতার সংখ্যার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন, “পাঁচ মহৎ আধুনিকের আরো বেশি কবিতা নিতে পারলে আমি তৃপ্তি পেতাম, কিন্তু বইয়ের আকৃ্তির ভয়ে তাদের আরো কবিতা নিই নি। তারা ছাড়া অন্য প্রায় প্রত্যেক কবি সম্পর্কেই আমি প্রচারিত ধারনা থেকে ভিন্ন ধারনা পোষন করি; তাই বড়ো ভাবমূর্তিসম্পন্ন অনেকই এ সংকলনে ক্ষুদ্র আকার ধারন করেছেন। যেমন প্রেমেন্দ্র মিত্র, অচিন্ত কুমার”।
দ্বিতীয় মুদ্রণে তিনি বলেছেন, “ সংকলনটিকে প্রশংসা করার পর সৈয়দ শামসুল হক আমাকে বলেছিলেন, এটি পড়ে তিনি বুঝতে পেরেছেন বাংলা কবিতা কতো মাঝারি আর নিম্ন মাঝারি মাপের।“
আধুনিক বাংলা কবিতার সংকলন এটিই প্রথম নয়। যেমন বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত আধুনিক বাংলা কবিতা (১৯৫৪) সম্পর্কে তিনি বলেছেন, “এটি আধুনিক কবিতাকে পৌঁছে দিয়েছে পাঠকদের কাছে, আবার কাজ করেছে আধুনিক কবিতাও বিরুদ্ধেও। এটি শুরু হয়েছে রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে, যা এক বড়ো ভ্রান্তি; রবীন্দ্রনাথ মহৎ সন্দেহ নেই আর এতেও সন্দেহ নেই যে তিনি আধুনিক নন, রোমান্টিক; তাই স্থান পেতে পারে না আধুনিক বাংলা কবিতার সংগ্রহে।“
আবু সয়ীদ আইয়ুব ও হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত আধুনিক বাংলা কবিতা বইটি খুললেও আমরা একই দৃশ্য দেখতে পাই। এই বিতর্কের অবসান ঘটাতে পারে আবু সয়ীদ আইয়ুব রচিত “আধুনিকতা ও রবীন্দ্রনাথ” বইটি। এটি পড়ে জানা যায় যে রবীন্দ্রনাথের কবিতায় আধুনিক কবিতার মূল সুর অমঙ্গল্পবোধ একেবারে যে ছিল না তা না। তবে তিনি পুরোপুরি আধুনিক ছিলেন না। বরং তিনি শেষ জীবনে আধুনিক কবিতার কতৃ্ত্ব মেনে নিয়ে গদ্য কবিতাও রচনা করেছেন এবং তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে, কবিতার ভবিষ্যত গদ্য কবিতা।
পরিশেষে বলা যায়, হুমায়ুন আজাদ সম্পাদিত “আধুনিক বাংলা কবিতা” বইটি নিঃসন্দেহে অসাধারন একটি বই। এই বইটি খুব সহজে আমাদের ভাল কবিতার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। আধুনিক বাংলা কবিতা যে কতটা শক্তিশালী তা এই বইয়ের প্রত্যেকটি কবিতা পড়লেই আমরা অনুধাবন করতে পারি। এবং একসাথে এতো ভাল কবিতা পড়ার সৌভাগ্য অন্য কোন বইয়ে পাওয়া যাবে না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


